14/05/2026
স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভের পর ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর করে সরকারি চাকরিবিধি প্রণীত হয়। তার প্রায় ২০ বছর পর ১৯৯১ সালে গড় আয়ু বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর করা হয়। তখন এদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৫৬ বছর। এরপর প্রায় ৩৫ বছর পার হয়ে গেছে। গোটা পৃথিবী এসময় জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহন করেছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও ৭২ বছর ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় সকল দেশ গড় আয়ুর সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের দেশের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়েছে। কোনো দেশে ৩৫, কোনো দেশে ৪০, কোনো দেশে ৪৫, আবার কোনো দেশে একেবারে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, বেশিরভাগ উন্নত দেশে বয়সসীমা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের যোগ্যতা থাকলে বয়স বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না। শুধুমাত্র বাংলাদেশ ও পাকিস্তান তাদের বয়সসীমা বাড়ায়নি।
বিগত পলাতক সরকারের সময় বয়সসীমা বৃদ্ধির দাবিতে আমরা বেশ কিছু আন্দোলন দেখতে পেয়েছি । কেউ লাইভে এসে সার্টিফিকেট ছিড়েছে, কেউ মানববন্ধন করেছে।এমনকি ছাত্ররা এই দাবিতে অনশনও করেছে। কিন্তু, শিক্ষার্থীদের এই দাবি তৎকালীন সরকারের কর্ণকুহরে পৌছাতে পারেনি।
তারপর করোনা ভাইরাস গোটা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিল। সার্কুলার কমে গেল। নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হতে শুরু করল।ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে সরকার তখন বয়স বাড়াতে পারত। কিন্তু, তারা সেটা না করে তিন বছরের জন্য ব্যাকডেট দিয়ে সুস্পষ্ট বৈষম্য তৈরি করল। ২০২০ সালের ২৫ শে মার্চ তারিখে যাদের বয়স শেষ হয়ে গেছে তারা আরো তিন বছর চাকরিতে আবেদনের সুযোগ পেল। অথচ, তারা করোনার ভুক্তভোগী নয়। কারণ, করোনা শুরু হওয়ার আগেই তাদের বয়স শেষ হয়ে গেছে। করোনার কারণে তাদের একদিনও ক্ষতি হয়নি। সে সময় যাদের চাকরির বয়স আরো দুই তিন বছর বাকি ছিল তারা করোনার কারণে পর্যাপ্ত সার্কুলার পায়নি। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত তারাই। বিশেষ করে যাদের জন্ম ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালে। অথচ, কোনো এক মাথামোটা লোক তিন বছর আবেদনের সুযোগ দিল তাদেরকে যারা স্বাভাবিকভাবে তাদের বয়স শেষ করেছে। আর যারা করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলো তাদের সাথে চরম বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করল। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের বয়স যেদিন ৩০ বছর পূর্ণ হলো ব্যাকডেটের মেয়াদও সেদিন শেষ হলো। ব্যাকডেটের বদৌলতে তারা উপকারই পেল না। এভাবে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করল। অথচ স্থায়ীভাবে বয়স বৃদ্ধি করে এই বৈষম্য সহজেই দূর করা যেত।
তারপর বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে সরকারের পতন হলো। নতুন সরকার আসলো। শিক্ষার্থীদের বয়স বৃদ্ধির আন্দোলন চলমান রইল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটার সমাধানের জন্য মুয়ীদ স্যারের নেতৃত্বে একটা কমিটি গঠন করল। কমিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী একটা সুপারিশ প্রদান করল। সুপারিশে ছেলেদের জন্য ৩৫ আর মেয়েদের জন্য ৩৭ বছর করার কথা বলা হলো। কিন্তু, মহাজ্ঞানী মহা পন্ডিত জমিদারের নাতি সারজিস আলমের বাঁধায় সেই সুপারিশ কার্যকর হলো না। অযৌক্তিকভাবে বয়সসীমা দুই বছর বাড়ানো হলো। কিন্তু, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস করোনার জন্য যেই ব্যাচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো তারা ইতোমধ্যে বয়স ৩২ পেরিয়ে গেছে। ফলে তারা বিন্দুমাত্র লাভবান হতে পারল না। বৈষম্য রয়েই গেল।
গোটা বিশ্বে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সবচেয়ে কম এখন পাকিস্তানে ৩০ বছর। তারপর বাংলাদেশে ৩২ বছর। আমরা শেষের দিক থেকে ২য়। ব্যাপারটা সুন্দর না? কোনো ভ্যাজাল আছে? আমরা পাকিস্তানের সাথে সবার পেছনের অবস্থান দখল করার জন্য লড়াই করছি। বাহ! চমৎকার! গোটা বিশ্ব যখন বয়স বাড়নোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে সেখানে আমরা এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পাকিস্তানের সাথে প্রতিযোগিতা করছি। আমরা অন্য সকল বিষয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোকে অনুসরণ করতে চাই। তাহলে, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার ক্ষেত্রে কেন পাকিস্তানকে অনুসরণ করতে হবে?
বর্তমান সরকারি দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে বয়সসীমা সংস্কারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এটা যে তারা সিরিয়াসলি কার্যকর করবে বলেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, খাল খনন ইত্যাদির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। তাই, আমি পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান স্যার বয়সসীমার যৌক্তিক সংস্কার করে নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ করবেন ইনশাআল্লাহ। আবার মনের মধ্যে একটা শঙ্কা জাগে যে, বয়স বাড়াতে বাড়াতে এতো দেরি না হয়ে যায় যাতে, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাচ সেই বয়সটাও অতিক্রম করে ফেলে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আমার আশঙ্কা যেন ভুল প্রমাণিত হয়। নাহলে যে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের ব্যাচগুলো বৈষম্যের করালগ্রাসে পতিত হবে।