02/02/2018
একটা সময় ছিল যখন পরীক্ষার আগে প্রিয়জনরা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন, 'ভালো করে পরীক্ষা দিও।' কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। ভালো পরীক্ষা এখন আমরা সবাই-ই দিই। বাইকের ধোঁয়ার সঙ্গে প্রেমিকার চুল উড়িয়ে যে ছেলেটা শহর কাঁপায়, শিক্ষকদের সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে যার ভেতরটা একটুও কেঁপে ওঠে না, এখন তারাও ভালো পরীক্ষা দেয়।
আবার ছিপছিপে তেলা মাথার যে ছেলেটা দিন-রাত এক করে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকে, যাকে আমরা 'আতেল' বলে ডাকি, সে-ও ভালো পরীক্ষা দেয়। তাহলে তফাৎটা কোথায়? তফাৎটা হল বিবেকে।
পরীক্ষার আগের দিন রাতে ফেসবুকে তোমার পেছনের সীটে বসা বন্ধু বলতে পারে, 'দোস্ত প্রশ্ন পাইছি, লাগবে নাকি? আবার পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে যখন দেখবে তোমার সব বন্ধুরা জড় হয়ে প্রশ্ন সলভ করে পরীক্ষার হলে ঢুকছে, তখন তোমার ভেতরের ভালো আর খারাপ সত্ত্বাদুটো একসঙ্গেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তুমি দ্বিধায় পড়ে যাবে। অন্যায় করার আগে সেই অন্যায়ের পক্ষে শত শত যুক্তি জমা পড়তে থাকবে মস্তিষ্কে। সে তুলনায় ন্যায়ের পক্ষে খুব কম যুক্তি-ই খুঁজে পাবে তুমি।
পরীক্ষা দেবার সময় কোন একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেলে প্রচণ্ড আফসোস হবে, 'ইস, হলে ঢোকার আগে একবার চোখ বুলালেই হয়ে যেতো।' এরপর পরীক্ষা শেষে যখন দেখবে সবাই হাসিমুখে বের হচ্ছে আর তুমি দশ নাম্বার উত্তরই করতে পারোনি, তখন মনে হতে থাকবে, কাল থেকে আমিও প্রশ্ন সলভ করেই পরীক্ষার হলে ঢুকবো।
হয়তো এতে তোমার ফলাফল অনেক ভালো হবে। কিন্তু একবার কী ভেবে দেখেছো সারাটা জীবন তোমাকে একটা অপরাধবোধ বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে। দিনশেষে একেবারেই একলা হয়ে যখন তুমি ডিমলাইটের দিকে তাকিয়ে ঘুমের জন্য অপেক্ষা করবে, তখন কি তুমি নিস্তার পাবে সেই অপরাধবোধ থেকে? তোমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকবে সেই অনুভূতি। তখন তুমি উপলব্ধি করতে পারবে এ+ এর জায়গায় অন্তত এ পেলেও আজ তুমি অনেক শান্তিতে থাকতে পারতে।
এতোসব কথা বলার মানে কিন্তু এই না যে আমি অনেক সাধু একটা মানুষ। ভুল-ত্রুটি নিয়েই আমাদের এই জীবন। কিন্তু তোমরা কখনোই এমন কিছু ভুল করো না যে ভুলের জন্য তোমার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শাস্তি পেয়ে যেতে হয়। এখন আবার শাস্তি বলতে ঐ জেলখানার লোহার শিকলের পেছনের দুনিয়াটাকে বুঝো না। তার চেয়েও অনেক বড় একটি শাস্তি হল এই অপরাধবোধটা নিয়ে বাকি জীবনটা পার করে দেওয়া।
আর হ্যাঁ, আজ এই কথাগুলো বলতে পারছি একারণেই যে সেই দিনগুলোতে পরীক্ষার হলের বাইরে জমে থাকা সব জটলাকে মুচকি হাসি দেখিয়ে তাদের পাশ কাটাতে পেরেছিলাম। অন্যায়ের পক্ষে জড়ো হওয়া সব যুক্তিদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পেরেছিলাম। কারণ আমি ভালো করেই জানতাম, খারাপ ফলাফল নিয়ে বাকি জীবনটা পার করা যতোটা সহজ, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশিগুণ কঠিন এরকম একটি অপরাধবোধ কাঁধে নিয়ে বাকি জীবনটা পার করা।
তাই ভালো করে পরীক্ষা দেবার পাশাপাশি তোমাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ- ভালো পন্থায় পরীক্ষা দিও।
তোমাদের সকলের প্রতি অনেক অনেক শুভ কামনা ও বুকভরা ভালোবাসা রইল।
লেখা : মেহেদী হাসান গালিব।