06/05/2025
গল্প: “নীল শাড়ির সোনালী স্বপ্ন”
(বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে)
তার নাম রেখেছিল মা— শাপলা। তবে এই শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, ধুলোমাখা কারখানার সিঁড়িতে, ঝড়জলের মত ব্যস্ত জীবনে সবাই তাকে শুধু “আপা” বলেই চেনে। ফুলের মত মেয়েটি আজ হারিয়ে গেছে বাস্তবতায়।
গার্মেন্টসে কাজ করে সাত বছর ধরে। সকাল সাতটায় কাজ শুরু, রাত আটটায় ছুটি। মাঝেমধ্যে ওভারটাইম— তখন আরও কিছু বাড়তি টাকা জোটে। মাসে মোটামুটি ১৩-১৪ হাজার টাকা আয়। স্বামী রফিক একজন চায়ের দোকানের কর্মচারী। খুব বেশি আয় না থাকলেও, শাপলা সংসারটা ধরে রেখেছিলো নিজের কাঁধে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, ভাড়া, ওষুধ, বাজার—সব কিছুতেই তারই ভাগ বেশি।
শাপলার একটা স্বপ্ন ছিলো— নিজের একটা ছোট বুটিকস খুলবে। গ্রামের বাড়িতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে মেয়েদের কাপড় সেলাই করাবে। ধীরে ধীরে বড় করবে কাজটা। সেই স্বপ্নের জন্যই গত পাঁচ বছর ধরে, প্রতি মাসে ৪০০০ টাকা করে স্বামী রফিকের হাতে দিয়ে আসছিলো, বলেছিলো—
“তুই একটা ডিপিএস খুল, আমি টাকা দিবো। পাঁচ বছরে ভালো একটা পুঁজি হবে।”
শাপলার বিশ্বাস ছিলো— রফিকের হাতে টাকা নিরাপদ। এত বছর সংসার করেছে, ঝগড়াঝাটি হলেও ভরসাটা ছিলো অটুট।
চার মাস আগে শাপলা আবার মা হয়েছে। নর্মাল ডেলিভারি হয়নি, সিজার করতে হয়েছে। হাসপাতালের খরচ, ওষুধ—সব কিছুই নিজের জমানো টাকায় চালাতে হয়েছে তাকে। ডেলিভারির তিন সপ্তাহ পরেই সে আবার কাজে ফিরে গিয়েছে। মালিক না দিলে চাকরি থাকবে না—এটাই ভয়।
এ মাসেই তার ডিপিএস শেষ হওয়ার কথা। রাতে কাজ থেকে ফিরে এসে স্বামীর পাশে বসে স্বপ্নের কথা বলছিলো—
“তুই বল তো, আমি বুটিকসটা কোথায় খুললে ভালো হবে? টাকাগুলো ব্যাংকে রাখবো, না বোনের সাথে ভাগাভাগি করে শুরু করবো?”
রফিক চুপ। খুব চুপ।
শাপলা হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে, “কী রে, চুপ কেন?”
রফিক একসময় মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলে—
“কোন ডিপিএস খুলি নাই। টাকাগুলো খরচ হয়ে গেছে...”
শাপলার মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো।
সে চোখ বন্ধ করে বোঝার চেষ্টা করলো, এটা কি দুঃস্বপ্ন? তার কষ্টের টাকা? পাঁচ বছর ধরে প্রতিমাসে রাত জেগে সেলাই করে, না খেয়ে টাকা জমিয়ে যেটুকু স্বপ্ন বুনেছিলো, সবকিছু কি মিথ্যা হয়ে গেলো?
সে জানতো রফিক মাঝে মাঝে ধূমপান করে। জানতো বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানে বসে অনেক সময় ‘লটারির’ গল্প করে। কিন্তু বুঝতে পারেনি— সব টাকা জুয়াতে উড়িয়ে দিয়েছে সে।
তার চার মাসের ছেলেটা হঠাৎ কেঁদে উঠলো। শাপলা তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। কিন্তু হাত বাড়াতে পারলো না। বাচ্চার কান্না তাকে স্পর্শ করলো না। এতটা ভার সে আর বইতে পারছে না।
..ভোর হলে শাপলা এক কাপড়ে দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়। রফিক চিৎকার করে বলে,
“তুই কোথায় যাবি শাপলা? সংসার ভেঙে গেলে আমাদের বাচ্চাদের কী হবে?”
শাপলা থামে। কিন্তু ফিরে তাকায় না। কাঁপা কণ্ঠে, কিন্তু দৃঢ়তায় বলে—
“আমি তোকে ছাড়ছি না রফিক। এই সমাজে বাবার নাম ছাড়া সন্তানরা মূল্যহীন। তোর নাম তাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু তোর সঙ্গে আর এক ছাদের নিচে থাকার শক্তি নেই আমার।
তুমি যা খেয়েছো, তা শুধু টাকা না—আমার স্বপ্ন, আমার বিশ্বাস, আমার আত্মা খেয়েছো।
তোমার আমার সম্পর্ক থাকলো, কিন্তু সংসার আর থাকলো না। এবার থেকে আমি আর আমার সন্তানরা আলাদা থাকবো—নিজের মতো করে, নিজের ইজ্জত নিয়ে।”
শাপলা দরজা খুলে বাইরে পা রাখে। এক মুহূর্তের জন্যও পেছনে তাকায় না। আর রফিক... সে দাঁড়িয়ে থাকে দরজার ফাঁকে—এক জীবনের ভুলের সামনে একা, চুপচাপ।😥😥