28/06/2026
#নিষিদ্ধআশ্রয়
@পর্ব-১
পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত পরিচয়গুলো হয়তো কোনো উৎসবে নয়, কোনো আনন্দে নয়, হয় মানুষের সবচেয়ে ভাঙা মুহূর্তে।
ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লার দিকে ছুটছিল বাসটা। জানালার বাইরে রাত নেমেছে। দূরের আলোগুলোকে মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে পড়ে থাকা ক্লান্ত কিছু তারা, যারা ভুল করে পৃথিবীতে আটকে গেছে।
তুহিন জানালার পাশে বসতে ভালোবাসে। মানুষের ভিড়ের চেয়ে রাস্তা তার কাছে বেশি সত্য মনে হয়। রাস্তা কখনো কাউকে আটকে রাখে না, আবার কাউকে ফেরতও ডাকে না।আজও সে জানালার পাশেই বসেছিল।
কিন্তু তার পাশে যে মেয়েটি এসে বসেছিল, তাকে প্রথমে খেয়ালই করেনি।বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পর খুব ক্ষীণ একটা শব্দ তার কানে এলো।
ফোঁপানোর শব্দ।
সে তাকাল না। মানুষের কান্না দেখতে নেই। কান্না দেখতে গেলে মানুষ অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
তবু শব্দটা বারবার ফিরে এলো।
একসময় বাসের জানালায় প্রতিফলিত মুখে সে দেখল মেয়েটি চুপচাপ কাঁদছে। চোখের পানি মুছছে এমনভাবে, যেন পৃথিবীর কেউ জানতে না পারে।
তুহিন কিছু বলল না। কিছু কান্নার পাশে ভাষা খুব বেমানান লাগে।
এক ঘণ্টা পর বাস একটা হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে থামল।
সবাই নেমে গেল। তুহিনও নামল। ফিরে আসার সময় তার হাতে শুধু একটা পানির বোতল।সে বোতলটা মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল।
নিন।
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল।
আমি তো চাইনি।
তুহিন মৃদু হেসে বলল, কান্নার পরে পানি খেলে একটু ভালো লাগে।মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর বোতলটা নিল।
এই প্রথম সে হাসল।
খুব ছোট্ট একটা হাসি।
যে হাসির ভেতরেও কান্নার গন্ধ লেগে থাকে।
বাস আবার চলতে শুরু করল।
অনেকক্ষণ নীরবতা।
হঠাৎ মেয়েটিই বলল,
আপনি কী সবাইকে এভাবে পানি কিনে দেন?
তুহিন জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল,না। সবাই এভাবে কাঁদে না।
মেয়েটা আরেকবার চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর নিজেই বলল,
আমার নাম নিশী।
আমি তুহিন।
কোথায় পড়েন?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
এত দূরে?
দূরত্বে অভ্যাস হয়ে গেছে।
নিশী হালকা হেসে ফেলল।
সেই হাসির ভেতরেও একটা ক্লান্তি ছিল।
মানুষ মাঝে মাঝে অচেনা কাউকে এমন সব কথা বলে ফেলে, যা আপনজনদের কাছেও বলতে পারে না।
হয়তো কারণ অচেনা মানুষ বিচার করে না।
শুধু শোনে।
নিশীও বলতে শুরু করল।
আমি একজনকে ভালোবাসতাম।
তুহিন কোনো প্রশ্ন করল না।
নিশী নিজেই বলে চলল
আমার কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের স্যার।
মানুষটা খুব সুন্দর ছিল না। কিন্তু তার কথা বলার ভঙ্গি... ছাত্রদের প্রতি দায়িত্ব... ব্যক্তিত্ব... সবকিছু আমাকে টেনে নিয়েছিল।ছয় মাস পরে জানতে পারলাম, উনি বিবাহিত।
কথাটা বলেই নিশী হেসে ফেলল।
অদ্ভুত সেই হাসি।যে হাসির শব্দ শুনলে বোঝা যায়, মানুষটা অনেক আগেই ভেঙে গেছে।
জানেন, সবচেয়ে কষ্ট কী?
তুহিন এবার প্রথম তাকাল।
নিশীর চোখ লাল।
প্রতারিত হওয়া না।
সবচেয়ে কষ্ট হয় তখন, যখন জানেন মানুষটা ভুল, তবুও তাকে ভালোবাসা বন্ধ করতে পারেন না।
তুহিনের মনে হলো, কিছু প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না।
শুধু নীরবতা হয়।
সেদিন সে কোনো উপদেশ দেয়নি।
শুধু শুনেছিল।
কারণ সে জানত
যে মানুষ ডুবে যাচ্ছে, তাকে সাঁতার শেখানো যায় না।
প্রথমে তাকে ভেসে থাকার সাহস দিতে হয়।
বাস যখন কুমিল্লার কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন রাত অনেক।
নামার আগে নিশী হঠাৎ বলল,আমরা কি... বন্ধু থাকতে পারি?
তুহিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিল।
বন্ধুত্বের একটা নিয়ম আছে।
কী?
মিথ্যে বলা যাবে না।
নিশী মাথা নাড়ল।
ঠিক আছে।
বাস থামল।
নিশী নেমে গেল।
জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে একবার হাত নাড়ল।
বাস আবার চলতে শুরু করল।
তুহিন জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল।
সে জানত না আজ রাতে এক বোতল পানির জন্য তার নিজের জীবনে কি কি ঘটতে চলেছে