29/03/2026
বাজারের ব্যাগটা মায়ের হাতে দিয়ে বাবা বলেন, শুনো মাংসের ভিতরে আজকে আলু দিবে না। আলু দিলে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়, আলুর স্বাদ মিশে যায়। মাংস খাই না আলু খাই বুঝতে পারি না।
মা ব্যাগটা খুলে মাংসের পলিথিন বের করে বলেন, এইটুকু মাংস যদি রান্না করি খুব অল্প হয়ে যাবে। এতোগুলা মানুষ দুই বেলা খাবে কিভাবে?
দুইবেলা খাবার দরকার নেই, একবেলাই খাবো, আরেকবলা না হয় অন্য কিছু দিয়ে খাবে সবাই।’
মা বাবার কথায় সম্মতি দেয়না। আমরা তিন ভাই বোন, দাদী থাকে আমাদের সাথে। সবমিলিয়ে বাসায় ছয়জন মানুষ, ছোটো চাচাও এসেছেন গতকাল রাতে।
বাবা মায়ের এই ঝগড়া ধারাবাহিক নাটকের মতো সেই দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। মা চাইছেন মাংসে আলু দিবেন, বাবা মাংসের ভিতরে আলু দিয়ে রান্না পছন্দ করেন না।
মা বলেন, দেখো তুমি একা মানুষ তো আর ঘরে না। ছেলেমেয়েরা আছে, ওরা একটু আলুর সাথে এক টুকরা মাংস সাথে ঝোল দিয়ে তৃপ্তি করে খেতে পারে। দুই বেলাই তাহলে মাংস দিয়ে হয়ে যাবে, রাতে আবার বাড়তি কিছু রান্না করতে হবে না।
মায়ের কথায় বড় আপা আর বড় ভাইজান এসে সম্মতি দিয়ে বলে, হ্যাঁ বাবা মাংসে আলুই খাবো আমরা। মাংসের সাথের আলু খেতেও অনেক ভালো লাগে।
বাবা মায়ের সাথে রাগী গলায় বলে, তোমাদের যা খুশি করো। আমি মাংস খাবো না, ভাতের ভিতরে আলু সিদ্ধ দিবে। আমার জন্যে শুধু ভর্তা বানাবে।
মা মন খারাপ করে রান্নাঘরে চলে যায়। অনেকদিন পরে বাসায় মাংস কেনা হয়েছে, পলিথিনে এক কেজি মাংস। চাচা আসছেন সেই উপলক্ষে মূলত মাংস কেনা।
মায়ের পিছু পিছু আমিও রান্নাঘরে যাই। বাসায় যেদিন মাংস রান্না হয় আমরা তিন ভাই বোন মায়ের সাথে ঘুরঘুর করি, মা কখনো বিরক্ত হয়ে বলেন ঘরের ভিতরে যেতে তবে আমরা যাই না। অপেক্ষা করি কখন পাতিল থেকে এক টুকরো মাংস তুলে বাটিতে দিবেন, সাথে তিন পিস গরম আলু। এর আগে একবার গরম আলু মুখে দিয়ে বড় আপার জিভ পুড়ে গেছিলো, চারদিন আর কিছু মুখে তুলতে পারেনি। এরপর মা বাটিতে মাংস আর আলু তুলে ফু দিয়ে দেন, নয়তো ঘরের ভিতরে ফ্যানের নিচে চলে আসি।
মা আলু কেটে টুকরো করে একটা পাতিলে রাখেন, বড় আপা আলু ধুয়ে দেয়। ভাত হতে এখনো অনেক বাকি, কেবল বসিয়েছে।
মাংস চুলায় বসানোর সাথে সাথে আমরা তিন ভাইবোন রান্নাঘরের পাশে দাঁড়াই। অপেক্ষা করি কখন মা বাটিতে মাংসের টুকরা আর আলু দিবেন।
মা রাগী চোখে বলেন, আজকে আর খাবারের আগে মাংস পাবি না। বাসায় তোর চাচা এসেছে, আজকে বাটিতে আগে মাংস দিবো না।
মায়ের কথাশুনে বুঝতে পারি আজকে সত্যিই মাংস দিবেন না, একসময় মন খারাপ করেই চলে যাই। তাড়াতাড়ি গোসল করে নেই সবাই। এখন মাংস হলেই ভাত খেতে বসবো।
বাবা রাগ করে দুপুরে মাংস প্লেটে তুলেননি। ছোটো চাচা যখন বলেন, ভাইয়া তুমি মাংস খাবে না? বাবা মৃদু হেসে বলে, বুঝলি আমার এলার্জি মাংস খেতে পারি না এখন, যন্ত্র*ণা শুরু হয়।
মা আর বাবাকে জোরাজুরি করেনি। একটা বাটিতে আলাদা করে বাবার জন্যে তরকারি তুলে রাখে, রাতে বাবার সামনে দিবেন ঠিক করে রেখেছে।
মাংস আর আলু দিয়ে আমরা তিনজনেই ভরপেটে খাবার খাই। আমাদের প্লেটের পাশে মাংস থাকে, শুধু ঝোল দিয়েই ভাত খেয়ে নেই। পরে মাংস আর আলু অল্প অল্প খাই। আমরা তিনজনেই এরকম খাই। অবশ্য খাবারের এই কৌশল শিখেছি বড় আপার কাছ থেকে।
ছোটো চাচা সন্ধ্যায় চলে যায়। রাতে খাবার খেতে বসলে মা আলু আর এক টুকরো মাংস সাথে প্লেটে দেন। বাবার প্লেটে একটু বেশিই আলু আর মাংস দেয়। বাবা এবারও বলেন সে খাবে না। টেবিলেই খেতে আসেনি।
মা খাবারটা নিয়ে রান্নাঘরে রাখে। সবার খাওয়া শেষে দাদী বাবার কাছে খাবার নিয়ে যায়। মা জানেন বাবা দাদীর কথা ফেলবেন না।
বাবা বলেন, মা দেখো আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। আর দেখলাম এই ঘরে আমার কথার গুরুত্ব নেই।
দাদী বলেন, রাগ করিস না খালিদ। বউমা তো সবার কথা চিন্তা করেই আলু দিয়েছে, যেনো দুইবেলা বাচ্চারা খেতে পারে। ওরা মাংস রান্না হলে সেদিন এতো আনন্দ করে তাইতো অল্প অল্প যেনো খেতে পারে তাই আলু দেয় সাথে।
দাদী বাবার পাশে বসে বলেন, খালিদ তোরা ছিলি সাত ভাই বোন। একটা মুরগীতে একবেলা হতো না। তোর বাবারও পছন্দ ছিলো শুধু মাংস খাওয়া। তবে সাত ছেলেমেয়ের জন্যে মাংসের ভিতরে কখনো আলু দেওয়া ছাড়া রান্না করতে পারিনি। আলু যখন দেই তখন তরকারি বেড়ে যায়, রাতেও তোরা খাইতে পারতি। সংসারে কিছু কৌশল আছে, সেই কৌশল তোরা পুরুষরা বুঝিস না তবে একজন মা ঠিকই বুঝে। মা যখন হয় তখন অনেক কৌশল করে সংসার সামাল দিতে হয়। বউমা যা করে এই সংসারের জন্যেই করেছে।
বাবা দাদীর কথা শুনে এবার চুপচাপ খেতে বসে।
আমাদের বাসায় মাংস কেবল বিশেষ দিনে কেনা হতো। মাসে দুই একবার মুরগী কেনা হতো। তবে এরপর আর বাবাকে তরকারির ভিতরে আলু দেওয়া নিয়ে মায়ের সাথে তর্ক করতে দেখিনি।
দেখতে দেখতে বহুবছর চলে যায়, বড় আপার বিয়ে হয়েছে। বড় ভইজান বিয়ে করেছেন, আমি কেবল নতুন একটা চাকরিতে যোগ দিয়েছি। কোম্পানির চাকরি তবে বেতন বেশ ভালো। বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, অল্প কিছু টাকা পেয়েছে তার অফিস থেকে। ভাইয়া আর আমার টাকাতেই এখন সংসার চলে।
ভাইয়া সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে এসেছেন কেবল, আমার আজকে ছুটি ছিলো। ভাইয়া বাসায় এসেই মায়ের হাতে একটা ব্যাগ দেয়, মা বলেন কি এর ভিতরে? ভাইয়া বলেন, মা মাংস আছে দুই কেজির বেশি হবে। এখনই রান্না করবে কেমন? আর মাংসের ভিতরে কোনো আলু দিবে না।
মা ব্যাগটা হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন, তখনই ভাবি আসেন ছুটে। মা একপাশে যেয়ে চোখমুছে নেয়।
ভাবি আর মা মাংস রান্না করছেন, পুরো ঘরভর্তি মাংসের ঘ্রাণ। বাবা এখন তেমন হাঁটাচলা করতে পারেন না, বিছানায়ই থাকেন সারাদিন।
রান্না হলেই আমরা সবাই টেবিলে বসি। বাবা দেখেন আজকে শুধু মাংস ভুনা করা হয়েছে, মাংসের ভিতরে কোনো আলু নেই। বাবা অল্প দুই টুকরা দিতে বলেন, যেহেতু আলু নেই, হয়তো সবার মাংসে হবে না তাই অল্প মাংসই প্লেটে নেয়। পাশ থেকে মা বলেন, পাতিলে আরো অনেক মাংস আছে তুমি আরেকটু নেও। মা বাবার প্লেটে মাংস তুলে দেয়।
আমার ভাতের প্লেটে হাতে থেমে থাকে। কিছুসময় পরে যেনো একটা স্বপ্নভঙ্গ হয়, তারপর মুখে ভাত তুলে নেই।
এরপর আমরা দুই ভাই যখনই বেতন পাই বাসায় মাংস কিনি, বাবার পছন্দমতো সেই মাংস রান্না হয়। বাবা আজকাল বাচ্চাদের মতো চুলার উপরে থাকা মাংস খেতে চায়, মা বাটিতে তুলে বাবার ঘরে মাংস দিয়ে আসে। আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য মনে হয় রান্নাঘর থেকে বাটিতে মাংস নিয়ে মা যখন বাবার ঘরের দিকে যায়।
কেমন লাগলো জানাবেন প্লিজ
#অল্পস্বল্পগল্প #ভাইরাল_গল্প #সংগৃহীত
28/03/2026
28/03/2026
28/03/2026