01/03/2026
https://www.facebook.com/share/p/1DX8WcvcJw/
মহাবিশ্বের এই বিশাল ক্যানভাসে কোটি কোটি আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত গ্যালাক্সির আঁশতন্তুগুলো যেখানে মহাজাগতিক জাল বুনেছে, সেখানে আছে এক অপার শূন্যতা, যার নাম ইরিডেনাস সুপারভয়েড। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর একটি কাঠামো, যার সাথে জড়িয়ে আছে মহাবিশ্বের জন্মরহস্য, অন্ধকার শক্তির ধাঁধা, এমনকি সমান্তরাল মহাবিশ্বের চমকপ্রদ সম্ভাবনা। যদিও এরকম আরও কিছু বিখ্যাত ভয়েড আছে যা বিজ্ঞান খুঁজে পেয়েছে, যেমন বুটিস ভয়েড। এর ভিডিও আছে এই পেজেই, দেখতে পারেন।
সবকিছুর শুরু ২০০৪ সালে, যখন বিজ্ঞানীরা উইলকিনসন মাইক্রোওয়েভ অ্যানিসোট্রপি প্রোব থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করছিলেন। তারা মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমিতে (CMB) মহাবিস্ফোরণের সেই স্মারক আলোতে একটি অস্বাভাবিক ঠান্ডা অঞ্চল আবিষ্কার করেন। এই কোল্ড স্পটের তাপমাত্রা আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ৭০ মাইক্রোকেলভিন কম, যা স্বাভাবিক মহাজাগতিক ওঠানামা থেকে অনেক বড়ো একটি অসঙ্গতি। এই অঞ্চলের অবস্থান ছিল ইরিডেনাস নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে। প্রশ্ন, কেন এই এলাকা এত ঠান্ডা?
প্রথমদিকে যন্ত্রগত ত্রুটি থেকে শুরু করে কল্পনাপ্রসূত বহুবিশ্ব তত্ত্ব, নানা ব্যাখ্যা সামনে আসে। কিন্তু সবচেয়ে জোরালো ও রোমাঞ্চকর ধারণাটি ছিল অতি বৃহৎ একটি শূন্যতার। ধারণা করা হয়, এই বিশাল শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মহাজাগতিক ফোটনগুলো শক্তি হারায়। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে ফোটনগুলো যখন এই শূন্যতায় প্রবেশ করে এবং বেরিয়ে আসে, তখন তরঙ্গদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, যার ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। কিন্তু এত বড় শূন্যতা কি সত্যিই সম্ভব? রহস্য এর বিশাল অঞ্চল দখলে রাখা।
২০১৫ সালে উত্তেজনা চরমে ওঠে। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্তভান সাপুডির নেতৃত্বে একদল গবেষক প্রমাণ পান যে, ইরিডেনাসের দিকে সত্যিই এক বিশাল শূন্যতা বিদ্যমান। এর আকার এতটাই প্রকাণ্ড যে এটি মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষিত সবচেয়ে বড় কাঠামোগুলোর একটি। হিসাব অনুযায়ী, ইরিডেনাস সুপারভয়েডের বিস্তার প্রায় ১.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে, যা আমাদের থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। একে প্রায়ই "মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড়ো- কিছুই না" হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই আবিষ্কার কোল্ড স্পটের রহস্য সমাধানের পথ অনেকটাই পরিষ্কার করে। সন্দেহ হচ্ছে? ডেটা জানতে চান? কমেন্ট করুন।
কিন্তু এত বিশাল শূন্যতা কীভাবে তৈরি হলো? এই প্রশ্নই নিয়ে আসে সবচেয়ে বড় বিস্ময়। এই শূন্যতার প্রভাব শুধু দৃশ্যমান বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২১ সালের শেষের দিকে, ডার্ক এনার্জি সার্ভে বা DES প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা একটি যুগান্তকারী ফলাফল ঘোষণা করেন। তারা অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের মানচিত্র তৈরি করে দেখান যে, ইরিডেনাস সুপারভয়েডে সাধারণ পদার্থের পাশাপাশি ডার্ক ম্যাটারেরও বিরাট ঘাটতি রয়েছে, আশেপাশের অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ৩০% কম ।
আর এখানেই আসে মূল রহস্য। আইএসিএর গবেষক আন্দ্রাস কোভাচের মতে, এই সুপারভয়েড কেবল কোল্ড স্পট সৃষ্টির জন্যই দায়ী নয়, বরং এটি ডার্ক এনার্জি বোঝার এক অনন্য পরীক্ষাগার। ফোটন যখন এই শূন্যতায় প্রবেশ করে, তখন ডার্ক এনার্জির বিকর্ষণমূলক প্রভাবের কারণে তারা প্রবেশের সময় যতটা শক্তি ব্যয় করে, বের হওয়ার সময় পুরোপুরি তা ফিরে পায় না। এই নিট শক্তি ক্ষয়ই তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, বিদ্যমান থিওরি (ΛCDM মডেল) অনুযায়ী এই প্রভাবে কোল্ড স্পটের তাপমাত্রা হ্রাসের মাত্র ১০-২০% ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু বাকি অংশের জন্য কী দায়ী?
এখানেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর স্বাদ পাওয়া যায়। এই অসঙ্গতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কিছু তাত্ত্বিক, যেমন লরা মের্সিনি-হাউটন, অভিনব এক প্রস্তাব দেন। তার মতে, এই ঠান্ডা অঞ্চলটি হয়তো আমাদের মহাবিশ্বের কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বের সাথে কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট বা ভৌত সংঘর্ষের ফল !
এছাড়াও আরেকটি চরম তত্ত্ব অনুযায়ী, এটি কোনো বিশাল ব্ল্যাক হোলের প্রভাব হতে পারে, যা আশেপাশের সবকিছু গ্রাস করছে। যদিও এসব তত্ত্ব মূলধারার বিজ্ঞানে এখনও প্রান্তিক, তবুও এরা ইরিডেনাসের রহস্যময়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরিডেনাস সুপারভয়েড আজ বিজ্ঞানীদের কাছে এক ধাঁধা। এটি যেমন মহাবিশ্বের এক বৃহত্তম কাঠামো, তেমনি ডার্ক এনার্জির আচরণ নিয়ে আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও উন্মোচিত করছে। এই শূন্যতা হয়তো একদিন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ডার্ক এনার্জি এবং পদার্থের মৌলিক প্রকৃতি নিয়ে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। যতদিন না সেই রহস্যের সমাধান হচ্ছে, ইরিডেনাস মহাকাশের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অজানা এক নাম হয়ে থাকবে।
■》যদি এর ডাটা বিশ্লেষণ সহ, গবেষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে সচিত্র আলোচনা চান, তবে জানাতে পারেন।