12/07/2026
এক ক্যাডেট মায়ের ডায়েরির পাতা থেকে... 🥀
"মা, এত কষ্ট কেন করো?"
এই প্রশ্নটা আমি জীবনে শতবার শুনেছি।
কেউ জানে না... একজন মায়ের স্বপ্নের দাম কত।
আমার ছেলেটা তখন মাত্র ক্লাস থ্রিতে।
স্কুল থেকে ফিরে একদিন বলেছিল, "মা, আমি বড় হয়ে আর্মি অফিসার হবো।"
সেদিন ওর চোখে যে আগুনটা দেখেছিলাম... সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার স্বপ্ন না হোক, ওর স্বপ্নটা আমি মরতে দেব না।
সেই দিন থেকেই যুদ্ধ শুরু।
যুদ্ধ কারও সঙ্গে নয়... দারিদ্র্যের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে। নিজের ক্লান্ত শরীরের সঙ্গে।
ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠতাম।
সবার জন্য নাস্তা বানাতাম।
ছেলেকে স্কুলে পাঠাতাম।
তারপর মানুষের বাসায় সেলাই... কখনো টিউশন... কখনো নিজের গয়না বন্ধক রেখে কোচিংয়ের ফি দিতাম।
অনেক রাত না খেয়ে ঘুমিয়েছি...
কিন্তু ও যেন কোনোদিন বুঝতে না পারে, সেজন্য মুখে সবসময় হাসিটা রেখে দিতাম।
যখন সবাই ঈদের কেনাকাটা করত...
আমি তখন হিসাব করতাম, এই টাকা দিয়ে একটা নতুন বই কেনা যাবে।
আমার নতুন শাড়ি হয়নি অনেক বছর।
কিন্তু ওর বইয়ের পাতায় কখনো ভাঁজ পড়তে দিইনি।
আত্মীয়রা বলত,
"এত টাকা খরচ করে কী হবে?"
"ক্যাডেট কলেজে সবাই চান্স পায় নাকি?"
"সরকারি স্কুলেই তো ভালো পড়ে।"
আমি শুধু হেসে বলতাম,
"সবাই যদি ভয় পায়, তাহলে স্বপ্ন দেখবে কে?" ..
ভর্তি পরীক্ষার আগের রাত...
ছেলেটা আমার কোলে মাথা রেখে বলেছিল,
"মা, আমি যদি না পারি?"
আমি ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিলাম,
"তুই শুধু চেষ্টা কর বাবা,
বাকি দায়িত্ব আল্লাহর।"
কিন্তু সত্যিটা কী জানো?
সারারাত আমি জায়নামাজে বসে কেঁদেছিলাম।
আমি আল্লাহকে বলেছিলাম,
"হে আল্লাহ...
আমার কষ্টের দাম না দিলে সমস্যা নেই।
কিন্তু এই ছোট্ট মানুষটার স্বপ্নটা ভেঙে দিয়ো না।" ..
রেজাল্টের দিন...
হাত কাঁপছিল।
মোবাইলটা ঠিকমতো ধরতেও পারছিলাম না।
ও পাশ থেকে শুধু একটা চিৎকার...
"মা... আমি পেরেছি! আমার ইনডেক্স নাম্বার এসেছে!"
তারপর কী হয়েছিল জানো?
আমি কাঁদছিলাম...
ও কাঁদছিল...
আমাদের ঘরের দেয়ালও যেন সেদিন কেঁদেছিল।
কারণ...
সেদিন শুধু একটা ছেলে ক্যাডেট কলেজে চান্স পায়নি।
একজন মায়ের বছরের পর বছর না খেয়ে থাকা, হাজারো অপমান, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, অগণিত দোয়া... সবকিছু সেদিন জিতে গিয়েছিল। ..
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি।
যেদিন ছেলেটাকে ক্যাডেট কলেজে রেখে ফিরছিলাম...
গেট থেকে বের হওয়ার আগে একবার পিছনে তাকিয়েছিলাম।
দেখলাম...
আমার ছোট্ট ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে।
ঠোঁটে হাসি।
কিন্তু চোখ দুটো ভিজে।
আমিও হাসছিলাম...
কারণ আমি চাইনি, আমার চোখের জল ওর সাহস কেড়ে নিক। তখন আমার সামনের পথটুকু যেনো ধোঁয়াশা লাগছিল।
বাসটা চলতে শুরু করল।
আমি জানালার পাশে বসে শুধু একটা কথাই বলছিলাম...
"আজ থেকে তুই দেশের ছেলে...
কিন্তু আমার কাছে তুই এখনও সেই ছোট্ট বাচ্চাটা, যে রাতে ঘুমাতে গেলে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখত।"
বাড়িতে ফিরে...
ওর খালি বিছানার পাশে বসে প্রথমবার বুঝলাম...
স্বপ্ন পূরণ হওয়ারও একটা গভীর কষ্ট আছে।
কারণ...
যে স্বপ্নের জন্য এত বছর লড়াই করেছি,
সেই স্বপ্নই আজ আমার ঘরটাকে ভীষণ ফাঁকা করে দিয়েছে।
তবু আমি কাঁদি না।
কারণ প্রতিবার চোখ বন্ধ করলে মনে হয়...
ওই ক্যাডেট ইউনিফর্মের ভেতর শুধু আমার ছেলেটা নয়...
আমার প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি সিজদা, প্রতিটি অপূর্ণ ইচ্ছা, প্রতিটি নির্ঘুম রাত দাঁড়িয়ে আছে।
আজ কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে,
"তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয় কী?"
আমি শুধু একটাই উত্তর দেব...
"আমি একজন ক্যাডেট মা।"
আর এই পরিচয়ের পেছনে আছে এমন হাজারো অশ্রুর গল্প...
যা পৃথিবীর কোনো মেডেল, কোনো সার্টিফিকেট, কোনো সম্মাননা দিয়ে মাপা যায় না।