01/09/2026
❣️❣️ শরতের শিউলি ❣️❣️--পর্ব 1
"আচ্ছা আঁখি তোর বাড়িতে কি একটাও ফ্লাওয়ার ভাস নেই?????একসাথে এতগুলো ফ্লাওয়ার ভাস কিনছিস.....কি ব্যাপার বল তো??????",,,একটা শপিং মলের মধ্যে তিন চারটে মেয়ে একসাথে দাঁড়িয়ে আছে......তারা প্রত্যেকেই সমবয়সী......তার মধ্যে একজন মেয়ের মুখ দেখা যাচ্ছে না.....সে কাউন্টারের দিকে মুখ করে সুন্দর কাঁচের ফ্লাওয়ার ভাস পছন্দ করছিলো......তবে সাইড থেকে মুখের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে.......বেশ বড়ো বড়ো চুল মেয়েটির..... চুলগুলো একটা ছোট্ট ক্লিপ দিয়ে আটকানো আছে..... কিন্তু এতোবড়ো চুলের ভার ওই ছোট্ট ক্লিপ নিতে পারছে না.....তাই চারপাশ থেকে সব বেরিয়ে মুখের ওপরে পড়েছে....... মেয়েটা একটা হলুদ রঙের চুড়িদার পরে আছে এটা বোঝা গেছে.......যে মেয়েটি কাউন্টারে আছে তাকে আরো ভালো কয়েকটা দেখাতে বলেছে........।
"আরে এই আঁখি......আর কতোগুলো কিনবি???দুটো তো কেনা হয়ে গেছে......"
এবারে মেয়েটা পেছনে ঘুরে বন্ধুদের দিকে তাকালো......একুশ বাইশ বছরের ঝকঝকে তরুনী..... তারুন্যে ভরপুর.....চোখ মুখে সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসার ঝলমলে আলো....... আঁখি মেয়েটা দেখতে ভীষন ই মিষ্টি.....পানপাতার মতো মুখের গড়ন..... ছোট্ট কপাল..... সুন্দর করে ভুরু আঁকা......কপালে একটা কালো রঙের টিপ ওর সৌন্দর্য দুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে........."বল কি বলছিস????তোরা কি আমাকে শান্তি করে কেনাকাটা করতেও দিবি না????জানিস আজকে বাড়িতে কতো কাজ!!!!সব দায়িত্ব আমার ওপরেই পড়েছে......."
"কি কাজ সেটাই তো জানতে চাইছি...তুই তো বাড়ি থেকে বেরোনো মাত্রই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছিস......"
আঁখি একটু মিষ্টি করে হেসে চোখ নাচিয়ে বললো......"আজকে সন্ধ্যায় দিদির বয়ফ্রেন্ড আসছে.......হবু বর বলে কথা.....একটু ঘরদোর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে হবে না????তাই মা সেই দায়িত্ব টা আমাকেই দিয়েছে"
"রুহি দির বিয়ের ঠিক হয়ে গেলো???কই কবে????তুই আমাদের বলিসনি তো????"
আঁখি -----"আরে বিয়ের ঠিক হয়নি...... জামাইবাবু থুড়ি অনন্ত দার সাথে দিদির মাস সাতেক ধরেই নাকি প্রেমপর্ব চলছে.....সেটা আমরা কেউই জানতে পারিনি.... সেদিন মা ধরে ফেলেছে......."
"সে কি রে????আন্টি জানতো না রুহি দি প্রেম করছে?????"
আঁখি -----"না.....দিদি তো সবসময় মডেলিং,,ফ্যাশান শো....এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে,,বাড়িতে যেটুকু সময় থাকে বাবার সাথেই কথা বলে....আমার আর মায়ের সাথে দেখা হয় খুব কম...... কয়েকদিন ধরেই শুনছি বাড়িতে নামটা...... কিন্তু আমি তো জানিস কারোর ব্যাপারে নাক গলাই না......মা হঠাৎ ধরে ফেলেছে....শুনেই বললো ঠিক আছে তাহোলে একদিন বাড়িতে নিয়ে আয়..... শুনলাম আজ বিকেলেই আসছে......."
"তুই আগে কখনো তোর দিদির বয়ফ্রেন্ড কে দেখিসনি????"
আঁখি -----"না..... ব্যাপার টা বেশিদিন হয়নি....তাছাড়া দিদি যখন কখনো নিজের থেকে বলতে চায়নি আমি কেন আগ বাড়িয়ে ছবি দেখতে চাইবো????আজকে এলেই আলাপ হবে......"
"কি করে রে????"
আঁখি -----"শুনেছি বিজনেস আছে.....বাড়ির ব্যবসার সাথে যুক্ত......"
"কিসের ব্যবসা????"
আঁখি -----"ডায়মন্ড......"
"ওরে বাবা!!!রুহি দি তো বিশাল জায়গায় হাত দিয়েছে রে.....হিরে ব্যবসায়ী!!!!তার মানে বিয়েতে তোর দিদিকে ওরা পুরো হিরের গয়নায় মুড়ে দেবে...."
আঁখি -----"হিরে দিয়ে মুড়ে দিক,, পান্না দিয়ে মুড়ে দিক..... পৃথিবীতে যত দামী দামী রত্ন আছে সব দিয়ে সাজিয়ে দিক....আমার কি????আমি আনন্দ করবো....প্রচুর সাজবো......এমন সাজবো কেউ যেন আমাকে চিনতে না পারে......"
"এই আমাদের ডাকবি তো????তোর হিরে দিয়ে মোড়া জামাই বাবুকে আমরাও একবার দেখতে চাই...."
আঁখি----"নিশ্চয়ই....তোরা দুদিন আগে থাকতে চলে যাবি.....তবে এখনো পর্যন্ত কিন্তু ডেট ঠিক হয়নি.....হোলে জানাবো....."
"জামাইবাবুর কি নাম বললি????"
আঁখি -----"অনন্ত.....চল এখানে এই তিনটে ভালো পেলাম......ওপরের সেকশনে দেখি যদি আরো দুটো পাই তো নিয়ে নেবো....."
মেয়েগুলো হি হি করে ওপরে চলে গেলো।
আঁখি সেন আর রুহি সেন দুই বোন.....রুহি বড়ো... আঁখি অনেকটা ছোটো......রুহির বয়স এখন ছাব্বিশ...... আর আঁখির একুশ....... রুহির বাবা অবিনাশ সেন কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি করতেন....মা ও স্কুলের শিক্ষিকা......রুহি কলেজ পাশ করার পরে মডেলিং নিয়ে পড়াশোনা করেছে.....ছোটো থেকেই মডেলিং এর প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক ছিলো,,বাবা মা দুজনেই যেহেতু চাকরি করতো.....মেয়ের পছন্দের বিষয় নিয়ে বাধ সাধেননি.......রুহি এখন মডেলিং এ মোটামুটি একটা নাম করেছে এই শহরে...... বিভিন্ন ফ্যাশান শো তে তার ডাক পড়ে.....তবে তার স্বপ্ন অনেক বড়ো.....সে চায় মুম্বাই যেতে...... সেখানে আরো অনেক বেশি সুযোগ....কে জানে এই মডেলিং এর দুনিয়া থেকেই হয়তো একদিন বিনোদন জগতে পা রাখবে....... আঁখি পড়াশোনা বেশি করেনি......ছোটো থেকেই সে একটু চুপচাপ ভীতু টাইপের ছিলো আর মায়ের খুব আদরের....... নিজের কাছের কিছু লোকজন ছাড়া কথা বলতেই চাইতো না..... একবার জ্যোতিষী তার হাত দেখে বলেছিলেন যে আঠারো বছর বয়সের পরে ফাঁড়া আছে.....বাইরে বেরোতে দিলে যেকোনো মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে......এই ফাঁড়া টা দু বছর চলবে......ওর মা চিত্রা খুব ভয় পেতো মেয়েকে নিয়ে..... আঁখি ছোটোবেলায় একটু হাবাগোবা ছিলো..... লোকজন দেখলেই ভয়ে দৌড়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে আসতো......বড়ো হওয়ার পরে সেটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে......তবু ও বাইরের লোকের সাথে চট করে মিশে যেতে পারে না......বেশ সময় লাগে...... উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে কলেজে ভর্তি হয়েছিলো...... একদিন বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যায়......আর বাসটা ওর গোড়ালির ওপর দিয়ে চলে যায়......তবে আর একটু দেরি হলেই একটা লরি মাথার ওপর দিয়ে চলে যেতো.......ওর বাম পায়ের গোড়ালির ওপরটা ভেঙে গেছিলো..... ওখানে পাত ঢুকিয়ে অপারেশন করতে হয়েছে......সেই থেকে চিত্রা এতো ভয় পেয়েছিলো যে ওকে আর কোনোদিন বাইরে যেতে দেয়নি......প্রায় দেড় বছর আঁখি বাড়ি থেকে বেরোয়নি....... পড়াশোনা টাও কমপ্লিট করেনি ......অবিনাশ বলেছিলো বাড়িতে থেকে প্রাইভেটে পড়াটা চালিয়ে যেতে...... কিন্তু আঁখির বিশেষ ইচ্ছে ছিলো না......আর কেউ তাকে জোর করেনি.....তবে তার অনেক গুন আছে.....সে নাচতে পারে,,ভালো গান গাইতে পারে..... দারুন আঁকতে পারে...... রান্নাবান্না করতে পারে.....নিজের জগত আর কিছু বন্ধু এদের নিয়েই আছে......রুহি মাঝে মাঝে কথা শোনায় বোনকে...... আঁখি পাত্তা দেয় না.....দিদি আসলে সবকিছুর মধ্যে থেকেই খুঁত বের করতে চায়........রুহি অপমান করলেও সে দিদিকে কখনো ছোটো করেনি.......নিজের জীবন নিয়ে ভালো থাকতে চেয়েছে......।
ওরা সবাই কথা বলতে বলতে এসকালেটরে উঠছে...... আঁখির হাতে দুটো কাঁচের ফুলদানি আছে.....বাকি একটা বন্ধুর হাতে আছে......ওরা একটু এগিয়ে গেছে......এসকালেটরে আরো একটা ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে উঠে আসছিলো.....সে এতটাই ফোনে ব্যস্ত ছিলো সামনে পেছনে কে আছে দেখেনি...... এতগুলো মেয়েকে দেখে এক্সকিউজ মি বলে পাশ কাটিয়ে দ্রুত বেগে বেরিয়ে যেতে চাইলো..... আঁখি শুনতে পায়নি....তাই সে রাস্তা ছাড়েনি..... ছেলেটা এমন ধাক্কা দিলো আঁখির হাত থেকে কাঁচের ফুলদানি গুলো পড়ে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেলো আর ছেলেটার হাত থেকেও ফোনটা ছিটকে মেঝেতে পড়লো......দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে.....
চলবে.......
কেমন লাগলো প্রথম পর্ব?????