03/08/2026
রিয়াজ উদ্দিন আহমাদ মুক্তাগাছাস্থ ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জমি প্রাপ্তিসহ স্কাউটিং ও সমাজসেবায় অনন্য অবদান রেখেছিলেন।
শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক অধ্যক্ষ আলহাজ্জ রিয়াজ উদ্দিন আহমাদ: এক অনন্য জীবন ও কর্ম
"মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর কর্ম ও কৃতির মাধ্যমে।" ময়মনসিংহের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অঙ্গনের ভিত মজবুত করার পেছনে যাঁদের আজীবন সাধনা ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে, সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ আলহাজ্জ রিয়াজ উদ্দিন আহমাদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, দূরদর্শী সংগঠক এবং স্কাউট আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন মানবকল্যাণে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই ক্ষণজন্মা মানুষের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম আজও আমাদের হৃদয়ে অনুপ্রেরণা জোগায়।
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে (বাংলা ১৩১৩ সাল) কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার বাঁশগাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই মনীষী। তাঁর পিতা মরহুম মৌলভী ছৈয়দ আলী ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার পুত্র ও পাঁচ কন্যার জনক ছিলেন। তাঁর সুযোগ্য জামাতা মরহুম আব্দুস সাকুর (যিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং পুরুষ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন) ময়মনসিংহের জেলা স্কাউটস-এর সম্পাদক ও কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শৈশব থেকেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এবং জ্ঞানার্জনে ব্রতী ছিলেন রিয়াজ উদ্দিন আহমাদ। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে নিজ গ্রাম বাঁশগাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রিয়াজুল ইসলাম পাবলিক লাইব্রেরি’। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে ভৈরব কালিকা প্রসাদ জুনিয়র মাদ্রাসা থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ময়মনসিংহ শহরে আগমন করেন এবং নাসিরাবাদ হাই মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিভাগে মেধাতালিকায় ৭ম স্থান অধিকার করে হাই মাদ্রাসা পাস করেন। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমানের হুগলি সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বড় মেয়ের অসুস্থতার কারণে নীতি ও কর্তব্যের টানে সরকারি চাকরি ছেড়ে নিজ বাড়ি ফিরে আসেন এবং প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাসিরাবাদ হাই মাদ্রাসায় মৌলভী পদে যোগদান করেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি এবং ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আরবি সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এর মাঝে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরাবাদ হাই মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘ফার্স্ট ইংলিশ টিচার’ হিসেবে পদোন্নতি পান এবং ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.টি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ময়মনসিংহের শিক্ষাবিন্যাসকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে অধ্যক্ষ রিয়াজ উদ্দিন আহমাদ অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দেই তিনি নাসিরাবাদ হাই মাদ্রাসার সুপারিন্টেনডেন্ট নিযুক্ত হন এবং ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে এই মাদ্রাসাকে ‘ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’-এ রূপান্তর করে প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরাবাদ ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ কোর্স প্রবর্তন করেন। একই বছরে নাসিরাবাদ হাই মাদ্রাসাকে কলেজিয়েট স্কুলে পরিণত করেন এবং ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ডিগ্রি ক্লাস চালু করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নারীশিক্ষার প্রসারে মুমিনুন্নিসা মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথমে এর অর্গানাইজিং সেক্রেটারি ও পরবর্তীতে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রেকটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে “ইমেরিটাস প্রিন্সিপাল” পদবিতে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ময়মনসিংহ মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এর রেকটরের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বাঁশগাড়ি দাখিল মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন ছাড়াও কাঁচিঝুলি জামে মসজিদ, কাঁচিঝুলি কোরকানিয়া মাদ্রাসা, মুসলিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ জামেয়া এমদাদিয়া মজলিসে সুরা, ভৈরব ইসলামিয়া মাদ্রাসা, জামেয়া ইসলামিয়া, জামেয়া আশরাফিয়া, আঠারবাড়ি ইসলামিয়া মাদ্রাসা, সাহেব কোয়ার্টার দাখিল মাদ্রাসা এবং ময়মনসিংহ এতিমখানার সাথে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন।
শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি মানবসেবা ও সামাজিক সংগঠনেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ হাফেজিয়া মাদ্রাসার সম্পাদক এবং ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ চকবাজার জামে মসজিদের মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত হয়ে আমৃত্যু এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁরই উদ্যোগে ময়মনসিংহ মূক ও বধির স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়; তিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এর সম্পাদক এবং ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আমৃত্যু সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ময়মনসিংহ মূক ও বধির সংঘ প্রতিষ্ঠা করে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয় মূক-বধির ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির দায়িত্ব পালন (১৯৬০-৬১), ঢাকা বিভাগীয় উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য নির্বাচন (১৯৬৫), ময়মনসিংহ শহীদ দারা সংসদের প্রধান উপদেষ্টা (১৯৭২-৭৫), ময়মনসিংহ কল্লোল কচিকাঁচার মেলার প্রধান উপদেষ্টা (১৯৮১), মুসলিম ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহের সহ-সভাপতি (১৯৮২-৮৪), বিআরটিসি বোর্ড অব ডিরেক্টসের সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদের সদস্য (১৯৮৩), জেলা জাকাত কমিটির সদস্য ও ময়মনসিংহ শুক্রবাসরীয় সাহিত্য সংসদের সভাপতি (১৯৮৫) এবং আশির দশকে ময়মনসিংহ রেডক্রস সমিতি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রোগীকল্যাণ সমিতি এবং ভৈরব ছন্নছাড়া এতিমখানার সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্কাউট আন্দোলনের প্রসারে অধ্যক্ষ রিয়াজ উদ্দিন আহমাদ ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বয়স্কাউট-এর অন্যতম ডেলিগেট হিসেবে লাহোরে অনুষ্ঠিত প্রথম পাকিস্তান স্কাউট কনফারেন্সে যোগদান করেন। তাঁরই উদ্যাগ ও প্রচেষ্টায় মুক্তাগাছায় ৪.৮১ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত নিয়ে ‘ঢাকা বিভাগীয় স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়। স্কাউটিংয়ে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ স্কাউটস-এর সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড “রৌপ্য ইলিশ” পদক অর্জন করেন এবং ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলা স্কাউটস-এর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। বর্ণাঢ্য স্কাউট জীবনে তিনি ময়মনসিংহ জেলা রোভারের প্রতিষ্ঠাতা কমিশনার, পূর্ব পাকিস্তান বয়স্কাউট সমিতির নির্বাহী কমিটির ৮ বছরের সদস্য এবং ময়মনসিংহ জেলা স্কাউটসের সহকারী কমিশনার, কমিশনার ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুদীর্ঘ, কর্মমুখর ও আলোয় ভরা জীবনের অধিকারী এই অদম্য কর্মবীর শিক্ষাব্রতী ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জানুয়ারি ফজরের আজান চলাকালীন সময়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮ নম্বর বেডে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ময়মনসিংহের গুলকিবাড়ী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই মহান ব্যক্তিত্ব। অধ্যক্ষ আলহাজ্জ রিয়াজ উদ্দিন আহমাদ ব্যক্তিজীবনে ছিলেন স্পষ্টভাষী, কঠোর পরিশ্রমী, দৃঢ়চেতা, ধর্মভীরু, সংস্কৃতিমনা, মিশুক ও অমায়িক মানুষ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন তিনি মানবপ্রেম ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা হয়ে মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে বেঁচে থাকবেন।
১৯৭৮ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথম জাতীয় স্কাউট জাম্বুরী উপলক্ষে দ্য বাংলাদেশ অবজার্ভার পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত মরহুম আলহাজ্জ রিয়াজ উদ্দিন আহমাদের "SCOUTING AND TEENAGER ORGANISATIONS" শীর্ষক নিবন্ধে স্কাউট আন্দোলনের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য কিছু দূরদর্শী প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি স্কাউটিংয়ের পাশাপাশি অন্যান্য শিশু-কিশোর সংগঠনের ইতিবাচক দিকগুলোকে সাধুবাদ জানিয়ে স্কাউট আন্দোলনকে আরও জনপ্রিয় করতে গণমাধ্যমের সক্রিয় সহযোগিতা, স্কাউট শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা, নিয়মিত ছাত্র-অভিভাবক সভার মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং স্কাউটিংয়ের মৌলিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
তথ্যসূত্র: স্কাউটার মোকাররম হোসেন সরকার