01/03/2026
শিকাগোর এক গ্যারেজে বসে ১৪ বছরের এক কিশোরী একমনে কী যেন জোড়াতালি দিচ্ছে।
সাধারণ কিশোরীদের মতো রূপচর্চা বা ভিডিও গেম নিয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই।
তাঁর চোখ বিমানের ইঞ্জিনের দিকে। নাট-বল্টু, অ্যালুমিনিয়ামের পাত ও তারের জঞ্জালের মাঝে বসে সে রীতিমতো এক জাদুকরের মতো কাজ করছে।
দেখতে দেখতে নিজের হাতেই সে আস্ত এক ইঞ্জিনচালিত বিমান বানিয়ে ফেলল!
শুধু বানানোই নয়, ১৬ বছর বয়সে সেই সিঙ্গল-ইঞ্জিন বিমান একাকী আকাশে উড়িয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল।
ভাবছেন, হলিউড মুভির গল্প শোনাচ্ছি? না, এটা বানানো গল্পের প্লট নয়। গল্পটা সাবরিনা গঞ্জালেস পাসটারস্কির বাস্তব জীবনের।
আজ যাঁকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুনিয়ায় বলা হচ্ছে ‘পরবর্তী আইনস্টাইন’। কিন্তু কে এই নারী?
কেন তাঁর নামের পাশে স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনের নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে? কেনই বা তিনি জেফ বেজোসের মতো বিলিয়নিয়ারের চোখ ধাঁধানো চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন?
কিউবান-আমেরিকান পরিবারের সন্তান সাবরিনার জন্ম ১৯৯৩ সালে। ছোটবেলা থেকেই মহাকাশ ও উড়োজাহাজ নিয়ে তার প্রবল আগ্রহ।
মাত্র ৯ বছর বয়স থেকে সে বিমান চালানোর তালিম নিতে শুরু করে।
নিজের হাতে বানানো ‘সেসনা ১৫০’ মডেলের কিট এয়ারক্রাফটটি যখন সে আকাশে ওড়াল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাভিয়েশন ম্যাগাজিনগুলো তাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘অ্যাভিয়েশনের ভবিষ্যৎ’।
কিন্তু সাবরিনার স্বপ্ন শুধু আকাশে ওড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনের নিয়মগুলো জানতে চাইত।
নিজের বানানো বিমানের সেই ভিডিও নিয়ে সে আবেদন করল ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) ভর্তির জন্য। অথচ শুরুতে তাকে রাখা হলো ওয়েটিং লিস্টে।
কিন্তু তার সেই ভিডিও দেখলেন, এমআইটির অধ্যাপকদের চোখ কপালে উঠল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই মেয়ে সাধারণ কেউ নয়।
এমআইটিতে ভর্তির পর সাবরিনা এমন এক ইতিহাস গড়লেন, যা গত কয়েক দশকে কোনো মেয়ে করতে পারেনি।
তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নিখুঁত ৫.০ জিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর পিএইচডির জন্য পাড়ি জমান আরেক বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সাবরিনার মেধা ও বিমান বানানোর জাদুকরী ক্ষমতা খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ল কর্পোরেট দুনিয়ায়। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ব্লু অরিজিনের মালিক জেফ বেজোস তাকে সরাসরি চাকরির প্রস্তাব দেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ছিল প্রায় ১.১ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা!
শুধু জেফ বেজোসই নন, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতো জগদ্বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানও তাকে লুফে নিতে চেয়েছিল।
কিন্তু সাবরিনা সবাইকে বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দেয়। কারণ তার স্বপ্ন কোনো বড় কোম্পানির চাকুরে বা কোটিপতি হওয়া নয়।
তার নজর তখন মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের দিকে। সে বুঝতে পেরেছিল, মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য জানতে হলে তাঁকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গভীরে ডুব দিতে হবে।
কোটি টাকার চেয়ে তাঁর কাছে ব্ল্যাকহোলের রহস্য সমাধান করাটা অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে তো আইজ্যাক নিউটনও অনেক বড় নাম, তাহলে সাবরিনাকে কেন নিউটনের বদলে আইনস্টাইনের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে?
এর কারণ লুকিয়ে আছে সাবরিনার গবেষণার বিষয়ে। নিউটন কাজ করেছিলেন ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে।
সেটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গতিবিধি ব্যাখ্যা করে। যেমন আপেল কেন মাটিতে পড়ে, কিংবা গ্রহরা কেন নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরে, এসব নিয়ে।
কিন্তু আইনস্টাইন কাজ করেছিলেন থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে। এই তত্ত্ব আলোচনা করে মহাকর্ষ, ব্ল্যাকহোল এবং স্থান-কালের মতো মহাবিশ্বের বিশাল বিষয়গুলো নিয়ে।
সাবরিনাও কাজ করছেন ঠিক এই জায়গাতেই।
বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো থিওরি অব এভরিথিং। মানে এমন একটি তত্ত্ব দাঁড় করানো, যা মহাবিশ্বের সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে পারে।
মুশকিল হলো, আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি এবং কোয়ান্টাম মেকানিকস তত্ত্ব আলাদাভাবে একদম নিখুঁত কাজ করলেও, এদেরকে একসঙ্গে মেলাতে গেলেই সব হিসাব উল্টে যায়।
সাবরিনা ঠিক এই দুই ভিন্ন জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি।
সাবরিনা যেহেতু আইনস্টাইনের অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণতা দেওয়ার পথে হাঁটছেন, তাই তাকে পরবর্তী আইনস্টাইন বলাটাই সবচেয়ে যৌক্তিক।
মূল: কাজী আকাশ (বিজ্ঞানচিন্তা)
©️ Enayet Chowdhury