**Error 409: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (অন্তিম পর্ব)**
আমাদের দেশে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়- 'সব জায়গায় ধর্ম টেনে আনবেন না।'
কথাটা আসলে উল্টো। আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র একে একে সব জায়গা থেকে ধর্মকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়েছে। সেক্যুলার রাষ্ট্রের আবির্ভাবের আগে এ জায়গাগুলো ধর্মের ছিল।
তাই সব জায়গায় ধর্ম টেনে আনবেন না কথাটা অনেকটা দখলদার ইস্রায়েলের রেটোরিকের মতো। দেখবেন ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় ইস্রায়েলি আর্মি ও সরকারের বিভিন্ন মুখপাত্র বলছে, 'ইস্রায়েলের নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অধিকার আছে। ইস্রায়েলের অধিকার কাছে নিজেকে রক্ষা করার।' যেন আগ্রাসন চালাচ্ছে ফিলিস্তিনের মুসলিমরা আর নিরীহ, শান্তিকামী ইস্রায়েল কেবল নিজেকে রক্ষা করছে। অথচ বাস্তবতা হলো ইউরোপ থেকে আসা ইহুদীরা ইস্রায়েলের নামে ফিলিস্তিনের মাটি ছিনিয়ে নিয়েছে, দখল করে রেখেছে মুসলিমদের পবিত্র স্থান মাসজিদ আল-আকসা এবং মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে আসছে সাত দশকের বেশি সময় ধরে। এতকিছুর পর মুসলিমরা যখন মসজিদ এবং মাটি ফিরিয়ে নিতে চায়, দখলদারি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে তখন ইস্রায়েল বলে-'ইস্রায়েলের অধিকার কাছে নিজেকে রক্ষা করার!' সব জায়গায় ধর্ম টেনে আনবেন না-কথাটা ইস্রায়েলের এই 'নিজেকে রক্ষা করার অধিকারের' কথার মতো। এমন এক মুখস্থ বুলি যা শব্দের চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে বাস্তবতাকে উল্টে দেয়।
প্রশ্নটা সব জায়গায় ধর্ম আনার না, প্রশ্নটা হলো আপনারা সব জায়গা থেকে ধর্মকে সরাতে চান কেন? আর যদি চান-ই, তাহলে সেটা সরাসরি স্বীকার করেন না কেন?
রাষ্ট্র ও ধর্মকে পৃথক করার এ মতাদর্শের ব্যাপারে মুসলিমদের অবস্থান কী হবে?
কার আইন প্রাধান্য পাবে? কার বিধান মেনে চলা হবে? কার কর্তৃত্বের কাছে আমরা বশ্যতা স্বীকার করব?
সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ কে? আইনপ্রণেতা কে?
বিধানদাতা কে?
এ ব্যাপারে সেক্যুলার দর্শনের অবস্থান পরিষ্কার।অন্যদিকে এ ব্যাপারে কুরআনের অবস্থানও স্পষ্ট।
মুসলিম হিসেবে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত, আমরা কি সেক্যুলার হয়ে সব জায়গা থেকে ধর্মকে সরাতে চাই? কিংবা চিন্তার কোনো বিচিত্র চোরাবালিতে নেমে স্বপ দেখি সেক্যুলারিযমের কাঠামোর ভেতর ইসলাম 'টিকিয়ে রাখার'?
নাকি আমরা পূর্ণাজ্ঞভাবে অনুসরণ করতে চাই ইসলামের?
📖মূল লেখাঃ 'চিন্তাপরাধ' বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
- আসিফ আদনান।
যুগসন্ধি
Recording the present, Reflecting the future
**Error 409: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (পর্ব-৪)**
সেক্যুলারিযম বলে রাষ্ট্র সব ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ অবস্থান নেবে। '𝑹𝒆𝒏𝒅𝒆𝒓 𝒖𝒏𝒕𝒐 𝑪𝒂𝒆𝒔𝒂𝒓 𝒕𝒉𝒆 𝒕𝒉𝒊𝒏𝒈𝒔 𝒕𝒉𝒂𝒕 𝒂𝒓𝒆 𝑪𝒂𝒆𝒔𝒂𝒓'𝒔, 𝒂𝒏𝒅 𝒖𝒏𝒕𝒐 𝑮𝒐𝒅 𝒕𝒉𝒆 𝒕𝒉𝒊𝒏𝒈𝒔 𝒕𝒉𝒂𝒕 𝒂𝒓𝒆 𝑮𝒐𝒅'𝒔'। ব্যক্তি তার মতো করে ধর্ম পালন করবে, আর রাষ্ট্র চলবে রাষ্ট্রের নিয়মে। রাষ্ট্রের কাজে ধর্মের কোনো হস্তক্ষেপ চলবে না। ধর্ম থাকবে চার্চ, সিনাগগ, মসজিদ আর মন্দিরে। ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত জীবনে যা ইচ্ছে সংবিধান মানুক-বাইবেল, তাওরাত, গীতা, কুরআন, কোয়ান্টাম মেথড, স্যাটানিক বাইবেল-কিচ্ছু যায় আসে না। রাষ্ট্রের চোখে সব সমান। কিন্তু শাসন, বিচার, আইন চলবে রাষ্ট্রের সংবিধান দিয়ে। এই সংবিধানই সার্বভৌম। এই মানবরচিত সর্বোচ্চ আইনের ওপর আর কারও কথা চলবে না। হোক সে আল্লাহ, সদাপ্রভু, জিহোভা কিংবা ব্যাফোমেট। এই হলো সেক্যুলারিযম, আর আধুনিক উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র।
কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। সেক্যুলার আইন বানাতে হলেও ভালোমন্দের একটা মাপকাঠি বেছে নিতে হয়। রাষ্ট্রের যেহেতু সমাজ ও মানুষকে নিয়ে কাজ করতে হয় তাই তার প্রয়োজন হয় একটা দর্শন এবং বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিরও। সেক্যুলার রাষ্ট্র কোন নৈতিকতা, মাপকাঠি ও বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে?
বাস্তবতা হলো, যেসব মূল্যবোধ ও প্রাথমিক মূলনীতিলোকে ভিত্তি করে সেক্যুলার আইন গড়ে ওঠে সেগুলো কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক কিংবা ঐতিহাসিক ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত। ইউরোপ যেমন প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের আইন বানানোর ক্ষেত্রে নিজেদের কিছু কিছু ধর্মীয় (খ্রিষ্টধর্ম) মূল্যবোধকে গ্রহণ করেছে। আজও পশ্চিমা বিশ্বের পররাষ্ট্র নীতি, বিশেষ করে মুসলিমবিশ্বের ব্যাপারে তাদের পলিসিগুলোর ওপর খ্রিষ্টীয় প্রভাব স্পষ্ট। পাশাপাশি তাদের সংবিধানগুলো গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী দর্শন এবং এনলাইটেনমেন্টের আদর্শের ওপর। সময়ের সাথে সাথে খ্রিষ্টধর্মীয় মূল্যবোধের প্রভাব কমেছে, বেড়েছে এনলাইটেনমেন্টের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া ভোগবাদ, বস্তুবাদ আর লিবারেলিযমের প্রভাব। উপমহাদেশের দিকে তাকান। বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও সুশীল সমাজ সেক্যুলারিযম ও অসাম্প্রদায়িকতা বলে যা বোঝায় সেটাকে মোটাদাগে কলকাতার হিন্দু এলিটদের অনুকরণ বললে ভুল হবে না।
সেক্যুলার রাষ্ট্র ধর্মগুলোর ওপর তার নিজস্ব সেক্যুলার মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়। সব ধর্মের অধিকার সংরক্ষণের বদলে সেক্যুলারিযম সব ধর্মকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ধর্মের কোনো বিধানের সাথে সেক্যুলার আইন সাংঘর্ষিক হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে সেক্যুলার আইন ধর্মকে বাধ্য করে সেই আইন মেনে নিতে। সেক্যুলারিযমের নিজস্ব হারাম-হালালের কনসেপ্ট আছে। সে আপনার ওপর সেটা চাপিয়ে দেবে। নিজের ধর্মের বিধান আপনি ভাঙতে পারবেন, কিন্তু সেক্যুলার বিধান ভাঙা যাবে না; মানতেই হবে। আপনি মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান যা-ই হন না কেন। যার বেশ অনেকগুলো উদাহরণ আমরা এরই মধ্যে দেখেছি।
আদতে এটা ধর্মনিরপেক্ষতা না; বরং স্বতন্ত্র একটা ধর্মের মতো। যে ধর্মের নাম হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, যে ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ হলো সংবিধান। ব্যাবিলনের নমরুদ আর মিসরের ফিরাউনদের মতো যে ধর্মের দেবতা হলো সেক্যুলার শাসক ও সংসদ।
(চলবে...)
📖মূল লেখাঃ 'চিন্তাপরাধ' বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
- আসিফ আদনান।
**Error 409: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (পর্ব-৩)**
আমরা এরই মধ্যে সেক্যুলার রাষ্ট্রে সব ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবির অসারতার প্রমাণ দেখেছি। এখন দেখা যাক সেক্যুলার রাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের 'স্বাধীনতা' ধর্মগুলোকে দেয়।
স্কুলে কিশোর-কিশোরীদের একসাথে সাঁতার শেখার বাধ্যতামূলক ক্লাসে নিজেদের ১২ ও ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে তুর্কী বংশোদ্ভূত সুইস নাগরিক বাবা-মাকে প্রায় ষোল শ পাউন্ডের মতো জরিমানা করে বসে সুইটযারল্যান্ডের এক স্কুল। দাবি করে, সাঁতার শেখার ক্লাস স্কুল কারিকুলামের অংশ, তাই সন্তানদের এ ধরনের ক্লাসে না পাঠানোর কোনো এখতিয়ার অভিভাবকদের নেই। জবাবে মামলা করে দেন দুই কিশোরীর বাবা-মা। তাদের যুক্তি হলো, পুরুষের উপস্থিতিতে একই সুইমিং পুলে মেয়েদের সাঁতার শেখা ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী বৈধ না, স্কুল তাদেরকে এ ক্ষেত্রে বাধ্য করতে পারে না। এটা তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার অংশ। মামলা নাকচ করে দেয় সুইস আদালত। হাল না ছেড়ে তারা যান ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ হিউম্যান রাইটস (ECHR) এর কাছে। ইউরোপিয়ান কোর্টও রায় দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং সুইস আদালতের পক্ষে। রায়ে বলা হয়, অভিভাবকদের আপত্তি অগ্রহণযোগ্য এবং মুসলিম অভিভাবকরা তাদের কিশোরী মেয়েদের ছেলেদের সাথে একই সাঁতারের ক্লাসে পাঠাতে আইনত বাধ্য। ইউরোপিয়ান আদালতের বিচারকরা স্বীকার করে যে, অভিভাবকদের এভাবে বাধ্য করার কারণে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। তবে আদালতের মতে, হস্তক্ষেপ হলেও এতে ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন হচ্ছে না। ঘটনাটা ২০১৭ এর।
তার কিছুদিন আগে ২০১৬ তে একই রকম মামলায় জার্মান আদালতের রায়ে বলা হয়, মুসলিম কিশোরীরা ছেলেদের সাথে সাঁতারের ক্লাস করতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অব্যাহতি পাবার অধিকার তাদের নেই।
২০১৬ তেই সুইটযারল্যান্ডের এক মুসলিম পরিবারকে প্রায় ৫,০০০ সুইস ফ্রাঙ্ক জরিমানা করা হয়, কারণ তাদের ১৪ ও ১৫ বছর বয়সী দুই ছেলে স্কুলের মহিলা শিক্ষকের সাথে হাত মেলাতে রাজি হয়নি। একই ধারাবাহিকতায় মিউনিসিপ্যাল কমিটির সাক্ষাৎকারে বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে হাত না মেলানোর কারণে ২০১৮ তে এক মুসলিম দম্পতির নাগরিকত্বের আবেদন বাতিল করা হয়।
ইউরোপের ৭টি দেশসহ পৃথিবীর মোট ১৩টি দেশে নিকাব এবং বোরকা নিষিদ্ধ। ২০১১ তে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে নিক্কাবকে অবৈধ ঘোষণা করে ফ্রান্স। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোযি ঘোষণা করে, পর্দা নারীর দাসত্ব ও শোষণের চিহ্ন এবং সেক্যুলার ফ্রান্সে এর কোনো জায়গা নেই। কোনো মহিলা জনসম্মুখে নিক্কাব পরে বের হলে তাকে ১৫০ ইউরো ফাইন করা হবে। অভিভাবক বা স্বামী যদি কোনো নারীকে নিকাব করতে বাধ্য করে, তবে তাকে জরিমানা করা হবে ৩০,০০০ ইউরো।
২০১৪ সালে একজন ফ্রেঞ্চ মুসলিম নারী এ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করেন ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ হিউম্যান রাইটসে (ECHR)। সেই একই যুক্তিতে, এই আইনের কারণে তার ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। কোর্টের রায়ে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়। একই রকম রায় দেয়া হয় বেলজিয়ামের নিকাব নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে করা আরেক মামলায় এবং ২০১৭ তে বেলজিয়ান কোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখে ইউরোপিয়ান কোর্ট। সেক্যুলার কোর্টের সিদ্ধান্তে জানিয়ে দেয়া হয়, নিকাব নিষিদ্ধ করার কারণে ইসলামের বিধানের লঙ্ঘন হচ্ছে না!
২০১৭ এর এক রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে তিন তালাক অসাংবিধানিক এবং অনৈসলামিক! ২০১৮ তে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ১৯৯৫ সালে বাবরি মসজিদ-বিষয়ক একটি মামলার রায় বহাল রাখে যেখানে বলা হয়েছে, 'মসজিদ ইসলাম ধর্মের অপরিহার্য অংশ নয়। মুসলিমরা যেকোনো জায়গায় নামায পড়তে পারে।'
লক্ষ করুন, প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিমরা কোনো আইন ভঙ্গ করেনি। তারা কেবল নিজেদের ধর্মের বিধান মানার চেষ্টা করেছে। সেক্যুলার ইউরোপ, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়া ইউরোপ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, আলাদাভাবে নতুন আইন তৈরি করে কিংবা ফাইন করে মুসলিমদের বাধা দিয়েছে তাদের ধর্ম পালনে। ভারতের ক্ষেত্রে কোনটা ইসলামের অংশ এবং কোনটা না তা নিয়েই ফতোয়াবাজি শুরু করেছে সেক্যুলার সুপ্রিম কোর্ট। এই হলো সেক্যুলারিযমের দেয়া ধর্মীয় স্বাধীনতার বাস্তবতা। যে নারী নিক্কাব করতে চায়, সরকার তাঁকে বাধ্য করে নিকাব খুলতে, শোষণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য! অর্থাৎ ধর্ম কী বলছে সেক্যুলার রাষ্ট্রে সেটা মূল্যহীন, এমনকি যে বিষয় ধর্মের আওতাভুক্ত বলে সেক্যুলাররিযম স্বীকার করে নেয়, সে ক্ষেত্রেও। ধর্মের কতটুকু পালনযোগ্য আর কতটুকু না, সেক্যুলার সংসদ আর আদালত সেটা ঠিক করবে সেক্যুলার সংবিধান অনুযায়ী। ধর্মের সীমানা ঠিক করে দেবে সরকার।
ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বললেও সেক্যুলারযিম আসলে ধর্মকে নিজের অধীনস্থ করে। সেক্যুলার সংবিধানের অধীনে যে ধর্মীয় 'স্বাধীনতা' দেয়া হয় সেটা হলো গোলামকে দেয়া মনিবের স্বাধীনতার মতো। মনিবের মেজাজ-মর্জিমতো এ 'স্বাধীনতা' গায়েব হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়।
(চলবে...)
📖মূল লেখাঃ 'চিন্তাপরাধ' বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
- আসিফ আদনান।
**Error 409: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (পর্ব-২)**
১৮৩৫ সালে ভারতের অমৃতসারের কাদিয়ানে জন্ম হয় মির্যা গোলাম কাদিয়ানির। এ লোক প্রথমে দাবি করে সে ইসলামের একজন মুজাদ্দিদ (সংস্কারক), তারপর দাবি করে সে আল-মাহদী এবং তারপর দাবি করে সে প্রতিশ্রুত মসীহ। শেষমেশ দাবি করে বসে তার কাছে ওহী আসে, সে আল্লাহর প্রেরিত নবী। তবে সে নতুন কোনো শরীয়াহ আনেনি, হারুন আলাইহিস সালাম যেমন মুসা আলাইহিস সালামের অনুগামী নবী ছিলেন তেমনি সেও খাতামুন নাবিয়্যিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীয়াহর অনুগামী নবী। মির্যা গোলামের অনুসারীরা কাদিয়ানি হিসেবে পরিচিত, যদিও তারা নিজেদের 'আহমাদি' বলে দাবি করে। শুরু থেকেই সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা নানাভাবে কাদিয়ানিদের সাহায্য এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে। পরবর্তীকালে এ লিস্টে যুক্ত হয়েছে অ্যামেরিকাও। আজও কাদিয়ানিদের মূল হেডকোয়ার্টার লন্ডনে।
একেবারে শুরু থেকেই কাদিয়ানিদের বিরোধিতা করে আসছেন উপমহাদেশের আলিমগণ। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যানারে কাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন করেছেন বাংলাদেশের আলিমরাও। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ আন্দোলনের মূল দাবি হলো, রাষ্ট্রীয়ভাবে কাদিয়ানিদের কাফির ঘোষণা করা, তাদের প্রকাশনা ও প্রচারণা নিষিদ্ধ করা, কাদিয়ানিদের জন্য ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা (যেমন: কাদিয়ানিদের উপাসনার জায়গাকে 'মসজিদ' না বলে 'উপাসনালয়' বলা)। ২০১৩ তে প্রকাশিত হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার ৬ নম্বর দাবিটিও ছিল কাদিয়ানিদের নিয়ে। দাবিটি ছিল, "সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।"
বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ এবং সুশীলদের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে আলিমদের এ দাবিগুলোর সমালোচনা ও বিরোধিতা করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো, কাদিয়ানিরা যদি নিজেদের মুসলিম মনে করে, তাহলে তাদের আত্মপরিচয় পরিবর্তন করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। এটি সরাসরি মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী এবং বাংলাদেশে সংবিধানের ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান ও স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দমতো ধর্ম পালন ও প্রচারের স্বাধীনতা দেয়। কাজেই এ ধরনের দাবি প্রথমত নির্যাতনমূলক, দ্বিতীয়ত অসাংবিধানিক।
অন্যদিকে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কাদিয়ানিদের মুসলিম হিসেবে মেনে নেয়া একেবারেই অসম্ভব। কাদিয়ানিদের জন্য যেটা ধর্মীয় স্বাধীনতা মুসলিমদের জন্য সেটা জঘন্য ধর্মদ্রোহিতা। কাদিয়ানিদের তাদের সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষিত অধিকার দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র যদি তাদের মুসলিম হিসেবে মেনে নেয়, তাহলে রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, এ যুক্তি কিন্তু কেউ দিলেও দিতে পারে। রাষ্ট্র এখানে যার পক্ষই নিক না কেন, সেটা হবে কারও না কারও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
যতই 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার' বলা হোক না কেন, একটা সেক্যুলার রাষ্ট্রে সত্যিকার অর্থে ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকতে পারে না। সেক্যুলারিযম যা দিতে পারে তা হলো সেক্যুলার সংবিধানের অধীনে, সেক্যুলারিযমের সীমার ভেতরে থেকে কিছু নির্দিষ্ট বিশ্বাস, কথা ও কাজের স্বাধীনতা। ব্যাফোমেট কিংবা কাদিয়ানিদের নিয়ে ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে এ সত্যটা আমাদের দেখিয়ে দেয়।
ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক করার নীতির সমর্থকরা মনে করে, রাষ্ট্রের জন্য সেক্যুলার অবস্থান নেয়াটাই সবচেয়ে ভালো। রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে সমর্থন করবে না আবার কোনো ধর্মকে অস্বীকারও করবে না। রাষ্ট্রের জনগণ নিজেদের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন ধর্ম অনুসরণ করবে এবং নিজ নিজ ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালন করবে। রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র সব ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ অবস্থান নেবে, নিশ্চিত করবে সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা।
কিন্তু বাস্তবতা এ দাবিগুলো সমর্থন করে? এখন দেখা যাক সেক্যুলার রাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের 'স্বাধীনতা' ধর্মগুলোকে দেয়।
(চলবে...)
📖মূল লেখাঃ 'চিন্তাপরাধ' বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
- আসিফ আদনান।
**Error 409: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (পর্ব-১)**
উল্টানো পেন্টাগ্র্যাম খোদাই করা সিংহাসনে বসা মূর্তিটার শরীর মানুষের, মাথা ছাগলের। বাঁকানো দুই শিং, মাঝে জ্বলন্ত মশাল। কাঁধের পেছন থেকে বেরিয়ে আছে এক জোড়া পাখা। পেশিবহুল হাতগুলোর একটা আকাশ আর অন্যটা মাটির দিকে তাক করা। ভাঁজ করা দুপায়ের পাতার জায়গায় পশমি খুর। দুপাশে দাঁড়ানো দুটো শিশু। মুখ তুলে কালো দেবতার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে দুজনেই। নাম তার ব্যাফোমেট।
অ্যামেরিকার ডেট্রয়েট নদীর কাছাকাছি এক পরিত্যক্ত কারখানার ওয়্যারহাউসে মধ্যরাতের ঠিক আগে পর্দা উন্মোচন করা হয় শতাব্দী পুরোনো ব্যাফোমেটের সম্মানে তৈরি নতুন এই ব্যাফোমেট মূর্তির। দিনটি ছিল ২০১৫ এর জুলাইয়ের এক শনিবার। মূর্তিটা বানায় 'স্যাইটানিক টেম্পল' (Satanic Temple, শয়তানি মন্দির) নামের এক সংগঠন। অ্যামেরিকাতে ওরা নিবন্ধিত একটা ধর্ম হিসেবে। নামে শয়তানি মন্দির হলেও এ সংগঠনের লোকজন সরাসরি সত্তা হিসেবে শয়তানের উপাসনা করে না। বিশ্বাসের দিক থেকে ওরা এনলাইটেনমেন্ট হিউম্যানিস্ট, পাক্কা ভোগবাদী। শয়তান তাদের কাছে একটা সিম্বল, একটা 'সাহিত্যিক চরিত্র'। যুক্তি, স্বাধীনতা আর প্রথাবিরোধিতার প্রতীক। ব্যাফোমেট হলো শয়তানের প্রতীক।
শয়তানি মন্দিরের ভাষ্যমতে ব্যাফোমেটের মূর্তি বানানোর উদ্দেশ্য উপাসনা না; বরং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির চর্চা। ২০১২ সালে অ্যামেরিকার ওকলাহোমা রাজ্যের ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের সামনে স্থাপন করা হয় বাইবেলের দশ আজ্ঞা-সংবলিত 'টেন কমান্ডমেন্টস মনুমেন্ট' নামের একটি ভাস্কর্য। শুরু থেকেই এ নিয়ে দেখা দেয় বিতর্ক। অন্য সব ধর্মকে বাদ দিয়ে সেক্যুলার দেশের সরকারি ভবনের সামনে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের ভাস্কর্য স্থাপনকে অনেকেই দেখেন ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির লঙ্ঘন হিসেবে। এ বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালে স্যাইটানিক টেম্পল। খুব সহজ কিন্তু শক্তিশালী এক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তারা তাদের যুক্তি সাজায়-'রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ব্যবহার করে খ্রিষ্টানরা যদি তাদের ধর্মের প্রচারণা চালাতে পারে, তাহলে অন্য ধর্মের লোকেরা কেন পারবে না?'
এ যুক্তি অনুযায়ী শয়তানি মন্দিরের সদস্যরা ব্যাফোমেট মূর্তি নিয়ে হাজির হয় অ্যামেরিকার বিভিন্ন সরকারি ভবনের প্রাঙ্গণে। স্বভাবতই খ্রিষ্টানদের দিক থেকে আসে তীব্র প্রতিবাদ। এসব প্রদর্শনীর সময় অনেককে স্লোগান দিতে শোনা যায়-'শয়তানের কোনো অধিকার নেই!'
একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায় এ ঘটনা আসলে ধর্ম ও আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের সামনে হাজির করে গভীর কিছু প্রশ্ন। সব ধর্ম ও বিশ্বাস পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ না; বরং অনেকগুলোই একে অপরের সাথে সাংঘর্ষিক। যা এক ধর্মের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা সেটা অন্য ধর্মের কাছে ধর্মদ্রোহিতা। যেমনটা ব্যাফোমেট মূর্তির ঘটনা থেকে স্পষ্ট। এমন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে? রাষ্ট্র কি অধিকাংশের পক্ষ নেবে? তাতে কি সংরক্ষিত হবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি? রাষ্ট্র কি স্যাইটানিল টেম্পলের যুক্তি মেনে নেবে? যদি মেনে নেয়, তাহলে কি খ্রিষ্টধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা বলা যায় না যে রাষ্ট্র ধর্মদ্রোহিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে? শয়তানি করার বিশ্বাসকে রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিচ্ছে?
এখন কেউ হয়তো বলতে পারেন যে স্যাইট্যানিক টেম্পলের দাবি গ্রহণযোগ্য না, কারণ তারা সত্যিকার অর্থে কোনো ধর্ম না। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন হবে, 'সতিকার অর্থে' ধর্মের সংজ্ঞা কী? ধর্মের সংজ্ঞা দেয়াটা আসলে কিন্তু অতটা সহজ না। এটাও হয়তো বলা যেতে পারে যে, ব্যাফোমেট মূর্তির ব্যাপারটা আসলে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটা ঘটনা আর ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না। এ ঘটনা থেকে সব সেক্যুলার রাষ্ট্র বা সেক্যুলারিযমের নীতির ব্যাপারে কোনো উপসংহার টানা ঠিক হবে না।
কিন্তু এ রকম আরও উদাহরণ আছে। আমাদের কাছে, আমাদের ঘরেই আছে।
(চলবে...)
📖মূল লেখাঃ 'চিন্তাপরাধ' বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
- আসিফ আদনান।
**আফসোস**
তাঁকে পাঠানো হল সবার শেষে, শেষবারের মত। আর কেউ আসবেন না, প্রয়োজন নেই কোনো সংশোধনীর।
পরিপূর্ণ করে দেয়া হলো সর্ববিষয়ের বিধানমালা, যাতে নেই কোনো সন্দেহের তিলমাত্র অবকাশ। অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক- এককথায় জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে যেকোনো মাত্রার শোষণ থেকে মানবতার মুক্তির বারতা নিয়ে এলেন তিনি। শেষেরও শেষ পর্যন্ত মানবজীবনের এবং সৃষ্টিকুলের সকল সমস্যার সমাধান নিয়ে এলেন তিনি-
- এক অলৌকিক গ্রন্থে (কুরআন),
- ব্যাখ্যা করে খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিলেন এবং সকল বিধানকে পরিপূরণ করলেন স্বীয় বাণীতে (হাদিস),
- নিজে সে অনুযায়ী জীবন কাটিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে, বিধানগুলো মানুষের জন্যই, মানুষের সাধ্যের বাইরে নয় (সুন্নাত)।
তাবলীগে দাওয়াতের বুনিয়াদি কথাই হল- "এক আল্লাহর হুকুম মানো, নবীর তরিকায় চলো, দুনিয়ায় শান্তি, আখিরাতেও শান্তি"। আখিরাতে শান্তি ব্যাপারটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু দুনিয়ার শান্তিও নবীজীর তরিকায়- বিষয়টা 'ব্রিটিশ-ইউরোপীয়-সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থায় বিধৌত-চর্চিত-সজ্জিত' মগজে আত্মস্থ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আরও অনেক ইংরেজি শিক্ষিত তরুণ-যুবাদের মন-মগজ যে ছাঁচে গড়ে উঠেছে তাতে আমরা কল্যাণ-মঙ্গল বলতে ইউরোপীয় জীবনধারাই বুঝি। কেবল আমরাই নই, আমাদের বিগত দুই-তিন পুরুষের একই অবস্থা। মনস্তাত্বিক ক্রুসেডে আমরা পুরোপুরি ধূলিসাৎ। ইউরোপীয় খ্রিষ্টানশক্তি ও তাদের চালক ইহুদি শেঠরা পুরো মুসলিম বিশ্বজুড়ে শাসন করে কয়েক প্রজন্ম 'মনদাস' তৈরি করে ফেলেছে-
- যাদের কাছে আমেরিকা-ইউরোপ মানে জান্নাত,
- তাদের গবেষণা আর মিডিয়া প্রপাগান্ডা মানে ওহি,
- ওদের উলঙ্গপনা মানে সাহসী অভিনয়;
- বাংলা বলতে গিয়ে তোতলালেও IELTS করার জন্য পাগল।
আর ইসলামকে আমরা দেখেছি এবং দেখছি আমাদের সেই ঔপনিবেশিক মনিবদের চশমা দিয়ে। মধ্যযুগীয়, সেকেলে, অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারসর্বসু, ঘুণেধরা, বুড়োদের প্রলাপ, উন্নতির অন্তরায়- এগুলো হিসেবেই তারা চিনিয়েছে ইসলামকে। সামাজিকতার খাতিরে বা কাঁপা কাঁপা বিশ্বাসে কিছু অংশ মানলেও মন পড়ে থাকে ওদের সিলেবাসেই। বিশেষত সুন্নাতের অনুসরণের সময় কখনো আরব সংস্কৃতি, কখনো মোল্লাগিরি-মুন্সিগিরি-হুজুরপনা ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত ও অভিযুক্ত করে সুন্নাতকে করে রাখা হয়েছে অস্পৃশ্য, সামাজিক বয়কটের শিকার। পশ্চিমের ভেসে আসা সুরে গলা মিলিয়ে-
- দীন (প্রায়োগিক জীবনবিধান)-কে বলছি ধর্ম (যা শুধু ধারণ করা হয়),
- ধার্মিককে বলছি ধর্মান্ধ,
- সুন্নাতকে বলছি গোঁড়ামি।
এরকম মানসগঠনে 'সুন্নাতের মধ্যে দুনিয়ায় সফলতা ও শান্তি' শুনে চমকে ওঠাই কি স্বাভাবিক নয়?
ইসলামের প্রয়োগ গত কত প্রজন্ম ধরে আমরা দেখি না?
ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কোন ক্ষেত্রেই ইসলামী সমাধান পৃথিবী চোখে দেখেনি কত বছর?
কিভাবে মেনে নিই যে ইসলামেই আছে মানুষের দুনিয়ার সব সমস্যার সমাধান?
মাটির মূর্তির পূজা না হয় করি না; কিন্তু দোকান, ব্যবসা, চাকরি, ওষুধ, নিজের মন, 'লোকে কি বলবে', স্ত্রী-সন্তান, খ্যাতি, ডিগ্রী, মিডিয়া, আধুনিকতা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ইত্যাদি হাজারো বিমূর্ত মূর্তিকে কত অবলীলায় আল্লাহর পাশে এমনকি বিরুদ্ধে বসিয়ে দিন গুজরান করছি আমরা। হৃদয়মন্দিরের এসব বিমূর্ত মূর্তির বেদীতে বলি দিয়ে দিচ্ছি প্রবল পরাক্রমশালী, কঠোরতম শাস্তিদাতা আল্লাহর কতশত হুকুম-আহকাম।
নবীজীর জীবনের প্রতিটি কাজের দিকে ইংগিত করে আল্লাহ যেন বলছেন, হে মানবজাতি, আমার রাসূলের মতো করে খাও, তাঁর মতো ঘুমাও, এরকম করে শৌচাগারে যাও, এভাবে পাক হও, এভাবে ব্যবসা কর, এভাবে বিবাহ কর, এভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা কর- যেভাবে আমার নবী করেছেন। এতে আমি, তোমার মালিক খুশি, এতে তোমরাও ভালো থাকবে। ভালো থাকবে তোমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় জীবন।
তাই যদি হয় তবে তো সেক্যুলার সমাজ ট্রিলিয়ন ডলারের গবেষণা শেষে যেখানে এসে দাঁড়াবে সেটা তো নবীর সুন্নাত ছাড়া আর কিছুই হওয়ার কথা নয়। কীভাবে হবে? ওরা দুনিয়ার সুখ-সফলতা-আরাম-সুস্থতার পন্থা খুঁজে ফিরছে, সেটা তো ১৪০০ বছর আগেই বানানেওয়ালা তাঁর রাসূলের দ্বারা করিয়ে সফলতার পন্থা জানিয়ে দিয়েছেন। আর আমাদের মত 'মনদাসেরা' নিজের ভান্ডারে রতন ফেলে পরজাতির গবেষণার দিকে চেয়ে দাসত্বের হক পূরণ করছে। আফসোস।
📖মূল লেখাঃ 'কষ্টিপাথর' বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
ড. শামসুল আরেফীন।
**ডিজিটাল ড্রাগ**
“আমি কয়েকশো হেরোইনে আসক্ত মানুষকে নিয়ে কাজ করেছি, আমি বরং বলি যে একজন সত্যিকারের স্ক্রিন-আসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করার চাইতে একজন হেরোইনে আসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করা সহজ।”
কথাটা ড. নিকোলাস কারদারাসের, যিনি বাচ্চাদের স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে লেখা বিখ্যাত “গ্লো কিডস” বইটির লেখক।
দু’শোর বেশি পরীক্ষায় দেখা গেছে অতিরিক্ত স্ক্রিন দেখার কারণে আসক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি (clinical disorder) দেখা যায়। সম্প্রতি ব্রেইন-ইমেজিং রিসার্চে জানা গেছে স্ক্রিন আসক্তি মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্সে কোকেইন বা হেরোইনের মত মাদকদ্রব্যের ন্যায় কাজ করে।
স্টিভ জবস আর বিল গেটস দু’জনই তাদের নিজ নিজ সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতেন। বিল গেইটস তার মেয়েকে ৪৫ মিনিটের বেশি গেইমস খেলার অনুমতি দিতেন না। ১৪ বছর বয়সের আগে তাকে মোবাইল দেয়া হয়নি। স্টিভ জবসের বাসায় বাচ্চাদের আইপ্যাড ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। কেন? কারণ তারা শিশুদের উপর এসবের ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে অন্যান্য বাবা-মার চাইতে বেশি জানতেন।
শিশুদের মস্তিষ্কের নার্ভাস সিস্টেমে নিউরন থেকে নিউরনে সাইনাপ্সের (synapses) মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে যায়। এভাবে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট এক্সপার্ট গেইল গ্রস হাফিংটন পোস্টে লিখেছিলেন, এই নেটওয়ার্কের ফলে সৃষ্ট সংযোগ একটি শিশুর বুদ্ধিবৃত্তি, আচার-আচরণ, কথাবার্তা, হিসেব করার ক্ষমতা এবং সবচেয়ে বেশি তার নিজস্ব জগত সম্পর্কে ধারণা রাখা ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। শিশুরা যদি অন্য কিছু, যেমন বাবা-মার সাথে কথা বলা বা বাইরে খেলাধুলোর মত কাজ কম করে এবং শুধু একটা জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়, তাহলে মস্তিষ্কে অনেক “সংযোগ” সৃষ্টি না-ও হতে পারে। সময়ের সাথে সাথে অব্যবহৃত সংযোগগুলো গাছের ডালের মতো কাটা পড়ে। সাইনাপসের এই কেটে সাফ হওয়ার ঘটনা (synaptic pruning) সবচেয়ে বেশি ঘটে চার বছর বয়সের আগে, যা আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
ভিডিও গেইমগুলোকে যত বেশি সম্ভব আকর্ষণীয় ও আসক্তি-সৃষ্টিকারী করার জন্য গেইম ডেভেলপাররা ডোপামিন ও এডরেনালিন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে পরীক্ষা করে নেয়। স্ক্রিন আসক্তি শিশুদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স (frontal cortex) এর বিকাশকে বাধা দেয়, যা শিশুর সামাজিকীকরণে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
পেন্টাগন আর ইউ.এস নেভির এডিকশন রিসার্চের হেড ড. এন্ড্রু ডোন ভিডিও গেইমসের উপর ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। তিনি বলেন, আজকের গেইমগুলো হলো মাল্টি বিলিওন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি, যা যত বেশি সম্ভব আসক্তি-সৃষ্টিকারী করার জন্য শ্রেষ্ঠ নিওরোসায়েন্টিস্ট আর মনোবিজ্ঞানীদের নিয়োগ দেয়। ভিডিও টেকনোলজি দ্বারা সৃষ্ট নিওরোবায়োলজিক্যাল এফেক্ট সম্পর্কে বোঝাতে তিনি টিভি/মোবাইল/ট্যাব ইত্যাদির স্ক্রিনকে বলেন “ডিজিটাল ফার্মাকিয়া” (ফার্মাসিউটিক্যালের গ্রিক শব্দ ফার্মাকিয়া)।
বর্তমানের ভিডিও গেইমস অত্যন্ত উত্তেজনাকর হয়ে থাকে। এসব গেইমস খেললে শিশুর ডোপামিন ও এড্রেনালিন হরমোনের নিঃসরণ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। গবেষনায় প্রমাণিত হয়েছে যে মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে যে মাত্রায় এই হরমোন নিঃসরণ ঘটে, ভিডিও গেইমসের ক্ষেত্রেও তা একই মাত্রায় ঘটে। এটা কোকেইন বা মরফিনের চাইতেও ক্ষতিকর।
📖সিহিন্তা শরীফা এর লেখা থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)
**পর্দার আড়ালে রঙধনু**
কার্ক-ম্যাডসেনের মতে সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন ও গ্রহনযোগ্যতা তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমের একটি হল মিডিয়া। বিশেষ করে ভিযুয়াল মিডিয়া –
‘সোজা ভাষায়, ভিযুয়াল মিডিয়া, টিভি ও সিনেমা হল ভাবমূর্তি তৈরির ক্ষেত্রে পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালি মাধ্যম। অ্যামেরিকান প্রতিদিন গড়ে সাতঘন্টা টিভি দেখে। এই সাতঘন্টা সময় সাধারন মানুষের চিন্তার জগতে ঢোকার এমন একটি দরজা আমাদের জন্য খুলে রেখেছে যার মধ্য দিয়ে একটা ট্রোজান হর্স ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব...যতো বেশি ও যতো উচ্চস্বরে সম্ভব, সমকাম, সমকামিতা এবং সমকামিদের কথা বলুন। বারবার দেখতে দেখতে থাকলে প্রায় যেকোন কাজই মানুষের কাছে ‘নরমাল' মনে হওয়া শুরু করে...তবে মানুষের সামনে আগেই সমকামি আচরণ উপস্থাপন করা যাবে না – কারন তা মানুষের কাছে জঘন্য বলে মনে হবে এবং মানুষ সমকামিতার বিরুদ্ধে চলে যাবে। তাই সমকামিদের যৌনাচার সাধারন মানুষের সামনে উপস্থাপন করা যাবে না। আগে তাবুর মধ্যে উটের নাক ঢুকাতে দিন, তারপর আস্তে আস্তে বাকিটাও ঢুকানো যাবে।' [Kirk & Madsen. The Overhauling of Straight America]
আর বাস্তবিকই ধীরে ধীরে এই দরজার মধ্য দিয়ে ট্রোজান হর্স ঢুকাতে সমকামি মাফিয়া সমর্থ হয়েছে।
📖মূল লেখাঃ 'অভিশপ্ত রঙধনু' বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
**আত্মজিজ্ঞাসা**
একদিন হঠাৎ ব্যাপারটা খুব ভাবাল আমায়। যেমন ধরেন, জ্ঞান হবার পর থেকে দেখে আসছি ৫ বছরের জন্য একজন দেশের 'রাজা' হয়, পরের ৫ বছরে আবার আরেকজন হয় ভোটে জিতে। ধরে নিয়েছিলাম, এটাই স্বাভাবিক ও শ্রেষ্ঠতম প্রক্রিয়া, যেন এটাই হবার, এটাই হয়, এটা ছাড়া আর কিছু হবার নেই। শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে বিটিভিতে শুরু হতো পূর্ণদৈর্ঘ্য 'বাংলা ছায়াছবি'। অধিকাংশ সিনেমাতেই থাকত একটা আদালতের দৃশ্য। কাঠগড়া, কাঠের হাতুড়ি, অর্ডার অর্ডার... দুজন উকিল ঝগড়াঝাঁটি করে 'অবজেকশন মিলর্ড'। বিচার-সালিশের এই চিত্রটাই যেন চিরন্তন, এটা ছাড়া আর কিছু যেন হতেই পারে না।
ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি-লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে। বড় হতে হতে জানলাম, সবাই স্কুলে পড়ে না, অনেকে মাদরাসায় পড়ে, তারাও অনেক পড়াশোনা করে; কিন্তু তাদের নিজের গাড়িঘোড়া থাকে না। আবার আমরা জীবনের ২০-২৫ সময় ব্যয় করি উচ্চ শিক্ষা অর্জনে। ছোট থেকে শুনে আসছি ভালমতো পড়ালেখা করলে ভাল চাকরি পাওয়া যায়, Life settled, সুখ আর সুখ। বড় হয়ে দেখছি সবাই চাকরি পায় না। আবার যে যেই বিষয়ে পড়ে সেই বিষয়ে চাকরি করে না। যা বেতন পায় তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেকে উপরি আয়ের পথ বেছে নেয়। যখন বুঝতে শিখলাম, দেখলাম বেশিরভাগ কোম্পানির মালিক উচ্চশিক্ষিত না। তাহলে কি মালিক হওয়ার জন্য এই উচ্চ শিক্ষার দরকার নাই? এই উচ্চ শিক্ষা কি শুধু দক্ষ চাকর তৈরী করে? যদিও সবাই অর্ধেক জীবন ব্যয় করেও দক্ষ চাকর হতে পারে না। এটা কি তাহলে নব্য দাস প্রথা?
ভেবে দেখলাম, একটা ছেলে যা পারে, একটা মেয়ে তা পারে না। আবার মেয়েরা যা পারে, ছেলে হয়ে আমি তা পারি না; কিন্তু আমাকে কেউ জোর করে বিশ্বাস করাতে চাইছে: একটা ছেলে যা যা পারে, মেয়েও তা পারে। মীনা কার্টুন ইত্যাদি দিয়ে এই কথাটাকে কেউ কাণ্ডজ্ঞান হিসেবে আমার ভেতর প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
কেজি ক্লাসে ইসলাম শিক্ষা বইয়ে পড়লাম, সালাত পড়তে হয় দিনে ৫ বার। কিন্তু আশেপাশে বেশিরভাগ মানুষই পড়ছে না। আরো বড় হয়ে বুঝলাম 'সালাত না পড়লে কী হবে, আমার ঈমান কিন্তু ঠিকই আছে।' ২৬ বছর বয়সের আগে ধর্মকর্ম নিয়ে ভাবার ফুরসত মেলেনি। অনেকের তো শেষ বেলায়ও মেলে না। কুরআনের অনুবাদ পড়তে গিয়ে দেখলাম, অনেক কিছুই আমার চেনা দুনিয়ার সাথে মিলছে না। দুনিয়ার যে সিস্টেমটার সাথে আমি বড় হয়েছি; যা যা ধ্রুবসত্য হিসেবে জেনে, আধুনিক-ভালো-শ্রেষ্ঠ জেনে, কান্ডজ্ঞান হিসেবে বিনা প্রশ্নে মেনে এসেছি, তার অনেক কিছুর সাথেই কুরআন মিলছে না। কুরআন যা বলছে, তা কেউ মানছে না। পাটিগণিতে সুদকষার অঙ্ক করানোর সময়ই বাবা বলে দিয়েছিলেন 'সুদ কী', 'সুদ ইসলামে হারাম' ইত্যাদি। তাহলে আমি করছি কেন এই অঙ্ক? তাহলে কেন তোমরা ব্যাংকে টাকা রাখছো সবাই? কোনো ক্লাসের বাংলা বইয়ে বেগম রোকেয়ার একটা প্রবন্ধ ছিল: 'পুরুষ যখন পৃথিবী-সূর্যের দূরত্ব মাপে, আমরা নারীরা তখন বালিশের ওয়ারের দৈর্ঘ্য মাপি। শকটের (গাড়ির) এক চাকা ছোট, আরেক চাকা বড় হলে সে শকট চলবে কী করে?'
>> ঠিকই তো, অর্ধেক জনসংখ্যা ঘরে 'পড়ে থাকলে' জাতি কীভাবে উন্নত হবে?
>> ঠিকই তো, ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয় না, বাংলাদেশের স্বাধীনতাই তার প্রমাণ।
>> ঠিকই তো, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।
>> ঠিকই তো, মুদ্রা তো কাগজেরই হয়। আন্তর্জাতিক লেনদেন তো ডলারেই হয়, ডলারেই হতে হয়।
>> ঠিকই তো, কুরআনের যে আইন (হাত কাটা, পাথর ছুড়ে হত্যা, বেত্রাঘাত), এগুলো আজকের যুগে 'চলে না'। 'অচল, বর্বর, অমানবিক'।
>> ঠিকই তো, জীবন তো একটাই। কাল হো না হো।
এরকম বহু 'ঠিকই তো'-রা এসে ভিড় করে কুরআন আর আপনার মাঝে, আল্লাহ আর আপনার মাঝে। কারা কীভাবে কখন এই 'ঠিকই তো'-গুলোকে সেট করে দিলো আমাদের মনে। ২০০১ সালেও সমকামিতাকে আমরা শতভাগ ছেলেই ঘৃণা করতাম আমাদের আবাসিক স্কুলটাতে, কেউ ধরা খেলে পুরো ব্যাচ মিলে ট্রায়ালে তোলা হতো তাকে। আজ ২০ বছরের মাথায় শুনছি অনেকেই একে স্বাভাবিক মনে করছে, পক্ষে ওকালতি করছে, বরং একে খারাপ ভাবাটাই নাকি মানসিক সমস্যা। তার মানে আমাদের 'ঠিকই তো'-র স্কেল বদলায়। গতকাল যা ঠিক, আজ তা ঠিক না। আবার গতকাল যা ঠিক ছিল না, আজ সেটাই ঠিক।
এই যে আমাদের চারপাশে যে সিস্টেমটা আমরা দেখি, সবকিছুই একটা বিশেষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিটা তো চিরটাকাল এমন ছিল না। কোত্থেকে এলো এই বিশেষ অলঙ্ঘ্য পদ্ধতিগুলো, যাদেরকে কোনো প্রশ্ন করা যায় না। যাদেরকে ছাড়া অন্যকিছু কল্পনা করা যায় না। আবার যেমন ধরেন, আমরা যে কাঠামোর ভেতরে চিন্তা করি, ঠিক-বেঠিক হিসেব করি, যা কিছুকে আমরা কাণ্ডজ্ঞান মনে করি; এগুলো এলো কোত্থেকে?
সুতরাং, মানুষের চিন্তার ইতিহাস আমাদের জানতে হবে। কীভাবে মানুষের চিন্তাগুলো বদলে গেল, এটা না জানলে 'আজকের আমাদেরকে' আমরা চিনতে পারব না। আজকে আমাদের চিন্তাগত যে অবস্থান, সেটা প্রাকৃতিক নাকি কৃত্রিম? আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মিত? নাকি অন্য কারো অভিজ্ঞতাকে আমি আমার জন্য ধ্রুব হিসেবে মেনে নিয়েছি, যদিও আমার অভিজ্ঞতাটা ছিল ভিন্ন? আমার চিন্তার ছকটা কি আমাদের বেছে নেওয়া, নাকি কারো চাপিয়ে দেওয়া?
ইউরোপ সেই ১৬শ শতক থেকে পুরো দুনিয়া শাসন করে আসছে, আজও করছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই নেটিভদের আইন-বিচার-অর্থনীতি-শিক্ষাকে তারা নিজেদের সুবিধার্থে সাজিয়ে নিয়েছে, যেকোনো শাসক তাই করবে। নিজস্ব একটা বিশেষ পরিস্থিতির অভিজ্ঞতায় ইউরোপ একটা বিশেষ চিন্তাধারা গ্রহণ করেছে, যাকে তারা নাম দিয়েছে 'সভ্যতা' বা 'আধুনিকতা'। এটাকে একটা স্ব-আরোপিত দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে যে, এই সভ্যতা তাকে পৌঁছে দিতে হবে সারা দুনিয়ায়-সভ্যতার দায় (White Man's Burden)। তাই ইউরোপের নিজস্ব অভিজ্ঞতাপ্রসূত আইডিয়াগুলো উপনিবেশ আমলে আমাদেরকে তারা মেনে নিতে পদ্ধতিগতভাবে বাধ্য করেছে, যদিও তাদের অভিজ্ঞতা আর আমাদের অভিজ্ঞতা এক নয়। সুতরাং,, আমরা চিন্তা-কাঠামোর ক্ষেত্রে ইউরোপের অনুসারী বা উত্তরাধিকারী। ইউরোপের মতো করেই আমরা চিন্তা করি, তাদের মতো করে চিন্তা করাকে আধুনিকতা বা প্রগতি মনে করি, তাদের সমস্যার সমাধানকে নিজের সমস্যারও সমাধান মনে করি।
ইউরোপীয় স্কেলে সবকিছু মাপতে শিখেছি আমরা, আমাদের বাবারা, তাদের বাবারা, কিন্তু কুরআন-হাদিস-ফিকহের ঠিক-বেঠিক, নৈতিকতা, আইন, সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় স্কেলে ঠিক যায় না। তাইলে সমাধানটা আসলে কী?
>> কেউ ইসলামকে ত্যাগ করে (নাস্তিক ইসলামবিদ্বেষী)
>> কেউ ইউরোপীয় খাপে যেটুকু আঁটে সেটুকু রাখার পক্ষে, বাকিটুকু ছেঁটে ফেলার পক্ষে (মডার্নিস্ট রিডাকশনিস্ট মুসলিম)
>> আবার কেউ ইউরোপের মনরক্ষা করে ইসলামকে পুনর্ব্যাখ্যা করার পক্ষে (মডারেট মুসলিম)
প্রথমটি তো ইসলাম থেকেই খারিজ, পরের দুটোও প্রকৃত ইসলাম নয়; বরং ইসলামের অপভ্রংশ। বহু মুসলিম সন্তান ইসলামের চিরন্তন অবস্থান ত্যাগ করে, এই ৩টিতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। তিনটা অবস্থানেরই গোড়া এক জায়গায় : ইউরোপীয় মাপকাঠিকে ধ্রুব মেনে নেওয়া। এজন্য ইউরোপকে চিনলে নিজেকে চেনা যাবে। প্রতিটি মুসলিমের প্রয়োজন ইউরোপকে চেনা, ইউরোপের চিন্তার ইতিহাস জেনে নিজেকে প্রশ্ন করা। ইউরোপ, তুমি কার? আর আমি কার?
📖মূল লেখাঃ ডা. শামসুল আরেফীন-এর “অবাধ্যতার ইতিহাস” বই থেকে নেওয়া (পরিমার্জিত)।
**পশ্চিমা সভ্যতার শেকড় ২.০**
পাশ্চাত্য দুনিয়া যখন আমাদের প্রশ্ন করে, পুরো ইসলামী ইতিহাসে তোমরা নিউটনের মত বিজ্ঞানী দেখাও তো পারলে? এর পাল্টা উত্তরে আমরা ফারাবী, ইবনে হাইসাম এবং ইবনে হাইয়ানদের দেখাতে যাব না। বরং আমরা সুফিয়ান সাওরী, আব্দুল ক্বাদের জ্বিলানীদের মত ব্যক্তিদের দেখাব। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন,তাবে তাবেয়ীন, আয়িম্মায়ে কেরাম সহ সালাফদের পবিত্র জামাতের কাউকে উপস্থাপন করে বলব তোমরা পারলে পাশ্চাত্যের ইতিহাসে এমন কাউকে দেখাও? ইবনে হাইসাম আর ফারাবী আমাদের লোক। তবে বুঝতে হবে, তারা যেই কারণে প্রসিদ্ধ- সেই অঙ্গনটা আমাদের উন্নতির মাপকাঠি না। আমরা অন্য আলোচনায় তাদের প্রসঙ্গ টানতে পারি। তবে এই প্রশ্নের উত্তরে না। কারণ এই প্রশ্ন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠির, এই প্রশ্ন আত্মোউন্নয়নের সিঁড়ির, এই প্রশ্ন সভ্যতার মাপকাঠির।
পাশ্চাত্য এই প্রশ্নটা এজন্যই করে যে, তাদের কাছে বস্তুবাদী উন্নতিই সবকিছু। কিন্তু আমাদের উন্নতি ও শ্রেষ্ঠত্বের ময়দান ভিন্ন। পাশ্চাত্য আর আর ইসলামের কাজের জায়গা আলাদা। এজন্য তাদের এরকম প্রশ্নে ফারাবী আর ইবনে হায়সামদের দেখানোর অর্থ হল, নিজেদের উন্নতির সর্বোচ্চ মাকাম নিয়ে হীনমন্নতায় ভোগা।নিজেদের আত্মোন্নতির সিঁড়িকে তুচ্ছ ভাবা। সর্বোপরি আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা। আমাদের কাছে চির উন্নত ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরামসহ সালাফ ও পূর্বসূরিদের মহান পবিত্র জামাত। আমাদের সভ্যতার প্রথম কথা হল, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক এবং তাকওয়া।
এমন পরাজিত মানসিকতার কারণেই আমাদের শিশু,তরুণ ও যুবকরা সাহাবায়ে কেরামের মত হতে চায় না। সালাফ ও পূর্বসূরিদের জীবন বৃত্তান্ত থেকে অনুপ্রাণিত হয় না। তাঁদের নিয়ে গর্ববোধ করতে পারে না। কারণ তাঁদের চিন্তার কেব্দ্রবিন্দুতে মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম পার্থিব উন্নয়ন ও প্রতিভার কিছু চরিত্র বসবাস করে। আমাদের এমন পরাজিত মানসিকতা প্রজন্মের কেবলা ভুলিয়ে দিচ্ছে। পাশ্চাত্য চরিত্রকে তাদের রঙিন স্বপ্নে পরিণত করছে। আত্মপরিচয় ভোলা এক জাতি!
📖মূল লেখাঃ ইফতেখার সিফাতের “আত্মপরিচয় ভোলা এক জাতি” থেকে নেওয়া ।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Khulna