17/05/2025
পচনের নৈঃশব্দ্যে সমাজ
--------------------------------
বৃষ্টি ভেজা এক দুপুর।
কলেজ থেকে ফিরে এলাম ক্লান্ত দেহে, ক্ষুধার্ত মনে।
খেয়ে দেয়ে শুয়েছিলাম,
নরম বালিশে মাথা রেখে ডুবেছিলাম স্বপ্নের ঘুমে।
ঘড়ির কাঁটা গড়িয়ে গেল,
আসরের নামাজের সময়,
সহধর্মিণী ডাক দিলো নামাজে যাবার প্রস্তুতির জন্য।
চোখ মেলে উঠলাম,
দরজা খুলে যখন বেরোলাম,
তখনো বাতাসে ভাসছে বৃষ্টির শেষ কণারা,
তখনো আকাশে একটুখানি ধোঁয়াটে অন্ধকার।
এগিয়ে গেলাম বাড়ির পূর্ব পাশে,
কান্না নয়, কিন্তু কিছু যেন কাঁদছিল ভিতরে ভিতরে—
চোখে পড়লো এক ঝোপের কাছে দুটো ছায়া।
দুটো স্কুলপড়ুয়া কিশোর-তরুণী,
অসামাজিক এক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত,
অপবিত্রতার একটি প্রদর্শনী যেন প্রকৃতির বুক চিরে জেগে উঠেছে।
আমার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠলো,
দৌড়ে গিয়ে ধরলাম তাদের,
হাত ধরে, না— বিবেক ধরে টানলাম বাইরে।
হুড়োহুড়িতে আশপাশের গরুর জন্য ঘাস কাটতে আসা লোকটা এগিয়ে এলো,
আমরা জিজ্ঞেস করলাম পরিচয়,
দুজনেই কাঁপতে কাঁপতে পায়ে লুটিয়ে পড়লো।
ভিক্ষা করলো, বাবা-মার কাছে যেন কিছু না বলি।
তাদের চোখের জল ছিল না, ছিল শুধু ভয়।
ভয় ধরা পড়ার নয়,
ভয় লজ্জার নয়—
ভয় ছিল সমাজের মুখোশ খুলে যাওয়ার।
জানতে পারলাম,
ছেলেটি এক জন শিক্ষকের সন্তান,
মেয়েটি এক এনজিও কর্মীর কন্যা।
কী অদ্ভুত!
আলো যে ঘর থেকে জ্বলে ওঠার কথা,
সেই ঘরেই আঁধারের নাচন!
তাদের শাসন করলাম, বুঝিয়ে দিলাম—
এই রাস্তায় যদি আর পাই,
অথবা এমন কর্মে লিপ্ত থাকো,
তবে নিজের হাতে বিয়ে পড়িয়ে দেবো,
নয়তো সমাজকেই ডাকবো সাক্ষী করে!
তবে এখানেই শেষ নয়,
চারপাশে মানুষজন মুখে আড়াল রাখলেও
চোখে কিছু সত্য ফাঁস হয়ে যায়।
জানলাম, এ তো দীর্ঘ দিনের কাহিনি,
এ রকম অসামাজিক কর্মকাণ্ড বহুদিনের।
কেউ মুখ খুলে না,
কারণ—
যে মুখ খোলে, তাকেই কুৎসা গিলে ফেলে,
সমাজ যার পক্ষে কথা বলার কথা ছিল,
সেই সমাজই তাকে করে দেয় অপমানের পাত্র।
একজন স্কুল শিক্ষক জানালেন,
তিনি একদিন বেত্রাঘাত করেছিলেন এমন এক আচরণ দেখে—
আর তাতেই ছাত্রীর মা থানায় অভিযোগ করেন।
শিক্ষক এখন নীরব,
বাকিরা নিশ্চুপ,
কারণ সত্য বলা এখন নিজেকে বিপদে ফেলার নামান্তর।
তবে প্রশ্ন জাগে,
এই সমাজ কি তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে?
শাসনের ভাষা কি হারিয়ে গেছে,
ধর্মীয় মূল্যবোধ কি এখন কেবল ওয়াজ মাহফিলের ফাঁকে ফাঁকে উচ্চারিত শব্দ?
পারিবারিক নজরদারি কি এখন শিশুর হাতে তুলে দেওয়া ফোনেই সীমাবদ্ধ?
সামাজিক বিচার কি ভয়ের সামনে অসহায়?
সামাজিকতা কি এখন ফেসবুকের শেয়ার বাটনে বন্দি?
আমরা হাঁটছি,
এক নিরুদ্দেশের পথে,
যেখানে নীতি নেই, শাসন নেই, ভ্রুক্ষেপ নেই।
যেখানে দায়িত্বহীন স্বাধীনতা বিপর্যয়ের জন্ম দেয়,
আর সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে দর্শকের আসনে।
পচন ধরেছে,
না— শুধু আচরণে নয়,
গভীর, মজ্জাগতভাবে।
এই পচন থামাতে না পারলে
শুধু ছেলেমেয়েই নয়,
হারিয়ে যাবে সমাজ,
হারিয়ে যাবে মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা।
এই তো সময়,
ভেঙে ফেলো নীরবতার দেয়াল,
শুরু করো নতুন করে,
যেখানে দায়িত্ব থাকবে, মূল্যবোধ থাকবে,
সেই সমাজ গড়ো—
যার আয়নায় চোখ রাখলে
লজ্জা নয়, দেখা যাবে আত্মসম্মান।
পচনের নৈঃশব্দে সমাজ
বটেশ্বর,নরসিংদী।
১৭/০৫/২৫ খ্রি.
৪:৩৭ ঘটিকা।