সময় তখন উনিশ শতকের শেষের দিক। তখন শিক্ষা থেকে শুরু করে বড় রকমের কোনো প্রয়োজনে এ অঞ্চলের মানুষকে যেতে হতো কলকাতায়। ওই গোধূলিলগ্নের একজন মানুষ গোপালচন্দ্র লাহিড়ী। তিনি চাইলেন শিক্ষা জগতে যুগান্তরের দুয়ার খুলে দিতে পাবনায়। সেই গোপালচন্দ্র লাহিড়ী ১৮৯৪ সালের মার্চ মাসে পাবনা ইনস্টিটিউশন নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা, স্বত্বাধিকারী, প্রথম ও আজীবন প্রধান শিক্ষক। ১৯৩১ সালের ৩১ জুলাই তার মৃত্যুর পর তারই নামানুসারে এ বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় গোপালচন্দ্র ইনস্টিটিউশন। যা সংক্ষেপে এখন জিসিআই নামে পরিচিত। এ বিদ্যালয়টি প্রথম পাবনা বাজার এলাকায় স্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে স্থানাভাব দেখা দিলে বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। পাবনার পোরজানা গ্রামের ভাদুরী জমিদাররা নামমাত্র সেলামিতে সাত বিঘা জমি দান করায় গোপাল বাবু ওই জমির উপর নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং ১৯০০ সালের মধ্যেই শেষ হয়।
এ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষেই জন্ম হয়েছিল ১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে বর্তমান সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের। এ জেলায় শিক্ষার ইতিহাসে যা ঘটেনি তাই গোপাল বাবু ঘটিয়েছিলেন। তিনি হলেন একই প্রতিষ্ঠান পাবনা ইনস্টিটিউশনের দ্বৈত সারথী। একই প্রতিষ্ঠানের এক চেয়ারে বসে কখনও তিনি হেড মাস্টার আবার কখনও তিনিই অধ্যক্ষ। পাবনার মাটিতে ১৮৯৮ সালে পাবনা ইনস্টিটিউশনে যে কলেজ হলো ১৯০৬ সালে তার নাম হলো পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের মাতৃসদন হলো পাবনা ইনস্টিটিউশন। গোপাল বাবু ১৯২৭ সাল পর্যন্ত কোনো রকম সরকারি সাহায্য গ্রহণ করেননি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপে এবং তত্কালীন জেলা প্রশাসক অম্বিকা দত্তের ব্যক্তিগত প্রভাবে তিনি সরকারি সাহায্য গ্রহণে সম্মত হন এবং মাসিক দেড়শ টাকা হিসাবে সরকারি সাহায্য মঞ্জুর হয়। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ভূমি ও মালিকানা স্বত্ব না থাকায় বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক সরকারি অনুদান বন্ধ ছিল। অবশেষে বিদ্যালয় সংলগ্ন ৪৭৫০ শতাংশ জমি কিনে তার উপর নির্মিত হয় দ্বিতল ভবন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে নিজস্ব জমির পরিমাণ প্রায় ১০ বিঘা। এতো জমি শহরের অন্য কোনো স্কুলের নেই।
বর্তমানে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রের সংখ্যা ৭’শ ২৭। শিক্ষক আছেন ১৭ জন, কর্মচারী তিনজন। স্কুলে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ আছে। আছে খেলার মাঠ, লাইব্রেরী ও বিজ্ঞানাগার। ২০১৪ সাল থেকে এ স্কুল শতভাগ পরীক্ষার্থী পাসের গৌরব অর্জন করেছে। এ শিক্ষাঙ্গনে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন নিখিল বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে। এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন ধর্মীয় নেতা অনুকূল চন্দ্র ঠাকুর। এছাড়া কলকাতা মেডিক্যাল সেন্টারের মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অশোক কুমার বাগচী, পশ্চিমবাংলার অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব অশোক গোবিন্দ চৌধুরী, আকাশবাণীর প্রয়াত লেখক প্রণবেশ সেন, কথাশিল্পী রশীদ হায়দার, কবি মাকিদ হায়দার, সচিব এবাদত আলীসহ এদেশের অনেক খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক, প্রকৌশলী, সঙ্গীতজ্ঞ, চিন্তাবিদের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বিদ্যাপিঠ এটি। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স বলেন, ইতিমধ্যেই এ স্কুল প্রতিষ্ঠার পর গৌরবময় শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। সে সময় এ জেলায় আলোকশিখা প্রজ্বলনের ক্ষেত্রে স্কুল এক বিপ্লবের সূচনা ঘটায়। স্কুল কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম হাসনায়েন জানান, পাবনা শহরবাসী ছাড়া প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে আসা বহু শিক্ষার্থী এ শিক্ষাঙ্গন থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং এ উপমহাদেশ তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক আব্দুল করিম বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই খেলার মাঠে এক হাঁটু পানি জমে যায়। স্কুলের মূল গেট নেই। নেই প্রশাসনিক ভবন। ইংরেজি ও বাণিজ্য বিভাগের দু’জন শিক্ষক এখন পর্যন্ত এমপিওভুক্ত হননি।তিনি বলেন, ১৯৭১ এ মুক্তিসংগ্রাম চলাকালে শহীদ হয়েছেন স্কুলের কৃতী শিক্ষক শিবাজী মোহন চৌধুরী, ছাত্র রিদ্দিক, হামিদ, দিল, গামা, মোয়াজ্জেম হোসেনসহ আরও নাম না জানা অনেকেই।