22/11/2024
আওয়ামি লিগের অনলাইন লাঠিয়ালবাহিনী বিশাল একটি গুপ্ত তথ্য আবিষ্কার করে ফেলেছে— জুলাই অভ্যুত্থানে 'মির মুগ্ধ' নামে কেউ নিহত হয়নি, জানাজা হয়নি, কবরও হয়নি; 'মির স্নিগ্ধ' নামে যাকে এখন জীবিত দেখা যাচ্ছে, আসলে সে-ই মুগ্ধ, একই ব্যক্তি মুগ্ধ ও স্নিগ্ধের ভূমিকায় অভিনয় করছে। বট অ্যাকাউন্টগুলোর পাশাপাশি 'আলো আসবেই' গংয়েরও কেউ-কেউ এই কুৎসিত প্রোপাগান্ডায় অংশ নিয়েছিল। বলাই বাহুল্য— মুগ্ধ-স্নিগ্ধ ভিন্ন ব্যক্তি, যমজ ভাই এবং পরিবারটি পাদপ্রদীপের বাইরে থাকতে চাওয়া রুচিশীল মন-মানসিকতার। গুজবটি কয়েক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়নি অবশ্য। আওয়ামি লিগের অনলাইনবাহিনী যত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন হতো, তা হলে তারা যে-কাজটি করত; তা হলো— দলকে প্রকাশ্যে কাঠগড়ায় তুলত, দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে তুলোধুনো করত, প্রশ্ন উত্থাপন করত কার-কার অযোগ্যতা-অথর্বতা-অবিমৃশ্যতার কারণে কোটা-আন্দোলনের মতো একটি আপাতনিরীহ ইশু এত ভয়ংকর রক্তপাতের দিকে গেল, কেন মুগ্ধদের খুন হওয়ার মতো প্রেক্ষাপট তৈরি হলো, কেন দল ও দেশকে অরক্ষিত-অনবহিত রেখে দলের সভাপতি শুধু নিজের বোনকে নিয়ে হেলিকপ্টারে চেপে পালিয়ে গেলেন, কেন দলের সাধারণ সম্পাদক এখনও গর্ত থেকে মুখ বের করছেন না, শেখ হাসিনা কেন ওবায়দুল কাদেরের মতো একজন নিকৃষ্ট নরাধমকে টানা তিনবার সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছিলেন, সারাদেশের মানুষের কাছে আওয়ামি লিগ কেন ও কীভাবে এতটা অজনপ্রিয় হয়ে উঠল, কেন শেখ হাসিনা টানা তিনটা ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন, শেখ বংশের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ভূস্বামীরা এখন কই, হাসিনা কেন দলের নেতাকর্মীদেরকে অব্যবহৃত ও নিষ্ক্রিয় রেখে পুলিশ আর আমলা দিয়ে সরকার চালাচ্ছিলেন, কেন একজনের পলায়নের সাথে-সাথে আওয়ামি লিগের এত বড় একটা দলকে ঝাড়ে-বংশে পালাতে হলো। লাঠিয়ালবাহিনী সেই আলোচনায় নেই, আছে একজন শহিদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সহজ ও সস্তা মিশনে।
জুলাইয়ে টেলিভিশন টকশোয় এসে একজন উপস্থাপকের সাথে জঘন্য দুর্ব্যবহার করে এবং 'রাজাকারের বাচ্চা' বলে গালাগাল করে আওয়ামি লিগের পতনকে আরো ত্বরান্বিত করেছিলেন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। মানিকের বদমায়েশির প্রেক্ষিতে হতবিহ্বল উপস্থাপক চিৎকার করে বারংবার বলছিলেন— 'আমি একটা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান।' চার মাস পর এসে আওয়ামি লিগের অনলাইন মাস্তানরা এখন সেই উপস্থাপককে বিতর্কিত করার মিশনে নেমেছে, প্রমাণ করতে চাইছে উপস্থাপকের পরিবারের কেউ মুক্তিযোদ্ধা না, উপস্থাপকের বাবা লম্পট। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিশেবে উপস্থাপকটি জামায়াতের আমিরের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর থেকে আওয়ামি মাস্তানরা আরো বেশি মাস্তানি করতে শুরু করেছে। অথচ আওয়ামি লিগের সমর্থকদের উচিত ছিল আওয়ামি লিগের সভাপতিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া— মানিকের মতো একজন মানসিক ভারসাম্যহীন সর্বজনস্বীকৃত বদ্ধউন্মাদকে কেন বিচারপতি বানানো হলো, সাঈদীর যুদ্ধাপরাধমামলার মতো স্পর্শকাতর মামলায় বিচারক হিশেবে কেন মানিককেই রাখা হলো, মানসিক রোগী জানার পরও মানিককে কেন আওয়ামি লিগের তরফ থেকে ধারাবাহিকভাবে টেলিভিশন টকশোয় পাঠানো হলো, টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থেকেও আওয়ামি লিগ কেন এমন কিছু বুদ্ধিজীবী উৎপাদন করতে পারল না যারা টেলিভিশন টকশোয় আওয়ামি লিগের পক্ষে কথা বলতে পারেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামি লিগের পক্ষে কলাম লিখতে কেন লোক ভাড়া করতে হয়; নিজামীর মতো যুদ্ধাপরাধীকে পাশে বসিয়ে শেখ হাসিনা নব্বইয়ের দশকে কেন সাংবাদিকসম্মেলন করেছিলেন, জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে কেন আন্দোলন করেছিলেন, শেখ হাসিনা কেন রাজাকারপরিবারে নিজের মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন, স্বঘোষিত রাজাকারের ছেলেকে কেন নিজের প্রেস সচিব বানিয়েছিলেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপে আওয়ামি লিগ নেই। কেননা, এই আলাপ তুললেই নগ্ন আওয়ামি লিগ আরো বেশি নগ্ন হয়ে যায়। এর চেয়ে সোজা একজন উপস্থাপকের পরিবার নিয়ে রসালো গুজব ছড়ানো। উপস্থাপক কেন জামায়াতের আমিরের সাক্ষাৎকার নেয়, এই প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা আওয়ামি লিগের লাঠিয়ালবাহিনীর আছে; নেই শেখ হাসিনা কেন জামায়াতের আরেক আমির নিজামীকে পাশে বসিয়ে সাংবাদিকসম্মেলন করলেন— সেই প্রশ্ন তোলার মুরোদ।
নিজেদের পক্ষে বলার মতো কিছুই নেই আওয়ামি লিগের, যা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করবে। মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে বেচে খেতে-খেতে ঐ দুই পুঁজিও শেষ। বাকি নেই কিছুই আর। সামান্যতম অপরাধবোধ বা ন্যূনতম লজ্জা তো আওয়ামি লিগের এমনিতেই নেই। এখন আছে জুলাইয়ের জীবিত ও মৃত ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে অতর্কিতভাবে ধরে-ধরে বিতর্কিত করা। কিন্তু আওয়ামি লিগের প্রতি মানুষের ঘৃণা তাতে কমবে না। বাড়বে, বাড়তেই থাকবে, জীবনে আর কখনও ক্ষমতার মুখ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা কমতেই থাকবে। নিজেদের কারিশমায় আওয়ামি লিগ তো আর কখনোই ফিরতে পারবে না; ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে হবে এর-ওর করুণার আশায়, ক্ষমতায় যেতে চাইলে অপেক্ষা করতে হবে সব সরকারের ব্যর্থতার আশায়। অন্য সবার ওপর বিরক্ত হয়ে মানুষ যদি আওয়ামি লিগের দিকে আবার একটু তাকায়— এই আশায় তাকিয়ে থাকা ছাড়া আওয়ামি লিগের আর কিছুই করার নেই। তিন মাসেই আওয়ামি লিগ হাঁপিয়ে উঠেছে, ক্ষমতার বাইরে থাকতে তাদের আর ভালো লাগছে না। তাদের এখনই ক্ষমতা চাই— আগামীকাল সকালের মধ্যে। কিন্তু আত্মমুগ্ধ আওয়ামি লিগের আত্মসমালোচনা নেই, আছে মৃত মুগ্ধদেরকে নিয়েও নিকৃষ্ট নোংরামি।
©আখতারুজ্জামান আজাদ