29/06/2025
শিশুরা ছবি আঁকার আগ্রহ ও সৃষ্টিশীলতা হারাচ্ছে
————/////———//-/////////////////——-/——-
(অভিভাবক ও ড্রইং শিক্ষকদের জন্য এই লেখাটি অবশ্যপাঠ্য নিবন্ধ)
ছবি আঁকা শুধু আর্ট না—এটা শিশুর কল্পনা, অনুভব, ও মনোজগত প্রকাশের জানালা খুলে দেয়ার একটি মাধ্যম।
লক্ষ করবেন- শিশুরা শুরুতে অনেক উৎসাহ নিয়ে আঁকা শুরু করে; ঘরের মেঝেতে-দেয়ালে, বই খাতার পাতায়, খেলনা ও নিজেদের গায়ে নিজেদের মতো করে আঁকতে থাকে। শিশুর ছবি আঁকার এমন আগ্রহ দেখে অভিভাবকরা এসময় নিয়ে যায় কোনো আর্ট স্কুল বা শিক্ষকের কাছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই শিশুর সেই আগ্রহটা মিলিয়ে যেতে থাকে।ধীরে ধীরে দেখা যায়, শিশু আর ছবি আঁকে না, অমনোযোগী হয়ে কাগজে খোঁচা খুঁচি করে পেন্সিল দিয়ে কিম্বা ড্রইং ক্লাস এড়াতে নানা বাহানা দিতে থাকে। ভাবতেই অবাক লাগে-
কী ভীষণ আগ্রহ নিয়ে শিশু ছবি আঁকা শুরু করেছিলো, তা নিমিষেই হারিয়ে গেলো ! কেনো এমনটা হয়? কোথায় আমাদের ভুল…?
কারণ এবং প্রতিকার:
১. প্রশংসার অভাব ও অতিরিক্ত সমালোচনা
আমরা অনেক সময় বলি "ভালো হলে প্রশংসা করবো" — কিন্তু শিশুদের চিত্রকলায় “ভালো” মানে শুধু নিখুঁততা নয়, বরং শিশু সাহস করে শুরু করেছে, সাবলিল নির্ভয়ে সব আঁকছে তার দেখা রঙের পৃথিবী, এটাই বড় কথা।
একজন শিশু হাত দিয়ে একটা সূর্য আঁকলো। আপনি বললেন,
“এটা তো গোল না, সূর্য এমন হয়?”
শিশুটি তখন ভাববে, “তাহলে না আঁকাই ভালো…”
উপায়:
আপনি বলুন-
“বাহ! তুমি তো দারুণ সূর্য এঁকেছো! বাহ! আমি তো তোমার মত আঁকতেই পারবোনা !”
এই টুকু উৎসাহ শিশুটিকে শিল্পের অথবা আত্মবিশ্বাসের জগতে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
২. তুলনা ও চাপ
“দেখো, তোমার বন্ধু কত ভালো আঁকছে, আর তুমি এসব কি আঁকছো !”
আপনার এই একটি বাক্যই ভেঙ্গে দিবে শিশুর আত্মবিশ্বাসটুকু চিরদিনের জন্য ।
মনে রাখবেন, শিশুরা প্রত্যেকেই আলাদা সত্বা, একরকম নয়। কারো হাতে রং ভালো খেলে, কেউ রূপকল্পনা করে, কেউ আকার গঠনে পারদর্শী হয়।
উপায় কী?
তুলনার বদলে বলুন- “তুমি যা আঁকো, সেটা একেবারে তোমার মতোই আলাদা — এইটা-ই তোমার ছবির বিশেষত্ব।”
তুলনা বাদ দিয়ে তার নিজ অগ্রগতি তাকে বোঝান।
৩. শেখার আনন্দকে পড়ায় রূপান্তর:
অনেক সময় দেখা যায় অভিভাবক বা শিক্ষক আঁকাকে একটা বাধ্যতামূলক পড়ায় রূপ দেয়। তাই শেখার আনন্দ যদি শাস্তির ছায়া পায়, তখন শিশু ছবি আঁকাকে বোঝা মনে করে।
যেমন: “আজ এটা না আঁকলে খেলতে পাবে না/চকলেট পাবেনা” — এর ফলে ছবি আঁকা হয়ে ওঠে স্কুল পাঠ্যের মত আর একটি হোম ওয়ার্ক। আঁকা তখন আর মজা থাকে না, হয়ে যায় বোঝা।
তাই আঁকা শেখান খেলাচ্ছলে, গল্পের মতো করে।
উপায়:
“চলো, আজ আমরা একটা মজার মিস্টি বাঘের মুখ আঁকবো, যার একটা চোখ বড় আর একটা ছোট!”
এইভাবে শেখা মানে শেখার মধ্যেই গল্পের আনন্দ থাকে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও সময় সংকট
শিশুদের অনেকেই স্কুলের পড়ালেখা, কোচিং, হোমওয়ার্কের চাপে হাঁপিয়ে যায়।
আর অভিভাবকও ভাবে — “ছবি আঁকা তো সময়ের অপচয়, আগে পড়া!”
অথচ গবেষণা বলছে:
যেসব শিশু নিয়মিত ছবি আঁকে, তাদের মনোযোগ, স্মৃতি শক্তি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অনেক ভালো হয়।
সুতরাং আঁকা শেখা সময়ের অপচয় নয়, বরং শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনের শক্ত ভিত হিসেবে বিবেচনা করুন।
৫. শেখার ভুল কৌশল ও কল্পনাহীন অনুশীলন:
শিশুদের অনেক শিক্ষক শুরুতেই বলে দেন — “এইভাবে আঁকো, এভাবে না।”
শিক্ষক/মা পাশে বসে বলে এখানে লাল দাও, নীল দাও।
কোনো কোনো আর্ট স্কুল/শিক্ষক বোর্ডে বা কাগজে ছবি এঁকে বা ছাপিয়ে শিশুদের হাতে তুলে দেন। ঘর গাছ মানুষ এসব শিক্ষক নিজেই এঁকে দেয় শিশু তা চাপে পরে কপি করে। ফলে একটি স্কুল বা একজন শিক্ষকের সকল শিক্ষার্থীশিশুর আঁকা ছবি দেখতেও বৈচিত্রহীন একই রকম হয়ে যায়। স্কুলে স্যারদের নোট মুখস্থ করে পরীক্ষা দেয়ার মতো।
আরও ভয়ঙ্কর প্রবনতা হলো প্রতিযোগিতা নির্ভর ছবি আঁকা ।
জাতীয় দিবস থেকে শুরু করে স্মরণ সভায় লোক জরকরার ঢাল হিসেবে শিশুদের ব্যবহার করার প্রবনতা সমাজে আজ প্রকট। সেখানে বিষয় ভিত্তিক ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা গুলো শিশুদের জন্য আর একটি ভয়ঙ্কর সর্বনাশের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। অনুকরণ করা কোনো একটি ছবিতে একটি যদি পুরস্কার পেয়ে যায়; ব্যস তাহলে ওই ছবি বারবার এঁকে শিশু তার অভিভাবকের মুখে হাসি ফোটায়।
এসব কারনে শিশুর ভাবনার- কল্পনার দরজা জানালা গুলো সব একে একে বন্ধ হয়ে যায়। তারা আর ভাবেনা, কল্পনা করেনা, শিশুরা হয়ে ওঠে শুধু অনুকরণকারী। ধীরে ধীরে কল্পনাশক্তি মরে যায়, ছবি আঁকার আগ্রহও হারায়।
উপায়:
প্রথমেই ওদের বলতে দিন — সে কি আঁকতে চায়।
আপনি বলুন: “তুমি যা ভাবো, তাই আঁকো”। ভাবনাকে গুরুত্ব দিন নিখুঁত টেকনিককে নয়, ভাবনা শেখানোই আসল শিল্প। শিশুকে জানতে চান- “তোমার ছবির গল্পটা কি?” এভাবেই শিশুরা শিল্প নয়, সৃজনশীলতা শিখবে।
পরিশেষে:
প্রতিযোগিতায় অন্য শিশুদের হারিয়ে প্রথম হওয়া নয়, নিজেকে প্রতিনিয়ত অতিক্রম করাই শিশুর শ্রেষ্ঠ অর্জন।
শিশুরা ছবি আঁকতে ভালোবাসে —
শিশুদের সেই ভালোবাসার জায়গাটাকে বাঁচিয়ে রাখুন।
তাদের ছোট ছোট আঁকাকে “অমূল্য” ভাবুন।
প্রশংসা করুন, সময় দিন, খেলতে খেলতে শেখার সুযোগ তৈরি করুন।
ওর স্বপ্ন, ওর দেখা আকৃতি ও রঙকেই কাগজে মাখাতে দিন।
ঘনঘন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা থেকে শিশুটিকে মুক্তি দিন। মনে রাখবেন- প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া আর সৃজনশীল/সৃষ্টিশীল হওয়া এক নয়।
নির্দ্ধারিত বিষয়ে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা বন্ধ করুন। শিশুদের ছড়া কবিতা গল্প রূপকথা গান শুনিয়ে, তা বুঝিয়ে বলে কল্পনার ছবি আঁকতে দিন। ১ম ২য় ৩য় না করে শিশুদের ছবির প্রদর্শনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাদের এক-একটি গ্রুপে নুন্যতম ১০জনকে সমান পুরস্কার দিন। অংশগ্রহণকারী সকল শিশুকে কিছু দিন। শিশুরা বন্ধুদের সাথে নিয়ে নিজেদের ছবি দেখবে প্রদর্শনীতে। আহা কি আনন্দ…।
তাই অভিভাবক ও শিক্ষক বৃন্দ —
শিশুর শিল্পপাঠের শুরুতে শিক্ষকরা স্যার বা গাইড না হয়ে, শিশুদের বন্ধু হয়ে যান।
কারণ, একটা ভুল মন্তব্য হয়তো তাকে আঁকার দুনিয়া থেকে বাহিরে নিয়ে গেলে, তাকে আর ফিরিয়ে আনবে না কখনোই।
আজ থেকেই চেষ্টা করে দেখুন:
“কোনো সমালোচনা না করে শিশুর আঁকা একটা ছবি শুধু মন দিয়ে দেখবেন — ওর চোখে চোখ রেখে বলবেন, ‘তুমি নিজেই একেকটা গল্প এঁকেছো।’”
আপনার এই ছোট্ট প্রশংসাই শিশুকে আগামী দিনের এক শিল্পী কিম্বা শিল্পবোদ্ধা হিসেবে তৈরী হতে সহযোগিতা করবে। অথবা নাইবা হলো সে শিল্পী, অন্ততো শিশুটি হবে তার ভবিষ্যত যেকোনো পেশায় আত্মবিশ্বাসী সৃজনশীল উদ্ভাবনী গুনসম্পন্ন মানুষ।
**প্রিয় অভিভাবক ও শিক্ষকগণ
উপরের কথাগুলো গভীর ভাবে ভেবে দেখার বিনীত অনুরোধ করছি-॥
👀“পোস্টটা শিল্পশিক্ষক ও অভিভাবকদের পড়ার সুযোগ করে দিন, একটা শেয়ার করে। তাতে হয়তো আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম কথিত শিল্পশিক্ষার পদ্ধতির নামে শিল্পনির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।”
লেখা: ধারণা : সংগ্রহ।
প্রকাশিত লেখা: সংযোজন ও বিয়োজনকৃত সম্পাদনার সাথে অর্জিত অভিজ্ঞতা।
ছবি: সংগ্রহ