10/06/2024
"কোক খাও না তো ফেসবুক চালাও কেন?"
এই বাখোয়াজ প্রশ্নের উত্তর দিতে ফেসবুক পর্যন্ত চলে আসতে হবে সেটা কখনোই চাই নি। কিন্তু এই প্রশ্নের ভুক্তভোগী সম্ভবত আমার মত আরও অনেক বয়কট সমর্থনকারী, কাজেই আমার মনে হলো জুতসই একটা উত্তর রেডি করা দরকার।
প্রথমে একটা কাহিনি বলা যাক, সহজ একটা কাহিনি। মাস দুয়েক আগে একটা প্রজেক্টে কাজ করেছিলাম, সেই কাজের ফাঁকে একদিন দুপুরে ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়েছে, পোলাও, রোস্ট। তো খাবারের জন্য বসেছি, সফট ড্রিংকস হিসেবে কোক দেওয়া হয়েছিলো। যে কোক বিতরণ করছিলো আমি তাকে বললাম, "ভাই, অন্য কোনো ড্রিংকস নাই? মোজো বা ফ্রেশ কোলা?"
সেই ভাই কিছুক্ষন আমার দিকে কটকট করে তাকিয়ে রইলো, তারপর খড়খড়ে গলায় বলল, "ফেসবুক চালান না?"
"হ্যা ভাই। চালাই তো। একটা পেজ আছে। মনে যখন যা উদয় হয়, পোস্ট দেই।" আমি সহজ গলায় বললাম।
ফেসবুক ই*জ*রা*ই*লী প্রডাক্ট না? সেটা তো ছাড়তে পারেন না? তাহলে এইসব বয়কট নিয়ে ত্যানা প্যাঁচান কেন?" ভাইজানের গলার খড়খড়ানি আরেকটু বাড়ল।
আমি হেসে ফেললাম, ইদানীংকালের এইসব পোলাপান মার্কা প্রশ্ন শুনতে শুনতে কান ব্যাথা হয়ে গেছে। উত্তর দেবো না দেবো না করেও দিয়েই ফেললাম, "ভাই, ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন মিডিয়া বলে একটা কথা আছে, জানেন তো? ফেসবুক, টুইটার হলো এমন কিছু মিডিয়া। এই মিডিয়াগুলো যার মালিকানাধীনই থাকুক না কেন, এটার ব্যবহার বিশাল বড় একটা জনগোষ্ঠী করে, এদের মধ্যে কেউ নিউট্রাল, কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে ।
তো কি হইসে? এইটার বেশিরভাগ শেয়ারও তো ই*জ*রা*ঈ*লীদের কাছেই, না?" ভাইজানের মুখ পূর্ণিমার চান্দের মত চকচক করছে, আমাকে ফাদে ফেলার আনন্দে।
"ভাই, আমি আপনাকে পাঁচটা যুক্তি দিবো, আমার ধারণা এই যুক্তিগুলো শুনে আপনি বুঝে যাবেন আমি কেন ফেসবুক ইউজ করি।" আমি শান্ত কন্ঠে বললাম।
ভাইজান সন্দিহান চোখে তাকালো, কিছু বলল না। আমি মৌনতাকেই সম্মতির লক্ষন ধরে বলতে লাগলাম,
প্রথম যুক্তি, এই ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব না থাকলে আপনি আমি হয়তো গাজায় কি চলছে তাও ভালো করে জানতে পারতাম না। ফেসবুকে এইটা নিয়ে লেখালেখি আমাদের জন্য একটা প্রতিবাদের মাধ্যম হয়েছে, কত কত মানুষ গাজার এই গণহত্যার প্রতিবাদ করে যাচ্ছে ফেসবুক বা টুইটার দেখলে বোঝা যায়। ফিলিস্তিনের মানুষরাও যদি কোনোভাবে এটা দেখে, তাদের হয়ত একটু হলেও মনে শান্তি পাবে, আর কিছু না হোক, আমরা জানি গাজায় কি চলছে এবং এই গণহত্যার প্রতিবাদও করছি, মৌখিকভাবেই হলেও প্রতিবাদ তো ভাই।
দ্বিতীয় যুক্তি, ফেসবুকের একেবারে সমস্ত দুনিয়ার কাছে ওয়েল এক্সসেপ্টেড মিডিয়া, আপাতত এই ফেসবুক ছাড়া এমন কোনো বিকল্প নেই যেটা ব্যবহার করে আমরা ফিলিস্তিনে কি ঘটছে সেটা জানতে পারবো বা অন্যকে জানাতে পারবো৷ এখন বিকল্প না থাকলে কি করে মানুষ এইরকম প্রয়োজনীয় একটা যোগাযোগ মাধ্যম বয়কট করে?
তাছাড়া আমি যতটুক জানি বড় এমাউন্টের একট মানুষ ফেসবুক থেকে গাজার মানুষদের কষ্ট দেখে ডোনেশনে এগিয়ে আসছে, কত বড় বড় ই*জ*রা*ই*লীদের সাপোর্টার প্রতিষ্ঠানে ধ্বস নেমেছে সেটা গরুতেও বলতে পারবে।
তৃতীয় যুক্তি, ফেসবুক টুইটার সারা দুনিয়ায় যে পরিমানের সহজলভ্য, বেশিরভাগ মানুষ এটা এফোর্ড করতে পারে। এটা অনেকটা ধারালো ছোরার মত, যার মালিক আপনার শত্রু, কিন্তু আপাতত আপনার হাতের কাছে। তাহলে আপনি এই ছুরি দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইলে দোষের কিছু নাই।
চতুর্থ যুক্তি, উপরের বলা উপকারগুলোর একটা উপকারও যদি কোক বা পেপসির করার সামর্থ্য থাকতো তাহলে আমি গ্যালন গ্যালন কোক খাইতেও রাজি ছিলাম। যেহেতু এটা আমার জীবনের এমন কোনো অবিচ্ছেদ্য জিনিস না, বাদ দিলে আমি মারা যাবো না প্লাস ফিলিস্তিনের উপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার নামার বিরুদ্ধে একটা নিরব প্রতিবাদ হবে, আমার মনের শান্তি হবে। কাজেই কোক, পেপসি আমি বয়কট করেছি, ইজি যুক্তি।"
আমি দীর্ঘ বাক্যের শেষে থামলাম।
ভাইজান আমার বাক্যবাণে কিছুটা ঘাবড়ে গেছেন, তাই কিছুটা ক্ষীণ গলায় বললেন, "আর পঞ্চম যুক্তি?"
"ভাই, শেষের যুক্তিটা একটু কড়া, সবাই হজম করতে পারে না। কাজেই বাদ দেন।" আমি একটু কেশে বললাম।
"বলেন, দেখি আপনার যুক্তি।" ভাইজানের কৌতুহল এবার চাঙ্গে উঠলো।
আমি হাই তুলে বললাম, "যেহেতু ফেসবুক ব্যবহার নিয়ে আপনার ভালো রকমের বিতৃষ্ণা আছে, আপনি এক কাজ করেন, আপনি আমাদের ফেসবুকের মত একটা এফোর্ডেবল, জনমুখী মিডিয়া এস্টাবলিশ করে দেন, আমরা খুশি খুশি মনে সেদিকেই যাই। কোকের সাথে ফেসবুকও বয়কট করি।"
ভাইজান এই কড়া যুক্তি ধাক্কায় মাছের মত খাবি খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
আমি শুরুর প্রশ্নটা আবারও করলাম, "ভাই, কোকের বদলায় আর কিছু নাই?"
কাহিনি এখানেই শেষ। যারা এত বড় কাহিনি পড়তে চাচ্ছেন না তাদের জন্য কাহিনির সারমর্ম বলে দেই?
যে যে অবস্থায় আছেন, সেখান থেকেই প্রতিবাদ করুন। কোক বয়কট করুন (স্বাস্থ্যের জন্যও এটা অতটা ভালো কিছু না, কাজেই ডাবল উপকার), যতটা সম্ভব জেনোসাইড সাপোর্টকারী প্রতিষ্ঠানের প্রডাক্ট বয়কট করুন (সাথে দেশীয় পণ্যের অগ্রগতিও হচ্ছে) ভিডিও শেয়ার দিন, লেখালিখি করুন বা অন্য যেভাবেই হোক। কিছুই যদি না পারেন, তাহলে অন্তত যে প্রতিবাদ করছে তাকে খোঁচা দিয়েন না। সাপোর্ট নাই করতে পারেন, কোক খাওয়া নাই ছাড়তে পারেন, নিজে না পারেন, অন্যকে মানুষ হতে বাধা দিয়েন না।
ক'মাস আগে গাজা, আজ রাফা তারপর...?
আর কত চুপ থাকবেন, ভাই? আর কত বাচ্চার ডেডবডি দেখলে আপনার হাতে ধরা কোকের বোতলটা একটু হলেও কেঁপে উঠবে?
©️ রাইয়ানা রাইন