14/07/2026
এক পাহাড়ি গ্রামের ছোট্ট এক কুটিরে থাকত এক বৃদ্ধ। গ্রামের মানুষ তাকে 'আলোর দাদু' বলে ডাকত। দাদুর কাজ ছিল অদ্ভুত। তিনি প্রতিদিন ভোরে একটা বড় ঝোলা কাঁধে নিয়ে পাহাড়ে চলে যেতেন। আর সন্ধ্যাবেলায় যখন ফিরতেন, তখন তার ঝোলা থেকে মিষ্টি, সোনালি রঙের আলো বের হতো।গ্রামের যেসব ঘরে রাতে প্রদীপ জ্বালানোর তেল থাকত না, বা যেসব শিশু অন্ধকারকে ভয় পেত, দাদু তাদের জানালায় গিয়ে টোকা দিতেন। ঝোলা থেকে এক মুঠো আলো বের করে ঘরের কোণে রেখে দিতেন। সেই আলোতে ঘর পুরো উজ্জ্বল হয়ে যেত, অথচ কোনো তেল বা সলতের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু কেউ জানত না দাদু এই আলো কোথা থেকে পান।সেই গ্রামে রনি নামে এক কৌতূহলী ছেলে ছিল। একদিন সে ঠিক করল দাদুর এই আলোর রহস্য তাকে জানতেই হবে। তাই পরদিন ভোরে সে লুকিয়ে লুকিয়ে দাদুর পিছু নিল।দাদু পাহাড়ে উঠে এক অচেনা ঝরনার পাশে গিয়ে বসলেন। ঝোলা থেকে বের করলেন একটা অদ্ভুত, চারকোনা কাচের টুকরো। রনি গাছের আড়াল থেকে দেখল, দাদু সেই কাচটি সূর্যের আলোর দিকে ধরলেন। কিন্তু কাচটি সূর্যের কড়া রোদকে শুষে নিয়ে ভেতরে খুব নরম, স্নিগ্ধ আর শীতল এক আলোতে রূপান্তর করছে। দাদু সেই কাচ থেকে আলোটা আলতো করে ধরে নিজের ঝোলায় পুরে নিচ্ছেন।রনি লোভ সামলাতে পারল না। সে ভাবল, "আমি যদি এই জাদুর কাচটা পেয়ে যাই, তবে আমি নিজেই পুরো গ্রামের আলোর মালিক হয়ে যাব। সবাই আমাকে সমীহ করবে।"দুপুরে দাদু যখন গাছের ছায়ায় একটু ঘুমিয়ে পড়লেন, রনি গুটিগুটি পায়ে গিয়ে তার ঝোলা থেকে জাদুর কাচটি চুরি করে দৌড়ে পালিয়ে এল।বাড়ি ফিরে রনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল কখন সন্ধ্যা হবে। সন্ধ্যা নামতেই সে কাচটি নিয়ে ঘরের মাঝখানে দাঁড়াল। সে ভাবল কাচ থেকে এখন আলো বের হবে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! কাচটি থেকে কোনো আলো তো বের হলোই না, উল্টো রনির ঘরের স্বাভাবিক আলোটুকুও কাচটি শুষে নিল। পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। রনি ভয় পেয়ে চিৎকার করতে লাগল।ঠিক তখনই জানালার বাইরে চেনা গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, "ভয় পেয়ো না দাদুভাই, আমি আছি।"আলোর দাদু জানালা দিয়ে এক মুঠো নরম আলো ঘরের ভেতর ছেড়ে দিলেন। মুহূর্তেই ঘর আলো ময় হয়ে উঠল। রনি লজ্জিত হয়ে জাদুর কাচটি দাদুর হাতে ফেরত দিল এবং কেঁদে ফেলে ক্ষমা চাইল। সে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, কাচটি আমার হাতে কাজ করল না কেন? উল্টো অন্ধকার হয়ে গেল কেন?"দাদু হেসে রনির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "দাদুভাই, এই কাচটি কেবল তখনই আলো ছড়ায়, যখন এটি অন্যের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা হয়। তুমি যখন এটাকে নিজের স্বার্থ আর অহংকারের জন্য নেওয়ার চিন্তা করলে, তখন এর ভেতরের আলো অন্ধকারে রূপ নিল। প্রকৃতির দেওয়া শক্তি নিজের লোভের জন্য নয়, সবার উপকারের জন্য।"রনি তার ভুল বুঝতে পারল। সেদিন থেকে সে আর লোভ করল না, বরং সে নিজেই আলোর দাদুর সহকারী হয়ে গেল। দাদুর বয়স হলে রনিই হয়ে উঠল সেই গ্রামের নতুন আলোর ফেরিওয়ালা।
গল্পের শিক্ষা: যেকোনো জ্ঞান, শক্তি বা সম্পদ তখনই প্রকৃত সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন তা নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়া হয়।