23/02/2026
ক্লাসরুমে বেত নাকি একটিভ লার্নিং ম্যাথড?
~আকতার হোসেন~
শিক্ষা মানে শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়; শিক্ষা মানে মানুষের ভেতরে মানুষ গড়ে তোলা। অথচ আমাদের অনেক ক্লাসরুমে আজও একটি পুরোনো প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বেত প্রয়োজন, নাকি শেখানোর জন্য দরকার একটিভ লার্নিং ম্যাথড? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শিক্ষা-দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে তাকাতে হয়।
একসময় বেত ছিল শিক্ষকের ক্ষমতার প্রতীক। ধারণা ছিল—ভয় দেখিয়ে শাসন করলে ছাত্র পড়াশোনায় মনোযোগী হবে। বাস্তবে যা হয়েছে, তা হলো: শিক্ষার্থী পড়েছে ভয় থেকে, বোঝার আনন্দ থেকে নয়। বেত শিক্ষার্থীকে নীরব করে, কিন্তু চিন্তাশীল করে না। প্রশ্ন করার সাহস কেড়ে নেয়, ভুল করার স্বাভাবিক অধিকার নষ্ট করে। ধীরে ধীরে শেখা হয়ে ওঠে শাস্তি এড়ানোর কৌশল, জ্ঞান অর্জনের পথ নয়।
শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বেতের প্রভাব আরও ভয়াবহ। শাস্তিভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীর মধ্যে ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও মানসিক চাপ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা-বিমুখতা, এমনকি স্কুল ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। তাই আধুনিক বিশ্বে শাস্তিকে আর শিক্ষার উপকরণ হিসেবে দেখা হয় না। UNESCO এবং UNICEF স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে—শিক্ষা পরিবেশে শারীরিক শাস্তির কোনো স্থান নেই।
এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে একটিভ লার্নিং ম্যাথড। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী কেবল শ্রোতা নয়, শেখার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। প্রশ্ন করা, আলোচনা করা, দলগত কাজ, বাস্তব উদাহরণ, খেলা ও সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে শেখা হয়। এখানে শিক্ষক শাসক নন, বরং পথপ্রদর্শক। শিক্ষার্থী ভুল করে শেখে, ভয় নয়—কৌতূহল তাকে এগিয়ে নেয়।
একটিভ লার্নিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি শিক্ষার্থীর ভেতরের আগ্রহকে জাগিয়ে তোলে। যে ছাত্র বেতের ভয়ে চুপ করে থাকত, সে এখানে কথা বলে। যে দুর্বল ছিল, সে দলগত কাজে নিজের জায়গা খুঁজে পায়। শেখা হয়ে ওঠে আনন্দময় ও অর্থবহ। বাংলাদেশেও এর বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। BRAC পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে একটিভ লার্নিং প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও টিকে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আসলে প্রশ্নটি বেত বনাম একটিভ লার্নিং নয়; প্রশ্নটি হলো—আমরা কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই। যদি লক্ষ্য হয় ভয়ভীত, নীরব ও যান্ত্রিক শিক্ষার্থী, তাহলে বেত কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় চিন্তাশীল, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক নাগরিক, তাহলে একটিভ লার্নিং ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে বলা যায়, বেত হয়তো সাময়িক শৃঙ্খলা আনে, কিন্তু শিক্ষা আনে না। একটিভ লার্নিং শৃঙ্খলার পাশাপাশি শেখার আনন্দ, মানবিকতা ও ভবিষ্যতের প্রস্তুতি দেয়। তাই আধুনিক ক্লাসরুমে বেত নয়—প্রয়োজন চিন্তা, অংশগ্রহণ ও সক্রিয় শেখার পরিবেশ। শিক্ষা তখনই সার্থক, যখন তা ভয় নয়, আলো তৈরি করে।