অল্প স্বল্প গল্প

অল্প স্বল্প গল্প

Share

Education For All.

29/03/2026

বাজারের ব্যাগটা মায়ের হাতে দিয়ে বাবা বলেন, শুনো মাংসের ভিতরে আজকে আলু দিবে না। আলু দিলে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়, আলুর স্বাদ মিশে যায়। মাংস খাই না আলু খাই বুঝতে পারি না।

মা ব্যাগটা খুলে মাংসের পলিথিন বের করে বলেন, এইটুকু মাংস যদি রান্না করি খুব অল্প হয়ে যাবে। এতোগুলা মানুষ দুই বেলা খাবে কিভাবে?

দুইবেলা খাবার দরকার নেই, একবেলাই খাবো, আরেকবলা না হয় অন্য কিছু দিয়ে খাবে সবাই।’

মা বাবার কথায় সম্মতি দেয়না। আমরা তিন ভাই বোন, দাদী থাকে আমাদের সাথে। সবমিলিয়ে বাসায় ছয়জন মানুষ, ছোটো চাচাও এসেছেন গতকাল রাতে।

বাবা মায়ের এই ঝগড়া ধারাবাহিক নাটকের মতো সেই দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। মা চাইছেন মাংসে আলু দিবেন, বাবা মাংসের ভিতরে আলু দিয়ে রান্না পছন্দ করেন না।

মা বলেন, দেখো তুমি একা মানুষ তো আর ঘরে না। ছেলেমেয়েরা আছে, ওরা একটু আলুর সাথে এক টুকরা মাংস সাথে ঝোল দিয়ে তৃপ্তি করে খেতে পারে। দুই বেলাই তাহলে মাংস দিয়ে হয়ে যাবে, রাতে আবার বাড়তি কিছু রান্না করতে হবে না।

মায়ের কথায় বড় আপা আর বড় ভাইজান এসে সম্মতি দিয়ে বলে, হ্যাঁ বাবা মাংসে আলুই খাবো আমরা। মাংসের সাথের আলু খেতেও অনেক ভালো লাগে।

বাবা মায়ের সাথে রাগী গলায় বলে, তোমাদের যা খুশি করো। আমি মাংস খাবো না, ভাতের ভিতরে আলু সিদ্ধ দিবে। আমার জন্যে শুধু ভর্তা বানাবে।

মা মন খারাপ করে রান্নাঘরে চলে যায়। অনেকদিন পরে বাসায় মাংস কেনা হয়েছে, পলিথিনে এক কেজি মাংস। চাচা আসছেন সেই উপলক্ষে মূলত মাংস কেনা।

মায়ের পিছু পিছু আমিও রান্নাঘরে যাই। বাসায় যেদিন মাংস রান্না হয় আমরা তিন ভাই বোন মায়ের সাথে ঘুরঘুর করি, মা কখনো বিরক্ত হয়ে বলেন ঘরের ভিতরে যেতে তবে আমরা যাই না। অপেক্ষা করি কখন পাতিল থেকে এক টুকরো মাংস তুলে বাটিতে দিবেন, সাথে তিন পিস গরম আলু। এর আগে একবার গরম আলু মুখে দিয়ে বড় আপার জিভ পুড়ে গেছিলো, চারদিন আর কিছু মুখে তুলতে পারেনি। এরপর মা বাটিতে মাংস আর আলু তুলে ফু দিয়ে দেন, নয়তো ঘরের ভিতরে ফ্যানের নিচে চলে আসি।

মা আলু কেটে টুকরো করে একটা পাতিলে রাখেন, বড় আপা আলু ধুয়ে দেয়। ভাত হতে এখনো অনেক বাকি, কেবল বসিয়েছে।

মাংস চুলায় বসানোর সাথে সাথে আমরা তিন ভাইবোন রান্নাঘরের পাশে দাঁড়াই। অপেক্ষা করি কখন মা বাটিতে মাংসের টুকরা আর আলু দিবেন।

মা রাগী চোখে বলেন, আজকে আর খাবারের আগে মাংস পাবি না। বাসায় তোর চাচা এসেছে, আজকে বাটিতে আগে মাংস দিবো না।

মায়ের কথাশুনে বুঝতে পারি আজকে সত্যিই মাংস দিবেন না, একসময় মন খারাপ করেই চলে যাই। তাড়াতাড়ি গোসল করে নেই সবাই। এখন মাংস হলেই ভাত খেতে বসবো।

বাবা রাগ করে দুপুরে মাংস প্লেটে তুলেননি। ছোটো চাচা যখন বলেন, ভাইয়া তুমি মাংস খাবে না? বাবা মৃদু হেসে বলে, বুঝলি আমার এলার্জি মাংস খেতে পারি না এখন, যন্ত্র*ণা শুরু হয়।

মা আর বাবাকে জোরাজুরি করেনি। একটা বাটিতে আলাদা করে বাবার জন্যে তরকারি তুলে রাখে, রাতে বাবার সামনে দিবেন ঠিক করে রেখেছে।

মাংস আর আলু দিয়ে আমরা তিনজনেই ভরপেটে খাবার খাই। আমাদের প্লেটের পাশে মাংস থাকে, শুধু ঝোল দিয়েই ভাত খেয়ে নেই। পরে মাংস আর আলু অল্প অল্প খাই। আমরা তিনজনেই এরকম খাই। অবশ্য খাবারের এই কৌশল শিখেছি বড় আপার কাছ থেকে।

ছোটো চাচা সন্ধ্যায় চলে যায়। রাতে খাবার খেতে বসলে মা আলু আর এক টুকরো মাংস সাথে প্লেটে দেন। বাবার প্লেটে একটু বেশিই আলু আর মাংস দেয়। বাবা এবারও বলেন সে খাবে না। টেবিলেই খেতে আসেনি।

মা খাবারটা নিয়ে রান্নাঘরে রাখে। সবার খাওয়া শেষে দাদী বাবার কাছে খাবার নিয়ে যায়। মা জানেন বাবা দাদীর কথা ফেলবেন না।

বাবা বলেন, মা দেখো আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। আর দেখলাম এই ঘরে আমার কথার গুরুত্ব নেই।

দাদী বলেন, রাগ করিস না খালিদ। বউমা তো সবার কথা চিন্তা করেই আলু দিয়েছে, যেনো দুইবেলা বাচ্চারা খেতে পারে। ওরা মাংস রান্না হলে সেদিন এতো আনন্দ করে তাইতো অল্প অল্প যেনো খেতে পারে তাই আলু দেয় সাথে।

দাদী বাবার পাশে বসে বলেন, খালিদ তোরা ছিলি সাত ভাই বোন। একটা মুরগীতে একবেলা হতো না। তোর বাবারও পছন্দ ছিলো শুধু মাংস খাওয়া। তবে সাত ছেলেমেয়ের জন্যে মাংসের ভিতরে কখনো আলু দেওয়া ছাড়া রান্না করতে পারিনি। আলু যখন দেই তখন তরকারি বেড়ে যায়, রাতেও তোরা খাইতে পারতি। সংসারে কিছু কৌশল আছে, সেই কৌশল তোরা পুরুষরা বুঝিস না তবে একজন মা ঠিকই বুঝে। মা যখন হয় তখন অনেক কৌশল করে সংসার সামাল দিতে হয়। বউমা যা করে এই সংসারের জন্যেই করেছে।

বাবা দাদীর কথা শুনে এবার চুপচাপ খেতে বসে।

আমাদের বাসায় মাংস কেবল বিশেষ দিনে কেনা হতো। মাসে দুই একবার মুরগী কেনা হতো। তবে এরপর আর বাবাকে তরকারির ভিতরে আলু দেওয়া নিয়ে মায়ের সাথে তর্ক করতে দেখিনি।

দেখতে দেখতে বহুবছর চলে যায়, বড় আপার বিয়ে হয়েছে। বড় ভইজান বিয়ে করেছেন, আমি কেবল নতুন একটা চাকরিতে যোগ দিয়েছি। কোম্পানির চাকরি তবে বেতন বেশ ভালো। বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, অল্প কিছু টাকা পেয়েছে তার অফিস থেকে। ভাইয়া আর আমার টাকাতেই এখন সংসার চলে।

ভাইয়া সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে এসেছেন কেবল, আমার আজকে ছুটি ছিলো। ভাইয়া বাসায় এসেই মায়ের হাতে একটা ব্যাগ দেয়, মা বলেন কি এর ভিতরে? ভাইয়া বলেন, মা মাংস আছে দুই কেজির বেশি হবে। এখনই রান্না করবে কেমন? আর মাংসের ভিতরে কোনো আলু দিবে না।

মা ব্যাগটা হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন, তখনই ভাবি আসেন ছুটে। মা একপাশে যেয়ে চোখমুছে নেয়।

ভাবি আর মা মাংস রান্না করছেন, পুরো ঘরভর্তি মাংসের ঘ্রাণ। বাবা এখন তেমন হাঁটাচলা করতে পারেন না, বিছানায়ই থাকেন সারাদিন।

রান্না হলেই আমরা সবাই টেবিলে বসি। বাবা দেখেন আজকে শুধু মাংস ভুনা করা হয়েছে, মাংসের ভিতরে কোনো আলু নেই। বাবা অল্প দুই টুকরা দিতে বলেন, যেহেতু আলু নেই, হয়তো সবার মাংসে হবে না তাই অল্প মাংসই প্লেটে নেয়। পাশ থেকে মা বলেন, পাতিলে আরো অনেক মাংস আছে তুমি আরেকটু নেও। মা বাবার প্লেটে মাংস তুলে দেয়।

আমার ভাতের প্লেটে হাতে থেমে থাকে। কিছুসময় পরে যেনো একটা স্বপ্নভঙ্গ হয়, তারপর মুখে ভাত তুলে নেই।

এরপর আমরা দুই ভাই যখনই বেতন পাই বাসায় মাংস কিনি, বাবার পছন্দমতো সেই মাংস রান্না হয়। বাবা আজকাল বাচ্চাদের মতো চুলার উপরে থাকা মাংস খেতে চায়, মা বাটিতে তুলে বাবার ঘরে মাংস দিয়ে আসে। আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য মনে হয় রান্নাঘর থেকে বাটিতে মাংস নিয়ে মা যখন বাবার ঘরের দিকে যায়।

কেমন লাগলো জানাবেন প্লিজ

#অল্পস্বল্পগল্প #ভাইরাল_গল্প #সংগৃহীত

28/03/2026

মন যে বলে চিনি চিনি - শেষ পর্ব

বড় আপার কথা শোনার পর মন মেজাজ বিগড়ে গেল একেবারে। রাগ করে আমি আর সবার সঙ্গে গাড়িতে উঠে গেলাম না। আব্দুল্লাহ ভাইয়াদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ি মূল সড়ক দিয়ে যেতে একটু দূরের পথ মনে হলেও বাড়ির পাশের বড় জঙ্গল দিয়ে অল্প কিছু পথ। দিনের বেলায় সবাই অনায়াসে এই জঙ্গলের পথ দিয়ে এই বাড়ি থেকে ওই বাড়িতে যায়। রাতেও যদিও যাওয়া হয়, সেটা অবশ্য পুরুষরাই যায়। মহিলাদের তেমন একটা যাওয়া হয় না। খুব সাহসী মহিলা ছাড়া কাউকে একা ওই পথ পেরোতে দেখা যায় না। আমি আজ সেই সাহসী উঁহু দুঃসাহসী কাজটা করলাম।

রাগের মাথায় বরাবরই আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। পুঁতিরা অনেক বারণ করল, আমি শুনলাম না। আমি ওই পথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। কিছুটা আসতেই আমার ভ'য় হতে লাগল। কালবৈশাখীর বাতাসের মতো বাতাস ছুটছে। জানি না ঝড় আসবে কিনা। এরমধ্যে পেছন পেছন শুকনো পাতায় কেউ একজন পা মাড়িয়ে আসছে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। হঠাৎ মনে হলো আমার পা দ্রুত চালাতে হবে তাই আমি ছুটতে লাগলাম। দিশাহারা হয়ে ছুটতে লাগলাম! আর একটা সময় ধপাস করে পড়ে গেলাম। ডান পা নাড়ানোর শক্তি টুকু আর আমার মধ্যে ছিল না। বুঝতে পারলাম হয়তো মচকে গেছে। হাড় ভেঙেছে কিনা সেটাও বলা মুশকিল। ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে পায়ে হাত দিয়ে আমি চুপচাপ বসে রইলাম। একটু পর পেছন থেকে কেউ একজন এসে আমার পাশেই বসল। তখন কেন যেন আর ভ'য় কাজ করছিল না। তাকিয়ে দেখলাম আরণ্যক ভাইয়া। অরণ্যে আরণ্যক থাকবে স্বাভাবিক। কোনো ভ্রূক্ষেপ করলাম না।

“ক্ষোভ ঝাড়া শেষ হলো?”

আমি কিছুই বললাম না। পা ব্যথায় টনটন করছে। কেবলমাত্র ব্যথায় কিনা জানিনা, চোখ ছলছল হয়ে আসে। বা হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে নিয়ে আমি আগের মতোই থম ধরে বসে রইলাম।

“বেশি ব্যথা করছে?”

উনি আমার পায়ে হাত দিতে চাইলে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম,

“ধরবেন না!”

“ভয় নেই। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ধরতে চাইছি না। ব্যথা পেয়েছ তাই…”

“আমার পা আমার ব্যথা। আপনি নাক গলাতে আসবেন না।”

“এখানেই পড়ে থাকবে?”

“থাকলে থাকব। আপনার তাতে কী!”

“আমার কিছুই না। একটু পর বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টির কথা নাহয় বাদ দিলাম। বৃষ্টি খুব সুন্দর একটা ব্যাপার, উপভোগ করার মতো। কিন্তু হায়েনাদের তো উপভোগ করা যায় না।”

আমি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললাম,

“ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। এই বনে হায়েনা নেই।”

“তুমি কী নিশ্চিত? সত্যিই নেই?”

আমি একটু ভাবলাম। কখনো তো হায়েনাদের গল্প শুনিনি। এখানে এরকম তো সত্যিই কিছু নেই। পরক্ষণেই বুঝলাম, অন্য হায়েনার তো নিশ্চয়তা নেই। তারা তো শুধু বন জঙ্গলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তারপরও নিজের রাগ ধরে রাখতেই বললাম,

“আপনি চলে যান। কে বলেছে আমার পেছনে আসতে? জুতা মেরে গরু দান করছেন?”

“জুতা!”

“আর নাটক করতে হবে না। আপাকে গিয়ে আমার নামে অভিযোগ দিয়েছেন। আমি নাকি আপনাকে অসম্মান করি আরো হেন তেন। আচ্ছা, আপনার এত সমস্যা কেন আমাকে নিয়ে?”

“সমস্যা নেই তো।”

“না থাকলে এসব করে বেড়াচ্ছেন কেন?”

“আমার ভালো লাগছে তাই।”

“অন্যকে কষ্ট দিয়ে ভালো থাকেন আপনি?”

“কষ্ট পেয়েছ নাকি?”

“তাহলে কী মজা পাব?”

আমার পায়ের ব্যথা বাড়ছে। এদিকে টুপটাপ বৃষ্টি নামতে লাগল। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম নীরবে। তিনি ভীষণ চিন্তিত গলায় বললেন,

“পায়ে বেশি ব্যথা করছে সুবর্ণা?”

এবার আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম,

“আপনি এমন কেন!”

“কেমন বলো তো?”

“সুবর্ণা ডাকেন কেন?”

“ডাকব না? পুঁটি মাছ ডাকব?”

“না, ওটাও না।”

“তাহলে কী ডাকব? তুমিই বলো…”

“কিছু ডাকতে হবে না।”

বৃষ্টি বাড়তে লাগল। আমিও জেদ ধরে বসে রইলাম। একটা সময় তার জোরের কাছে আমার জেদ টিকল না। লোকটা হঠাৎ আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে হাঁটা ধরল। আমি প্রথমে বাধা দিলেও পরবর্তীতে আর কিছু করলাম না। চুপ করে রইলাম।

বাড়ি আসতেই মায়ের আহাজারি শুরু হয়ে গেল। সেই সাথে বকাঝকা! ডাক্তার এসে দেখে গেল। প্রাথমিক চিকিৎসা যা প্রয়োজন ছিল সেসব দিয়ে পরদিন হসপিটাল গিয়ে এক্সরে করতে বলল। রাতে আমার গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। পরদিন সকালে শুনেছি আরণ্যক ভাইয়ার ও ভীষণ জ্বর। আব্দুল্লাহ ভাইয়ার বিয়েতে আমার আর আরণ্যক ভাইয়ার যাওয়া হলো না। আমাদের দেখভালের জন্য মা আর বড় চাচীও গেলেন না আর। বড় আপা আমার পাশাপাশি তার বন্ধুকেও খুব করে বকে দিলেন। আমার যেমন বকাঝকা খেলে মন খারাপ হয়ে যায় লোকটার তেমন কিছুই হলো না। আপা বকছিল আর তিনি শুধু হাসছিলেন।

আমার পায়ের ব্যথা ছিল অনেকদিন। আমি যখন একটু হাঁটতে পারলাম ততদিনে আমাদের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। দীর্ঘ এক মাস পর আমি ঢাকায় ফিরলাম। কিন্তু বড় আপা হলে থাকতে দিলেন না। তার ফ্ল্যাটে নিয়ে গেলেন। বলে দিলেন, আমি পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হলে যেতে পারব না। আমার পায়ের ব্যথা যদিও তখন তেমন একটা ছিল না। হয়তো বেশিক্ষণ হাঁটলে একটু ব্যথা হতো‌। কিন্তু বড় আপাকে বলে বিশেষ কোনো লাভ হলো না। বড় আপার ফ্ল্যাটে আসার দু'দিন পর আপা জানালেন রাতে বাসায় দাওয়াত রেখেছে। বন্ধুরা সব আসবে। বন্ধুদের কথা বলতেই মনে পড়ে গেল আরণ্যক ভাইয়ার কথা‌। সেইসময় জ্বর নিয়েই তিন দিনের দিন বাড়ি ছেড়েছিলেন। সেই তিন দিন আমাদের দেখা হয়েছিল হাতে গোনা দুই বার। আমি হসপিটাল থেকে আসার পর আর তিনি ফিরে যাওয়ার সময় যখন বড় আপার সাথে আমার ঘরে এসেছিলেন তখন। হ্যাঁ, তিনি এসেছিলেন। আমার থেকে বিদায় নিতে। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। যদিও এত অবাক হবার মতো কিছুই ছিল না। তবে এবার বন্ধুদের মধ্যে আরণ্যক ভাইয়া থাকবেন না। কীভাবে থাকবেন? তিনি তো আমেরিকায়। আমার তো মনে হয় আপার বন্ধুমহলের কারো বিয়ে লাগা ছাড়া তিনি আর আসবেন না। ব্যাপারটা আসলে মজার। প্রত্যেক বন্ধুর বিয়েতে আমেরিকা থেকে এসে কয়েক দিনের জন্য ঢু মেরে যান। এতদিনে বন্ধুদের জন্য যে তার মনে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আছে তা আমার ভালোই বোঝা হয়ে গেছে।

বিকেলে বড় আপার সাথে টুকটাক কিছু কাজ করে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সন্ধ্যায় আপা ডেকে তুলল। বলল,

“যা ফ্রেশ হয়ে আয়। সবাই এসে পড়েছে।”

আমি অবাক হয়ে বললাম,

“আমি যাব ওখানে?”

“কেন যাবি না? অসামাজিক তুই? গেস্ট আসলে দেখা করবি না এটা কেমন কথা!”

বড় আপার সাথে তর্কে গিয়ে লাভ নেই। সেই শক্তি কিংবা ইচ্ছেও নেই আমার। অগত্যা উঠে ফ্রেশ হয়ে এলাম। ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখলাম আপার বন্ধুরা সবাই আছেন। আমি সালাম দিলাম। আপার বন্ধুরা ছাড়াও আরো দু'জন ছিলেন। আপা পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাঁরা আরণ্যক ভাইয়ার বাবা মা। আমি একটু অবাক হলাম। আরণ্যক ভাইয়া নিজে আসতে পারেননি বলে কী তার বাবা মাকে পাঠিয়েছেন বন্ধুদের গেট টুগেদারে! অদ্ভুত তো!

খাবার টেবিলে আপার বন্ধুরা সব গল্প করছিলেন। না চাইতেও কিছু কথা কানে এলো। কেবল এক আরণ্যক ভাইয়া ছাড়া আর সবাই এখন বিবাহিত। এবার আরণ্যক ভাইয়ার পালা। খাবার টেবিলে আরণ্যক ভাইয়ার বিয়ে নিয়েই আলোচনা বেশি হলো বলে আমার মনে হলো। ফেরার আগ মুহূর্তে আন্টি আমার হাত ধরে পাশে বসালেন। আমার হাতে একটা স্বর্ণের ব্রেসলেট পরিয়ে দিয়ে বললেন,

“ভীষণ মিষ্টি মেয়ে! আমার বাবার সাথে দারুণ মানাবে।”

প্রথমেই আমি আঁতকে উঠলাম। তাঁর বাবার সাথে মানে? পরে বুঝলাম, এই বাবা সেই বাবা নয়। এই বাবা তার ছেলে, অ্যামাজন তথা আরণ্যক। বড় আপার সামনে আমি কিছুই বলতে পারলাম না।

সবাই চলে যাওয়ার পর আমি লক্ষ্য করলাম একের পর এক ফোন কল আসছে। আমাদের বাড়ি থেকে। বড় আপা আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে ফোনে কথা বলতে লাগল। আমি দুলাভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, এসব কী হচ্ছে! ততক্ষণে যদিও আমি আন্দাজ করতে পেরেছি। ভাইয়া হাসতে হাসতে বললেন,

“শালিকা, এখন জোড়া বাঁধার সময় হয়েছে যে!”

আমি বরাবরই প্রস্তুত ছিলাম অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের জন্য। আমার নিজের এমনকি পারিবারিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কখনোই ওসব লাভ ম্যারেজ এর চিন্তাও করিনি। সেদিকে চেষ্টা করা তো দূরের কথা। তবে, আরণ্যক ভাইয়াকে যখন বিয়ে করতে হবে শুনলাম তখন বেঁকে বসলাম। এদিকে আমাদের বাড়ির হর্তাকর্তা বড় আপা হ্যাঁ বলে দিয়েছেন। বাড়ি থেকে চাপ আসতে লাগল, অযথা আপার বন্ধুত্ব নষ্ট হবে। আমি এখন যেন এমন কোনো কিছু না করি। আমার কথা হলো, বন্ধুত্ব নষ্টের কথা আমার কেন চিন্তা করতে হবে? ওই লোকটার কী উচিত ছিল না ওটা চিন্তা করার! তাছাড়া এক মুহূর্তের মধ্যে কীভাবে কী হয়ে গেল? হঠাৎ তার আমাকে বিয়ের উপযুক্ত কেন মনে হলো?

শেষ পর্যন্ত আমি আর না করতে পারিনি। বরাবরই বাড়ির বড়রা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় তখন আমরা আর সেটার উপরে কিছু বলতে পারিনা। আমি অন্তত এভাবেই বড় হয়েছি। বিয়ের মতো একটা বড় বিষয়ে নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো সাহস আমার মধ্যে নেই। আমি কেঁদেছি, অনুরোধ করেছি। আমার থেকে যতটুকু সম্ভব হয়েছে করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি।

আমাদের বিয়ে হলো ঢাকায়। তিনি এলেন বিয়ের আগেরদিন। আমার সাথে দেখা হলো হলুদ অনুষ্ঠানে। আমার হাতে তখন মেহেদী ছিল। তিনি আমার পাশে বসে বললেন,

“দেখি তো আমার নামটা কোথায় লিখেছ!”

তিনি খুঁজতে লাগলেন। পেলেন না। একটা সময় বেশ আক্ষেপ করে বললেন,

“এই পুঁটি! আমার নাম কোথায়?”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “চোখ নেই আপনার?”

তিনি আবার খুঁজতে লাগলেন। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন,

“অ্যামাজন! এই তুমি কী আমার নাম অ্যামাজন দিয়েছ নাকি?”

আমি কিছুই বললাম না। তিনি খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলেন। মুগ্ধ চোখে সেই হাসি দেখতে দেখতে আমার মনে হলো, নিশ্চয়ই এই মানুষটাকে আমি কখনো অপছন্দ করিনি। অপছন্দ করলে তার হাসিতে ওভাবে ডুবতাম? তবে হ্যাঁ, রাগ ছিল। অনেক দিনের জমানো রাগ। যখন দেখলাম আর অন্য উপায় নেই। তখন ঠিক করলাম বিয়ের পর সব শোধ তুলব। কোনো ছাড় দিব না! বিয়ের রাতে তিনি আমাকে বললেন,

“সুবর্ণা, একটা কথা বলি?”

আমি বাজখাঁই গলায় বললাম, “কী?”

“তোমাকে যেদিন প্রথম দেখলাম…”

“সেদিন প্রেমে পড়ে গেছেন এটাই বলবেন তো?”

“উঁহু।”

“তাহলে?”

“আমার মন বলছিল তোমার সাথে আমার কিছু একটা হবে।”

“আপনার মন বলেছিল?”

“হ্যাঁ। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না। কিন্তু জাপানি একটা ধারণা আছে। ‘কোই নো ইয়োকান’– ইংরেজিতে ‘প্রিমোনিশন অভ লাভ’। সহজ বাংলায় বলতে গেলে, এটা প্রথম দেখায় ভালোবাসা বোঝায় না। তবে মনের মধ্যে এই অনুভূতি জাগায় যে তুমি টের পাবে অপর মানুষটার সাথে তোমার কিছু হতে চলেছে। হয়তো প্রেম, হয়তো ভালোবাসা।”

আমি আমতা আমতা করে জানতে চাইলাম,

“কিন্তু আমাদের তো তেমন কিছু হলো না!”

“কে বলেছে হয়নি? আমার তো হয়েছে।”

“কী হয়েছে?”

“এই যে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।”

“আর ভালোবাসা?”

“ভালোবাসা না এলে কী আর বিয়ে হতো!”

সেই রাতে তিনি আমাকে গান গেয়ে শোনালেন,

“মন যে বলে, চিনি চিনি
যে-গন্ধ বয় এই সমীরে..
কে ওরে কয় বিদেশিনী,
চৈত্ররাতের চামেলিরে!”

পুনশ্চ:
আমাদের বিয়ের পর টের পেলাম আমি পুঁটি আসলেই তার কাছে চুনোপুঁটি। অত সহজে হেরে যাওয়ার বান্দা নয় সে। এই যেমন, বর্তমানে আমি দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জননী। আমার বড় ছেলের নাম বোয়াল, ছোট ছেলের নাম চিতল আর মেয়ের নাম তেলাপিয়া। এই তিনটি নামই তাদের বাবার রাখা।

(সমাপ্ত)

#অল্পস্বল্পগল্প #সংগৃহীত #ভাইরাল_গল্প

28/03/2026

মন যে বলে চিনি চিনি - পর্ব-৪

আমার ফুফাতো বোন রেশমা আপার বিয়েতে, আমাদের দাদী গল্পের আসরে বলেছিলেন, মেয়েরা যে ছেলেকে প্রথম প্রথম দেখতে পারে না পরে তার প্রেমেই হাবুডুবু খায়। সে কথা শুনে আমরা শুধু হেসেছিলাম। এই ব্যাপারটা যে ভীষণ চিন্তার বিষয় তা তখন মাথায় আসেনি। বরং খুব মজার মনে হয়েছিল। এমন প্রেমকাহিনি জানতে কৌতুহল হতো। কিন্তু এখন ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগছে না। কেন? যাকে প্রথমে ভালো লাগল না তাকে পরে কেন ভালো লাগবে? কোন দুঃখে?

না না, আমার কাউকে ভালো লাগেনি। লাগতে পারে না। একটু সহমর্মিতা কী অনুভব করলাম অমনি সেটাকে ভালো লাগা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়?

আমার জীবনে কোনো দিন প্রেম ভালোবাসা আসেনি। আমিই আসার সুযোগ দেইনি। আমার মনে হয়েছে ওসব ফালতু, বেহুদা আর সময় নষ্ট। আশেপাশে কারো কিছু দেখলেও নাক সিঁটকিয়ে চলে আসতাম। এতটাই অপছন্দ করি এসব আমি। কেন? কেন একজনকে ভালোবেসে নিজেকে ভুলতে হবে? অন্য একজনের ভালো থাকা না থাকার ওপর কেন নির্ভর করতে হবে? আমার ভালো আমি থাকব, আমার খারাপও আমি থাকব। আমার টা যেমন আমি কাউকে দিব না, কারোরও তেমনি উচিত হবে না তার টা আমার উপর চাপিয়ে দেয়া। গতবারের ফিফা বিশ্বকাপের একটা ঘটনা…

আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের দিন, আমার মামাতো বোন আমাদের বাড়িতে এলো। সেদিন আমি তাকে কত করে অনুরোধ করলাম রাতটা থাকতে আমরা একসাথে ম্যাচ দেখব। কিন্তু তার কথা একটাই, থাকার জন্য অনুমতি পাবে না। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার মামার কাছে কল করে অনুমতি চেয়ে নিলাম। দেখলাম এবারো আমার মামাতো বোনের তরফ থেকে না এলো। অতঃপর বুঝলাম, কোথা থেকে অনুমতি নিতে হবে। তাই সেদিন আমি আমার মামাতো বোনকে বিদায় দিলাম আর কোনো কথা না বলেই। কী বলব? যে কিনা প্রেমিকের অনুমতি নিয়ে আমাকে সময় দিতে চায়, তাকে আমি সুবর্ণাই তো আমার অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় দিব না। কখনোই না!

আপার বিয়ের পর কিছুদিন আমার মন কেমন কেমন করছিল ঠিকই কিন্তু দিন যত পার হলো, ততোই ভুলতে লাগলাম। আমার সেমিস্টার ফাইনাল এসে পড়ল, পড়ালেখার তখন না চাইতেও অনেক চাপ নিতে হলো। বাবার ইচ্ছে, আমাকে বিসিএস পরীক্ষায় বসতে হবে। যদি একান্তই বিসিএস আমার চাওয়া হিসেবে না থাকে, আমি যেন অন্তত ভালো একটা সিজি তুলে কোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। আমার পক্ষে দুটোর একটাও খুব একটা সহজ নয়। বরং বেশ কঠিন। আমি পড়ালেখায় খারাপ এটা আমি কখনো বলব না। কারণ আমি পড়ালেখায় তেমন একটা শ্রম দেইনি কখনো। দিলে এত অধঃপতন আমার হতো না। আমি বরাবরই ফাঁকিবাজির মধ্যে থেকেছি। যার খেসারত প্রত্যেক সেমিস্টারে এসেই দিতে হচ্ছে। তারপরও আমি নিজেকে শুধরানোর চেষ্টা করছি না। বড় আপা এ নিয়ে কয়েক দফা আমাকে বকাঝকা করেছেন। লাভ হয়নি খুব একটা। আমি আমার মতোই আছি। কিন্তু এবার ভাবছি একটু লাগাম টেনে ধরতে হবে। অনেক হয়েছে!

আমার যৎসামান্য চেষ্টায় এই সেমিস্টার সত্যি বলতে ভালোই গিয়েছে। একটা লম্বা ব্রেকে হল ছেড়ে আমি এসে পড়লাম বাড়িতে। বাড়িতে এসে জানলাম আব্দুল্লাহ ভাইয়া বিয়ে করছেন। খুশির সংবাদ! একটা বন্ধে বিয়ের দাওয়াত খেয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কী যে সুন্দর! আমাকে দেখে আব্দুল্লাহ ভাইয়া ভীষণ খুশি হলেন, খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,

“পুঁটি! এসেছিস কী যে ভালো লাগছে! শুনেছিলাম তোর সেমিস্টার চলছিল। আমি তো ভাবলাম এই বুঝি তোর মিস্ গেল!”

“তোমার বিয়েতে তো আমি সেমিস্টার ফেলে এসেও অ্যাটেন্ড করতাম। এত সহজে নিস্তার পাবে না আমার থেকে।”

বিয়েটা খুব চটজলদি হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হলো। তা অবশ্য ঠিক। আপার বিয়েতে কমপক্ষেও দশ দিন যাবৎ আমাদের উৎসব চলছিল। একেক দিন একেক প্রোগ্রাম। বিয়ের আগে, বিয়ের পরে কত কত প্রোগ্রাম যে রাখা ছিল! আপার ওই গ্র্যান্ড ওয়েডিং দেখার পর যে কারোরই এমন দুই দিনের অনুষ্ঠান পানসে বলে মনে হবে। তবে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে বুঝলাম, এই দুই দিনেই তারা দশ দিনের আনন্দ পুষিয়ে নিতে পারবে। এত এত আয়োজন! এত এত লোকজন!

বড় আপা আর দুলাভাই এলেন সন্ধ্যায়। আমি তখনো তাদের সাথে দেখা করিনি। সাজগোজের মধ্যে সময় পাইনি আসলে। দেখা হলো রাতে, একদম আব্দুল্লাহ ভাইয়াদের বাড়ি গিয়েই। বড় আপা আমাকে দেখেই বললেন,

“তোর এক্সাম কেমন গেল!”

“ভালো।”

“কতটা ভালো? গতবারের মতো ভালো? ওই যে সিজি টেনেটুনে থ্রি’তে উঠল ওইরকম ভালো?”

“এবার আসলেই ভালো হয়েছে।”

“ভালো হলেই ভালো। পড়ালেখা যখন করছিস, করার মতো করবি। নয়তো দরকার নেই, ছেড়ে দিস।”

“আচ্ছা আপা।”

বিয়ে বাড়িতে এসেও বড় আপা আমার পড়ালেখা নিয়ে পড়লেন। ব্যাপারটা ভীষণ কষ্টদায়ক। কিন্তু কিছু করার নেই। বড় আপার জীবনের একটা বড় অংশই ছিল এই পড়ালেখা কে ঘিরে। আপা জীবনে সফল হওয়া বলতে যদি কিছু বোঝে তাহলে সেটা হবে ‘অ্যাকাডেমিক সাকসেস’।

বড় আপা চলে যেতেই আমি মন খারাপ করে সোফায় বসে পড়লাম। তখনই পেছন থেকে কেউ একজন ডেকে উঠল,

“এই পুঁটি মাছ!”

আমি হকচকিয়ে গেলাম। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলাম মাথায় ক্যাপ পরা একজন পেছনের সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। চেহারা ঠিক মতো না দেখা গেলেও আমি মুহুর্তেই চিনে ফেললাম। আরণ্যক! আরণ্যক ভাইয়া! আমি তৎক্ষণাৎ সব ফেলে এটা ভাবতে লাগলাম, তিনি কবে আর কখন এলেন! লোকটা এতক্ষণ যে এখানেই ছিলেন অথচ আমি টেরও পেলাম না! হঠাৎ আমার আগের সেসব স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ঝকঝকে মুক্তোর মতো পরিস্কার সব স্মৃতি। শেষ বিদায়… যদিও শেষ বিদায়ের কিছু নেই। বিদায় বেলায় আমাকে তো জানিয়ে যায়নি।

কিন্তু মানুষটা আদৌ এখানে এসেছে নাকি নিছকই আমার কল্পনায়? আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম। অত পাগলও তো আমি হইনি যে তাকে কল্পনায় দেখতে হবে…

“এভাবে তাকিয়ে কী দেখছ? আমি কী আরো সুন্দর হয়ে গিয়েছি নাকি?”

কথার ধরনে বুঝলাম। না, কল্পনা নয় মনের ভুল ও নয়। সত্যিই এসেছে। তার মতো ওরকম সেল্ফ অবসেসড মানুষ আর দু'টো কী আছে?

“মানুষ শুধু সুন্দরের দিকেই তাকিয়ে থাকে না। চিড়িয়াখানায় গিয়ে আজব চিড়িয়ার দিকেও তো তাকিয়ে থাকে।”

“তাহলে তুমি বলছ আমি আজব চিড়িয়া?”

“বলছি।”

“হুম, খারাপ না! তুমি মাছ আমি চিড়িয়া।”

“আমি মাছ আপনি বললেই হলো!”

“আমি না বললেও তুমি মাছ, পুঁটি মাছ।”

এমন পাগল আমি আর দেখিনি। এই এক নাম নিয়ে আমি আমার জীবদ্দশায় এত টিটকারি শুনতে পাইনি যতটা এই একজন মানুষের থেকে পেয়েছি। আমাকে এ যাত্রায় আরো অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন,

“আমি তোমার জন্য গিফট এনেছি।”

“আমার চাই না।”

“তোমার চাইতে হবেও না। আমি না চাইতেও তোমার জন্য আনতে পারি।”

আমি তাকিয়ে রইলাম তার মুখের দিকে। কথাটা অন্যরকম শোনালো। লোকটা অবশ্য তার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নিচে ফেলে রাখা লাগেজ থেকে থেকে একটা বাক্স বের করে আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তখন আব্দুল্লাহ ভাইয়া এলেন হন্তদন্ত হয়ে। অবাক স্বরে বললেন,

“আরণ্যক! তুই এখনো ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হলি না! আশ্চর্য! সময় তো পেরিয়ে যাচ্ছে।”

“হ্যাঁ, যাচ্ছি।”

আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে তিনি উপরে চলে গেলেন। আব্দুল্লাহ ভাইয়াও যাওয়ার আগে বললেন,

“পুঁটি জলদি আয় তো!”

আমি মাথা নাড়লাম শুধু। ড্রয়িং রুম তখন একদম ফাঁকা। সবাই বাইরে, আমি ভেবেছিলাম ওখানেই ফেলে আসব বাক্সটা। কিন্তু আমার মন উতলা হয়ে উঠল। ভেতরে ঠিক কী আছে তা জানার জন্য। একটা সময় কৌতুহল আর দমানো গেল না। আমি বাক্সটা খুলতেই তব্দা খেয়ে গেলাম। ভেতরে কতগুলো খেলনা চুনোপুঁটি, সরপুঁটি মাছ। এই লোকটা এত বদ কেন? এক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি ভেবেছিলাম ভেতরে এমন কিছু থাকবে, যা কিনা… ধুর! আমিও কী বোকা! কার থেকে কী আশা করছি? কেন করছি?

আরণ্যক ভাইয়াকে দেখে আমার কাজিন মহলে ব্যাপক হৈ হুল্লোড় পড়ে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না এরা লোকটার মধ্যে কী এমন পেয়েছে? এত আদিখ্যেতা দেখানোর কী আছে? এদের এমনিতেই সবকিছুতে বাড়াবাড়ি। লোকটাও কম না! এত ঢং দেখাচ্ছে! তাছাড়া একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, আমার কাজিনদের সাথে এমনকি নতুন নতুন অনেক মুখের সাথেও তার আচরণ ভদ্র, সভ্য। প্রশংসা করারই মতো। আমার সাথেই একটু কেমন যেন! পুঁতির সাথে যখন বললাম সে ফিসফিস করে আমাকে বলল,

“মনে হয় তোকে পছন্দ করে। আমি গল্প উপন্যাসে এমন অনেক পড়েছি।”

“রাখ তো তোর গল্প উপন্যাস। বাস্তবসম্মত কথা বল। বাস্তবে এটাকে অ’ভদ্রতা আর অ’সভ্যতা বলে।”

“না রে পুঁটি। তুই যাই বলিস না কেন, আমার মনে হয় ওটাই হবে।”

আমি মাথা নাড়লাম। না, এ হতেই পারে না‌। অসম্ভব, ওই লোকটা… আসলেই করে? আমি দোটানায় পড়ে গেলাম। জানি না কেন, আমার তার মনের কথা জানতে ইচ্ছে করল। কখনো কখনো তার চোখের দিকে তাকালে আমারো মনে হতো, অন্যরকম কিছু। কিন্তু আমার চিন্তাভাবনাও তো আমি ওভাবে চাপিয়ে দিতে পারি না।

বাড়ি ফেরার সময় বড় আপা হঠাৎ ডাকলেন। বড় আপা ডাকলেই আমি ভয়ে ভয়ে থাকি। না জানি আবার কী নিয়ে বকা দেন!

“পুঁটি শোন, আরণ্যক আমাদের বাড়িতে যাবে। ও দু'দিন ওখানেই থাকবে। তুই একদম ওর সাথে কোনপ্রকার বেয়াদবি করবি না।”

“আমি কী বেয়াদবি করলাম?”

“আরণ্যক বেহুদা অভিযোগ দেওয়ার ছেলে না। আর মিথ্যে বলার অভ্যাস ওর নেই। তোর কাছে তোর ব্যবহার বেয়াদবি মনে না হলেও ওর কাছে মনে হতে পারে। আর আমিও নোটিস করেছি তুই ওকে দেখলেই বিরক্ত হয়ে যাস। আরণ্যক নিশ্চয়ই ফাতরা কোনো ছেলে না যে তুই ওইরকম লুক দিবি ওকে।”

“আমি তো তেমন কিছুই করিনি। উনি যে সবসময় আমার নাম নিয়ে…”

“তুই ছোট হিসেবে ও তোর সাথে একটু মজা মশকরা করতেই পারে। সবকিছুতে এমন রাগ করলে হয় নাকি?”

বললেই হলো! আমি এমনি এমনি রাগ করি? তিনি আপার প্রিয় বন্ধু, আপা তার কোনো দোষ দেখবে না, স্বাভাবিক।

আমার রাগ হলো, সে আমার নামে ঠিক কী অভিযোগ করল? আমি যখনই ভাবি একটু সহজ হবো তখনই তার এমন এমন কাজ না করলেই হয় না! আসলে আমার রাগের থেকেও কষ্ট হলো বেশি। তিনি কেন আমার উপর এত বিতৃষ্ণা পোষণ করেন!

চলবে।

#অল্পস্বল্পগল্প #সংগৃহীত #ভাইরাল_গল্প

28/03/2026

মন যে বলে চিনি চিনি - পর্ব-৩

আমি আহামরি সুন্দর না হলেও সুন্দর, এই কথাটা আমি জানি। ছোট থেকেই লোক মুখে শুনে এসেছি। তাই কখনো নিজেকে অসুন্দর মনে করে হীনমন্যতায় ভুগতে হয়নি। তবে এই যে সবার মাঝে আমিই সুন্দর, এমন কিছুও কখনো কল্পনা করিনি। কারো চোখে সবাইকে ছাপিয়ে যাব এমনটাও কখনো আশা করিনি। আমি বাস্তববাদী। ওসব রোমান্টিক ব্যাপার আমার কাছে গল্প উপন্যাস পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। তাই যখন ওই মানুষটা আমার নাম নিল ওটা আমার ঠিক বিশ্বাস হলো না। বিশ্বাস না হবার পেছনে আরেকটা কারণও স্পষ্ট। তার সাথে আমার এই পর্যন্ত ভালো একটা সম্পর্ক নেই। আমার দিক থেকে নয় বরং তিনি নিজেই একদম প্রথম দিন থেকেই অন্যরকম ছিলেন আমার সাথে। তার কাজকারবার দেখেই তো পরিস্কার বোঝার কথা সে আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না। নয়তো তার কী দরকার ছিল কফির চিনি নিয়ে ওইরকম মিথ্যাচার করার? আর আমার নাম! নাম নিয়েও তো কম করেনি!

লোকটা আমার নাম নেওয়ার পর থেকে সবাই আমাকে নিয়ে টিটকারি করতে লাগল। যেখানেই যাচ্ছি কেউ না কেউ একজন ডেকে উঠছে,

“এই সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটা!”

সে কেন আমার নাম নিয়েছে, এই ভেবে আমি প্রথমে খুব অবাক হলেও পরে কারণটা ধরতে পারি। বুঝতে পারি, পাজি অ্যামাজন এখানেও ছল চাতুরি করেছে। সবাই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে বলেই হয়তো সে আমার নাম নিয়েছে। আমি তার চোখে কোনো সুন্দর টুন্দর না। আর আমি হতেও চাই না। কোন মহামানব সে? যে তার চোখে সুন্দর হতে হবে আমার!

লোকটার সাথে আমার আবার দেখা হলো খাবার টেবিলে। সবাই ছিল তাই আমি চাইলেও উঠে যেতে পারিনি। আব্দুল্লাহ ভাইয়া বললেন,

“পুঁটি? অনুভূতি কেমন?”

“কীসের?”

“আরে কীসের মানে! আমাদের সবচেয়ে সুন্দর, স্মার্ট বন্ধুর থেকে এত বড় তকমা পেয়ে!”

“আপনার কথা শুনে হাসি পাচ্ছে।”

“কেন? হাসি পাচ্ছে কেন?”

“সুন্দর আর স্মার্ট কাকে বললেন?”

“কেন? আরণ্যক কে! সে কী? এত সুন্দর ছেলেটাকে তোর চোখে পড়ছে না?”

“না তো, পড়ছে না।”

আব্দুল্লাহ ভাইয়া হেসে ফেললেন। তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আরণ্যক! তোর বিরাট লস হলো। যাকে তুই সবচেয়ে সুন্দরী বললি তার চোখে তো তুই পড়িস না!”

আমিও আড়চোখে তাকালাম তার দিকে। দেখলাম সে মিটিমিটি হাসছে। সে কী! হাসি পাচ্ছে তার? রাগ হচ্ছে না? কেন হচ্ছে না? আমি তো তার রাগ দেখতেই চাইছিলাম!

“তুই তো জানিস আব্দুল্লাহ, আমার বরাবরই পুঁটি মাছ খুব প্রিয়। পুঁটি নামটা শুনলেই আমার ভালো লাগে। এই প্রথম দেখলাম পুঁটি মানুষ ও হয়। তা দেখতে সে যেমনই হোক, তার নাম পুঁটি অতএব আমার চোখে সবচেয়ে সুন্দর।”

এটা কেমন কথা? এটাই কী তবে ঠাণ্ডা মাথায় অপমান! লোকটা আমাকে আবারো অপমান করল? সমস্যা কোথায় তার?

আব্দুল্লাহ ভাইয়া হাসতে হাসতে বললেন,

“তা ঠিক, আরণ্যকের পুঁটি মাছ খুব পছন্দ। সরপুঁটি বেশি পছন্দ মনে হয়। তাই না রে?”

“উঁহু, পছন্দ এখন বদলেছে।”

“এখন কী পছন্দ?”

এবার আর কোনো কথা বললেন না। চুপচাপ খেতে লাগলেন। আমার আর খাওয়া হলো না। শখের বিরিয়ানি প্লেটেই পড়ে রইল। আমি শুধু আঙুল নাড়তে থাকলাম।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাবা মায়ের ঘর থেকে একবার ঢু মেরে এলাম। হঠাৎ কেন যেন আমার মন আনচান আনচান করছিল। আমার এমন লাগলে আমি গিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। মা বার কয়েক জিজ্ঞেস করবেন কী হয়েছে, আমি কোনো জবাব দেই না। এরপর আর মাও কিছু জিজ্ঞেস করেন না। চুপচাপ মাথায় বিলি কেটে দেন। বাবা পাশেই বসে টিভিতে খবর দেখেন। আর আমাকে একটু পরপরই বলেন,

“মামনি, এটা নোট করে রাখো। মন দিয়ে এই নিউজটা শোনো। ইন ফিউচার বিসিএসে কাজে দেবে।”

আমি ভুলেও চোখ তুলে তাকাই না। ছোট থেকেই এসব খবর শুনতে আমার বিরক্ত লাগে। টিভিতে খবর দেখলেই আমার গায়ে সূচ ফোটানোর মতো ব্যথা হয়। অথচ বাবা কী ভালোবাসেন! চা নিয়ে আয়েশ করে বসে একের পর এক চ্যানেল বদলে ব্রেকিং নিউজ কী তা শুনবেন। মায়ের সাথে মাঝে মাঝে ঝগড়া হয় অবশ্য। মায়ের প্রিয় সিরিয়ালের সময় বাবার প্রিয় টক শো হয়। কেউ কাউকে এই ব্যাপারে ছাড় দিতে রাজি না। তবে মাঝেমধ্যে মা ছাড়া দেন। এই যেমন আজ আমি যখন রুমে ঢুকলাম টিভিতে মায়ের প্রিয় সিরিয়াল চলছিল। মা আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতেই বাবা সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন।

আমার বাবা মায়ের আমি একটাই সন্তান। আমার আর ভাই বোন নেই। তবে, আমাদের যৌথ পরিবার হওয়ায় আমার ভাই বোনের কমতি কখনো টের পেতে হয়নি। বড় আপা, বড় ভাইয়া, ছোট ভাইয়া, পুঁতি, তুতি, দিতি এরা সবাই আমার বাকি দুই চাচার সন্তান। আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক একদম মায়ের পেটের ভাই বোনের মতোই।

মায়ের ঘর থেকে বের হয়ে উপরে আসতেই দেখলাম অ্যামাজন অর্থাৎ আরণ্যক লোকটাকে। সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। খুব মনোযোগী হয়ে। ভাবলাম আমাকে খেয়াল করেনি। কিন্তু পাশ দিয়ে যেতেই বলে উঠল,

“একটু কফি পাওয়া যাবে?”

আমি ভ্রু কুঁচকে ফেললাম। মানে কী? আবার কফি! এই লোকের এখনো আমার হাতের কফি খাওয়ার সাধ আছে? নাকি লোকটা আমাকে চিনতে পারেনি। অন্য কেউ ভেবেছে? কিন্তু অন্য কাকেও বা ভাববে? আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। তার দৃষ্টি তখনও ল্যাপটপের স্ক্রিনে, আঙুল কী বোর্ডে। হঠাৎ হাত থামল তার, আমার দিকে সরাসরি তাকালো। আমি আমতা আমতা করে বললাম,

“আপনি আমাকে কিছু বলছিলেন?”

“হুঁ, কফি চাইছিলাম।”

“আমার কাছে কীসের কফি চাইছেন! আমি তো লবণ দেই কফিতে। আমার কফি তো মুখেও তোলা যায় না। থু করে ফেলে দেন।”

“কালও তো খেলাম। ফেলিনি তো!”

আমি চমকে উঠলাম। বললাম,

“আপনি কাল লবণের টেস্ট পেয়েছিলেন?”

“হুঁ।”

“তারপরও ওটা খেলেন!”

“হুঁ।”

“কেন?”

“তুমি দিলে তাই।”

“আমি তো এর আগের দিনও দিলাম। দুধ চিনির একটা পার্ফেক্ট কফি দিয়েছি। আপনি সেটা কেন ফেলে দিলেন? আর মিথ্যে কেন বললেন?”

“এমনিতেই।”

“এমনিতেই আপনি এমন করবেন?”

“করলাম তো।”

“আপনার আমার সাথে কোনো শত্রুতা নেই আমার জানামতে।”

“সবকিছুর পেছনে সবসময় শত্রুতা থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই সুবর্ণা।”

আমি চুপ করে গেলাম। আবারো বলল! কিন্তু এবার আমাকে সরাসরি আমার নামে সম্বোধন করল। আমার ভালো নামটায়, যেটা আমি পছন্দ করি। আশ্চর্য! এমন কেন লাগছে আমার? আমি তার কথায় দুর্বল হয়ে যাচ্ছি কেন!

ওখান থেকে চলে এলাম ঘরে। ঘরে এসে বসতেই কেমন খারাপ লাগা শুরু হলো। মানুষটা আমার কাছে কফি চেয়েছে। সব কিছু না হয় বাদ দিলাম। সে তো আমাদের অতিথি! অতিথির সাথে এমন আচরণ করা অবশ্যই উচিত নয়। আমি উঠে গেলাম। তখনো তিনি ওখানেই বসে ছিলেন। আমি ঝটপট গিয়ে কফি করে নিয়ে এলাম। কিন্তু কফি করে এনে দেখলাম লোকটা ওখানে আর নেই। কোথায় গেল? চলে গেল!

আমার হঠাৎই খুব কান্না পেল। নিশ্চয়ই মনে আ’ঘাত পেয়েছে। আমি এত খারাপ কাজ কীভাবে করলাম? একটা মানুষ আমার কাছে কিছু চাইল আর আমি কী করলাম! ওই কফির মগ আঁকড়ে ধরে আমি ওখানেই বসে রইলাম। জানি না কেন! আমার ঘুম উড়ে গেল। আর মাথায় থেকে গেল শুধু সে, আরণ্যক!

বড় আপার বিয়ের দিন আমি কী কী করব, কীভাবে করব কত প্ল্যান করে রাখলাম অথচ কিছুই করতে পারলাম না। আমার পরার কথা ছিল শাড়ি আমি পরলাম সালোয়ার কামিজ। বর যাত্রী আসার সময় গেট ধরতে গেলাম না বাকিদের সাথে। আমি কেন গেলাম না এ নিয়ে বড় আপা আমাকে এক দফা বকলেন। বড় শালিকা হিসেবে আমার ওখানে উপস্থিত থাকার দরকার ছিল। ছোটরা সবাই গেল অথচ আমি গেলাম না। কেন গেলাম না এই প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারিনি। কী দেব? আমি নিজেও তো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কেন গেলাম না!

বিয়ে পড়ানোর সময় বড় আপার সাইন নিতে কাজি সাহেবের সাথে এলেন আব্দুল্লাহ ভাইয়া আর তার প্রিয় বন্ধু আরণ্যক। আমি লক্ষ্য করলাম লোকটা একবারের জন্যও আমার দিকে তাকালো না। অন্যদিন দেখা হলেই তো নাম নিয়ে মশকরা শুরু করে। নয়তো কোনো হুকুম দিয়ে দেয়। আর আজ তাকায়নি পর্যন্ত। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। এর পেছনে কী কারণ থাকবে পারে? কতক্ষণ এটা নিয়ে ভাবার পর আমার মনে হলো কফি দেইনি বলেই হয়তো রাগ করেছে। অদ্ভুত তো! কফির জন্য রাগ করবে? লোকটা কী বাচ্চা? উঁহু! পরক্ষণেই আবার বুঝলাম। শুধু যে কফি তা নয়! আমি তাকে অবজ্ঞা করেছিলাম। সেটাই কী কারণ হতে পারে?

আমি হঠাৎ ভীষণ অপ”রা’ধ”বোধে ভুগতে লাগলাম। আমি তো তাকে অসম্মান করতে চাইনি। আমি তার ওপর রাগ করে ছিলাম। সহজ হিসাব! সে আমাকে রাগ করার সেই সুযোগ দিয়ে গেছে সবসময়। আমি তো নিতান্তই ভদ্র সভ্য মেয়ে। সবার সব কাজ করে দেই। চা, কফি এসব তো আমি শখ করেও করে এনে দেই। কিন্তু কাল ওভাবে ঘরে চলে গিয়েছিলাম কারণ সে আবারো আমার মেজাজ বিগড়ে দিচ্ছিল। কেমন কেমন কথা বলছিল! পরিস্কার নয় ভণিতা করেই। তাছাড়া সে আমার নাম মুখে কেন নেবে? সুবর্ণা! ওভাবে কেন ডাকবে? এত গভীর করে? আমার তখন কেমন কেমন লাগছিল!

এ কী করছি আমি? সুবর্ণা কেন বলল এই নিয়েও এখন মনে মনে অভিযোগ করছি? পুঁটি ডাকলেও অন্যদিকে রাগ করছি! ধ্যাত, আমার যে কী হচ্ছে! থাক, যা হওয়ার হয়েছে। আমি নাহয় আমার যতটুকু ভুল ছিল তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেব। অন্তত নিজের দিক থেকে আমি স্বচ্ছতা রাখতে চাই। ক্ষমা করা না করা তার ব্যাপার। তাও তো আমি আমার অল্প টুকু ভুলের ক্ষমা চাইতে রাজি আছি। তারমধ্যে তো তেমন কিছু দেখি না! শুধু আমাকে রাগালেই যেন তার আনন্দ হয়।

বড় আপার বিদায়ের পর আমি ভাবলাম তার কাছে গিয়ে স্যরি বলব। কিন্তু এরপর আর তার সাথে আমার দেখা হলো না। আমি তাকে খুঁজলাম, পেলাম না। ভাবলাম সবার সাথে বাইরে কোথাও গেছে। ফিরে এলে বলব। আমার অপেক্ষার অবসান আর হলো না। ফিরল না! ফিরলেন শুধু আব্দুল্লাহ ভাই। তাও অনেক রাত করে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

“আপনার বন্ধু কোথায়?”

“কোন বন্ধু?”

“ওই যে, আরণ্যক ভাইয়া!”

“আরণ্যক? ও তো চলে গেছে!”

“চলে গেছে মানে?”

“তুই জানিস না? আরণ্যক এলো অল্পদিনের ছুটিতে। রুপকথার বিয়ে অ্যাটেন্ড করার জন্যই। রিটার্ন টিকেট কাটা ছিল। ভোর পাঁচটায় ফ্লাইট। আমি তো ওকে ঢাকার বাসে উঠিয়ে দিয়েই এলাম।”

আব্দুল্লাহ ভাইয়া চলে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি জানি না ঠিক কেন, হঠাৎ করেই আমার বুকে ভেঙে এত কান্না আসছিল! আমি সেই কান্না কিছুতেই আটকে রাখতে পারছিলাম না! এত অবাধ্য কান্না!

#চলবে।

(শেষ করার কথা ছিল এই পর্বেই। কিন্তু এমন এমন অনুরোধ গুলো ফেলতেও পারছিলাম না। গল্পটা আপনাদের এত ভালো লাগছে দেখে আমিও লিখতে আনন্দ পাচ্ছি। কিন্তু খুব সম্ভবত আর দুই এক পর্বই বাড়ানোর আছে। এর বেশি সম্ভব হবে না… আপনারা প্লিজ কিছু মনে করবেন না।)

#অল্পস্বল্পগল্প #সংগৃহীত #ভাইরাল_গল্প

Want your school to be the top-listed School/college in Rangamati?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Rangamati
Rangamati
4500