07/10/2023
ইসলামে শ্রমিকের অধিকার,শ্রমিক ঠকানোর পরিণতি ভয়াবহ
শ্রমিকরা মালিকের পরিবারভুক্ত
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিক মালিকের পরিবারভুক্ত। ইসলাম শ্রমিককে ‘ভাই’ স্বীকৃতি দিয়ে তার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে বলেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের দাসরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন, কাজেই কারো ভাই যদি তার অধীনে থাকে, তবে সে যা খায়, তা থেকে যেন তাকে খেতে দেয় এবং সে যা পরিধান করে, তা থেকে যেন পরিধান করায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৪৫)
শ্রমিকের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা
শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিকেরই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মালিকানাধীন (অধীন) ব্যক্তির জন্য খাবার ও কাপড়ের অধিকার আছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৬২)
মজুরি নিয়ে টালবাহানা নয়
বেতন ও পারিশ্রমিক কর্মজীবীর অধিকার—ইসলাম দ্রুততম সময়ে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৪৩০)
ঠুনকো অজুহাতে বেতন-ভাতা ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আরো ভয়ংকর অপরাধ। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিপক্ষে থাকব।...আর একজন সে, যে কাউকে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার পর তা থেকে কাজ বুঝে নিয়েছে অথচ তার প্রাপ্য দেয়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২২৭)
দুর্দিনে শ্রমিকের পাশে থাকবে মালিক
ইসলাম সাধারণভাবেই দুর্দিনে অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আর অসহায় ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি যদি হয় তার সেবাদানকারী শ্রমিক—তবে এই দায়িত্ব বেড়ে যায় বহুগুণ।
কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) মালিকপক্ষকে শ্রমিকের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সে যা খায়, তা থেকে যেন তাকে খেতে দেয় এবং সে যা পরিধান করে, তা থেকে যেন পরিধান করায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৪৫)
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘যৌবনকালে যে ব্যক্তি শ্রম দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের সেবা করেছে, বৃদ্ধকালে রাষ্ট্র (কর্তৃপক্ষ) তার হাতে ভিক্ষার ঝুলি তুলে দিতে পারে না।’ (ইবনে মাজাহ)
লভ্যাংশের ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব লাভ করার অধিকার:
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকদের লাভের মধ্যে অংশীদার হওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এর নিমিত্তে ইসলাম মুদারাবাত, মুজারাআত প্রভৃতি পন্থা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাদের মুনাফার অংশীদার হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। নবী করিম (সা.) শ্রমিককে মজুরিদান করার পরেও তাকে লাভের অংশ দেয়ার জন্যও উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘শ্রমিকদের তাদের শ্রমার্জিত সম্পদ (লাভ) হতেও অংশ দিও। কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায়না।(মুসনাদে আহমাদ)
অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সা:) বলেন: “তোমারভৃত্য যদি তোমার জন্য রান্না করে এবং তা নিয়ে তোমার কাছে আসে, রান্না করার সময় আগুনের তাপ এবং ধোঁয়া তাকে কষ্ট দিয়েছে, তখন কষ্টকে কিছু লাঘবের জন্য তোমার সঙ্গে বসিয়ে তাকে খাওয়াবে”। যে কষ্ট স্বীকার করে রান্না করে তার যেমন রান্না করা খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার অধিকার আছে, তেমনি যে শ্রমিক টেক্সাইলে কাজ করে, তার শ্রম দিয়ে মালিকের যে মুনাফা হয়, বেতনের বাইরেও তার ওই মুনাফার একটি অংশ ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তার প্রাপ্য।
অবকাশ বা ছুটি পাওয়ার অধিকার:
শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য বিশ্রাম, আপনজনদের সাথে একত্রে থাকা ও সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণ করার জন্য সাপ্তাহিক ও বাৎসরিক ছুটি প্রয়োজন। বিশ্রামহীনভাবে বা ছুটি ব্যতিত টানা কাজ করতে শ্রমিককে বাধ্য করানো যাবে না। একসঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর কিংবা নিরবিচ্ছিন্ন কয়েকদিন কাজ করলে তাকে ছুটি বা অবসর দিতে হবে। আরাম ও বিশ্রামের সুযোগ করে দিতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “আল্লাহ তোমাদের প্রতি সহজতা ও নম্রতা আরোপ করতে চান, কঠোরতা ও কঠিনতা আরোপ করতে ইচ্ছুক নন” (সূরা বাকারাঃ ১৮৫)। রাসূলে কারীম (সা:) বলেনঃ “তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন কর, কঠোরতা অবলম্বন করবে না”। নবী করীম (সা:) আরো বলেছেন, তোমরা তোমাদের কর্মচারীদের থেকে যতটা হালকা কাজ নেবে, তোমাদের আমলনামায় ততটা পুরস্কার ও পুণ্য লেখা থাকবে (তারগীব ও তারহীব)।
আনুপাতিকভাবে মজুরি পাওয়ার অধিকার:
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের শ্রমের অনুপাতে মজুরি নির্ধারণ করা মালিকের কর্তব্য। মালিক শ্রমিকদের ভরণপোষণের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করার অজুহাতে কর্মচারীদের উপর সক্রীয় শক্তিবলে অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারবে না। কেউ অতিরিক্ত বা অতি উত্তম কাজ করলে বা কাউকে দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করালে তার জন্য অতিরিক্ত মজুরি বা পুরস্কার দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে লোক এক বিন্দু পরিমাণ উত্তম কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে’।(সূরা যিলযাল ৭)
মালিক যদি অতিরিক্ত কাজ শ্রমিকের উপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে তাকে সাহায্য করার ব্যাপারে রাসূল (সা:) নির্দেশ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “ শক্তি সামর্থের অতিরিক্ত কাজ শ্রমিকের উপর চাপাবেনা। যদি তার সামর্থের অতিরিক্ত কোন কাজ তাকে দাও তাহলে সে কাজে তাকে সাহায্য কর।(বুখারী, মুসলিম)।
প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীর্ঘ দিনের খাদেম ছিলেন হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আচরণ কেমন ছিল, তা বর্ণনা করে তিনি বলেন-
‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীর্ঘ ১০ বছর খেদমত করেছি। তিনি আমার সম্পর্কে কখনো ‘উহ’ শব্দটি বলেননি এবং কোনো দিন বলেননি যে, এটা করো নি কেন? ওটা করো নি কেন? বরং আমার বহু কাজ তিনি নিজে করে দিতেন।’ (মিশকাত)
শ্রমিক ঠকানোর ভয়াবহ পরিণতি
শ্রমিক ঠকানো ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম পাপ, বরং ইসলামের নির্দেশনা হলো, শ্রমিক তার প্রাপ্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হলেও মালিক তাকে প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে। যেমন—শোআইব (আ.) মুসা (আ.)-কে ডেকে এনে পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তখন নারীদ্বয়ের একজন সলজ্জ পায়ে তার কাছে এলো এবং বলল, আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ করেছেন আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করানোর বিনিময় প্রদানের জন্য।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৫)
অথচ বর্তমানে অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হয়। মহানবী (সা.) এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘যে জাতির দুর্বল লোকেরা জোরজবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না, সেই জাতি কখনো পবিত্র হতে পারে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪২৬)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘...যে ব্যক্তি কারো কাছ থেকে শ্রম আদায় করল এবং তার পারিশ্রমিক না দিয়ে চলে গেল; অপরজন হলো, যে অনর্থক কোনো প্রাণী হত্যা করে।’ (মুসতাদরাকুল হাকিম, হাদিস : ২৭৪৩)
ভেবে দেখা উচিত, এই গুণগুলো আমাদের মধ্যে আছে কিনা! দুনিয়ার লোভে পড়ে কোন্ পাপ কাজটি আমরা করি না। মিথ্যা কথা বলা থেকে শুরু করে আমানতের খেয়ানত পর্যন্ত সবই আমরা করে বেড়াই। লোক ঠকাই। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করি।
অথচ, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যার চরিত্রে আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না তার দ্বীন নেই। (মুসনাদে আহমাদ)।
অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি- যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তখন তা ভঙ্গ করে আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন সে তার খেয়ানত করে। (বুখারি, মুসলিম)।
‘তোমরা অধীনস্থদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে এবং তাদেরকে কোন রকমের কষ্ট দেবে না। তোমরা কি জান না, তাদেরও তোমাদের মতো একটি হৃদয় আছে। ব্যথা দানে তারা দুঃখিত হয় এবং কষ্টবোধ করে। আরাম ও শান্তি প্রদান করলে সন্তুষ্ট হয়। তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা তাদের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন কর না।’ -বুখারী।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেছেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (সা:) এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা:) চাকর-বাকরের অপরাধ আমি কতবার ক্ষমা করব? রাসুল (সা:) চুপ রইলেন। সে পুনরায় তাঁকে প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ রইলেন। সে পুনরায় তাঁকে প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ রইলেন। চতুর্থবার বলার পর বললেন, ‘প্রত্যেক দিন সত্তরবার তাকে ক্ষমা করবে। (আবু দাউদ)।
একজন শ্রমিক অন্যেক কাজ করে অর্থের প্রয়োজনে। তিনি তার শ্রম দিচ্ছেন নিজের জীবন পরিচালনা এবং তার পোষ্যদের ভরণ-পোষণ নির্বাহ করার জন্যে। তাই তাকে যিনি শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করবেন উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেয়া তার নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামী বিধানে শ্রমিক, চাষী এবং অন্যান্য শ্রমজীবীকে কেউ বিনা পারিশ্রমিক খাটাতে পারে না। ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে শ্রমিকের কাজের ফল বা মজুরী কিংবা পারিশ্রমিক যথাযথ দেয়া এবং কোনোরকম জুলুম-অন্যায়, নিপীড়ন, শোষণ করা উচিত নয়। যদি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ আলোচনার ভিত্তিতে শ্রমিককে নির্ধারিত পারিশ্রমিক প্রদান না করে, তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক কমিয়ে দেয় কিংবা ঠকিয়ে দেয় তিনি হবেন আল্লাহর দৃষ্টিতে জালিম। আর জালিমের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তার কোন সাহায্যকারী কিয়ামতে থাকবে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেকের মর্যাদা তার কাজ অনুযায়ী, এটা এজন্য যে, আল্লাহ প্রত্যেকের কর্মেও পূর্ণ প্রতিফল দিবেন এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না ।’ (সূরা আহকাফ:১৯)
অনেক সময় শ্রমিকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মালিকগণ উপযুক্ত মজুরী প্রদান না করে ইচ্ছামত মজুরী দেন এবং শ্রমিকদের বঞ্চিত করেন ও ঠকান। আর শ্রমিকগণ নীরবে তা সহ্য করে থাকে। এ ধরনের কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ যদি শ্রমিকের মজুরি না দেয় অথবা দিতে গড়িমসি করে, তার বিষয়ে বলতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হবো। আর আমি যাদের প্রতিপক্ষ হবো, তাদেরকে পরাজিত করেই ছাড়ব। তাদের একজন হলো, এমন ব্যক্তি যে কাউকে মজুর নিয়োগ করে পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তাকে তার পারিশ্রমিক পরিপূর্ণভাবে আদায় করে দেয়না (বুখারী)।