10/09/2023
স্টিফেন হকিং এর জীবনী
তিনি একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, মহাবিশ্ববিদ, লেখক, বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারী, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক মহাকাশবিদ্যা বিভাগের পরিচালক, এবং প্রফেসর। পড়াশোনা করেছে, কিন্তু তার নাম জানে না, এমন মানুষ মনে হয় গোটা দুনিয়াতে একজনও পাওয়া যাবে না। বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা মেধাবী এই মানুষটার নাম স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। জীবনের বেশির ভাগ সময় মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে হুইলচেয়ারে কাটিয়েছেন, তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়েছেন। তারপরেও তার অর্জনের খাতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মহিমান্বিত। আসুন, আজ আমরা এই অসামান্য মেধাবী লোকটার জীবনের গল্প শুনি।
জন্ম ও শৈশব
তার বাবা-মা দুজনেই অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করতেন, কিন্তু তখন তাদের দেখা হয়নি। আমরা অনেক সময় যুদ্ধকালীন সময়ের রোমান্সের গল্প পড়ি। তাদের গল্পটা বুঝি অনেকটা সেরকমই। পড়াশোনা শেষ করার পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার কিছু সময় পর লন্ডনে তাদের দেখা হয়েছিলো। চারিদিকে জার্মান বোমা পড়ছে, এমন একটা সময়ে মা ইসোবেলের গর্ভে এলেন স্টিফেন হকিং। তার জন্ম হয়েছিলো অক্সফোর্ডেই, ১৯৪২ সালের ৮ই জানুয়ারি। জন্মের আগেই গর্ভবতী মা লন্ডন ছেড়ে অক্সফোর্ডে চলে এসেছিলেন, কারণ লন্ডনে তখন প্রায়ই সাইরেন বাজে; “বোমারু বিমান আসছে”- সেই সাইরেন।
মেধাবী পরিবারেই জন্ম হয়েছিলো তার, এবং মা-বাবা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার দিকে বেশ মনযোগও দিয়েছিলেন। প্রাইমারি স্কুলে অনেকদিন পার করার পরেও হকিং পড়তে পারতেন না, এজন্য তিনি স্কুলকেই দোষ দিয়েছেন। অবশ্য সেটা কেটে গিয়েছিলো কয়েক বছরের মধ্যেই, ইন্টারমিডিয়েটও পাশ করে ফেলেছিলেন অন্যদের চেয়ে এক বছর আগেই, প্রধান শিক্ষকের বিশেষ অনুমতি নিয়ে।
তার আগে অবশ্য আসে হাই স্কুল (শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে, টুয়েলভে গিয়ে শেষ হয়)। বাবা চেয়েছিলেন নামকরা ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াতে, কিন্তু বিধি বাম! স্কলারশিপের জন্য একটা পরীক্ষা দিতে হয়, আর সেই পরীক্ষার দিন হকিং অসুস্থ হয়ে পড়লেন, পরীক্ষা আর দেয়া হলো না। আর এত টাকা খরচ করে সেখানে পড়ানোর মত অবস্থাও বাসায় ছিলো না। তাই আগের স্কুল সেইন্ট আলবানস-ই সই! সেখান থেকেই ইন্টার পাশ করেছিলেন তিনি। ও হ্যাঁ, আরেকটা জিনিস, স্কুলে অনেকেই তাকে “আইনস্টাইন” বলে ডাকতো। এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে, বলুন!
অক্সফোর্ডে পড়াশোনা
১৯৫৯ সাল। হকিং এর বয়স ১৭।
আগেই বলেছি, তার বাবা-মা অক্সফোর্ডে পড়েছিলেন। ইউরোপ-আমেরিকাতে একটা জিনিস খুব বেশি চলে। বাবা-মা চায়, তাদের সন্তান তাদেরই ইউনিভার্সিটিতে পড়ুক; তারা যে হাউজে থাকতেন, সেই হাউজেরই সদস্য হোক। নিজ নিজ হাউজের জন্য অনেকে অনেক অনুদানও দেয়।
বাবা চাইলেন, “তুমি আমার ছেলে, তুমি আমার মত ডাক্তারি পড়বে”।
ছেলে বললো, “গণিত পড়বো”।
বাবা বললেন, “গণিত পড়লে খাবে কী? তাছাড়া তুমি অক্সফোর্ডে পড়বে, এটা নিয়ে কোনো ওজর আপত্তি শোনা হবে না। অক্সফোর্ডে গণিত বলে কোনো বিষয় নাই”। হুম, ঐ আমলে অক্সফোর্ডে ম্যাথামেটিক্স ছিলো না।
ছেলে বললো, “আচ্ছা, অক্সফোর্ডে পড়বো, কিন্তু ডাক্তারি পড়বো না। ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি পড়বো। এটা নিয়ে কোনো ওজর আপত্তি শোনা হবে না।” —- এগুলো সম্পূর্ণ আমার মস্তিষ্কপ্রসূত কাল্পনিক ডায়লগ, কিন্তু কাহিনী সত্য!
যাই হোক, তরুণ হকিং সাহেব “আইনস্টাইন” ডাকনামটার নামকরণের সার্থকতা যাচাই করে যাচ্ছিলেন অক্সফোর্ডে এসেও। পড়াশোনা নাকি পানিভাত ছিলো তার কাছে। তাকে পদার্থবিজ্ঞানে একাডেমিক কোনো সমস্যা দিলেই সমাধান হাজির- এটা তার তৎকালীন প্রফেসর রবার্ট বারম্যানের মন্তব্য। এজন্য পড়াশোনার দিকে তার ধ্যান ছিলো খুবই কম। অনার্স জীবনের তৃতীয় বছরে পড়াশোনা বলতে প্রায় বাদ দিয়ে টোঁটো করে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, বন্ধু বান্ধব বানানোর দিকে মনযোগ দিলেন। চতুর্থ বছরে, ফাইন্যাল পরীক্ষার ফলাফল এমন হলো যে ফার্স্ট ক্লাস নাকি সেকেন্ড ক্লাস- সেটা নির্ধারণের জন্য ভাইভা প্রয়োজন হলো। অমনযোগী ছাত্র হিসেবে ততদিনে তিনি বেশ সুনাম(!) কামিয়েছেন। ভাইভাতে গিয়ে তিনি সেটার সুযোগ নিলেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা জিজ্ঞেস করার পর তিনি যা বলেছিলেন, সেটা সরাসরি অনুবাদ করে তুলে দিচ্ছি, “যদি আমাকে ফার্স্ট ক্লাস দেন, তাহলে কেম্ব্রিজে চলে যাবো, ওখানে গিয়ে মহাবিশ্বতত্ত্ব পড়বো। যদি সেকেন্ড ক্লাস দেন, তাহলে অক্সফোর্ডেই থাকবো। মনে হয়, ফার্স্ট ক্লাস দিয়ে বিদেয় করে দিলেই ভালো হবে”।
তিনি ভাইভা বোর্ডের শ্রদ্ধা অর্জন করলেন, ফার্স্ট ক্লাস পেলেন, ইরান থেকে ঘুরে এলেন, শুরু করলেন কেম্ব্রিজের পিএইচডি জীবন।
কেম্ব্রিজে পিএইচডির দিনগুলি
বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হয়েল তখন কেম্ব্রিজে পড়াচ্ছেন। হকিং চেয়েছিলেন, তার সাথে কাজ করতে। কিন্তু তাকে সুপারভাইজার হিসেবে পাওয়া গেলো না। হয়েল অনেক ব্যস্ত ছিলেন, এটা একটা কারণ হতে পারে। যারা হয়েলকে চেনেন না, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি – আমরা এখন জানি যে, আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান। আমাদের শরীরের প্রত্যেকটি অণু পরমাণু কোনো একটা নক্ষত্রের হৃদয়ে তৈরি হয়েছে। কার্ল সেগান এই ধারণাটাকে সবার মধ্যে জনপ্রিয় করে দিয়েছিলেন “we are star stuff” উক্তি দিয়ে। কিন্তু সেই একাডেমিক গবেষণা করেছিলেন ফ্রেড হয়েল এবং তার সহযোগী গবেষকরা (মার্গারেট বারবিজ, জেফ্রি বারবিজ, আর উইলিয়াম ফাওলার)। B2FH paper লিখে গুগল করলেই আর্টিকেলটা পেয়ে যাবেন। এমন একটা গবেষকের সাথে কাজ করতে না পেরে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিলো তার। তবে, তিনি যাকে পেয়েছিলেন, সেটা হকিং এর জন্য শাপে বর হবে একদিন। তার সুপারভাইজার ছিলো ডেনিস সিয়ামা, আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের জনকদের একজন। তার সাথে কাজ করতে গিয়ে, প্রথমদিকে নিজের গণিতজ্ঞান নিয়েও ঠোকর খাচ্ছিলেন হকিং। আগেই বলেছি, তিনি অক্সফোর্ডে ছিলেন, আর সেখানে গণিতের জন্য উৎসর্গীকৃত বিভাগও ছিলো না তখন। তবু সাধারণ আপেক্ষিকতা আর মহাবিশ্বতত্ত্ব নিয়ে কাজ শিখে নিতে লাগলেন তিনি। ডেনিসও খুব ধৈর্য নিয়ে তার সাথে আলোচনা করতেন।
এমন সময় তার বোনের একটা বন্ধু জেইন ওয়াইল্ডের সাথে দেখা হলো তার। ফরাসি সাহিত্যে পড়ুয়া এই মেয়েটার সাথে খুব দ্রুত তার সখ্যতা গড়ে উঠলো এবং সেটা প্রেমেও গড়ালো। এই মেয়েটা না থাকলে হকিং হয়তো হ