13/08/2026
শিক্ষকদের আন্তরিকতা-পরিশ্রমে টিকে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
এডুকেশন টাইমস
১২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪২ PM
শিক্ষকদের আন্তরিকতা-পরিশ্রমে টিকে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
দেশজুড়ে যেখানে শুধু প্রাথমিক শিক্ষা তথা শিক্ষক সমাজের বদনাম, এ অবস্থায় মনে পড়ল শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়ার একটি গানের কলি, ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’ অনুরূপভাবে স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত অসুবিধা, শিক্ষকদের আর্থিক অনটন, সংশ্লিষ্টদের সমস্যা সমাধানে সময়ক্ষেপণ বা অবহেলা, পাঠদান বহির্ভূত অসংখ্য কাজের চাপসহ ছোট্ট শিশুদের সীমাহীন যন্ত্রণার মাঝে প্রাথমিক শিক্ষকরা তাদের কাজ যথারীতি কঠিন পরিশ্রমে আন্তরিকতার সঙ্গে করে আসছেন।
নানা সমস্যার মাঝে প্রাথমিক শিক্ষকরা কীভাবে প্রাথমিক শিক্ষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করছি:
প্রথমে আসা যাক ছোট্ট অসংখ্য শিশুর যন্ত্রণা সম্পর্কে: আমাদের বাড়ি-ঘরে এক বা একাধিক শিশু থাকলে তাদের দেখভাল তথা নজরদারিতে পরিবারের সবাই ব্যস্ত থাকে। বিদ্যালয়ে অসংখ্য শিশুর হৈচৈ, মারামারি, দৌড়াদৌড়ি, ছোটখাটো আঘাত, বিচার-আচার শাসনবিহীন অবস্থায় পরস্পরের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় শিশুকে আদর, সোহাগ, ভালোবাসা অর্জন করে শিক্ষাদান করতে হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষকরা শিশু শিক্ষায় ট্রেনিংয়ের যন্ত্রণায় অভ্যস্ত বিধায় তারা কাজটি সহজে করতে পারেন। বড় বড় সমালোচক তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ দিনের বেশি ক্লাস করলে অনেকটা মাথায় যন্ত্রণার সাথে পেট খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা হয়ে পড়বে। সকল পর্যায়ের শিক্ষার মধ্যে কঠিন হলো শিশু শিক্ষা। অবুঝ শিশুকে মানব শিশুতে রূপান্তরিত করার কাজ। অথচ সমাজ, রাষ্ট্র সবাই মিলে অবহেলা করে যাচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাকে। চরমভাবে অবহেলার শিকার আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ার কারিগর প্রাথমিক শিক্ষকদের।
দ্বিতীয়: স্বাধীনতার পর থেকে অবিরাম শিক্ষক সংকটে চলে আসছে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা। অনেকটা ট্রাকের তেলের ট্যাংকিতে লেখা ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’-এর মতো। ২/৩/৪ বছর পর পর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। ফলে মৃত্যু, অবসর, অন্য পেশায় চলে যাওয়া, সি ইন এডসহ নানা প্রশিক্ষণ, মাতৃত্ব, চিকিৎসা ছুটিসহ নানাবিধ কারণে শিক্ষক সংকট প্রকট হতে থাকে। অনেকটা ‘নদীর এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এ তো নদীর খেলার মতো’, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রমে একদিকে নিয়োগ অন্যদিকে পদ শূন্য হতে থাকে।
স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরে প্রাথমিক শিক্ষার চরম বেহাল দশা বর্তমানে বিরাজমান। সারা দেশে প্রায় ৩৫ হাজার প্রধান শিক্ষক, কয়েক হাজার সহকারী শিক্ষকের পদ, অসংখ্য সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে এক বিদেশি নাস্তিক স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ঘুরতে এসে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা উপস্থাপন করছি: বিদেশি নাস্তিক ভদ্রলোক সারা দেশ ঘুরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের দূষিত পানি খাওয়াও ব্যবহার নিয়ে তিনি মন্তব্য করলেন, এ দেশের দূষিত পানি খেয়ে, এরা কীভাবে বেঁচে আছে। নানা ভাবনার পর তার মাঝে দৃশ্যমান হলো, ঈশ্বর ছাড়া তাদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের রাষ্ট্র, সমাজসহ সুধীসমাজ কারোই ভাবনা একবারও আসে না, অর্ধেকের বেশি শিক্ষক নেই, অথচ নানা ঘাত প্রতিঘাতের পরও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার অস্তিত্বকে কঠিন শ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে প্রাথমিক শিক্ষকেরা। পুরো জাতির অনেকের এ উপলব্ধিবোধ নেই।
সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল চিত্রের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার খণ্ড চিত্র তুলে ধরছি। উপজেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২১৯টি। ২১টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ১টি পৌরসভায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪০০ জন।
এদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক আছেন ৯০ জন। প্রধান শিক্ষক নেই ১২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তৃণমূলের প্রাথমিক শিক্ষা দেখভালের জন্য ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদের মধ্যে আছেন ১ জন কর্মরত। ৫ জন অফিস সহায়ক পদের মধ্যে কর্মরত ১ জন, উচ্চমান সহকারীর পদটি শূন্য।
একদিকে বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটে পাঠদান বিঘ্নিত হচ্ছে, এ অবস্থায়ও বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক এনে অফিসের কাজ করানো হচ্ছে। এ বেহাল অবস্থা সারাদেশে বিরাজমান। অথচ যারা এ অচল অবস্থার জন্য দায়ী রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিসহ শিখন ও রিডিং স্কিলের ঘাটতির জন্য নিজেদের দায়ীর বিষয়ে কিছু মনে না করে ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’-এর মতো শিক্ষকদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা গোল্লায় গেল-অপবাদ দিয়ে বেড়াচ্ছে। এ পর্যুদস্ত অবস্থায়, প্রাথমিক শিক্ষকরা যে মাত্রাধিক পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে, এর কৃতজ্ঞতাবোধ রাষ্ট্র বা সমাজের মধ্যে খুব বেশি দৃশ্যমান নয়।
শিক্ষক তথা প্রাথমিকের সমস্যা দূরীকরণের বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে সীমাহীন অবহেলা বা সময়ক্ষেপণ বিষয়ে কারো কোনো দোষারোপ নেই। সবার মাঝে তেলা মাথায় তেল দেওয়ার প্রবণতা দৃশ্যমান। আর প্রাথমিক শিক্ষকদের মাথায় তেল নেই, শুকনো মাথায় তেল কেহ দেয় না। বরং মাথায় তেল না থাকার জন্য অপবাদ দিয়ে বেড়াচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষকরা রাষ্ট্রের চরম অবহেলার মাঝে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র, সমাজ, সুধীজনের কাছ থেকে যথাযথ সম্মান আশা করে থাকেন। তবে সংশ্লিষ্টদের দায়ের জন্য বদনাম নিজেদের ঘাড়ে নিতে কষ্ট হয়। এককভাবে শিক্ষকদের নয়, সকলের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক।
লেখক: মো. সিদ্দিকুর রহমান, শিক্ষাবিদ।
এসএস/