Tazkiya Academy - তাযকিয়া একাডেমি

Tazkiya Academy - তাযকিয়া একাডেমি ঘরে বসেই কুরআন-সুন্নাহর ইলম ও ভাষা শেখার বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান।

তবে 'হৃদয়ে বেঁচে থাকতে' শিক্ষককেও তলাবায়ে কেরামের তালিম-তরবিয়তে ফিদা হতে হয়। দায় সারা শিক্ষকতা দিয়ে এই 'প্রভাব' আশা করা ...
08/08/2026

তবে 'হৃদয়ে বেঁচে থাকতে' শিক্ষককেও তলাবায়ে কেরামের তালিম-তরবিয়তে ফিদা হতে হয়। দায় সারা শিক্ষকতা দিয়ে এই 'প্রভাব' আশা করা যায় না।

অবশ্য এই কথাটা যার, শায়েখ মহিউদ্দীন ফারুকী হাফিজাহুল্লাহ, আমি অকপটেই স্বীকার করি এবং বুকভরা ভালোবাসা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে বলি, তিনি আমার জীবনে এমনই একজন শিক্ষক, যার প্রভাব কখনো শেষ হবার নয়।

আল্লাহ শায়েখের ছায়া আমাদের জন্য দীর্ঘায়িত করেন, খুব বেশি ইস্তেফাদার তাওফিক দেন, তাকে নেক হায়াত দান করেন, ইলম আমল ও হায়াতে বরকত দেন।

শায়েখ মহিউদ্দীন ফারুকী হাফিজাহুল্লাহ Mohiuddin Faroqi -এর মজলিস থেকে কুড়ানো কিছু মুক্তোআজ একটা ব্যক্তিগত কাজে মারকাযুল...
27/07/2026

শায়েখ মহিউদ্দীন ফারুকী হাফিজাহুল্লাহ Mohiuddin Faroqi -এর মজলিস থেকে কুড়ানো কিছু মুক্তো

আজ একটা ব্যক্তিগত কাজে মারকাযুল লুগায় যাওয়ার নসিব হয়েছিল। নসিব বলছি এই কারণে যে, মন তো প্রতিক্ষণেই সেখানে ছুটে যেতে চায়; বাস্তবতাই কেবল পেছন থেকে টেনে ধরে। হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেও শায়েখ আমাকে বেশ দীর্ঘ সময় দিলেন, একেবারে আন্তরিকতা দিয়ে জড়িয়ে।
ঘরোয়া আলাপ-আলোচনায় বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। যোহরের নামায শেষে শায়েখ বসলেন কোর্সের ছাত্রদের নিয়ে তালিমে। হাতে শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহিমাহুল্লাহর 'মিন আদাবিল ইসলাম'। বুকের ভেতর একটা চেনা টান অনুভব করলাম— মারকাযুল লুগায় থাকাকালে ঠিক এই সময়টাতেই তো এই কিতাবেরই তালিম হতো আমাদের।
মজলিসে বসতেই শায়েখ প্রথমে কথা তুললেন নামাযের কাতার নিয়ে। আক্ষেপের সুরে বললেন, মাদ্রাসার ছাত্ররা প্রায়ই গরমের অজুহাত দেখিয়ে কাতারের মাঝে ফাঁক রেখে দাঁড়ায়— আসলে এটা আর কিছু না, নিছক অলসতা, 'তাসাহুল'। অথচ কাতার সোজা রাখা তো নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এ তো ইবাদতেরই একটা অংশ। আরবের মসজিদগুলোতে এই বিষয়ে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, আমাদের এখানে তা কেবল গতানুগতিক একটা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে— ইমাম সাহেব নামাযের আগে কিছু কথা বলে যান, আমরাও নিছক শুনেই যাই, মনে গেঁথে নিই না। শায়েখ বললেন, এই অবহেলাটা আমাদের ছাড়তেই হবে।
এরপর কিতাব খুলে একটু একটু ইবারত পড়ে শোনাতে থাকলেন, আর সেই আলোকে টেনে আনলেন আমাদের চারপাশের সমাজটাকে। যা যা বললেন, তার কিছুটা এখানে নোট করে রাখি।

প্রথমে বললেন গৃহে প্রবেশের আদব নিয়ে। কারো ঘরে ঢোকার সময় মাথা নিচু করে, দৃষ্টি অবনত রেখে ঢোকাই সুন্নাহ। আর জুতা রাখার মতো এত সাধারণ একটা কাজ— এটাকেও তিনি তুলে ধরলেন আমাদের ব্যক্তিত্বের আয়না হিসেবে। বললেন, জুতা খোলার সময় মোটে দুই সেকেন্ড ব্যয় করে সেগুলো গুছিয়ে রাখলেই তো সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ ঘটে; অথচ আমাদের অবহেলায় কত মাদ্রাসার বারান্দায় জুতার এমন স্তূপ জমে থাকে যে খালি পায়ে হাঁটাই দায় হয়ে পড়ে। বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিলেন, জুতা পরার সময় আগে ডান পা, খোলার সময় আগে বাম পা— এটাই সুন্নাহ। আর মসজিদে ঢোকার আগে জুতার তলায় পানি বা ময়লা লেগে আছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে বললেন।
তারপর কথা এল মেহমানদারির সূক্ষ্ম আদবগুলো নিয়ে। মেহমান হয়ে গেলে বসার জায়গা নিয়ে মেজবানের সাথে তর্কে জড়ানো ঠিক না, তিনি যেখানে বসতে বলেন সেখানেই বসে পড়া উচিত। আর বসতে হবে এমনভাবে, যেন দৃষ্টি ঘরের অন্দরমহলের দিকে না যায়। শায়েখ একটা সূক্ষ্ম কথা বললেন— অনেক সময় মেজবান আন্তরিক হয়ে আরামদায়ক জায়গায় বা ভালো বিছানায় বসতে দেন, আর আমরা বিনয় দেখাতে গিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করি। অথচ মেজবান যখন সম্মান (একরাম) করেন, তখন সেটা খুশি মনে গ্রহণ করাই আসল আদব। আরেকটা কথাও মনে করিয়ে দিলেন— কারো বাড়িতে অসময়ে, বিশেষত খাওয়ার বা বিশ্রামের সময় হুট করে হাজির হওয়া মেজবানের জন্য যে কতটা অস্বস্তিকর হতে পারে, সেটা আমাদের এড়িয়ে চলা দরকার।
এরপর শায়েখের কণ্ঠে একটা উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠল, শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে। একটা পরিসংখ্যান দিলেন— এখন ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে বড়জোর ১০-২০ জন প্রকৃত অর্থে পড়াশোনা করে, বাকিরা সময় কাটায় নিছক গুরুত্বহীনভাবে। বড় বড় ক্লাসে হাজার হাজার ছাত্র একসাথে গাদাগাদি করে পড়ার কারণে পড়াশোনার মান যে ব্যাহত হচ্ছে, আর অনেকে যে মূল কিতাব বাদ দিয়ে কেবল নোটবই-নির্ভর হয়ে পড়ছে, এই কথাটাও আক্ষেপ করে বললেন।
তারপর এলো এই সময়ের সবচেয়ে বড় ব্যাধির কথা— মোবাইল আর ফেসবুক। এই নিয়ে বেশ কড়া কথাই বললেন শায়েখ। অন্যের ফোন হাতে নিয়ে গ্যালারি ঘাঁটা, ছবি ডানে-বামে সোয়াইপ করে দেখা— এটা যে কতটা 'অসভ্যতা' আর 'আমানতের খেয়ানত', বারবার সেই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। কারণটাও বললেন— কারো ফোনের গ্যালারিতে তার মা-বোনের ব্যক্তিগত ছবি থাকতে পারে, আর সেটা দেখা তো আমাদের জন্য হারাম। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটা আদবের কথা বললেন— সরাসরি ফোন না করে আগে মেসেজ পাঠানো, আর অপরিচিত কাউকে হুট করে ভিডিও কল না দেওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার সস্তা নেশায় যেখানে সেখানে ভিডিও বানানোকে তিনি সরাসরি 'অপদার্থতা' বলে আখ্যা দিলেন। এমনকি খাওয়ার সময় কারো ছবি বা ভিডিও তোলাটাও যে কতটা অমার্জিত, সেই শিক্ষাটুকুও তিনি দিতে ভুললেন না।
সবশেষে একটা কথা বললেন, যা মনে গেঁথে গেল। আমরা যারা দাড়ি রাখি বা টুপি পরি, আসলে আমরা একা নই— আমরা পুরো জাতিকে, পুরো ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করি। কোনো দাড়িওয়ালা মানুষ যখন ব্যবসায়িক লেনদেনে প্রতারণা করে, মানুষ তখন পুরো দ্বীনটাকেই ভুল বুঝে বসে। আক্ষেপ করে বললেন, আজকাল অনেক সময় মানুষ দাড়িওয়ালা লোকের চেয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীর কাছ থেকে পণ্য কিনতে বেশি নিরাপদ বোধ করে— এটা আমাদের জন্য লজ্জারই কথা। তাই আমাদের আচরণ আর লেবাস যেন কখনো ইসলামের অবমাননার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, এই ব্যাপারে কঠোর সতর্ক থাকতে হবে।
মজলিস থেকে উঠে আসতে আসতে মনে হচ্ছিল, এই ছোট ছোট শিষ্টাচারগুলোই তো আসলে আমাদের প্রকৃত মানুষ বানিয়ে তোলে, আমাদের চলন-বলনকে সুবাসিত করে। এমন মজলিস মারকাযে নিয়মিত হয়। কত খুশনসিব তাদের, যারা এমন মোবারক মজলিসে নিয়মিত বসার সুযোগ পান!

আলমী আলেম তৈরীর অন্তরায়: পদ্ধতি, পরিবেশ ও ভাষা-দক্ষতার সঙ্কটপর্ব: ২এই মূল সংকটের সাথে জড়িয়ে আছে আরো কিছু শাখাগত সমস্যা...
20/07/2026

আলমী আলেম তৈরীর অন্তরায়: পদ্ধতি, পরিবেশ ও ভাষা-দক্ষতার সঙ্কট
পর্ব: ২

এই মূল সংকটের সাথে জড়িয়ে আছে আরো কিছু শাখাগত সমস্যা, যেগুলো নিয়ে আমরা সচরাচর ভাবি না।
প্রথমত, পদ্ধতিগত সংকট। আমাদের ভাষা-শিক্ষার পুরো কাঠামোটাই দাঁড়িয়ে আছে ‘তরজমা পদ্ধতি’র ওপর—নাহু-সরফের নিয়ম মুখস্থ করে একটা বাক্যকে বাংলায় রূপান্তর করাই যেন ভাষা শেখার শেষ কথা। অথচ ভাষা শেখা মানে শুধু বোঝা নয়, বরং সেই ভাষায় ভাবতে পারা, বলতে পারা, লিখতে পারা। আমরা বছরের পর বছর কায়দা-নাহু পড়িয়ে যাচ্ছি, কিন্তু একটা ছাত্রকে কখনো জিজ্ঞেস করি না—‘আজকের দিনটা কেমন গেল, আরবিতে লিখে দেখাও তো; বা যে পড়াগুলো পড়লে, একটু নিজের মতো করে আরবিতে লিখে ফেলো তো।’ ফলে ব্যাকরণের সূক্ষ্ম মাসআলা জানা থাকলেও, বাস্তব ব্যবহারের সাথে ছাত্ররা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে না।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশের অনুপস্থিতি। ভাষা শেখা যতটা না বইয়ের বিষয়, তার চেয়ে বেশি অভ্যাসের বিষয়। অথচ আমাদের প্রায় মাদরাসাগুলোতে এমন কোনো পরিবেশ নেই, যেখানে ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে আরবিতে কথা বলবে, ভুল করবে, সংশোধিত হবে, আবার চেষ্টা করবে। উল্টো কেউ নিজ আগ্রহে আরবি চর্চা করতে গেলে অন্যরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। এটা কারো একার দোষ নয়; গোটা সিস্টেমটাই এমন। ভুল করার ভয়েই বেশিরভাগ ছাত্র মুখ খোলে না। ফলে বছরের পর বছর আরবি পড়েও কেউ যখন সহজভাবে দুটো বাক্য বলতে পারেন না, লজ্জায় গুটিয়ে যায়, তখন সেই লজ্জাই তাকে আরো পিছিয়ে দেয়।
তৃতীয়ত, যুগের ভাষার সাথে বিচ্ছিন্নতা। আমরা যে আরবি পড়ি, তা প্রায় পুরোটাই ক্লাসিক্যাল কিতাবের ভাষা। সমকালীন আরবি সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সাহিত্য, এমনকি আধুনিক আরব লেখকদের রচনার সাথে আমাদের তেমন কোনো সংযোগ নেই। ফলে আরবি ভাষাটা আমাদের কাছে ক্লাসিক্যাল কিতাবের ভাষা হিসেবে কদর পেলেও সমকালকে পড়ার সামগ্রিক ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। এই বিচ্ছিন্নতার কারণেই আমরা বর্তমান বিশ্বের ইসলামবিরোধী প্রচারণা, ভুল উপস্থাপনা কিংবা বৈশ্বিক বিতর্কের জবাব সরাসরি আরবি বা ইংরেজিতে দিতে পারি না—জানতে বা শিখতেও পারি না, জানাতে বা শেখাতেও পারি না।
চতুর্থত, ইংরেজির প্রশ্নে একধরনের মানসিক প্রতিরোধ কাজ করে। ইংরেজিকে আমরা প্রায়ই ‘দুনিয়াদারদের ভাষা’ মনে করে এড়িয়ে যাই, অথচ ভুলে যাই যে, পূর্বসূরি উলামায়ে কেরাম দাওয়াত ও মুনাযারার প্রয়োজনে গ্রিক, ফারসি, সুরিয়ানি ভাষা পর্যন্ত রপ্ত করেছিলেন। আজ ইংরেজি না জানার কারণেই আমরা পাশ্চাত্যের একাডেমিয়ায়, আন্তর্জাতিক সেমিনারে, গবেষণাপত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারছি না। ফলে ইসলাম সম্পর্কে বিশ্বমঞ্চে যে বয়ান তৈরি হচ্ছে, তার লাগাম প্রায় পুরোপুরি অন্যদের হাতে চলে গেছে।
এসবের সম্মিলিত ফল হলো—আমাদের ইলম যত গভীরই হোক, তা আঞ্চলিকতার বেড়াজালে বন্দি থেকে যায়। বাংলা ভাষায় রচিত মূল্যবান গবেষণা আরবি বা ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিশ্বের সামনে যায় না, আবার আমরাও বিশ্বের চিন্তাধারার সাথে সরাসরি সংযুক্ত হতে পারি না। ফলাফল— আমাদের প্রভাব থেকে যায় সীমিত গণ্ডির ভেতর।

চলবে...

রিফাত হাসান
তাযকিয়া একাডেমি
01890-948242

আলমি আলেম তৈরির অন্তরায়: পদ্ধতি, পরিবেশ ও ভাষা-দক্ষতার সংকটপর্ব: ১উস্তাদে মুহতারাম মাহমুদুল হাসান জুনায়েদ হাফিজাহুল্লা...
19/07/2026

আলমি আলেম তৈরির অন্তরায়: পদ্ধতি, পরিবেশ ও ভাষা-দক্ষতার সংকট
পর্ব: ১

উস্তাদে মুহতারাম মাহমুদুল হাসান জুনায়েদ হাফিজাহুল্লাহর কথা মনে পড়ে। কিছু মানুষ হন এমন, যারা মনের উঠোনটা সামান্য মাড়িয়ে যান শুধু, কিন্তু তাদের পায়ের ছাপ জীবনে থেকে যায় আজীবন। মারকাযুল লুগা থেকে ফেরার পথে তাকে যখন এগিয়ে দিতে যাই, তার কথাগুলো যেন এখনো কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন দেখতে হয় বড়, আমি হব আলমি আলেম। আর হাজারও আঞ্চলিক আলেমের ভিড়ে আলমি আলেম হতে হলে নিজেকে অনন্য অসাধারণ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আঞ্চলিকতার উর্ধ্বে উঠে আলমি হতে যা যা দরকার, সেসব হাসিল করে যেতে হবে।’
আমার শায়েখ মাওলানা সাইফুল্লাহ সাহেব হাফিজাহুল্লাহ প্রায়ই আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ যুগে ফারেগ তো অনেক হয়, থানবী মাদানী কেন হয় না।’ এমন কেউ, যিনি সাধারণ ও সমকালের গতানুগতিকতা ছাড়িয়ে হয়ে উঠবেন অনন্য, বরেণ্য, সমাদৃত; যার খেদমত যুগের পর যুগ ধরে আলো ছড়াবে গোটা পৃথিবীতে।
এ দেশীয় আলেমদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ, একটি আলমি ভাষা রপ্ত না থাকা। আমাদের হাতের নাগালে দুটো আলমি ভাষা আছে—আরবি ও ইংরেজি। আরবি ভাষাটাকে আমরা রপ্ত করি ‘কিরাআ’-র ভাষা হিসেবে, ‘কিতাবা’-র নয়। তাই অনেকেই আছেন, যারা ভালো পড়তে পারলেও লিখতে বা বলতে জানেন না। অথচ পড়ার মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করা গেলেও, নিজেকে ছড়িয়ে দিতে হয় লিখে বা বলে। আলমি ভাষায় আমরা নিতে জানলেও দিতে জানি না, নিজের জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে পারি না। তাই আমাদের শেখা ইলম আলমি হলেও, সেই জ্ঞান আলমি পর্যায়ে ছড়ায় না।

আর ইংরেজির কথা কী আর বলব! নানা প্রতিকূলতা আর যদি-কিন্তু-তবের পরও ইংরেজি এখনো জ্ঞানচর্চার স্তরে পৌঁছায়নি এদেশীয় ইসলামী মহলে। ইংরেজি যারা একটু-আধটু পারেন, তাদেরও অনেকে শো-অফের মতো কিছু শব্দ রপ্ত করলেও, সেটা জ্ঞানচর্চার স্তরে পৌঁছায় না।
তিক্ত হলেও বাস্তব, ইসলামি জ্ঞান, চিন্তা ও দ্বীনী মেজায তৈরির জন্য যে পর্যায়ের পড়াশোনা দরকার, তা অর্জনের মতো ভাষা-দক্ষতা এখন অনেক তলাবায়ে কেরামের ভেতরই পাওয়া যায় না। একদম সহজ আরবি ভাষার একটা কিতাব কোনো মেধাবী ছাত্রের হাতে দিলেও তিনি হতাশ হয়ে যান, এগোতে পারেন না। অধিকাংশের মনন-মগজ এভাবেই তৈরি হয়ে গেছে—উস্তাদ যা পড়িয়ে দেবেন, আমি শুধু তা-ই বুঝতে পারব। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে আলমি আলেম কীভাবে তৈরি হবে?

চলবে...

পর্ব ৩: بَيْت، دَار، مَنْزِل ও مَسْكَن #সমার্থের_ভ্রম |  #الفُرُوقُ_اللُّغَوِيَّةবাংলায় "বাড়ি," "ঘর," "আবাস," "বাসস্থা...
18/07/2026

পর্ব ৩: بَيْت، دَار، مَنْزِل ও مَسْكَن
#সমার্থের_ভ্রম | #الفُرُوقُ_اللُّغَوِيَّة
বাংলায় "বাড়ি," "ঘর," "আবাস," "বাসস্থান" — এই শব্দগুলো আমরা প্রায় হাত বদল করার মতোই ব্যবহার করি, কোনো বাছবিচার ছাড়াই। কিন্তু আরবি ভাষা এখানে একদমই উদাসীন নয়। بيت، دار، منزل، مسكن — চারটা শব্দ, চারটা আলাদা মানে। একটা তাকিয়ে থাকে রাতের দিকে, একটা তাকিয়ে থাকে সীমানার দিকে, একটা তাকিয়ে থাকে সফরের শেষ প্রান্তের দিকে, আর একটা তাকিয়ে থাকে স্থিরতার দিকে। চলুন, একে একে খুলে দেখি।

بَيْت — রাতের আশ্রয়
বাইত শব্দের মূলে আছে بَاتَ — রাত কাটানো। ঠিক যেমন ظَلَّ মানে দিনের বেলা অবস্থান করা, তেমনি বাতা মানে রাতের বেলা অবস্থান করা। তাই বাইতের গোড়ার পরিচয়ই হলো রাত্রিযাপনের জায়গা — একটা নির্দিষ্ট, একচালা কাঠামো, যার একটা দেহলিজ (প্রবেশপথ) আছে। এই সংজ্ঞাটা এসেছে আবুল বাক়ার "আল-কুল্লিয়্যাত" গ্রন্থ থেকে — "البيت هو اسم لمسقف واحد له دهليز" (বাইত হলো একটামাত্র ছাদওয়ালা কামরার নাম, যার একটা দেহলিজ আছে)।

মজার ব্যাপার হলো, বাইতের অস্তিত্ব তার কাঠামোর সাথেই বাঁধা। আবুল বাক়া রহ. নিজেই বলেন,
"البيت ليس ببيت بعدما انهدم"
(বাইত ভেঙে পড়ার পর আর বাইত থাকে না)।
অর্থাৎ ইট-কাঠ সরে গেলে বাইতও হাওয়া, নাম বদলে যায়।

কুরআনও এই ভৌত-কাঠামোগত পরিচয়টা ধরে রেখেই বাইত শব্দের ব্যবহার করেছে। যেমন —
لَيْسَ الْبِرَّ بِأَن تَأْتُوا الْبُيُوتَ مِن ظُهُورِهَا
— "সৎকর্ম এই নয় যে, তোমরা ঘরে পেছনের দিক দিয়ে প্রবেশ করবে" (সূরা বাকারা, ২:১৮৯)
এখানে বাইতের একটা "সামনে" আর "পেছনে" আছে — এটা স্রেফ একটা ভৌত দালান, দেয়াল আর দরজাওয়ালা ঘর।
دَار — ঘেরাও করা পরিসর
দার শব্দটা এসেছে دَوَران (ঘোরা, প্রদক্ষিণ করা) থেকে — কারণ দার তার দেয়াল দিয়ে একটা জায়গাকে ঘিরে রাখে, বেষ্টন করে রাখে। আবুল বাক়া বলেন,
"الدار اسم لما اشتمل على بيوت، ومنازل، وصحن غير مسقف"
(দার হলো যা একাধিক বাইত, মানযিল আর একটা ছাদহীন উঠান নিয়ে গঠিত)।

আর এখানেই বাইত ও দারের মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ পার্থক্যটা লুকিয়ে —
"والدار دار وإن زالت حوائطها"
(দেয়াল ভেঙে পড়লেও জায়গাটাকে দার-ই বলা চলে)।
মানে দার একটা ভূমি বা পরিসরের নাম, কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়; কিন্তু বাইত সম্পূর্ণই কাঠামোনির্ভর — কাঠামো নেই তো বাইতও নেই।

এই বেষ্টনীর ধারণা থেকেই দার শব্দটা ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে গোটা একটা জনপদ, এমনকি গোটা দুনিয়াকেও বোঝাতে শুরু করে। কুরআনে তাই দার দিয়ে বোঝানো হয় জীবনের গোটা একটা স্তরকে —
وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ
— "আর নিশ্চয়ই আখিরাতের আবাস মুত্তাকীদের জন্য উত্তম" (সূরা আনআম, ৬:৩২)।
এখানে দার কোনো দালান নয় — এটা একটা গোটা অস্তিত্বের পরিসর। এই একই যুক্তিতে জান্নাতকে বলা হয় "দারুস সালাম" —
لَهُمْ دَارُ السَّلَامِ عِندَ رَبِّهِمْ
— "তাদের রবের কাছে তাদের জন্য আছে শান্তির আবাস" (সূরা আনআম, ৬:১২৭)।

مَنْزِل — সফরের যতিচিহ্ন
মানযিল শব্দটা এসেছে نُزُول থেকে — অবতরণ করা, নেমে পড়া। যে জায়গায় সফরকারী থেমে যায়, নেমে পড়ে বিশ্রামের জন্য, সেটাই মূলত মানযিল। মুতাররিযী তাঁর "আল-মুগরিব" গ্রন্থে ফকীহদের পরিভাষা উল্লেখ করে বলেন —
") المنزل) : موضع النزول، وهو عند الفقهاء دون الدار وفوق البيت، وأقله بيتان أو ثلاثة"
(মানযিল হলো অবতরণের জায়গা, ফকীহদের কাছে এটা দারের চেয়ে ছোট আর বাইতের চেয়ে বড়, কমপক্ষে দুই-তিনটা বাইত নিয়ে গঠিত)।
আবুল বাক়াও প্রায় একই কথা বলেন —
"والمنزل اسم لما يشتمل على بيوت، وصحن مسقف ومطبخ يسكنه الرجل بعياله"
(মানযিল হলো একাধিক বাইত, একটা ছাদওয়ালা উঠান আর রান্নাঘর নিয়ে গঠিত, যেখানে মানুষ পরিবার নিয়ে বসবাস করে)।

আর মুনাবী তাঁর "আত-তাআরীফ" গ্রন্থে পুরো চারটা স্তরকে একটাই বাক্যে গেঁথে ফেলেন, যেন একটার ভেতর আরেকটা বসানো—
"البيت موضع المبيت من الدار المخصوصة من المنزل المختص من البلد"
(বাইত হলো দারের অন্তর্গত রাত্রিযাপনের জায়গা, দার হলো মানযিলের অন্তর্গত নির্দিষ্ট অংশ, আর মানযিল হলো শহরের অন্তর্গত নির্দিষ্ট অংশ)। অর্থাৎ — শহর > মানযিল > দার > বাইত। প্রতিটা ধাপে জায়গাটা ছোট হতে হতে শেষমেশ একচালা কামরায় গিয়ে ঠেকে।

مَسْكَن — স্থিরতার নাম
এতক্ষণ তিনটা শব্দই ঘুরছিল আকার আর কাঠামো নিয়ে — কোনটা ছোট, কোনটা বড়, কোনটা ভাঙলে নাম বদলায়। কিন্তু مسكن একদমই আলাদা অক্ষে দাঁড়িয়ে থাকে। এর মূল ধাতু سكن, যার অর্থ রাগিব আল-ইসফাহানী তাঁর বিখ্যাত অভিধান "আল-মুফরাদাত"-এ দিয়েছেন এভাবে —
"السكون: ثبوت الشيء بعد تحرك"
(সুকূন মানে হলো নড়াচড়ার পর কোনো কিছুর স্থির হয়ে যাওয়া)।
অর্থাৎ মাসকান বাইত-দার-মানযিলের মতো কোনো আকার বা মাপের ধারণা বহন করে না, বরং বহন করে এক ধরনের অবস্থার ধারণা — স্থিরতা, বসতি গাড়া, নড়াচড়া থামিয়ে দেওয়া। এজন্যই—
"سكن فلان مكان كذا" মানে হলো, অমুক ব্যক্তি ঐ জায়গায় স্থায়ীভাবে বসতি গেড়েছে।
এই "স্থিরতা" ধারণাটাই কুরআনে বাইত আর মাসকানের মধ্যে একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করে দেয় —
وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُم مِّن بُيُوتِكُمْ سَكَنًا
— "আর আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে তোমাদের জন্য প্রশান্তির স্থান বানিয়েছেন" (সূরা নাহল, ১৬:৮০)।

লক্ষ্য করুন — এখানে বাইত হলো কাঠামো, আর সেই কাঠামো যে জিনিসটা দেয়, সেটার নাম "সাকান" (প্রশান্তি, স্থিরতা)। অর্থাৎ বাইত শরীর, সুকুন তার কাজ। আর যখন এই স্থিরতার জায়গাটাকেই বিশেষ্য বানিয়ে ফেলা হয়, তখন সেটা হয়ে যায় মাসকান — যেখানে মানুষ থিতু হয়েছে।
আরেকটা জায়গায় এই শব্দটা আরও গভীর একটা মাত্রা পায় — 'আদ জাতির ধ্বংসের পর কুরআন বলে —
فَأَصْبَحُوا لَا يُرَىٰ إِلَّا مَسَاكِنُهُمْ
— "অতঃপর তারা এমন হয়ে গেল যে, তাদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না" (সূরা আহকাফ, ৪৬:২৫)।
এখানে যারা বসবাস করত তারা নেই, বাইত হয়তো ভেঙেও পড়েছে, কিন্তু "মাসাকিন" শব্দটা রয়ে গেছে — কারণ মাসকান বোঝায় বসতি গাড়ার জায়গা বা ভিত্তি, যা মানুষ চলে গেলেও, এমনকি কাঠামো ধ্বসে গেলেও, একটা চিহ্ন বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে থাকে। এখানেও দারের সাথে একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় — দুটোই কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয় — কিন্তু ভিন্ন কারণে। দার টেকে কারণ এটা একটা বেষ্টিত ভূমি; মাসকান টেকে কারণ এটা একটা বসতি-চিহ্নিত স্থান।

চারটাকে পাশাপাশি রাখলে
এবার পুরো ছবিটা একসাথে দেখা যাক। বাইত মাপে সবচেয়ে ছোট, আর তার পরিচয় সম্পূর্ণ কাঠামোনির্ভর — ভাঙলেই শেষ। মানযিল তার চেয়ে বড়, একাধিক বাইত আর একটা পারিবারিক ইউনিট নিয়ে গঠিত, সফরের যতিচিহ্ন হিসেবে জন্ম নেওয়া একটা ধারণা। দার সবচেয়ে ব্যাপক কাঠামোগত একক — একাধিক বাইত ও মানযিল নিয়ে গঠিত একটা বেষ্টিত ভূমি, যার পরিচয় কাঠামো ভাঙলেও অক্ষত থাকে, এমনকি প্রসারিত হয়ে গোটা দুনিয়া বা আখিরাতকেও ধারণ করতে পারে। আর মাসকান এই তিনটার কোনোটার প্রতিদ্বন্দ্বী নয় — এটা একটা আলাদা মাত্রা, যা আকার নয়, অবস্থা বোঝায়। তাই বাইত, মানযিল, দার — সবগুলোই মাসকান হতে পারে, যদি সেখানে কেউ থিতু হয়ে বসতি গাড়ে। এই কারণেই বলা যায়, প্রতিটা বাইত একটা মাসকান, কিন্তু প্রতিটা মাসকান বাইত নয় — একটা সেনানিবাস বা ছাত্রাবাসকেও মাসকান বলা যায়, কিন্তু বাইত বলা যায় না, কারণ সেখানে নেই কোনো একক পরিবারের নিজস্ব রাত্রিযাপনের সেই ঘনিষ্ঠতা।

সহজ কথায়
বাইত মানে রাতের আশ্রয় — শরীরনির্ভর, ভাঙলেই বিলুপ্ত। দার মানে বেষ্টিত পরিসর — ভূমিনির্ভর, কাঠামো ভাঙলেও টিকে থাকে। মানযিল মানে সফরের সমাপ্তিবিন্দু — আকারে বাইত আর দারের মাঝামাঝি একটা পারিবারিক একক। আর মাসকান মানে স্থিরতা নিজেই — কাঠামো নয়, বরং সেই অবস্থা, যেখানে মানুষ নড়াচড়া থামিয়ে থিতু হয়। চারটা শব্দ, চারটা ভিন্ন জানালা — একই "ঘর" ধারণাকে চারটা ভিন্ন কোণ থেকে দেখার চারটা উপায়।

16/07/2026

শব্দের গোলমাল...😀

 #সমার্থের_ভ্রম #الفُرُوقُ_اللُّغَوِيَّة #পর্ব ২: عِلْم বনাম مَعْرِفَةবাংলায় আমরা ‘জ্ঞান’ বললেই একটা শব্দে সব সেরে ফেলি...
15/07/2026

#সমার্থের_ভ্রম
#الفُرُوقُ_اللُّغَوِيَّة
#পর্ব ২: عِلْم বনাম مَعْرِفَة

বাংলায় আমরা ‘জ্ঞান’ বললেই একটা শব্দে সব সেরে ফেলি, কিন্তু আরবি ভাষাটা যেন এই ব্যাপারে একটু বেশিই খুঁতখুঁতে। عِلْم আর مَعْرِفَة — দুটোকেই বাংলায় অনুবাদ করলে ‘জ্ঞান’ দাঁড়ায় ঠিকই, কিন্তু আরবির কান দুটোকে দুই রকমভাবে শোনে। একটা যেন বিশাল এক সমুদ্র, আরেকটা সেই সমুদ্র থেকে চিনে-চিনে তুলে আনা একেকটা মুক্তো।
ধরুন কেউ বলল, ‘আমার ফিজিক্সে ইলম আছে।’ সাথে সাথে বোঝা যায়, লোকটা এই একটা বিষয় নিয়ে গভীরে ডুবে গেছে, পড়াশোনা করেছে, একটা নির্দিষ্ট শাস্ত্রে দখল বানিয়েছে। আরবিতেও ঠিক এভাবেই চলে— علم الفيزياء، علم الأحياء، علم الكيمياء — প্রতিটা ‘ইলম’-ই একটা নির্দিষ্ট শাখা, একটা বিশেষায়িত জগৎ। কিন্তু مَعْرِفَة এর ব্যাপারটা একেবারে অন্যরকম। এটা কোনো একটা শাখায় আটকে থাকে না, বরং ছড়িয়ে থাকে সবখানে— জ্ঞানের সেই বিশাল সমুদ্র, যার ছায়ায় বাকি সব ইলমই আশ্রয় নেয়। একজন মানুষ হয়তো অনেক কিছু সম্পর্কে মারিফাহ রাখে, একটু একটু করে, ভাসাভাসাভাবে— কিন্তু ইলম মানে হলো একটা বিষয়কে বেছে নিয়ে তার তলদেশে চলে যাওয়া।
মজার ব্যাপার হলো, কুরআনে এই ভেদরেখার একদম নিখুঁত উদাহরণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা নিজের ব্যাপারে বলেন, وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ — ‘আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞানী’ (সূরা নিসা, ১৭৬)। এখানে আছে ইলম— যা কোনো পূর্ব-পরিচয়ের ধার ধারে না, সীমাহীন, সার্বিক জানাশোনা। কিন্তু যেখানে কথা হয় চেনা-জানার, শনাক্ত করার, সেখানেই কুরআন নজর দেয় মারিফাহর দিকে—
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ
— ‘যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে তেমনভাবেই চেনে, যেমন নিজেদের সন্তানদের চেনে’ (সূরা বাকারা, ১৪৬)।
ভাবুন তো, নিজের সন্তানকে চেনার মধ্যে কী থাকে? আগে থেকে একটা পরিচয়ের ছাপ মনে গাঁথা আছে, আর এখন চোখের সামনে সেটা মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে— এটাই মারিফাহর আসল স্বাদ। এই কারণেই আরেক জায়গায় আহলে কিতাবের চোখের পানি ঝরার কারণ বলতে গিয়ে কুরআন বলে, مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ — ‘সত্যকে চিনতে পারার কারণেই।’ (সূরা মায়িদা, ৫৮৩)।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পার্থক্যটা কি শুধু ভাষার খেলা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কিছু আছে? ইমাম বদরুদ্দীন আল-আইনী তার ‘উমদাতুল কারী’ গ্রন্থে এর একটা সুন্দর জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, মারিফাহ হলো আংশিক জিনিসের উপলব্ধি, আর ইলম হলো সামগ্রিক জিনিসের উপলব্ধি। ঠিক এই কারণেই আল্লাহকে ‘আলিম’ (عَالِم) বলা যায়, কিন্তু ‘আরিফ’ (عَارِف) বলা যায় না। কারণ আরিফ শব্দটা যেন একটা সীমিত, খণ্ডিত জানাকে ইঙ্গিত করে, যা আল্লাহর জ্ঞানের বিশালতার সাথে একদম বেমানান।
ফিরুযাবাদী তার ‘বাসাইরু যাওয়িত তাময়ীয ফী লাতাইফিল কিতাবিল আযীয’ গ্রন্থে বিষয়টা আরেকটু খুলে বলেন। তার মতে, মারিফাহ মানে হলো কোনো কিছুর প্রভাব বা চিহ্ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তাকে চেনা— এটা ইলমের চেয়ে অনেক বেশি নির্দিষ্ট, অনেক বেশি সংকীর্ণ একটা জানা। তাই মানুষ সম্পর্কে বলা হয়, فلان يعرف الله — ‘অমুক ব্যক্তি আল্লাহকে চেনে,’ কারণ মানুষ তো আল্লাহকে সরাসরি দেখে চেনে না, বরং তাঁর সৃষ্টি আর নিদর্শনের ওপর চিন্তা করে করে তাঁকে চিনতে শেখে।
কিন্তু আল্লাহর নিজের ব্যাপারে কখনো বলা হয় না "يعرف كذا" — বলা হয় শুধু "الله يعلم كذا"। কেন? কারণ মারিফাহ আসলে এমন এক জ্ঞান, যেটা অর্জন করতে হয় চিন্তা-ভাবনা করে করে, যেটার পেছনে থাকে একটা পূর্ববর্তী অজ্ঞতা— আগে জানতাম না, এখন ভেবে-চিন্তে জেনেছি।
আল্লাহর ক্ষেত্রে এমন কল্পনাই অচল, কারণ তাঁর জ্ঞান কোনো অজ্ঞতা পেরিয়ে অর্জিত নয়, বরং চিরন্তন ও পরিপূর্ণ, শুরু থেকেই সম্পূর্ণ।
আর এই জন্যই আল্লাহ তাআলা নিজের জন্য যে নামগুলো বেছে নিয়েছেন, সবগুলোই এসেছে ইলম থেকে— العالم (আল-আলিম), العليم (আল-আলীম), العلاّم (আল-আল্লাম)। মারিফাহ থেকে কোনো নাম তিনি বেছে নেননি। আর যে শব্দটা আল্লাহ নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন, স্বভাবতই সেটাই দুই অর্থের মধ্যে পূর্ণতর, শ্রেষ্ঠতর। এজন্যই কুরআনে যেখানেই বান্দাকে জ্ঞান অর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছে, সেখানেও এসেছে ইলম—
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ ‘সুতরাং জেনে রাখো, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই।’ (সূরা মুহাম্মাদ: ১৯)

شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, আর ফেরেশতা ও ইলমের অধিকারীরাও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে সাক্ষ্য দিচ্ছে’ (সূরা আলে ইমরান :১৮)

আর সেই বিখ্যাত দুআ— وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا ‘বলো, হে আমার রব! আমার ইলম বৃদ্ধি করে দাও’ (সূরা ত্বহা: ১১৪)।

তাহলে পুরো ব্যাপারটা একটা লাইনে বললে দাঁড়ায় এমন— ইলম হলো এক সীমাহীন সমুদ্র, যেখানে ঢুকতে কোনো পূর্ব-পরিচয় লাগে না; আর মারিফাহ হলো সেই সমুদ্র থেকে চিন্তা করে করে, চিহ্ন অনুসরণ করে খুঁজে বের করা একটা চেনা মুখ। আল্লাহর জ্ঞান তাই সবসময় ‘ইলম’ দিয়ে বর্ণিত হয়— কারণ তা সীমাহীন, চিরন্তন। আর বান্দার চেনাশোনা বর্ণিত হয় ‘মারিফাহ’ দিয়ে— কারণ তা সীমিত, অর্জিত, এবং সবসময় কিছু না কিছু নিদর্শনের ওপর নির্ভরশীল।
আপনার জানা এমন কোনো শব্দজোড়া আছে, যেটা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়? কমেন্টে লিখুন, পরের পর্বে আমরা সমাধান নিয়ে হাজির হব ইনশাআল্লাহ।
নিয়মিত আরবির পুষ্টি পেতে তাযকিয়া একাডেমির সাথেই থাকুন।

** #সমার্থের_ভ্রম**** #الفُرُوقُ_اللُّغَوِيَّة***পর্ব: ১خَوْف বনাম خَشْيَةদুটো শব্দই বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘ভয়’।...
13/07/2026

** #সমার্থের_ভ্রম**
** #الفُرُوقُ_اللُّغَوِيَّة**
*পর্ব: ১

خَوْف বনাম خَشْيَة

দুটো শব্দই বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘ভয়’। অথচ কুরআন মাজীদে যেখানেই এই দুটো শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যায়— আরবি ভাষা শব্দ দুটো একই ভাব বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না।

خَوْف ব্যবহৃত হয়েছে সাধারণ, বাহ্যিক সংকট আর পরীক্ষার প্রসঙ্গে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ
— ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে।’ —সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৫
এখানে খাওফ একটা বাহ্যিক পরিস্থিতির নাম— বিপদ, অনিশ্চয়তা, যা যে কারো জীবনেই আসতে পারে, ইলম থাকুক বা না থাকুক।

কিন্তু خَشْيَة এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গে—
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
— ‘আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই খাশয়াহ করে।’ —সূরা ফাতির, আয়াত ২৮

এখানে খাশয়াহ-কে সরাসরি জুড়ে দেওয়া হয়েছে উলামার সাথে। অর্থাৎ এটা নিছক ভয় নয়, বরং জ্ঞান থেকে জন্ম নেওয়া এক গভীর, শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়। একজন সাধারণ মানুষও খাওফ অনুভব করতে পারে, কিন্তু খাশয়াহ আসে বোঝাপড়া থেকে— যত বেশি চেনা, তত গভীর খাশয়াহ।

আর সবচেয়ে চমৎকার জায়গাটা হলো সূরা রা’দে, যেখানে আল্লাহ তাআলা উলুল আলবাব-দের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে দুটো শব্দই একসাথে ব্যবহার করেছেন—
وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ
— ‘আর তারা তাদের রবকে খাশয়াহ করে এবং হিসাবের কঠোরতাকে খওফ করে।’ — সূরা রা'দ, আয়াত ২১

একই আয়াতে দুটো শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে দেওয়াটাই প্রমাণ করে, শব্দ দুটো সমার্থক নয়। খাশয়াহ এখানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে রবের প্রতি— একটা দৈনন্দিন ও স্থায়ী সচেতনতা, যার কারণে মানুষ আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে, তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে থাকে। আর খাওফ জুড়ে দেওয়া হয়েছে হিসাবের সাথে— কিয়ামতের দিনের সেই বিশেষ মুহূর্তের ভয়, যখন প্রতিটা কাজের জবাবদিহি হবে।

‘মাদারিজুস সালিকীন’-এ ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ এই পার্থক্যটা এক লাইনে ধরিয়ে দিয়েছেন, যা সহজে ভোলা যায় না— খাওফ হলো অন্তরের নড়াচড়া, গতিময়তা; ভয়ের বিষয় স্মরণ হওয়া মাত্র অন্তর যেন পালাতে চায়। আর খাশয়াহ হলো ঠিক তার বিপরীত—এমন ভয়, যার ফলে অন্তরে উল্টো প্রশান্তি ও স্থিরতা তৈরি হয়। একটা শব্দ অন্তরকে অস্থির করে তোলে, আরেকটা শব্দ অন্তরকে থিতু করে।

তাহলে অর্থ দাঁড়ালো এমন—খাওফ হলো ভীতিকর কিছু থেকে পালিয়ে যাওয়া। আর খাশয়াহ হলো জেনে-বুঝে সেই সত্তার কাছেই ফিরে আসা, আর সেখানেই থিতু হয়ে যাওয়া। কারণ যে রবকে সত্যিকার অর্থে চেনে, খাওফ তাকে যতই কাঁপায়, শেষমেশ সে সেই রবেরই কাছে ফিরে গিয়ে শান্তি খুঁজে পায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন— ‘আমিই তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি খাশয়াহ করি।’ যিনি সবচেয়ে বেশি জানতেন, তিনিই সবচেয়ে বেশি এই স্থির ও শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় অনুভব করতেন।

আরবি ভাষার দুই বিভ্রম— যে শব্দগুলো আমাদের বারবার ভুল বোঝায়বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে গেলে অনেক সময় আমরা না চাইতেও একটা অ...
12/07/2026

আরবি ভাষার দুই বিভ্রম— যে শব্দগুলো আমাদের বারবার ভুল বোঝায়

বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে গেলে অনেক সময় আমরা না চাইতেও একটা অন্যায় করে ফেলি— আরবির দুটো, তিনটা, এমনকি চারটা আলাদা শব্দকে একটা মাত্র বাংলা শব্দের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিই। লেখকের একাধিক আরবি শব্দের বিপরীতে একটি বাংলায় অনুবাদ করাই যথেষ্ট মনে করি।

"ভয়" লিখে দিলাম, অথচ আরবিতে খাওফ আর খাশয়ার মধ্যে যে ফারাক, তা চিন্তা করা হলো না। "বাড়ি" লিখে দিলাম, অথচ বাইত আর দারের মধ্যে যে জগৎ-প্রসারী পার্থক্য, তা চাপা পড়ে গেল। এই ভ্রমটার নাম সমার্থের ভ্রম— যেখানে আমরা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দকে এক ভেবে ফেলি, শুধু অনুবাদের সীমাবদ্ধতার কারণে।

কিন্তু আরবি ভাষা আরেকভাবেও আমাদের ভুল বোঝাতে পারে— ঠিক তার উল্টো পথে। কখনো কখনো দুটো শব্দ দেখতে-শুনতে প্রায় অভিন্ন, একই হরফ পরপর সাজানো, শুধু একটা যবর বা যের এদিক-ওদিক। অথচ অর্থ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। যেমন عِلْم (ইলম) মানে জ্ঞান, কিন্তু শুধু হারাকাত বদলে গেলে عَلَم (আলাম) হয়ে যায় পতাকা বা চিহ্ন। এই ভ্রমটার নাম রূপের ভ্রম। এখানে সমস্যা অনুবাদের নয়, বরং পাঠ ও উচ্চারণের সূক্ষ্মতার।

দুটো ভ্রমই আসলে একই বাস্তবতার দুই দিক— আরবি ভাষা এতটাই নিখুঁতভাবে সাজানো যে, একটামাত্র শব্দের গভীরে অথবা তার হারাকাতের একটামাত্র বিন্দুর মধ্যেও অর্থের আস্ত একটা জগৎ লুকিয়ে থাকতে পারে। আমরা যদি এই সূক্ষ্মতাগুলো ধরতে না পারি, তাহলে কুরআন-হাদিসের অনেক গভীর ইঙ্গিতই আমাদের কাছে অধরা থেকে যায়।

এই কারণেই আমরা দুটো আলাদা সিরিজ শুরু করতে যাচ্ছি—

الفُرُوقُ اللُّغَوِيَّة | সমার্থের ভ্রম — যেখানে দুটো ভিন্ন আরবি শব্দ নিয়ে বসব, দেখব কোথায় তাদের অর্থ আলাদা হয়ে যায়, আর কুরআন-হাদিসে সেই পার্থক্যটা কীভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে।

الفُرُوقُ الصَّرْفِيَّة | রূপের ভ্রম — যেখানে একই হরফের শব্দ নিয়ে বসব, দেখব শুধু হারাকাত বদলে কীভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা অর্থ জন্ম নেয়।

আজ থেকে তাই এই দ্বিমুখী যাত্রাটা শুরু হলো। আপনাদের মধ্যে যাদের এমন কোনো শব্দজোড়া নিয়ে কৌতূহল আছে— অর্থে কাছাকাছি অথচ আলাদা শব্দ, অথবা দেখতে একই অথচ হারাকাতে ভিন্ন— কমেন্টে জানাবেন। সেগুলো নিয়েও পর্ব সাজাব আমরা।

একদিন আমার হাতও কাঁপবেঅটোতে করে যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে এক মুরব্বি নামলেন। কাঁপা কাঁপা পায়ে ড্রাইভারের বরাবর এলেন। এরপর কা...
27/06/2026

একদিন আমার হাতও কাঁপবে
অটোতে করে যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে এক মুরব্বি নামলেন। কাঁপা কাঁপা পায়ে ড্রাইভারের বরাবর এলেন। এরপর কাঁপা হাতে পকেট থেকে কোনোরকমে একমুঠো নোট বের করলেন। ভাড়া দশ টাকা। লাল দশ টাকার নোটটা আমি স্পষ্ট দেখছি তার হাতে। কিন্তু তিনি সেটা ধরতে পারছেন না। কাঁপা আঙুলগুলো বারবার নোটের গায়ে লাগছে, তবুও ঠিক করে ধরতে পারছেন না। কয়েকবার চেষ্টা করলেন। অবশেষে কোনোমতে নোটটা আলাদা করে ড্রাইভারের হাতে দিলেন। পুরো দৃশ্যটা হয়তো আধা মিনিটের। কিন্তু ভেতর থেকে এক-দুজন বিরক্তির শব্দ করল। আমি শুরু থেকেই তাকে পড়ছিলাম— শৈশবে পড়া ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতার মতো। সাথে চিন্তাপত্রের অগোছালো পৃষ্ঠাগুলো উল্টাচ্ছিলাম। কখন যে অজান্তেই চোখের কোণে পানি জমে গেছে— টেরই পাইনি।
মাদরাসার পাশের বাজারে এক মুরব্বি দুধ-ডিম বিক্রি করেন। মাঝে মাঝে তার দোকানে খেতে বসি আমি। অন্য সবার ডিম তিনি নিজ হাতে ছিলে দেন। তবে আমি কখনো তাকে ছিলে দিতে বলতে পারি না। কাঁপাকাঁপা হাতে, অনেকক্ষণ ধরে, একটু একটু করে ডিমের খোসাটা ছাড়ান। মুখে কিছু বলেন না, পেশার খাতিরে ছিলে দেন ঠিক; তবে যেন ছিলতে না হয় এমন একটা আকাঙ্ক্ষাও নিশ্চয় রাখেন তিনি। খাওয়া শেষে যখন টাকা দিই, বাকী টাকাটা তুলে নিতে গিয়েও সেই একই দৃশ্য। পাঁচ টাকার নোটটা ভেতর থেকে আলাদা করতে পারছেন না। আঙুলগুলো যেন কথা শুনছে না; আসলে শুনতে পারছে না।
একসময় আমার দাদার ভয়ে উঠোনে দুষ্টুমি করতে পারতাম না। ধমক দিলে পা কাঁপত। কঠিন মেজাজের মানুষ খুব। বাচ্চাদের হইচই সহ্য করতেন না। সেই দাদাকে এখন কাঁধে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়। হাঁটতে পারেন না ঠিকমতো। হাত দুটো থরথর করে কাঁপে। অনেক কিছু ভুলে যান।
চারপাশে হাজারও মৃত্যুর ডাক শুনেও হুশ ফেরে না আমাদের। পরিচিত মানুষ চলে যায়, নিয়মরক্ষার জানাজা পড়ি, মাটির ঘরে রেখে আসি। সবকিছুই আনু্ষ্ঠানিকতা। তারপর আবার সেই একই জীবন—যান্ত্রিক যাপন।
দুই দিনের দুনিয়ায় তিন দিনের আয়োজন আমাদের। স্বপ্নের পর স্বপ্ন, পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা। যৌবনের খাহেশ, তারুণ্যের আয়েশ আর শক্তির বড়াই—এসবই যেন জীবন; অনন্তকালের জীবন!

অথচ এই মুরব্বিরা আমাদের আয়না। যেই তারুণ্যের জোরে আমি গাফলতের হাজার কিলো চাদরটা টেনে বেড়াচ্ছি, একজন মুরব্বির প্রতি একটুখানি ইবরতের দৃষ্টি সেই চাদরটাকে গোড়া থেকে পুড়িয়ে দিতে পারে। সেই মুরব্বির মধ্যে কি একটুও নিজেকে দেখতে পাই না আমি? সেই মুরব্বির মতো একদিন আমার হাতও কাঁপবে। আমার আঙুলও নোট ধরতে পারবে না। আমাকেও হয়তো কেউ কাঁধে ধরে নিয়ে যাবে।

এক পলক সময়ের মালিকও আমি না। অথচ জমিনে চলি রাজার হালে। এই গাফলতের হিসাব একদিন দিতে হবে। সেদিনের আগেই যদি একটু হুশ ফেরে।

রিফাত হাসান
মাদরাসা উসমান বিন আফফান রা.
মিরকাদিম, মুন্সীগঞ্জ

Address

Munshiganj

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Tazkiya Academy - তাযকিয়া একাডেমি posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share