11/08/2026
SSC-তে ৪.৮১ থেকে ৪৫তম BCS-এ প্রশাসন ও ৪৬তম BCS-এ পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত—আমার গল্পটা আসলে বারবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার গল্প।
SSC তে ৪.৮১ পাওয়ার পরে আব্বা বলেছিল HSC তে আমাকে আর সায়েন্সে পড়াবে না।
এমন বলার অবশ্য যৌক্তিক কারণও ছিল। প্রাথমিক থেকে শুরু করে SSC পর্যন্ত প্রতিটি রেজাল্টেই তাকে হতাশ করেছি। ২য় শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ফাস্ট বয় ছিলাম, কিন্তু ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি পাইনি। আর SSC তে করলাম এক হতাশাজনক রেজাল্ট।
আমার কাছে অত্যাধিক প্রত্যাশার চাপ ছিল। তাই বৃত্তি পরীক্ষা বা বোর্ড পরীক্ষায় ১/২টা সাবজেক্টে খারাপ করে বসতাম। পরীক্ষার পরে আব্বাকে আবার মিথ্যা আশ্বাস দিতাম—বৃত্তি পাব, গোল্ডেন আসবে—এসব।
তবে জীবনের সেরা কামব্যাকটা দিয়েছিলাম HSC তে।
আব্বাকে বললাম, হয় আমাকে সায়েন্সে পড়াতে হবে, না হয় আমি পড়বই না। অবশেষে তিনি রাজি হলেন। গ্রাম থেকে আমাকে উপজেলায় ছোট চাচার বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হল।
ভোর ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রুটিন চলত। SSC তে A+ মিসের হতাশা সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়াতো। তাই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম—যত কষ্টই করা লাগুক, HSC তে A+ পেতেই হবে।
হায়ার ম্যাথ আর কেমিস্ট্রির জৈব যৌগের রিয়েকশন এত বেশি প্র্যাকটিস করতাম যে আমার আঙুলের এক পাশ ফুলে গিয়েছিল—এখনও সেই ফোলা ভাব আছে।
আর যখন হতাশ হতাম, শিব খেরার “You Can Win” বইয়ের মোটিভেশনাল গল্পগুলো পড়তাম। বইটা আমার কঠিন সময়ে ভীষণ মোটিভেট করেছে।
অবশেষে HSC তে কাঙ্খিত GPA-5 পেলাম। আব্বার সাথে করা প্রথম চ্যালেঞ্জে জয়লাভ করলাম।
এরপর আবার ব্যর্থতা।
মেডিকেলে দুইবার চেষ্টা করেও চান্স পেলাম না। অবশেষে জবিতে ফার্মেসীতে ভর্তি হই।
মেডিকেলে চান্স না পাওয়ার হতাশা আর তীব্র সেশনজটের কারণে ভার্সিটি লাইফে খুব একটা পড়াশোনা করতাম না যদিও সেইসব পড়া আবার চাকরির ভাইভার জন্য পড়তে হয়েছে। ৪ বছরের কোর্স লেগেছে ৬বছর!
নিয়মিত ক্লাস করতাম তাই মোটামুটি পাশ করে যেতাম। ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে প্রচুর মুভি, ডকুমেন্টারি দেখতাম আর ব্লগ পড়তাম। আর লেখালেখির অভ্যাসও কিছুটা ছিল।
শেষ পর্যন্ত অনার্স ও মাস্টার্সে ফাস্ট ক্লাস নিয়ে বের হতে পেরেছিলাম।
৭ম সেমিস্টারে উঠে মনে হলো ক্যারিয়ারে কোনো এক দিকে ফোকাস করা দরকার। বিসিএস নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করলাম।
৪১তম বিসিএসে প্রিলি টিকলাম, কিন্তু লিখিত পরীক্ষা ভালো দিতে পারলাম না। কারণ খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম—আমার প্রস্তুতিই গোছানো ছিল না।
৪১তম লিখিত পরীক্ষার পর প্রায় ৩ মাস শুধু নোট করেছিলাম। প্রস্তুতি গোছালো হয়ে গেল। এরপর একের পর এক পরীক্ষায় ভাইভা দিতে লাগলাম।
১১ গ্রেডের একটা চাকরি পেয়েও জয়েন না করার সিদ্ধান্ত নিলাম—এই ভেবে যে বিসিএসে আরও এফোর্ট দেওয়া প্রয়োজন।
আমার মতো মিডিওকোর প্রোফাইলের একজনের জন্য এটা খুব রিস্কি একটা ডিসিশন ছিল। কাছের কয়েকজন পাগলও বলেছিল।
কিন্তু আমার নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল—আমি ৯ম গ্রেডের একটা চাকরি পাওয়ার মতো ক্যালিবারে নিজেকে নিয়ে যেতে পারব।
সেই আত্মবিশ্বাসেই প্রায় ২০টা চাকরির ভাইভার সুযোগ পেয়েছি , যার ১৬ টিই ৯ম গ্রেডের।
৪১তম বিসিএসের পরে ৪৩তম ও ৪৪তম বিসিএসেও ক্যাডার পেলাম না।
কিন্তু থামিনি।
অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন আর ৪৬তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলাম।
SSC পর থেকেই আমি নিজেকে মাঝারি মানের স্টুডেন্ট মেনে নিয়েছি, কিন্তু নিজের উন্নতির জায়গায় কখনও কমপ্রোমাইজ করিনি।
SSC-এর খারাপ ফল মানে জীবন ব্যর্থ—এমনটি ভাবা সমীচীন নয়।
জীবন আমাদেরকে বারবার সুযোগ দেয়। আমরা নিজের প্রতি কতটা সৎ থেকে নিজের করা কমিটমেন্টকে রক্ষা করতে পারলাম, সেটাই মূলত পার্থক্য গড়ে দেয়।
আমি সবাইকে বিসিএস ক্যাডার হতে বলছি না। আমি শুধু চাই, যারা খারাপ ফল করেছে তারা যেন ভেঙে না পড়ে।
জীবন অপার সম্ভাবনাময়। কে কোথা থেকে শুরু করেছে সেটা নয়, সীমিত সময়কে কে কতটা কাজে লাগাতে পারলো—সেটাই বড় বিষয়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—
আজ অনেকের অভিভাবক হয়ত ছেলে/মেয়ের খারাপ ফলের কারণে বকাঝকা করছে। কিন্তু সেই সন্তান হয়ত একদিন অনেক ভালো কিছু করবে—শুধু দুর্ভাগ্যবশত তার বাবা/মা হয়ত সেটা দেখে যেতে পারবে না।
তাই ফলাফল খারাপ হলে সন্তানকে ভেঙে না দিয়ে তাকে একটু সময় দিন, বিশ্বাস করুন এবং চেষ্টা করার সুযোগ দিন।
–
© S.M. NASIR UDDIN
৫ম শ্রেণী—বৃত্তি মিস
৮ম শ্রেণী—বৃত্তি মিস
SSC—4.81
45th BCS—Administration Cadre (Recommended)
46th BCS—Foreign Affairs Cadre (Recommended)