21/05/2026
খেয়াল করে দেখেছেন কি, বেশকিছু বছর ধরেই আমাদের দেশের বাচ্চারা অল্পতেই অনেক বেশি উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে, অনেক বেশি কান্নাকাটি করছে– অপরিচিত ক্রাউডের পরিবেশ বা নতুন স্কুলিং এক্সপেরিয়েন্স হলে তো কথাই নেই। এই যে হুটহাট কান্নাকাটি– এইটা কিন্তু একটা বায়োলজিক্যাল বিষয়। আমরা কাঁদি ব্রেইনের এক জায়গায়, কিন্তু সেই কান্নাটাকে থামাই ব্রেইনের আরেক জায়গায়। কান্না থামানোর ইনহিবিটরি মেশিনারি আমাদের ব্রেইনের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে থাকে, যেটা কান্নাকাটির কেমিক্যাল লোডের সামনে আমাদের ব্রেইনটাকে শান্ত করে। এটা মূলত ইম্পালস কন্ট্রোলের বিষয়।
এই ইম্পালস কন্ট্রোলজনিত সমস্যা তো আসলে শুধুমাত্র দেশের বাচ্চাদের না, সম্পূর্ণ জাতিরই সমস্যা। বিশেষ করে ২০২৪ এর বসন্তের পর থেকে আমরা এমন এক জাতিকে দেখছি যার ইম্পালস কন্ট্রোল বলেই কিছু নাই।
এইসব নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মনে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তোফাজ্জলের কথা। মানসিকভাবে অসুস্থ লোকটাকে আমাদের তথাকথিত সুস্থ ছাত্ররা একবার মারতে মারতে আধমরা করলো–তারপর একটু থেমে–তারা আবার মারলো। এইবার মারতে মারতে মেরেই ফেললো একদম। আমার মনে পড়ে দীপু চন্দ্র দাসের কথা। মেরে লোকজন তাকে গাছে ঝুলায়ে পুড়ায়ে দিলো– আশেরপাশের মানুষ চিয়ার করে উঠলো–অথচ কারও মনে হলো না একটু থামা উচিত। আবরার ফাহাদ থেকে লালচাঁদ সোহাগ–সবাই কী একই ভাবেই মরে গেলো না? এমন কিছু নব্য যুবকের হাতে যারা কোনোভাবেই থামতে জানে না। নিজেদেরকে থামাতে জানে না। মৃত দেহের উপরে উল্লাসকে তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।
২৪ এর আগস্ট থেকে ২৬ এর মার্চের এই অল্প সময়ে অন্তত সাড়ে তিনশ লোক মবের হাতে এভাবে মারা গেছে– রিপোর্টেড। স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্লানেশনগুলা তো অবশ্যই খাটে। হাসিনার রেজিম পড়ে গেছে, ইন্টেরিমের পুলিশ দুর্বল ছিলো, নতুন ইলেক্টেড পার্টিও এখনও সবকিছু হাতে নিয়ে আসতে পারে নাই। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মানুষের মানুষ মারার আগ্রহকে ব্যাখ্যা করতে পারে না, গতিকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। মারার জন্য ভীড় হয়ে যায় এইখানে দ্রুত, সিচুয়েশন এস্কেলেট করে আফ্রিকার জঙ্গলে দলছুট কোনো হরিনের দেখা পাওয়া জাগুয়ারের দৌড়ের মত। সাথে সাথে মানুষ ক্যামেরা নিয়া হাসিমুখে রেডি হয়ে যায় রেকর্ড করার জন্য। এই যে ভায়োলেন্সের প্রখরতা, দ্রুততা, আর হঠাৎ করে এত গুণ বেড়ে যাওয়া এইগুলা কী খালি পলিটিক্যাল ব্যাখ্যা দিয়ে উড়ায়ে দেয়া যায়?
আমার কাছে মনে হয় যায় না।
তাই আমি নানান জায়গায় উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছিলাম কিছুদিন ধরে।
খুঁজতে খুঁজতেই আমেরিকার একটা রিসার্চে আমার চোখ আটকায়ে যায়।
ষাট ও সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল; কিন্তু নব্বইয়ের দশকে তা হঠাৎ করেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। অনেক বিশেষজ্ঞ সেটাকে নানানভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেছিলো কিন্তু কেউই পুরাপুরি মিলায়ে উঠতে পারে নাই। কারণ এই কমাটা ছিলো পুরা দেশজুড়ে, কিন্তু আমেরিকায় স্টেটওয়াইজ পলিসি আলাদা, সব মেজর সিটিগুলাতেই পলিসিমেকিং ছিলো ডিফারেন্ট। পুলিশিং, কারাব্যবস্থা, মাদকনীতি, কিংবা সামাজিক সংস্কারের মতো প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলো এই পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বছরটায় মার্কিন অর্থনীতিবিদ রিক নেভিন একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণায় দেখান যে, গাড়ির জ্বালানিতে লেড (সীসা) ব্যবহারের বিস্তার এবং সহিংস অপরাধ বৃদ্ধির মধ্যে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। তার গবেষণা অনুযায়ী, জ্বালানিতে লেড সংযোজনের প্রায় ২২ বছর পর সহিংস অপরাধ বাড়তে শুরু করে, এবং লেড অপসারণের প্রায় ২২ বছর পর অপরাধ কমে আসে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আরও আটটি দেশের ডেটাতেও তিনি একই ধরনের প্যাটার্ন খুঁজে পান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই গবেষণাগুলোর correlation coefficient ছিল ০.৯-এরও বেশি, যা সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণায় অত্যন্ত বিরল।
নিউরোসায়েন্স এই বিষয়টির একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা দেয়। লেড আমাদের শরীরের কাছে একটা ছদ্মবেশী ক্যালসিয়াম। এর ক্যাটায়নিক চার্জ ২ আর আয়নিক রেডিয়াসও কাছাকাছি। ডেভেলপিং ব্রেইনে লেড ক্যালসিয়ামের বদলি হিসেবে ঢুকে যায়, এরপর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে ড্যামেজ করে– যেইটা আমাদের ইম্পালস কন্ট্রোল, ফিউচার অরিয়েন্টেশন আর ইমোশনাল রেগুলেশনের জায়গা। এর ফলে ব্যক্তি তুলনামূলক বেশি ইমপালসিভ হয়ে ওঠে, তাৎক্ষণিক তৃপ্তির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা তৈরি হয়, এবং সহিংস আচরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ব্যক্তি পর্যায়ে এই ক্ষতি হয়তো সূক্ষ্ম; কিন্তু পপুলেশন লেভেলে এই ড্যামেজ ঠিকই দেখা যায়– ২২ বছরের টাইম গ্যাপে, ইকোনমিস্টদের রিসার্চে। ডেটা ঘেঁটে পেলাম ভয়ানক সব পরিসংখ্যান।
ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, লেড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের চতুর্থ। ২০২৫ সালের Multiple Indicator Cluster Survey (MICS) দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশুর রক্তে WHO নির্ধারিত intervention threshold-এর চেয়ে বেশি লেড রয়েছে। সংখ্যার হিসেবে এটি দুই কোটিরও বেশি শিশু।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায় ২০২২-২৪ সালে আইসিডিডিআরবি এবং Stanford University পরিচালিত একটি গবেষণায়। ঢাকার ২-৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর উপর পরিচালিত সেই গবেষণায় দেখা যায়, প্রত্যেক শিশুর রক্তেই লেডের উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে ঢাকার প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে লেডের মাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের “immediate attention needed” পর্যায়েরও ওপরে। এই লেড এসেছে প্রধানত অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং, বিষাক্ত রঙ, দূষিত খাদ্যপণ্য, শিল্পবর্জ্য, এবং বায়ুদূষণের মাধ্যমে।
লেডের এক নাম্বার সোর্স আনরেগুলেটেড ব্যাটারি রিসাইক্লিং। দেশে এখন ৪০ লাখের উপর ব্যাটারি রিকশা চলে, দশ বছর আগেও যা ছিলো ২ লাখের কম, ১৫ বছর আগে ৫০ হাজারের কম। প্রত্যেকটায় পাঁচটা লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি, প্রতিটার আয়ু গড়ে ৬-১১ মাস। UNEP ও Pure Earth-এর তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাটারির বড় অংশ দেশের বিভিন্ন অনিয়ন্ত্রিত “ভাট্টি”-তে খোলা চুল্লিতে গলানো হয়—যার অধিকাংশই আবাসিক এলাকার ভেতরে অবস্থিত। Stanford-এর গবেষণা অনুযায়ী, এই ধরনের শিল্পস্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে লেডের মাত্রা গড়ে ৪৩ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
লেডের দুই নাম্বার সোর্স পেইন্ট। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে লেড পেইন্ট আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ পেইন্ট এখনও লিগ্যাল লিমিটের অনেক বেশি লেড পার্টিকল সহ বিক্রি হয়– প্রায়শই ১০,০০০ পিপিএম এর কাছাকাছি ঘনত্বে।
তিন নাম্বার সোর্স আমাদের রান্নাঘর। দশকের পর দশক ব্যবসায়ীরা হলুদকে আরও উজ্জ্বল হলুদ দেখানোর জন্য তাতে লেড ক্রোমেট পিগমেন্ট মিশিয়েছে– কারণ আমরা উজ্জ্বল হলুদকে "ভালো হলুদ" বলে চিনি। অর্থাৎ লেড আমাদের ডাল-ভাতেও ঢুকেছে মার্কেটের চাহিদার মেটাতে কুটবুদ্ধির পথ ধরে।
লেডকে আমাদের সমস্যার কারণ হিসেবে দেখানোটা সবচেয়ে ইজি কারণ লেডকে নিয়ে এই পার্সপেক্টিভে এরমধ্যেই লার্জ স্কেল রিসার্চ আছে। কিন্তু লেডই তো একমাত্র বিষ না। দেখা যাচ্ছে, লেড হইলো বাংলাদেশের পলিউশন অপেরার একটামাত্র ইন্স্ট্রুমেন্ট। কিন্তু এর পিছনে একটা পুরা অর্কেস্ট্রা বাজতেছে।
আমাদের চার নাম্বার সোর্স হাজারিবাগের ট্যানারি। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ক্রোমিয়ামে ডুবিয়ে রেখেছে। ঢাকার বাতাস WHO-র গাইডলাইনের বহুগুণ ছাড়িয়ে যায় প্রতি বছর– গাড়ির ধোঁয়া, ইটভাটার কয়লা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল নিঃসরণের একটা কেমিক্যাল ককটেল এইখানে চার কোটি মানুষ প্রতিদিন শ্বাসের সাথে টানে। গ্রামের কয়েক কোটি মানুষ টিউবওয়েলের আর্সেনিকযুক্ত পানি খেয়ে গেছে দশকের পর দশক। ডেভেলপিং ব্রেইন এগুলোর একটার বিরুদ্ধেও কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে পারে না। সেখানে একই শৈশবে কয়েকটা বিপদ একসাথে আসলে প্রায় কিছুই করার থাকে না, থাকে কী?
তাহলে ইকুয়েশনটা কী দাড়াচ্ছে?
চলুন আমেরিকার ২২ বছরের টাইম ফ্রেমের হিসাবটা আমাদের কনটেক্সটে চিন্তা করি। ২০২৪-২৬ এর মব ভায়োলেন্সে যারা মানুষ মারছে তারা জন্ম নিয়েছিলো ২০০০ এর দশকের শুরুতে বা এর আশে-পাশে। ঠিক সেই সময়টায় বাংলাদেশের গাড়ি আমদানীর হার বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছিলো, ব্যাটারি রিসাইক্লিং এর আইডিয়া ছড়াচ্ছিলো, ঢাকার বাতাস-মাটি-পানি সেই সব রাসায়নিক শোষণ করে আসছিলো যেগুলো আইসিডিডিআরবি আজকের দুই বছর বয়সী বাচ্চাদের রক্তে এখন মাপছে। নেভিনের ২২ বছরের ক্যালকুলেশন এই কোহর্টের উপরই হুবহু পড়ে– কেবল ফুয়েলের মধ্যের লেড না, আরও অনেক কিছু সহ। চল্লিশ লাখ ব্যাটারি-চালিত রিকশা, দশকের পর দশক ধরে ব্যবহার হওয়া পেইন্টের লেড, ট্যানারির ক্রোমিয়াম, হলুদের মধ্যে দেওয়া লেড ক্রোমেট, সব নিউরোটক্সিনকেই নেভিনের ইকুয়েশনে ফেলে হিসেব করা যায়।
আমার মনে হয় বাংলাদেশের এই মব জেনারেশনের ব্রেইনটা এতসব নিউরোটক্সিনে পুরো বারুদ হয়ে আছে। একটু ঘষা দিলেই জ্বলে উঠে। আশেপাশের সব ছাড়খাড় করে দেয়। দাবানলকে যেমন থামানো যায় না তেমন থামানো যায় না মবদের। সবার মাথায় ভায়োলেন্সের অফুরন্ত জ্বালানি। বাংলাদেশের বাতাসে শ্বাস নিয়ে, বাংলাদেশের হলুদ খেয়েই তো সবাই বড় হয়েছে। তাই দল-মত-বাম-ডান নির্বিশেষে সবাই এখানে টিকিং বম্ব, যেকোনো মুহুর্তে ফাটতে পারে।
নিজেকে জিজ্ঞেস করছিলাম, আমাদের কালচারের কতটুকু আসলে আমাদের? পলিটিক্স, এডুকেশন, ভ্যালুজ– যেগুলোর মধ্যে আমরা সবকিছুর ব্যাখ্যা খুঁজি– এর কতটুকু আসলে ছোটবেলায় চুপিচুপি জমে যাওয়া বিষের ছায়া? ভাট্টির পাশের মাটি, ট্যানারির উপরের বাতাস, টিউবওয়েলের পানি, দেয়ালের পেইন্টের ধুলা– এইগুলোর ফলাফল আমাদের নৈতিকতার ভাষায় ব্যাখ্যা হতে থাকে। আমজনতা লেড আর ক্রোমিয়াম খেতে খেতে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হতে থাকে। আইকিউ কমতে থাকে, ইম্পালস কন্ট্রোল বলে কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না। বাসায় পেটায় স্ত্রীকে, রাস্তায় মব হয়ে পেটায় উদ্বাস্তুদের। ইন্সট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশনের পাগল এই বিকলাঙ্গরা পর্ন দেখে মাথার নিউরোট্রান্সমিটার সিস্টেমকে আরও ধ্বংস করে। এরপর ধর্ষণের সুযোগ পেলে না করে আর থাকতে পারে না কারণ ইম্পালস কন্ট্রোল বলে ব্রেনের যে ফাংশন সেটা আর কাজ করছে না। এগুলোকে তখন আমরা বলি "অশিক্ষা," "অসভ্যতা," আর "মৌলবাদ।" আসল কারণটা নিয়ে আমাদের আর কাজ করা হয় না।
আমেরিকার গল্পে একটা পজিটিভ আর্ক আছে।
লেডকে ফুয়েল থেকে সরানো হলো।
২২ বছর পর ক্রাইম-রেট অনেক নিচে নামলো।
বাংলাদেশের সেইরকম কোনো আর্ক চোখে পড়ছে না। ভাট্টি কমতেছে না– উল্টো আরও বাড়তেছে, ব্যাটারি-চালিত রিকশার সংখ্যা ২০১০ সালের ৪০ হাজার থেকে ২০১৬ সালে ২ লাখ হইছে, তারপর ২০২৬ এ এসে দেখি ব্যাটারি-চালিত রিকশার সংখ্যা ৪০ লাখে এসে দাড়িয়েছে। হলুদের লেড নিয়ে বেশ কাজ হয়েছিলো ২০১৯-২১ এ, কিন্তু পেইন্টের আইনের কোনো এনফোর্সমেন্ট নাই। বাতাস বছর বছর খারাপ হচ্ছে। এই ড্যামেজটা একবার হয়ে গেলে আর কিন্ত আনডু করে ফ্রেশ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। আপনাকে প্রিভেনশনের রাস্তা নেওয়া ছাড়া আর কোনো অপশন থাকছে না হাতে। আর হলুদের এক্সেপশনটা বাদ দিলে– প্রিভেনশন একদমই হচ্ছে না।
বাংলাদেশ যেটার সামনে দাঁড়ায়ে আছে সেটাকে পরে সমাধান করার মত কোনো ম্যাজিক কিন্ত নাই। সমস্যা এখন, এই বর্তমানেই। জেনেটিক প্রিডিসপজিশন আর ভয়ংকর অসহিষ্ণুতার কালচার একে অপরকে ফিড করতে করতে ভবিষ্যত হয়তো অবস্থা আরও ভয়ানক হবে। সেটা ইতিমধ্যেই অনেকটা হয়ে গেছে– এমন সব বাচ্চার রক্তে যারা এতই ছোট যে নিজেরাও জানে না কতটা অস্থির নিয়ন্ত্রণহীন কালচারের অংশ তারা হতে যাচ্ছে।
ঢাকার বাতাস একরাতে বদলাবে না। ভাট্টিগুলা একদিনে বন্ধ হবে না। কিন্তু ছোট ছোট কিছু কাজ এখন থেকেই শুরু করা যায়। লেড পেইন্টের আইন আছে– সেইটা মানতে বাধ্য করা যায়। আবাসিক এলাকার ভাট্টি চিহ্নিত করে সরানো যায়। হলুদের মার্কেটকে কন্টিউনিয়াস মনিটরিংয়ে রাখা যায়। বাচ্চাদের রক্তের লেড নিয়মিত মাপা যায়– ঠিক যেমন আমরা ওজন আর উচ্চতা মাপি।
আর শুধু পরিবেশ না– বাচ্চাদের সাথে আমাদের আচরণটাও বদলানো দরকার। আমাদের জেনারেশন যেইভাবে বড় হয়েছি– সব ছোটখাটো জিনিসে চিৎকার-চেঁচামেচি, মারধর, ভয় দেখানো– এইগুলাও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের ডেভেলপমেন্টে বাধা দেয়। এবং বাচ্চারা দেখে তার বাবা-মায়েরাই ইম্পালস কন্ট্রোল করে না–তারা কী করবে? বাচ্চাকে ইম্পালস কন্ট্রোল শেখানো এখনকার বাংলাদেশী প্যারেন্টিং কালচারে ঢোকানোটা মাস্ট।
মব কালচারকে নর্মালাইজ করা বন্ধ করতে হবে। লিঞ্চিং-এর ভিডিও শেয়ার করা বন্ধ করতে হবে। প্রতিটা মব হত্যায় যে লোকটা ক্যামেরা নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়ায়ে আছে, সেও যে অপরাধী– এইটা সামাজিকভাবে বলা শুরু করতে হবে। কারণ যতদিন মব ভায়োলেন্স সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য থাকবে, ততদিন বিষ-আক্রান্ত ব্রেইনগুলা সেই গ্রহণযোগ্যতার দরজা দিয়েই বের হতে থাকবে।
আমেরিকা তার লেড সমস্যাকে চিনতে পেরেছিলো ত্রিশ বছর পর। আমাদের কাছে এত সময় নাই। যেই কোহর্ট আজকে রাস্তায় মানুষ মারতেছে তাদের ব্রেইনের ফিজিক্যালি আর কালচারালি দুইভাবেই ড্যামেজড– সেটা আর ঠিক করার উপায় নাই। কিন্তু যে বাচ্চাটা আজকে ভাট্টির পাশে হামাগুড়ি দিতেছে, যে বাচ্চাটা হলুদ-মেশানো ডাল খাচ্ছে, যে বাচ্চাটা ঢাকার বাতাস টানতেছে– তাদের এখনও বাঁচানো যায়–ড্যামেজটা থামিয়ে এবং হেলদি একটা কালচার দিয়ে।
কিন্তু সেটার জন্য আগে স্বীকার করতে হবে যে তারা বিষাক্ত হচ্ছে। আর এটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন। কারণ স্বীকার করা মানে কাজ শুরু করা।
17/05/2026
17/05/2026
17/05/2026
16/05/2026