18/12/2025
আজ শুধু একজন শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যু হয়নি, আজ মৃত্যু হয়েছে আমাদের 'বিবেকের'। ১২ তারিখের বুলেট তার শরীর ঝাঁঝরা করে দিয়েছে, আর ১৮ তারিখের মৃত্যু আমাদের জানিয়ে দিলো। এই 'পলিটিক্যাল কসাইখানা' (Political Slaughterhouse) মেধাবীদের সহ্য করতে পারে না। কিন্তু, আজ আবেগের বশবর্তী হয়ে কান্নাকাটি করার আগে নিজেদের আয়নায় দেখুন। ওসমান হাদী কি শুধু এই মৃত্যু চেয়েছিলেন? না। তার বুকে জমে ছিল এক পাহাড়সম আক্ষেপ।
১. তার আক্ষেপ এবং আপনাদের অযোগ্যতা:
ওসমান হাদী বারবার তরুণদের ডেকে বলতেন,'ভাইয়েরা, শুধু স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করা যায় না। তোমরা স্কিলড হও। তোমরা ইংরেজি শেখো, আরবি শেখো, আইটি শেখো, ফটোগ্রাফি শেখো।'
কিন্তু নির্মম সত্য হলো, যখন তিনি রাজপথে কঠোর বক্তৃতা দিতেন, তখন হাজার হাজার মানুষ তালি দিতেন। আর যখন তিনি 'স্কিল ডেভেলপমেন্ট' বা পড়াশোনা নিয়ে কথা বলতেন, তখন আপনারা থাকতেন না। তিনি হতাশ হয়ে বলতেন, 'তোমাদের শিখতে বললে কেউ আসো না, কিন্তু মারামারি করতে বললে সবাই রাজি।' আজ তার নিথর দেহ আপনাদের সেই অযোগ্যতার দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করছে, যেই যোগ্যতা অর্জন করতে তিনি বারবার মিনতি করেছিলেন, সেটা না করে আজ তার জন্য কাঁদা কি ভণ্ডামি নয়?
২. আধিপত্যবাদ রুখতে হলে 'মগজ' লাগে:
তিনি বুঝেছিলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদ বা ভিনদেশী আগ্রাসন শুধু লাঠি দিয়ে ঠেকানো যাবে না। ওদের হারাতে হলে ওদের ভাষার দখল থাকতে হবে। মিডিয়া চালানোর মতো ফটোগ্রাফি ও এডিটিং জানতে হবে। জিওপলিটিক্স বোঝার মতো আন্তর্জাতিক জ্ঞান (ইংরেজি/আরবি) থাকতে হবে।
তিনি চেয়েছিলেন আমরা যেন 'ইমোশনাল জম্বি' না হয়ে 'গ্লোবাল কম্পিটিটর' হই। কারণ, একজন অযোগ্য দেশপ্রেমিকের চেয়ে একজন দক্ষ নাগরিক দেশের জন্য বেশি জরুরি।
৩. ইনকিলাব মঞ্চ ও সাংস্কৃতিক লড়াই:
ওসমান হাদী জানতেন। ভিনদেশী সংস্কৃতি (বলিউড/সিরিয়াল) আমাদের মগজ খেয়ে ফেলেছে। তাই তিনি 'ইনকিলাব মঞ্চ' গড়েছিলেন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, তাহজীব আর তামাদ্দুনকে রিভাইভ করার জন্য। তিনি চেয়েছিলেন আপনারা ক্যামেরা হাতে নিজেদের গল্প বিশ্বকে জানান, কলম হাতে নিজেদের ন্যারেটিভ তৈরি করুন। কিন্তু আপনারা তা করেননি। আপনারা শুধু তাকে 'নেতা' বানিয়ে দায় সেরেছেন।
৪. প্রতিশোধের ধরণ পাল্টান:
ওসমান হাদীর খুনের বদলা কোনো ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ নয়। ওটা তো তিনি ঘৃণা করতেন। তার প্রতি যদি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা থাকে, তবে আজ লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কসম করুন: আর কোনোদিন সময়ের অপচয় করবেন না। আগামী ৬ মাসের মধ্যে নিজেকে কোনো না কোনো স্কিলে (ভাষা, টেকনোলজি, মিডিয়া) দক্ষ করে তুলবেন। নিজেদের যোগ্য করে এমন জায়গায় নিয়ে যাবেন, যেন এই সিস্টেম বা কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি আপনাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পায়।
ওসমান ভাই, আমাদের মাফ করবেন। আপনি বেঁচে থাকতে আমরা আপনার 'স্কিল' শেখার গুরুত্ব বুঝিনি, আমরা আবেগের নেশায় বুঁদ ছিলাম। তবে কথা দিচ্ছি, আপনার এই রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেব না। আপনার দেখিয়ে যাওয়া পথেই আমরা নিজেদের 'হিউম্যান রিসোর্স' হিসেবে গড়ে তুলব। আমরাই হব আপনার সেই স্বপ্নের 'স্কিলড জেনারেশন', যারা বুক চিতিয়ে বিশ্বমঞ্চে লড়বে।
শহীদ ওসমান হাদী, আপনার আক্ষেপই আজ আমাদের বারুদ। আপনি আমাদের চিরকালের দায়, দরদ, দোয়া এবং দ্রোহের লড়াই...