26/09/2026
তিন বছর আগে, ২০২৩ সালে—আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানিয়েছিলাম প্রাণের কুষ্টিয়া জিলা স্কুলকে।
কী অদ্ভুতভাবে সময় চলে যায়! মনে হয়, এই তো সেদিন—অচেনা কিছু মুখ নিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের পথচলা। তখন কে জানত, সেই মুখগুলোই একদিন হয়ে উঠবে শৈশবের সবচেয়ে আপন মানুষ, আর কুষ্টিয়া জিলা স্কুল হয়ে উঠবে আমাদের ছোট্ট পৃথিবী।
ক্লাস থ্রি, ফোর, ফাইভ—শৈশবের সবচেয়ে নির্ভার সময়। নতুন বন্ধু, খেলা, টিফিন, দুষ্টুমি আর হাসি-ঠাট্টায় কেটে গেল কয়েকটা বছর। তখন বুঝিনি, এই সাধারণ দিনগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলো।
ক্লাস সিক্সে পরিচিত গণ্ডিটা আরও বড় হলো। নতুন কিছু বন্ধু, নতুন সম্পর্ক—খেলা, আড্ডা, ছোটখাটো ঝগড়া আর আবার মিলেমিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বন্ধুত্বগুলো কখন যে গভীর হয়ে উঠল, টেরই পাইনি।
তারপর ক্লাস সেভেন।
করোনা মহামারি হঠাৎ থামিয়ে দিল সবকিছু। স্কুল বন্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা নেই—চেনা জীবনটা যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল।
তখন স্কুল বন্ধ থাকাটা আনন্দের মনে হয়েছিল। আজ মনে হয়, যদি সেই দিনগুলো আরেকবার ফিরে আসত! কারণ তখন বুঝিনি—স্কুলে যাওয়ার মতো সাধারণ একটা দিনও একদিন অসাধারণ স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে।
স্কুল খুলল। আবার ফিরলাম পরিচিত বেঞ্চ, মাঠ আর বন্ধুদের কাছে। আর তারপর এলো ক্লাস নাইন—আমাদের স্কুলজীবনের সেরা অধ্যায়ের সেরা সময়।
এই সময়েই বন্ধুত্বগুলো সবচেয়ে গভীর হলো। হাসি, আড্ডা, দুষ্টুমি, অভিমান আর অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত মিলিয়ে তৈরি হলো এমন এক সময়, যার গুরুত্ব তখন পুরোপুরি বুঝিনি।
তবে তখনই প্রথমবার মনে হয়েছিল—
এই সময়টা চিরকাল থাকবে না।
একদিন আমাদেরও থামতে হবে।
তারপর ক্লাস টেন।
একই স্কুল, একই ক্লাসরুম, একই বন্ধুরা—তবুও সময়টা যেন হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেল। সামনে পরীক্ষা, ভবিষ্যৎ আর নতুন জীবনের ভাবনা; আর তার মাঝেই ধীরে ধীরে উপলব্ধি হচ্ছিল, আমাদের পরিচিত এই পৃথিবীটা আর বেশিদিন আগের মতো থাকবে না।
যে বেঞ্চে বসে এত গল্প করেছি, যে মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি, যে মানুষগুলোর সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়েছে—সবকিছুকেই অজান্তে শেষবারের মতো ছুঁয়ে যাচ্ছিলাম।
কখনো বুঝিনি কোন আড্ডাটা শেষ আড্ডা, কোন টিফিনটা শেষ টিফিন, কিংবা কোন বিকেলটা শেষ বিকেল। শুধু সময় এগিয়ে গেছে, আর আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছি বিদায়ের দিকে।
শেষ সময়ে ছবি তুলেছি, স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছি, একে অন্যকে বিদায় জানিয়েছি। হয়তো ভেতরে কোথাও বিশ্বাস ছিল—আবার দেখা হবে, আবার সবাই একসঙ্গে বসব।
দেখা হয়েছে, কিন্তু সময়টা আর ফিরে আসেনি।
অবশেষে এলো ২০২৩।
আনুষ্ঠানিক বিদায়।
সেদিন স্কুলের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে আসার মুহূর্তটা হয়তো তখন এতটা ভারী মনে হয়নি। কিন্তু পরে বুঝেছি—আমরা শুধু একটা স্কুল ছেড়ে আসিনি; জীবনের সবচেয়ে নির্ভার একটা সময় পেছনে ফেলে এসেছিলাম।
তারপর আর বাজেনি সেই স্কুলের ঘণ্টা আমাদের জন্য। একসঙ্গে ক্লাস করা হয়নি, টিফিনের ঝামেলা হয়নি, আলম মামার দোকানে ছুটে যাওয়া হয়নি। মামা গলি, তেঁতুলতলা, ললিপপ, ‘ফাস্ট বুক’, খাকি প্যান্ট আর সাদা শার্ট—সবকিছু ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।
যে বন্ধুরা একসময় প্রতিদিন পাশে থাকত, আজ তাদের কেউ দূরে, কেউ ব্যস্ত নিজের জীবনে। হয়তো সামনে আরও দূরে চলে যাব আমরা। কেউ নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে, কেউ জীবনে অনেক বড় হবে—সবার জন্য সেই দোয়াই থাকবে।
জীবন আমাদের আলাদা পথে নিয়ে গেলেও, আমাদের শুরুর গল্পটা একই জায়গায় লেখা—কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে।
আজ ২০২৬। বিদায়ের তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছু বদলেছে—মানুষ, ব্যস্ততা, পথ, স্বপ্ন। শুধু কিছু স্মৃতি বদলায়নি।
মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই ছেলেগুলো যদি একবার ফিরে তাকাতে পারত! তারা জানত না, তখনই তারা জীবনের এমন একটা সময় বেঁচে ছিল, যার কাছে ভবিষ্যতের অনেক কিছুই একদিন ফিকে মনে হবে।
আজ সেই ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। সেই বয়সটাও নেই, সেই দিনগুলোও নেই। কিন্তু কিছু স্মৃতি ফিরে পাওয়ার জন্য নয়—সারাজীবন সঙ্গে রাখার জন্য।
বিদায়, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।
তিন বছর আগে তোমার গেট পেরিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম।
আজ বুঝি—সেদিন শুধু স্কুল থেকে বেরিয়ে আসিনি; আমার শৈশবটাকেও তোমার উঠোনে রেখে এসেছিলাম।
সময় আমাদের যত দূরেই নিয়ে যাক, জীবন যত নতুন অধ্যায়ই লিখুক, আমাদের পথ যত আলাদাই হোক—KZS-এর সেই দিনগুলো আমাদের জীবনের ভেতর থেকে কোনোদিন মুছে যাবে না।
কারণ কিছু জায়গা শুধু স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে না—
সেগুলো মানুষের বেড়ে ওঠার অংশ হয়ে যায়।
কুষ্টিয়া জিলা স্কুল—
শুধু একটি বিদ্যালয়ের নাম নয়;
এটা আমাদের শৈশব, আমাদের বন্ধুত্ব, আমাদের বেড়ে ওঠা—
আর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর হয়ে থাকা একটি অধ্যায়।