26/08/2026
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে একজন প্রকৌশলী কীভাবে বিশ্বের লাখো প্রকৌশলীর নেতৃত্বে পৌঁছাতে পারেন—প্রফেসর ড. সাইফুর রহমানের জীবন যেন তারই এক অসাধারণ উদাহরণ। ইলেকট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গবেষক শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়েই নিজের জায়গা করে নেননি, নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তিবিষয়ক পেশাজীবী সংগঠন IEEE-এর।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। এরপর Stony Brook University থেকে মাস্টার্স এবং Virginia Tech থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ কেটেছে Virginia Tech-এ। ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থাকা সাইফুর রহমান বর্তমানে সেখানকার Joseph R. Loring Professor of Electrical and Computer Engineering। একই সঙ্গে তিনি Virginia Tech-এর Advanced Research Institute-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় IEEE। প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ নিয়ে বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত এই সংগঠনের ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট ও CEO নির্বাচিত হন তিনি। IEEE-এর মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পৌঁছানো তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন।
তাঁর নেতৃত্বের পরিধিও ছিল বিস্তৃত। IEEE-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি প্রকৌশলীদের সামাজিক দায়িত্ব, টেকসই উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর উদ্যোগের অন্যতম স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হলো ‘IEEE Jagadish Chandra Bose Medal in Wireless Communications’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে এই আন্তর্জাতিক পদক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রযুক্তি অঙ্গনে বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক বিজ্ঞানীর নামকে নতুনভাবে সামনে আনার সুযোগ তৈরি হয়।
গবেষণার জগতেও সাইফুর রহমানের অবদান বিস্তৃত। তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ১৫০-এর বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত ৫০০-এরও বেশি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও বৈজ্ঞানিক আয়োজনে তিনি অংশ নিয়েছেন। IEEE-এর বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। শুধু অংশগ্রহণ নয়, নিজেও আয়োজন করেছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও প্রকৌশলভিত্তিক অনুষ্ঠান।
তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা, স্মার্ট গ্রিড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং ভবিষ্যতের টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা। এসব বিষয়ে তাঁর কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; যুক্তরাষ্ট্রের National Science Foundation, Department of Defense ও Department of Energy-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন।
সাইফুর রহমানের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হবে, কিন্তু সেই গবেষণা যেন শিল্প, সরকার ও সমাজের কাজে আসে—এই ধারণাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। Virginia Tech-এর Advanced Research Institute প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল গবেষণা, সরকারি সংস্থা এবং শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর এমন একটি লক্ষ্য।
একজন বাংলাদেশি প্রকৌশলীর এই বৈশ্বিক উত্থান তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি প্রশ্ন রেখে যায়। যে দেশের একজন প্রকৌশলী বিশ্বের প্রায় অর্ধমিলিয়ন প্রকৌশলীর নেতৃত্ব দিতে পারেন, সেই দেশ কেন তাঁর মতো বৈশ্বিক মানের গবেষক ও প্রকৌশলীদের জ্ঞানকে দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে গবেষণার সীমিত সুযোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বল সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিনীতি না থাকার মতো বিষয়। অথচ বিশ্বে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে দেশের বাইরে থাকা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে নিজ দেশে প্রযুক্তি শিল্প গড়ে উঠেছে।
তাইওয়ানের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। Morris Chang যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার পর তাইওয়ানে ফিরে Taiwan Semiconductor Manufacturing Company—TSMC প্রতিষ্ঠা করেন। আজ সেই প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বিশ্বমানের প্রকৌশলী ও গবেষকদের ক্ষেত্রে এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উদ্যোগ কি আমরা নিতে পারি না?
প্রফেসর ড. সাইফুর রহমানের জীবন অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—মেধার কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত নেই। বুয়েট থেকে শুরু করে Stony Brook, Virginia Tech, এরপর IEEE-এর বৈশ্বিক নেতৃত্ব—একজন বাংলাদেশি প্রকৌশলী নিজের যোগ্যতা, গবেষণা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে কতদূর যেতে পারেন, তাঁর ক্যারিয়ার তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো সাফল্যের শেষ প্রান্তে নয়, বরং শুরুর জায়গায়। বাংলাদেশ এমন মানুষ তৈরি করতে পারে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারে। আমাদের তরুণদের মধ্যেও বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা আছে। এখন প্রয়োজন সেই মেধাকে দেশে ধরে রাখা, বিদেশে থাকা মেধাকে দেশের সঙ্গে যুক্ত করা এবং গবেষণাকে বাস্তব প্রযুক্তি ও শিল্পে রূপ দেওয়ার মতো একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা।
কারণ সাইফুর রহমানের মতো মানুষ কেবল বাংলাদেশের গর্ব নন—তাঁরা একই সঙ্গে একটি সম্ভাবনারও প্রমাণ। প্রশ্ন শুধু, সেই সম্ভাবনাকে আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারি।