26/08/2025
পুরোনো স্যাটেলাইটের গন্তব্য কোথায়?
পৃথিবীর কক্ষপথে এখন হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ঘুরছে। এগুলি নানা কাজ করে—নেভিগেশন বা দিকনির্দেশনা দেওয়া থেকে শুরু করে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা, এমনকি বনাঞ্চলে আগুন শনাক্ত করার মত কাজ। কিন্তু এসব স্যাটেলাইট যখন কার্যক্ষম জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছায়, তখন কী হয়?
তখন স্যাটেলাইটগুলিকে নিষ্ক্রিয় করতে হয়। স্যাটেলাইট নিষ্ক্রিয় করার উপায় মূলত দুইটি। এক হল এগুলিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা, আরেক হল আরও দূরে পাঠিয়ে দেওয়া।
নিচু কক্ষপথের স্যাটেলাইট: এগুলিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে হয়
পুরোনো স্যাটেলাইট কক্ষপথে ফেলে রাখা যায় না, কারণ অকেজো স্যাটেলাইট সেখানে থাকলে ভবিষ্যতে সচল স্যাটেলাইটের গতিপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। যেসব স্যাটেলাইট নিচু কক্ষপথে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে—সেগুলির ওপর বায়ুমণ্ডলের হালকা টান বজায় থাকে।
যখন স্যাটেলাইট কক্ষপথে ঘুরছে, তখন এগুলিকে ঘোরাতে থ্রাস্টারের দরকার হয় না; পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিই তাকে কক্ষপথে ধরে রাখে। আসলে, কক্ষপথে থাকা কোনো বস্তুকে বলা যায় যে, সেটি সবসময় পৃথিবীর দিকে পড়ছে, কিন্তু এত দ্রুত সামনের দিকে এগোচ্ছে যে পৃথিবীর মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। তবে প্রায় সব স্যাটেলাইটেই একটু প্রপালশন বা ধাক্কা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, যা তাকে কক্ষপথে ঠিক জায়গায় রাখতে বা ছোটখাটো পরিবর্তন করতে ব্যবহার করা হয়।
যখন কোনো স্যাটেলাইট তার কার্যকাল সমাপ্ত করে, তখন পৃথিবী থেকে নিয়ন্ত্রণকারী দল তাদের থ্রাস্টার চালু করে স্যাটেলাইটের গতি কমিয়ে দেয়। এতে স্যাটেলাইট আগের মত দ্রুত পৃথিবীর বাঁক অতিক্রম করতে পারে না। ফলে মাধ্যাকর্ষণ এটিকে নিচে টেনে আনে, আর তখন সেটি পৃথিবীতে পতিত হয়।
উঁচু কক্ষপথের স্যাটেলাইট: জিওসিঙ্ক্রোনাস অরবিট থেকে গ্রেভইয়ার্ড অরবিটে
যেসব স্যাটেলাইট অনেক উঁচু কক্ষপথে, যেমন জিওসিঙ্ক্রোনাস (Geosynchronous - GSO) স্যাটেলাইট হিসেবে থাকে, সেগুলিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন। কারণ এতে অনেক বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হয়।
জিওসিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইট হল সেইসব স্যাটেলাইট, যা পৃথিবীকে তার ঘূর্ণন গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একবার প্রদক্ষিণ করে। ফলে পৃথিবী থেকে দেখলে এগুলি আকাশে একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থির আছে বলে মনে হয়। এই স্যাটেলাইটগুলি সাধারণত জিওস্টেশনারি (Geostationary - GEO) কক্ষপথে, অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫,৭৮৬ কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থান করে। এই উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলের কোনো প্রভাব থাকে না।
অকেজো হয়ে যাওয়া জিওসিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইটগুলি সেখানে ফেলে রাখলে তা অন্য স্যাটেলাইটের কাজে বাধা দিতে পারে। তাই সেগুলিকে পৃথিবীতে না নামিয়ে তাদের বর্তমান কক্ষপথ থেকে আরো কয়েকশো কিলোমিটার উঁচুতে একটি বিশেষ স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাকে "গ্রেভইয়ার্ড অরবিট" বা "কবরস্থান কক্ষপথ" বলা হয়। এতে জ্বালানি কম লাগে এবং অকেজো স্যাটেলাইটগুলি সক্রিয় স্যাটেলাইট থেকে দূরে থাকে, ফলে সরাসরি কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না।
তবে, মহাকাশের আবর্জনার সমস্যা এখানেও আছে। গ্রেভইয়ার্ড অরবিট নিরাপদ দূরত্বে থাকলেও সেখানে জমে থাকা অকেজো স্যাটেলাইটগুলি ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যাওয়া
নিচু কক্ষপথের ছোট স্যাটেলাইটগুলি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন সেগুলি পুড়ে যায়। স্যাটেলাইট খুব দ্রুত গতিতে নামতে থাকলে বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণ হয়, আর এই ঘর্ষণ থেকে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। এর ফলে স্যাটেলাইট টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়, আর এই টুকরাগুলি সাধারণত মাটিতে পৌঁছানোর আগেই পুড়ে শেষ হয়ে যায়। রাতের আকাশে এসব জ্বলন্ত স্যাটেলাইটকে আগুনের গোলার মত দ্রুত ছুটে আসতে দেখা যায়।
তবে কিছু স্যাটেলাইট এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে তারা বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে নামার সময় অক্ষত থেকে নিরাপদে পৃথিবীতে নেমে আসতে পারে, এমনকি যদি সেগুলি মানুষবিহীনও হয়। যেমন ধরুন, কোনো গবেষণা স্যাটেলাইট মহাকাশ থেকে এমন উপাদান সংগ্রহ করেছে যা পৃথিবীতে পরীক্ষা করার দরকার আছে।
আবার বিকিরণ বা নিম্ন মাধ্যাকর্ষণ কোন ধরনের বস্তুর ওপর কী প্রভাব ফেলে তা পরীক্ষা করতেও মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো হয়। এমন ক্ষেত্রে যদি স্যাটেলাইট নেমে আসার সময় ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে এর ভেতরে থাকা গবেষণা উপাদান হারিয়ে যাবে, আর গবেষণা করাই সম্ভব হবে না।
তবে বেশিরভাগ স্যাটেলাইটই তৈরি করা হয় এই ধারণা নিয়ে যে তারা তাদের পুরো কাজের জীবনটাই মহাকাশে কাটাবে। তাই যখন তারা পৃথিবীতে ফিরে আসে, তখন তাদের কাজ শেষ হয়ে যায়—ফলে তারা বায়ুমণ্ডলে পুড়ে গেলে কোনো সমস্যা হয় না। বরং এটা অনেক দিক দিয়ে ভাল, কারণ এতে পৃথিবীতে পতিত ধ্বংসাবশেষ বা আবর্জনার পরিমাণ কমে যায়।
স্পেসক্রাফ্ট সিমেট্রি বা মহাকাশযানের কবরস্থান কী?
প্রতিটি স্যাটেলাইট নামার সময় পুরোপুরি পুড়ে যায় না। বড় স্যাটেলাইটগুলির কিছু অংশ পৃথিবীর মাটিতে পৌঁছে যেতে পারে।
এই ভাঙা টুকরাগুলি যদি মানুষের বসবাসের এলাকায় পড়ে, তবে তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই স্যাটেলাইটকে খুব সাবধানে নামানো হয়। যখন নিয়ন্ত্রণ দল কোনো স্যাটেলাইটকে বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে আনে, তারা চেষ্টা করে সেটিকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে—যেটাকে বলা হয় স্পেসক্রাফ্ট সিমেট্রি বা মহাকাশযানের কবরস্থান।
এই জায়গাটির নাম পয়েন্ট নিমো, যাকে বলা হয় সমুদ্রের দুর্গম মেরু। এটি সমুদ্রের এমন একটি জায়গা, যেটি মাটি থেকে সবচেয়ে দূরে এবং তাই সবচেয়ে নির্জন। এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে, নিউজিল্যান্ড আর চিলির মাঝামাঝি অবস্থিত, যা নিকটতম স্থলভাগ থেকে প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দূরে। এত নির্জন হওয়ার কারণে এখানেই পুরোনো স্যাটেলাইট ফেলা হয়, যাতে মানুষের বসতি বা জাহাজের ওপর পড়ার কোনো ঝুঁকি না থাকে।
বিবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত এখানে ২৬০টিরও বেশি মহাকাশযান ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলা হয়েছে।
মহাকাশের আবর্জনা
মহাকাশের আবর্জনা একটি বড় সমস্যা। পৃথিবীর চারপাশে থাকা অকেজো স্যাটেলাইট, রকেটের অংশ এবং ভাঙা টুকরাগুলিকে একত্রে মহাকাশের আবর্জনা বলা হয়। এই আবর্জনার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে এবং এটি কেবল নতুন স্যাটেলাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে না, বরং একটি বিপজ্জনক চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে, যা কেসলার সিন্ড্রোম নামে পরিচিত।
কেসলার সিন্ড্রোম হল এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে মহাকাশে আবর্জনার ঘনত্ব এত বেশি হয়ে যায় যে একটি সংঘর্ষ আরেকটি সংঘর্ষ ঘটায়, যা পুরো কক্ষপথকে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলে। একটি ছোট্ট সংঘর্ষে অনেকগুলি ছোট টুকরা তৈরি হয়, যা আবার অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে একসময় পৃথিবী থেকে মহাকাশে কোনো নতুন স্যাটেলাইট পাঠানো বা মহাকাশ মিশন পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
স্যাটেলাইট নিষ্ক্রিয়করণে নতুন প্রযুক্তি
বর্তমানে মহাকাশে জমে থাকা আবর্জনার সমস্যা সমাধানের জন্য মহাকাশ সংস্থাগুলি নতুন নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে একটি হল মহাকাশযানকে জালে ধরা। এই পদ্ধতিতে বড় বড় জাল বা 'স্পেস নেট' ব্যবহার করে মহাকাশের আবর্জনাগুলিকে আটকানো হবে এবং তারপর সেগুলিকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করা হবে।
আরেকটি পদ্ধতি হল লেজার ব্যবহার। এই ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে লেজার রশ্মি দিয়ে ছোট ছোট আবর্জনার টুকরাগুলিকে আঘাত করা হবে। এতে আবর্জনার গতিপথ বদলে যাবে এবং সেগুলি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যাবে।
এছাড়া, রোবট ব্যবহারেরও চিন্তা করা হচ্ছে। মহাকাশে রোবট পাঠিয়ে অকেজো স্যাটেলাইটগুলিকে ধরে নামিয়ে আনা হবে অথবা সেগুলিকে মেরামত করে আবার ব্যবহারের উপযোগী করা হবে। এই পদ্ধতিগুলি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও, ভবিষ্যতে এগুলি কার্যকর হলে মহাকাশের আবর্জনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
স্যাটেলাইট পুনর্ব্যবহার করা কি সম্ভব
বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী, যখন একটি স্যাটেলাইটের কাজ শেষ হয়ে যায়, তখন এটিকে পুড়িয়ে ফেলা হয় অথবা মহাকাশের দুর্গম কোনো জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়। ফলে এর ভেতরের মূল্যবান উপকরণগুলি আর ব্যবহার করা যায় না। এ কারণে বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা এখন এমন পদ্ধতি খুঁজছে, যার মাধ্যমে স্যাটেলাইটের যন্ত্রাংশগুলি পুনর্ব্যবহার করা যায়।
মহাকাশ থেকে উপকরণগুলি পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে পুনর্ব্যবহার করা খুবই কঠিন এবং ব্যয়বহুল। এই কারণে বিজ্ঞানীরা মহাকাশেই স্যাটেলাইট পুনর্ব্যবহারের উপায় নিয়ে গবেষণা করছেন।
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA) এই উদ্দেশ্যে OMAR (On-orbit Manufacturing, Assembly and Recycling) নামে একটি প্রোগ্রাম শুরু করেছে। এর প্রধান লক্ষ্য হল:
• মহাকাশেই নষ্ট হয়ে যাওয়া স্যাটেলাইট মেরামত করা
• ভাঙা স্যাটেলাইট থেকে দরকারি অংশ উদ্ধার করে নতুন কাজে লাগানো
• কক্ষপথে নতুন মহাকাশযান তৈরি করা
এই ধারণাটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে আছে। এর মূল চ্যালেঞ্জ হল, মহাকাশে পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়াটি অনেক ব্যয়বহুল। তবে ESA বিশ্বাস করে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি সফল হলে মহাকাশ মিশনগুলি সাশ্রয়ী এবং কার্যকর হবে। সহজ ভাষায় বললে, তারা মহাকাশেই একটি সার্ভিস সেন্টার তৈরি করার কথা ভাবছে, যাতে সবকিছু একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে না হয়।
#স্যাটেলাইট #মহাকাশ #প্রযুক্তি
13/08/2025
06/08/2025