25/08/2024
শিক্ষায় নতুন পরিবর্তন: কমিটি বাতিল নয়, সভাপতি বদল
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ২০২৪ সালের এপ্রিলে একটি নতুন প্রবিধানমালা প্রণয়ন করেছে, যা ১৯৬১ সালের Intermediate and Secondary Education Ordinance-এর Section 39-এর অধীনে গৃহীত হয়েছে। এই প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার পর থেকেই শিক্ষাব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে, ছাত্র-জনতার সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের পর প্রাথমিকভাবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিটি বাতিলের প্রত্যাশা থাকলেও, সরকার কমিটি বাতিল না করে সভাপতিদের বদল করেছে।
মাত্র চার মাস আগে কার্যকর হওয়া এই প্রবিধানমালা শিক্ষা ব্যবস্থার সুশৃঙ্খলা ও মান উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছিল। ছাত্র-জনতার সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনবে। এই সরকার গঠনের পর পরই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান কমিটি বাতিল করার একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, যার মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।
বর্তমানে, কমিটি বাতিল না করে, বরং পূর্বের প্রবিধানমালা অনুযায়ী, বিশেষ করে প্রবিধানের ৬৮ অনুচ্ছেদ মোতাবেক, সভাপতিদের সরানো হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা।
বিগত সরকারসমূহ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবই দলীয় লোকজন, মন্ত্রী, এবং এমপিরা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব পদক্ষেপ শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। ছাত্র-জনতার সরকারের এই নতুন পরিপত্র রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে এনে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চাইছে।
এটি বোঝা যাচ্ছে যে বর্তমান সরকার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে এবং এ ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করতে চায়। নতুন প্রবিধানমালার অধীনে, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইচ্ছা করলে একটি পরিপত্র জারি করেও এই পরিবর্তনগুলি বাস্তবায়ন করতে পারত। তবু, নতুন বিধির আওতায় যা করা হয়েছে, তা যথার্থ ও উপযুক্ত হয়েছে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।
বর্তমানে উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা বাতিল করে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কাজের পরিধি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করতে হয়। বর্তমান বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের জেলা ও উপজেলার অনেক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে হয়, এবং তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রমও পরিচালনা করেন। এই নতুন ব্যবস্থায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বহুমুখী দায়িত্বের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা করতে আরও ব্যস্ত সময় করতে অতিবাহিত করতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে আরও কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। আশা করা যায়, সরকার শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন করবে এবং এটি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০২৪ এর প্রবিধানমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল সভা প্রতিষ্ঠানেই করতে হবে। বিধি মোতাবেক, জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধি এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সভা করার কথা। তবে, জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের প্রধান কর্মকর্তারা এত বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে, যা তাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করবে। এই বাস্তবতায়, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সভা করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। ফলে, নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে, কমিটির সদস্য সচিব এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জেলা প্রশাসন বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। এই পরিস্থিতি প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে এবং সময়ের অপচয় ঘটাতে পারে।
নতুন পরিপত্র বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কিছু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সভাগুলির সময়সূচী এবং কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন হতে পারে। আশা করা যায়, সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
কমিটি বাতিল না করে সরকার একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিশেষ করে শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এনটিআরসিএর সুপারিশের পর কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। বর্তমান বিধিমালায় শিক্ষকদের নিয়োগদান কর্তৃপক্ষ কমিটি।
বর্তমান ব্যবস্থার অধীনে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করতে এখনও পারে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে, কমপক্ষে দুটি এবং সর্বোচ্চ পাঁচটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (কলেজ, স্কুল এবং মাদ্রাসা) উপজেলায় বা জেলায় কর্মরত ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা সপ্তম গ্রেড ও পঞ্চম গ্রেডে বেতনভাতা উত্তোলন করেন। সুতরাং, তাদের সম্মানের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতি গ্রহণ করলে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন, কারণ তারা প্রশাসনিক চাপ থেকে মুক্ত থাকবেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলির কাজের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন।
যদি এসব প্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়, তাহলে উপজেলায় বা জেলায় একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা যেতে পারে। আবার জেলা প্রশাসকও একটি কমিটি গঠন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। এই কমিটি দুই থেকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বণ্টন সম্পন্ন করবে।
অতএব, বর্তমান প্রবিধানমালা এবং নতুন পরিপত্রের মাধ্যমে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা এবং তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে আরও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। এই পরিবর্তনগুলি শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল করতে সাহায্য করবে।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের নতুন স্বাধীন সরকারের অধীনে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি গড়া হয়েছিল। এ পদক্ষেপটি ছিল একটি বিশাল অর্জন এবং জাতির জন্য এক অমূল্য উপহার। পরবর্তীতে, শেখ হাসিনার সরকারের সময়েও আরও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ করা হয়েছে, যা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই সমস্ত পদক্ষেপ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পরও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। সরকারি/জাতীয়করণের অভাব বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের একটি স্পষ্ট দাবি, যা এখনো পূরণ হয়নি। এই দাবি পূরণের মাধ্যমে সরকার কেবল শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে না, বরং একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী, স্থিতিশীল, অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করবে।
ছাত্র-জনতার সরকার যে পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বেসরকারি শিক্ষকদের প্রাণের দাবিকে সম্মানিত করতে সহায়ক হতে পারে। সরকারের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থায় সুশাসন এবং স্বচ্ছতা আনার হয়, তবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয়করণ একটি অতীব জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারকে একটি সমতামূলক এবং প্রগতিশীল শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দিতে সক্ষম হবে।
জাতীয়করণের এই প্রক্রিয়া কেবল বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনে একটি নতুন সূচনা এনে দেবে না, বরং দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ছাত্র-জনতার সরকার এই প্রাণের দাবি পূরণ করে ইতিহাসের পাতায় একটি অনন্য স্থান লাভ করবে এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। আশা করি, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
মো: আবুল কালাম আজাদ
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
নরসিংদী সদর, নরসিংদী।
[email protected]