05/10/2025
#শিক্ষক_দিবস
রহিম স্যারকে এভাবে দেখব পুরোপুরি ভাবতে পারিনি। আসলে পুরোপুরি বলার কারণ ক্লাসে মাঝে মাঝে আমাদের উপর রেগে গেলে বলতেন, "এই গরু ছাগল না পড়িয়ে স্কুলের সামনে ঝালমুড়ি আর শরবত-আইস্ক্রিম বেচা অনেক ভালো। অন্তত এত পরিশ্রমের না। হাঁপিয়ে উঠেছি।" সেই রহিম স্যার কি সুন্দর মগের মধ্যে মুড়ি আর মশলা ঢেলে একটা মোটা বেতের সরু লাঠি দিয়ে হাত ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে মেখে চলেছেন। প্লেটে ঢেলে একজন কাস্টমারের দিকে হাসিমুখে এগিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছে খুব উপভোগ করছেন। ফিজিক্সের এককালে নামকরা একজন শিক্ষককে এভাবে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে দেখাটা তার ছাত্র হিসেবে হজম করতে পারছি না। আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললেন,"এখন কি কর?"
-আমি স্যার একটা কলেজে আছি। কয়েক মাস হলো জয়েন করলাম। আপনার সাব্জেক্টেই।
- বাহ বেশ। শিক্ষকতা কি বুঝেশুনে পেশা হিসেবে নিয়েছো? নাকি ঠেকায় পড়ে?
- না স্যার। ঠেকায় পড়ে না। আমার কলেজ জীবন থেকেই হঠাৎ মনে হলো শিক্ষকতা আমাকে টানে।
- ধৈর্য্য ধরে রেখো। আমি আর ধৈর্য্য ধরতে পারলাম না। জেনারেশনটা কেমন যেন। শর্টকাট খুঁজে। ম্যাথ পারেই না। অথচ ফিজিক্স পুরোটাই ম্যাথ। সেই সাথে আদব কায়দা শ্রদ্ধাবোধ নাই। এরা ভাবে টাকা দেই পড়ি। এর বেশি কোনো খাতির নাই।
-জ্বি স্যার। স্যার আপনার মুখোশ কই?
প্রশ্নটা করতেই স্যার হো হো করে হেসে উঠলেন। আশেপাশের কাস্টমাররা অবাক হতে তাকাচ্ছে। স্যার সংযত করে নিলেন নিজেকে।
-তোমার মনে আছে সেই কথা এখনো?
-জ্বি স্যার। ঐ যে আপনি বলতেন "শিক্ষকতা ছেড়ে মুখোশ পরে ঝালমুড়ি বেচব, আর পারি না তোদের নিয়ে" তখন আমরা বলতাম "মুখোশ কেন স্যার? লজ্জায়? " আপনি বলতেন "লজ্জা কিসের? কোনো কাজ ছোট না। মুখোশ পরব যেন তোরা আমাকে চিনে বাকিতে না খাস বা স্যার ট্রিট দেন বলে না বসিস।
স্যার কেমন যেন উদাস হয়ে গেলেন। একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন
-আসলেই রে আর পারলাম না। ছাত্ররা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। সেটা ভয়ের বিষয় না। ভয়ের বিষয় এদের চাইতে এদের অভিভাবকরা আরও বেশি অধৈর্য্য। দুই এ মিলে আমাকে আর দিল না স্বাভাবিক থাকতে। পরে একদিন এই সিদ্ধান্ত।
-স্যার। আজকে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি কেন জানেন?
-না
-আজ শিক্ষক দিবস। তাই সরাসরি আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে চলে এলাম।
স্যার কিছুই বললেন না। চুপ হয়ে গেলেন। মগ নিয়ে মুড়ি বানাতে লাগলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন," ঝাল কি আগের মতো বেশি খাও? তোমাকে একটা স্পেশাল মুড়ি ভর্তা বানিয়ে দিচ্ছি।"
বলেই স্যারের হাতের কাঠি ঘুরতে লাগলো। আমিও কেমন থমকে গেলাম। মনে হলো পুরো সময় ই যেন থমকে গেছে। স্যারের হাতের কাঠি যেন আলোর বেগে ঘুরছে। একসময় এই বেতের লাঠি আমাদের মানুষ করেছে। স্যারের হাতে বেতের লাঠি আজও আছে। শুধু উদ্দেশ্য পরিবর্তন হয়েছে।