09/05/2026
মাসআলা : বাণিজ্যিক বীমা কোম্পানিগুলো (যেমন লাইফ ইনশুরেন্স, প্রপার্টি ইনশুরেন্স ইত্যাদি)।
এই ধরনের বীমা কোম্পানিগুলো ইসলামের ইতিহাসে প্রথমে ইসলামের শত্রুদের (যেমন ইউরোপীয় খ্রিস্টান দেশগুলোর) দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে উপনিবেশকালে। পরবর্তীকালে এটি মুসলিম সমাজে ঢুকে পড়েছে শুধুমাত্র ইসলামের শত্রুদের অন্ধ অনুকরণের ফলে। লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ, এতে কোনো শরিয়তভিত্তিক ভিত্তি নেই।
এই কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থার বিস্তারিত চিত্র: এরা বণিক, ব্যবসায়ী এবং রাজধানির মালিকদের (যেমন জাহাজ মালিক, কারখানা মালিক) সাথে চুক্তি করে তাদের ধন-সম্পদ (মালপত্র, জাহাজ, গাড়ি) এবং জীবনকে স্থায়ী জায়গায় বসবাসকালে এবং ভ্রমণকালে (সমুদ্রপথে, সড়কপথে) নিরাপদ রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা বণিকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম (অর্থাৎ নিয়মিত অর্থ) নেয়, হয় মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক হিসাবে।
যদি কোনো ক্ষতি ঘটে (যেমন জাহাজ ডুবে যাওয়া, গাড়ির দুর্ঘটনা, যুদ্ধ বা বিপর্যয়ে মৃত্যু), তাহলে কোম্পানি সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেয়—যত অর্থই হোক না কেন।
কিন্তু যদি কোনো ঘটনাই না ঘটে (যা সাধারণত ঘটে, কারণ ঝুঁকি কম), তাহলে কোম্পানি সেইসব প্রিমিয়াম অর্থ নিজেদের লাভ করে, যা প্রচুর পরিমাণে হয় এবং তাদের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা চালায়।
এদের খাঁটি বাণিজ্যিক প্রকৃতির প্রমাণ: এরা যখন মহাযুদ্ধ (যেমন বিশ্বযুদ্ধ) বা বড় দুর্যোগ (যেমন বন্যা, ভূমিকম্প) ঘটে, তখন যাদের সাথে চুক্তি আছে তাদের থেকে সম্পূর্ণ হাত তুলে নেয়, কোনো ক্ষতিপূরণ দেয় না। কারণ তাতে তাদের দেউলিয়াত্ব হতে পারে এবং মালিকদের জেল-কারাগারে যেতে হতে পারে। এতে স্পষ্ট যে, এরা কোনো নিরাপত্তা প্রদান করে না, শুধু লাভের ব্যবসা করে।
আমাদের যুগের অধিকাংশ আলেমের ফতোয়া: ইমাম আব্দুল আজিজ ইবন বাজ (রাহ.) [ফতাওয়া ইবন বাজ ১৩/৫১-৫২], ইমাম মুহাম্মদ ইবন সালিহ উসাইমিন (রাহ.) [শারহু মুমতি' ১৬/২১৩-২২১], ইমাম মুহাম্মদ আমিন আল-ওয়াদিঈ (রাহ.) [রাওযুল জানাতিন ৪/২৬৩] এবং হায়াতে কারওয়ান (সৌদি আরবের স্থায়ী কমিটি) [ফতোয়া নং ৬১৫৯] সহ অধিকাংশ আলেম এই বীমা কোম্পানি এবং তাদের সাথে লেনদেনকে হারাম ঘোষণা করেছেন নিম্নলিখিত কারণসমূহে:
১) অত্যধিক ঘরর (অজানা ঝুঁকি): এটি ঘররের ফাহিশ (চরম) সম্বলিত চুক্তি। মুবীম (বীমা নেয়া ব্যক্তি) জানে না কত ক্ষতি হবে বা কখন হবে, কোম্পানিও জানে না কত লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন: "নিষিদ্ধ হলো ঘররের বিক্রয়" [বুখারী ২১৪৭; মুসলিম ১৫১৩]।
২) জুয়া ও ময়সীর প্রকার: এতে আর্থিক লেনদেনে ঝুঁকি নেওয়া হয়—ঘরম বিলা জিনায়াত (অন্যায়ভাবে ক্ষতি সহ্য), গনম বিলা মুকাবালাত (বিনা প্রতিদানে লাভ) বা অসমান প্রতিদান। যদি জাহালাত (অজ্ঞতা) প্রবল হয়, তা খাঁটি জুয়া। আল্লাহ বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْمَيْسِرُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ} [সূরা মায়িদা: ৯০]।
৩) রিবা (সুদ): রিবা ফদ্বল (অতিরিক্ত দেয়া) ও রিবা নাসিয়া (বিলম্বে দেয়া)। কোম্পানি যদি প্রিমিয়ামের চেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ দেয়, তা ফজলের রিবা; মেয়াদ কেটে দেয়া হয় তাই নাসিয়া। সমান দিলেও নাসিয়া। নিষেধ: {وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا} [সূরা বাকারা: ২৭৫]; হাদিস: "সকল সুদ হারাম" [মুসলিম ১৫৯৮]।
৪) নিষিদ্ধ রেহান (দাবি বা প্যারি):
বীমায় দুজনেই দাবি রাখে:
মুবীম (যে বীমা নেয়) তার প্রিমিয়াম অর্থ রাখে। কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তুতি রাখে।
যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, মুবীম জিতে কোম্পানির দাবি (প্রস্তুত অর্থ) নেয়।
যদি কিছু না ঘটে, কোম্পানি জিতে—মুবীমের দাবি (প্রিমিয়াম) নেয়।
এটি জুয়ার মতো। শরিয়তে দাবি জায়েয শুধু তিন জিনিসে: খুফ (তীর), নসল (তলোয়ার) বা হাফির (ঘোড়ার খুর)—কারণ এগুলো যুদ্ধের জন্য।
হাদিস: "তিন দাবি জুয়া নয়: খুফের দাবি, তলোয়ারের দাবি ও খুরের দাবি।" [বুখারী ২৮৮৮; মুসলিম ১৭২৮]।
উদাহরণ: দুই বন্ধু বলে, "যদি বৃষ্টি হয় তুই আমাকে ১০০ টাকা দিবি, না হলে আমি তোকে দিব।" এটি হারাম দাবি, বীমা ঠিক তেমনই।
৫) বাতিলভাবে অর্থ খাওয়া: প্রিমিয়াম বিনা প্রতিদানে লাভ। {وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ} [সূরা বাকারা: ১৮৮]। এছাড়া, ইলজাম বিলা ইলজাম, শরিয়তে বাধ্যতামূলক নয় যা বাধ্য করে।
📚ফাতহুল আল্লাম ৫/৫৫১
অনুবাদ ও সংযোজন
আআশরাফুল ইসলাম বিন রেজাউলহক