25/08/2026
জুমা ৪৮, "নবীজি সা. এর নবুওয়াত প্রাপ্তি এবং হিজরত পর্যন্ত জীবনী"
রবিউল আউয়াল মাস চলছে। এ মাসেই পৃথিবী আলোকিত করেছেন হযরত মুহাম্মদ সা.। তার জীবনী নিয়ে ধারাবাহিক বয়ানের আজ তৃতীয় পর্বে "নবীজির নবুওয়াত প্রাপ্তি থেকে শুরু করে হিজরত পর্যন্ত মাক্কী জীবন" আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং নিজে পড়ুন, অন্যকে শেয়ার দিন, সম্ভব হলে খতিবগণ জুমায় আলোচনা করুন। বয়ানটি টেক্সট বা লিখিত আকারেও পড়তে পারেন। আর পিডিএফে পড়তে এবং ডাউনলোড করতে প্রথম কমেন্ট দেখুন -↓
#নবীজি_সা., #মুহাম্মদ_সা., #মাক্কী_জীবন, #সীরাতুন্নাবী, #নবুওয়াত, , #তায়েফ, #বিষয়ভিত্তিক_জুমার_বয়ান, #ইব্রাহীম_কাসেমী_নদভী
লেখক: ইব্রাহীম কাসেমী নদভী, খাগড়াছড়ি: 01609473161
শিরোনাম:
1. নবীজি সা. এর ওহী প্রাপ্তি এবং নবুওয়াতের সূচনা
2. প্রথমে ঈমান আনয়নকারী সাহাবীগণ রা.
3. কোরাইশদের প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত এবং আবু লাহাবের ঔদ্ধত্য
4. কুরাইশদের বিরোধিতা এবং তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব, নবীজি সা. এর উত্তর
5. সাহাবাদের উপর অমানবিক নির্যাতন
6. হাবশায় প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরত এবং হযরত জাফর রা. এর ঐতিহাসিক বক্তব্য
7. হযরত ওমর রা. এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা
8. আবু তালেবের ঘাঁটিতে সামাজিক অবরোধ এবং দুঃখের বছর
9. ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তায়েফ সফর
10. ইসরা ও মিরাজ
11. মদিনাবাসীর সঙ্গে আকাবায় সাক্ষাত ও বাইআত এবং হযরত মুসআব (রা.)-কে মদিনায় প্রেরণ
12. হযরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার পথে ঐতিহাসিক হিজরত
ভূমিকা: গত জুমায় আমরা নবী কারীম সা. এর জন্ম থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তির আগ পর্যন্ত জেনেছি। এ জুমায় আমরা নবীজি সা. এর “মাক্কী জিন্দেগি” অর্থাৎ নবুওয়াত প্রাপ্তি থেকে মদিনায় হিজরত পর্যন্ত মক্কার ১৩টি বছর সম্পর্কে জানবো, ইনশাআল্লাহ। এই ১৩ বছর ছিল ইসলামের সূচনা কাল। এ সময়টিতে নবীজি সা. ইসলামের প্রচার প্রসারের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। অনেক দুঃখ ও দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছেন। যার কিছুটা আমরা সামনের আলোচনার মাধ্যমে জানতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।
(১) নবীজি সা. এর ওহী প্রাপ্তি এবং নবুওয়াতের সূচনা: যখন নবীজি সা. এর বয়স ৪০ বছর পূর্ণ হলো আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাকে নবুওয়াত দান করেন এবং তার প্রতি ওহী প্রেরণ করেন। ‘ওহী’ শব্দের অর্থ হলো গোপনে কোনো সংবাদ বা বার্তা পৌঁছে দেওয়া। আর শরিয়তের পরিভাষায় ওহী বলা হয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর মনোনীত নবী-রাসূলদের কাছে যে বিশেষ পদ্ধতিতে তাঁর বাণী, বিধান ও নির্দেশনা পৌঁছে দেন, তাকে ওহী বলা হয়। ‘রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রতি ওহীর সূচনা কীভাবে শুরু হয়েছিল’ সে সম্পর্কে সহীহ বুখারীর ৩ নং হাদিসে এসেছে: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন: أَوَّلُ مَا بُدِئَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنَ الْوَحْيِ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ فِي النَّوْمِ "রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রতি ওহির সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা ভোরের আলোর মতোই সুস্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হতো। এরপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় করে দেওয়া হলো। তিনি হেরা গুহায় গিয়ে নির্জনে ইবাদত করতেন। পরিবারের কাছে ফিরে আসার আগে কয়েক রাত সেখানে অবস্থান করতেন এবং সেই সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতেন। খাবার শেষ হয়ে গেলে হযরত খাদিজা রা.-এর কাছে ফিরে আসতেন এবং পুনরায় অনুরূপ সময়ের জন্য খাবার নিয়ে হেরা গুহায় চলে যেতেন।
অবশেষে তিনি যখন হেরা গুহায় অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর কাছে সত্যের আগমন হলো। ফেরেশতা (জিব্রাইল) তাঁর কাছে এসে বললেন, اقْرَأْ পড়ুন।” তিনি বললেন, مَا أَنَا بِقَارِئٍ “আমি পড়তে জানি না।” রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ফেরেশতা আমাকে ধরে এমনভাবে চেপে ধরলেন যে আমার অত্যন্ত কষ্ট হলো। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন।” আমি বললাম, “আমি পড়তে জানি না।” তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে ধরে চেপে ধরলেন। এবারও আমার প্রচণ্ড কষ্ট হলো। এরপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন।” আমি বললাম, “আমি পড়তে জানি না।” এরপর তিনি তৃতীয়বার আমাকে ধরে চেপে ধরলেন। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ١ خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ ٢ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ. [العلق ١-٣]
“পড়ুন আপনার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘আলাক’ থেকে। পড়ুন, আর আপনার প্রতিপালক সর্বাধিক সম্মানিত।” এগুলো ছিল সূরা আলাকের প্রথম তিন আয়াত। এরপর রাসূলুল্লাহ সা. সেই ওহি নিয়ে ফিরে এলেন। তাঁর হৃদয় কাঁপছিল। তিনি হযরত খাদিজা রা.-এর কাছে এসে বললেন: زَمِّلُونِي، زَمِّلُونِي “আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।” তাঁরা তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। এভাবে তাঁর ভয় দূর হয়ে গেলে তিনি হযরত খাদিজা রা.-কে পুরো ঘটনা জানিয়ে বললেন: “আমি নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি।” হযরত খাদিজা রা. বললেন:
كَلَّا وَاللَّهِ، مَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا ؛ إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ،
“কখনোই নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অসহায় মানুষের বোঝা বহন করেন, নিঃস্ব ব্যক্তিকে সাহায্য করেন, অতিথির আপ্যায়ন করেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে আসা বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করেন।” এরপর হযরত খাদিজা রা. তাঁকে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফল এর কাছে গেলেন। তিনি জাহেলি যুগেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং ইবরানি ভাষায় কিতাব লিখতে জানতেন। তিনি ইঞ্জিল থেকে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী ইবরানি ভাষায় লিখতেন। তখন তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। হযরত খাদিজা রা. তাঁকে বললেন: “হে আমার চাচাতো ভাই! আপনার ভাইয়ের ছেলের কথা শুনুন।” ওয়ারাকা বললেন: “হে আমার ভাইয়ের ছেলে! তুমি কী দেখেছ?” রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে যা দেখেছিলেন, তার বিস্তারিত ঘটনা জানালেন। তখন ওয়ারাকা বললেন: هَذَا النَّامُوسُ الَّذِي نَزَّلَ اللَّهُ عَلَى مُوسَى، يَا لَيْتَنِي فِيهَا جَذَعًا ، لَيْتَنِي أَكُونُ حَيًّا إِذْ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ “এ তো সেই নামুস (ওহি নিয়ে আসা ফেরেশতা), যাকে আল্লাহ মূসা আ.-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। হায়! আমি যদি তখন যুবক থাকতাম! হায়! তোমার সম্প্রদায় যখন তোমাকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম!” রাসূলুল্লাহ সা. বিস্মিত হয়ে বললেন: أَوَمُخْرِجِيَّ “তারা কি আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা বললেন: “হ্যাঁ। তুমি যে বার্তা নিয়ে এসেছ, এর মতো বার্তা নিয়ে অতীতে যে ব্যক্তিই এসেছে, তার সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। যদি তোমার সেই সময় পর্যন্ত আমি জীবিত থাকি, তাহলে আমি তোমাকে শক্তভাবে সাহায্য করব।” এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন এবং ওহি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারি রা. ওহি সাময়িক বন্ধ থাকার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “আমি একদিন চলছিলাম। হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেই ফেরেশতা, যিনি হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিলেন, তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি আসনের ওপর বসে আছেন। তাঁকে দেখে আমি ভীত হয়ে গেলাম। আমি ফিরে এসে বললাম, ‘আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।’ এরপর আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন: يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ ١ قُمْ فَأَنذِرْ ٢ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ٣ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ٤ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ ٥. [المدثر ١-٥] অর্থ: “হে চাদরাবৃত ব্যক্তি! (১) উঠুন এবং সতর্ক করুন। (২) আর আপনার প্রতিপালকের মহত্ত্ব ঘোষণা করুন। (৩) এবং আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন। (৪) আর অপবিত্রতা (শিরক ও পাপাচার) থেকে দূরে থাকুন। (৫)” (সূরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪:১–৫) এরপর ওহি প্রবলভাবে ও ধারাবাহিকভাবে আসতে লাগল। (সহিহ বুখারি, কিতাবু বাদইল ওহি, হাদিস নং ৩) কবি বলেন,
محمد نے آکر کفر کو مٹایا +++ کفر کو مٹاکر صداقت بتایا،
অর্থ: “মুহাম্মদ এসে কুফরকে মিটিয়ে দিলেন, কুফরকে মিটিয়ে সত্যতা প্রকাশ করলেন।”
নবুওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ সা. এর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তাওহীদ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান। তিনি মানুষকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করতেন এবং শিরক ও পূর্বপুরুষদের ভ্রান্ত রীতি পরিত্যাগ করতে বলতেন। তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতি ছিল হিকমত, উত্তম উপদেশ, নম্রতা ও সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে। ওই সময় শুধু কালেমার দাওয়াত ফরজ ছিল, নামাজ এবং সাদাকা (যাকাত) এর অস্তিত্ব ছিল কিন্তু ফরজ আকারে ছিল না। এগুলো পরবর্তীতে ফরজ হয়।
(২) প্রথমে ঈমান আনয়নকারী সাহাবীগণ রা.: যখন দাওয়াতের নির্দেশ এসে গেছে তখন থেকে নবীজি সা. তার নিকটতম ব্যক্তিদেরকে দাওয়াত দিতে থাকেন। এই সময়ে নারীদের মাঝে সর্বপ্রথম হযরত খাদিজা, বালকদের মাঝে হযরত আলী, স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর, এবং মাওয়ালিদের (দাসদের) মধ্যে সর্বপ্রথম হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা রা. প্রমুখ ঈমান আনেন। হযরত আবু বকর রা. ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তাঁর দাওয়াতে কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন: হযরত উসমান ইবনে আফফান, যুবাইর ইবনে আওয়াম রা., আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা., সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. এবং হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.। তাঁদের পর একে একে বহু সাহাবি ইসলামের ছায়াতলে আসেন।
(৩) কোরাইশদের প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত এবং আবু লাহাবের ঔদ্ধত্য: কিছুটা নীরবে এবং গোপনে ইসলামের দাওয়াতের কাজ চলমান ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, যখন এই আয়াত নাজিল হলো, وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ “আর আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়-স্বজনকে সতর্ক করুন।” (সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:২১৪) তখন নবীজি সা. সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন। এরপর তিনি কুরাইশের বিভিন্ন গোত্রকে ডাকতে লাগলেন: “হে বনু ফিহর! হে বনু আদী!” এভাবে তিনি কুরাইশের বিভিন্ন গোত্রকে ডাকতে থাকলেন। একপর্যায়ে সবাই তাঁর কাছে সমবেত হলো। আর কেউ যদি নিজে আসতে সক্ষম না হতো, সে কী ঘটছে তা জানার জন্য একজন লোককে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়ে দিত। এরপর আবু লাহাব ও কুরাইশের লোকজনও সেখানে উপস্থিত হলো। রাসূলুল্লাহ সা. তাদের জিজ্ঞেস করলেন: أَرَأَيْتَكُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلًا بِالْوَادِي تُرِيدُ أَنْ تُغِيرَ عَلَيْكُمْ، أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِيَّ؟ “তোমরা বলো তো, আমি যদি তোমাদের সংবাদ দিই যে, এই উপত্যকায় একদল অশ্বারোহী বাহিনী রয়েছে, যারা তোমাদের ওপর আক্রমণ করতে চায়, তাহলে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?” তারা বলল: نَعَمْ، مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلَّا صِدْقًا “হ্যাঁ। আমরা তো আপনাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি; বরং আপনার ব্যাপারে সবসময় সত্যবাদিতাই পেয়েছি।” তখন রাসুলুল্লাহ সা. বললেন: فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ “তাহলে জেনে রাখো, আমি তোমাদের সামনে আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ককারী।”এ কথা শুনে আবু লাহাব ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলল: تَبًّا لَكَ سَائِرَ الْيَوْمِ، أَلِهَذَا جَمَعْتَنَا؟ “সারাদিন তোমার ধ্বংস হোক! এই কথার জন্যই কি তুমি আমাদের একত্র করেছ?” তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন: تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ مَا أَغْنَىٰ عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ “আবু লাহাবের উভয় হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোনো কাজে আসেনি।” (সহিহ বুখারি, কিতাবুত তাফসির, সূরা আশ-শু‘আরা-এর তাফসির, ৬/১১১, হাদিস নং ৪৭৭০)
(৪) কুরাইশদের বিরোধিতা এবং তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব, নবীজি সা. এর উত্তর: নবীজি সা. যখন প্রকাশ্য দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন, তখন কুরাইশরা ভাবলেন আমরা যেভাবে মুহাম্মাদ সা. এর বিষয়টা সহজ ভেবেছি বাস্তবে তা সহজ নয়। তার দাওয়াত “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” মক্কায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানে আমাদের কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার শেষ হয়ে যাওয়া এবং আমরা বংশপরম্পরায় যে ধর্ম পালন করে আসছিলাম এবং যে মূর্তি পূজা করে আসছি তা শেষ হয়ে যাবে। তাই তারা নবীজিকে ইসলামের দাওয়াত থেকে বিরত রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দেওয়া শুরু করলো।
মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাযী রহ. বলেন, কুরাইশের অন্যতম নেতা উতবা ইবনে রাবিয়া একদিন কুরাইশের মজলিসে বলল, “আমি কি মুহাম্মদ সা. এর কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলব এবং কিছু প্রস্তাব দেব? হয়তো তিনি সেগুলোর কোনোটি গ্রহণ করবেন। বিনিময়ে আমরা তাঁকে তা দিয়ে দেব এবং তিনি আমাদের থেকে বিরত থাকবেন।” কুরাইশ বলল, “হে আবুল ওয়ালিদ! তুমি যাও এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলো।” উতবা রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে গিয়ে বলল, “হে আমার ভাতিজা! তুমি আমাদের মধ্যে সম্মানিত বংশ ও মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু তুমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছে এমন এক বিষয় নিয়ে এসেছ, যার মাধ্যমে তাদের ঐক্য নষ্ট হয়েছে, তাদের বুদ্ধিকে তুমি নির্বোধ বলেছ, তাদের উপাস্য ও ধর্মের সমালোচনা করেছ এবং তাদের পূর্বপুরুষদেরও অবিশ্বাসী বলেছ। তাই তুমি আমার কথা শোনো। আমি তোমার সামনে কয়েকটি প্রস্তাব রাখছি, তুমি চিন্তা করে দেখো; হয়তো এর কোনোটি তুমি গ্রহণ করবে।” রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, “হে আবুল ওয়ালিদ! বলুন, আমি শুনছি।” উতবা বলল,
إِنْ كُنْتَ إِنَّمَا تُرِيدُ بِهَذَا الْأَمْرِ مَالًا جَمَعْنَا لَكَ مِنْ أَمْوَالِنَا حَتَّى تَكُونَ أَكْثَرَنَا مَالًا، وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ شَرَفًا سَوَّدْنَاكَ عَلَيْنَا، وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ مُلْكًا مَلَّكْنَاكَ عَلَيْنَا...
“তুমি যদি এই দাওয়াতের মাধ্যমে সম্পদ চাও, তাহলে আমরা আমাদের সম্পদ একত্র করে তোমাকে এত সম্পদ দেব যে তুমি আমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্পদশালী হয়ে যাবে। যদি সম্মান ও নেতৃত্ব চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানাব এবং তোমার অনুমতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। আর যদি রাজত্ব চাও, তাহলে তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে দেব। আর যদি তোমার কাছে যে বিষয়টি আসে তা কোনো জিনের প্রভাব হয়, যা তুমি নিজের থেকে দূর করতে পারছ না, তাহলে আমরা তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব এবং এজন্য আমাদের সম্পদ ব্যয় করব।”
উতবা কথা শেষ করলে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, “হে আবুল ওয়ালিদ! আপনার কথা শেষ হয়েছে?” সে বলল, “হ্যাঁ।” রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, “তাহলে এবার আমার কথা শুনুন।” এরপর তিনি সূরা ফুসসিলাতের শুরু থেকে তিলাওয়াত করতে থাকলেন: حم تَنْزِيلٌ مِنَ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا... “হা-মীম। এটি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এটি এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করা হয়েছে, আরবি কুরআনরূপে, সেইসব লোকের জন্য যারা জ্ঞান রাখে।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:১–৩) এভাবে পড়তে পড়তে যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছলেন: فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنْذَرْتُكُمْ صَاعِقَةً مِثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ “অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলুন, ‘আমি তোমাদেরকে সতর্ক করছি এমন এক বজ্রাঘাতের ব্যাপারে, যা আদ ও সামূদের বজ্রাঘাতের অনুরূপ।’’ তখন উতবা রাসুল সা. কে থামানোর জন্য তাঁর মুখে হাত দিয়ে আত্মীয়তার দোহাই দিতে লাগল। রাসূল সা. তিলাওয়াত শেষ করে সিজদার আয়াতে সিজদা করলেন। এরপর বললেন, “হে আবুল ওয়ালিদ! আপনি যা শুনলেন, তা শুনেছেন। এখন আপনার ইচ্ছা।”
উতবা ফিরে কুরাইশের কাছে গেলে তারা বলল, “হে আবুল ওয়ালিদ! কী নিয়ে ফিরলে?” সে বলল, “আমি এমন এক বাণী শুনেছি, আল্লাহর কসম! এর মতো বাণী আমি কখনো শুনিনি। এটি কবিতা নয়, জাদু নয়, গণকের কথাও নয়। হে কুরাইশ! তোমরা আমার কথা মেনে নাও এবং এই ব্যক্তিকে তাঁর কাজ করতে দাও। তাঁকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম, আমি তাঁর মুখে এমন বাণী শুনেছি, যার ভবিষ্যতে বড় প্রভাব পড়বে। আর যদি আরবরা তাঁকে পরাজিত করে, তাহলে তোমরা অন্যদের মাধ্যমে তাঁর ব্যাপারে নিষ্কৃতি পাবে। আর যদি তিনি আরবের ওপর বিজয়ী হন, তাহলে তাঁর রাজত্ব হবে তোমাদের রাজত্ব এবং তাঁর সম্মান হবে তোমাদের সম্মান।” তখন কুরাইশ বলল, “আল্লাহর কসম! তাঁর কথার জাদু তোমাকেও প্রভাবিত করেছে।” উতবা বলল, “এ বিষয়ে এটাই আমার মত। এখন তোমরা যা ইচ্ছা করো।” (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ, باب عرض قريش عليه أشياء من خوارق العادات وغير العادات...।
অভিযোগ নিয়ে আবু তালেবের কাছে কুরাইশরা: সরাসরি নবীকে বলে যখন কাজ হচ্ছিল না, তখন কুরাইশ সর্দাররা চাচা আবু তালেবের কাছে আসলো এবং তাকে বলল, তোমার ভাতিজা মুহাম্মদ সা. যেন দাওয়াতের কাজ থেকে নিভৃত থাক। অতঃপর যখন তিনি নবী সা. কে তাদের আগমনের এবং চাপ দেওয়ার বিষয়টি বললে নবীজি উত্তর দিলেন,
وَاللَّهِ لَوْ وَضَعُوا الشَّمْسَ فِي يَمِينِي، وَالْقَمَرَ فِي يَسَارِي، عَلَى أَنْ أَتْرُكَ هَذَا الْأَمْرَ حَتَّى يُظْهِرَهُ اللَّهُ، أَوْ أَهْلِكَ فِيهِ، مَا تَرَكْتُهُ
অর্থ: “আল্লাহর কসম! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদও রেখে দেয়, এই শর্তে যে আমি এই দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দেব, যতক্ষণ না আল্লাহ এটিকে বিজয়ী করেন অথবা আমি এ পথে মৃত্যুবরণ করি, তবুও আমি তা ছাড়ব না।” নবীজির দৃঢ়তা দেখে আবু তালেব বলেন: اذْهَبْ يَا ابْنَ أَخِي، فَقُلْ مَا أَحْبَبْتَ، فَوَاللَّهِ لَا أُسْلِمُكَ لِشَيْءٍ أَبَدًا অর্থাৎ, “হে আমার ভাতিজা! তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। আল্লাহর কসম, কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি তোমাকে তাদের হাতে তুলে দেব না। (ইবনু হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৬, শিরোনাম: طَلَبُ أَبِي طَالِبٍ إلَى الرَّسُولِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْكَفَّ عَنْ الدَّعْوَةِ وَجَوَابُهُ لَهُ )
(৫) বিভিন্ন সাহাবাদের উপর অমানবিক নির্যাতন: নবুয়াতের পঞ্চম বছর শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই কাফেররা মুসলমানদের উপর নির্যাতন শুরু করে; হযরত বেলাল, সুহাইব, খাববাব, আম্মার বিন ইয়াসির, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ রা. সহ অনেকের উপর নির্যাতন শুরু হয়। আল্লামা ইবনে কায়্যিম রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ “যাদুল মাআদে” লেখেন, নির্যাতিতদের মাঝে হযরত আম্মার বিন ইয়াসির, তাঁর মাতা সুমাইয়া এবং তাঁর পরিবার ছিল। তারা আল্লাহর পথে কঠোর শাস্তি ভোগ করেছেন। যখন মরুর বালু উত্তপ্ত হয়ে উঠত তখন তাদেরকে চিৎ করে শায়িত করে শাস্তি দেয়া হতো। সে অবস্থায় একদিন রাসূলুল্লাহ সা. তাঁদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলেছিলেন- صَبْرًا يا آلَ يَاسِرٍ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الجَنَّةُ ‘‘হে ইয়াসিরের পরিবার ধৈর্য ধারণ করো, তোমাদের ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।’’ তখন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হযরত ইয়াসির ইন্তেকাল করেন! আবু জাহেল হযরত সুমাইয়া (রাঃ) এর লজ্জাস্থানে তীর দিয়ে আঘাত হানলে তৎক্ষণাৎ তিনি শাহাদত বরণ করেন। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। তারা হযরত আম্মারের উপরও শাস্তি কঠোর করে, কখনও তাকে তারা উত্তপ্ত রোদ্রে ফেলে শাস্তি দিত, কখনও ভারি প্রস্তর তার উপরে চাপিয়ে রাখতো, আবার কখনও আগুনে দগ্ধকরে শাস্তি দিত এবং বলতো- ‘যতক্ষণ তুমি মুহাম্মাদ সা. কে গালি না দিবে অথবা ‘‘লাত’’ ও ‘‘উয্যা’’ সম্পর্কে ভালো কথা না বলবে ততক্ষণ আমরা তোমাকে ছাড়বোনা। তিনি বাধ্য হয়েই তাদের কথায় সম্মতি দেন এবং পরবর্তীতে ক্রন্দনরত অবস্থায় ও রাসূল সা. এর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার জন্য উপস্থিত হন। আল্লাহ্ তাআলা তার প্রেক্ষিতে এই আয়াতটি নাযিল করেন- مَن كَفَرَ بِاللَّهِ مِن بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَٰكِن مَّن شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ‘‘যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর যদি আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয়- তাদের উপর পতিত হবে আল্লাহর গযব’’। (সূরা নাহল-২৭:১০৬)
আরো যে সমস্ত সাহাবী কাফেরদের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন হযরত বেলাল (রাঃ) তাদের অন্যতম। তাকে আল্লাহর রাস্তায় কঠিন শাস্তি দেয়া হয়েছে। তিনি ছিলেন উমাইয়া বিন খালফের দাস ছিলেন। উমাইয়া তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করত, উত্তপ্ত রৌদ্রে অভূক্ত অবস্থায় ফেলে রাখত। যখন দ্বি-প্রহরের কঠিন রোদে বালু উত্তপ্ত হয়ে উঠতো তখন তাকে মক্কার মরুভূমিতে নিয়ে যেত, অতঃপর চিৎ করে শুইয়ে তার বক্ষদেশে বিশাল একটি পাথর চাপিয়ে দিত। তখন তিনি বলতেন, আহাদ, আহাদ (আল্লাহ্ এক, আল্লাহ্ এক)। একদা আবু বকর (রাঃ) তাঁর নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন, সে সময় তার শাস্তি হচ্ছিল। তিনি তাকে একটি কৃষ্ণ দাসের বিনিময়ে ক্রয় করেন। মতান্তরে তিনি তাকে পাঁচ উকিয়া (দু’শ দিরহাম) রৌপ্যের বিনিময়ে ক্রয় করে আযাদ করে দিয়েছিলেন। (যাদুল মা‘আদ ফি হাদই খাইরিল ইবাদ, , ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ., তৃতীয় খন্ড, فصل مراتب الجهاد
(৬) হাবশায় প্রথম এবং দ্বিতীয় হিজরত: নবুওয়াতের ৫ম বছরে মুসলিমদের উপর যখন কুরাইশদের নির্যাতন কঠোর থেকে কঠোরতর হতে লাগল এবং তাদেরকে যখন বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি দেয়া শুরু করল, তখন আল্লাহ্ তাআলা তাদের উপর দয়া করলেন এবং মুশরিকদের নির্যাতন হতে মুক্তি দান কল্পে আবিসিনিয়ায় (হাবশায়) হিজরত করার অনুমতি দিলেন। আবিসিনিয়ার বাদশাহ্ নাজাশী ছিলেন একজন ন্যায় পরায়ণ ও দয়ালু বাদশাহ। তাদের দলনেতা ছিলেন উসমান বিন আফ্ফান (রাঃ)। তাঁর সাথে ছিলেন নাবী নন্দিনী হযরত রুকাইয়্যা (রাঃ)। তারা ছিলেন সংখ্যায় ১২জন পুরুষ ও ৪জন মহিলা। তারা গোপনে মক্কা থেকে বের হলেন। লোহিত সাগরের তীরে গিয়ে আল্লাহর তাওফীক মোতাবেক তারা দু’টি নৌকা পেয়ে গেলেন। নৌকার মাঝিরা তাদেরকে উঠিয়ে নিলেন।
এটি ছিল নবুওয়াতের ৫ম সনের রজব মাসের ঘটনা। কুরাইশরা তাদের সন্ধানে বের হয়ে সাগরের তীর পর্যন্ত পৌঁছল। কিন্তু তারা তাদের সন্ধান পেল না। তারা আবিসিনিয়ায় পৌঁছে উত্তমভাবে অবস্থান করতে শুরু করলেন। এদিকে আবিসিনিয়ায় মুহাজিরদের নিকট এই মর্মে খবর পৌঁছে যায় যে, কুরাইশরা মুসলিমদের উপর নির্যাতন বন্ধ করেছে এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। সুতরাং তারা ঐ বছরের শাওয়াল মাসে প্রত্যাবর্তন করেন। যখন তারা মক্কায় এসে পৌঁছেন তখনই আসল তথ্য অবগত হতে সক্ষম হন। তারা জানতে পারেন যে, কুরাইশরা আগের চেয়ে আরও বেশী নির্যাতন চালাচ্ছে। তখন তাদের কেউ কেউ পুনরায় আবিসিনিয়া ফেরত চলে যায় আবার কেউ কেউ গোপনে অথবা কুরাইশদের কারো নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করেন। এরপর কুরাইশের পক্ষ থেকে হাবশায় হিজরত করে ফিরে আসা এবং অন্যান্য মুসলমানদের ওপর নির্যাতন আরও তীব্র হয়ে উঠল। তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাদের দ্বিতীয়বার হাবশার উদ্দেশে হিজরত করার অনুমতি দিলেন। এই হিজরত তাদের জন্য প্রথমবারের চেয়ে আরও কঠিন ও কষ্টকর ছিল। ইবনে ইসহাকের মতে, দ্বিতীয় হিজরতে ৮৩ জন পুরুষ বের হয়েছিলেন। আর নারীদের সংখ্যা ছিল ১৯ জন। ( যাদুল মা‘আদ ফি হাদই খাইরিল ইবাদ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ.৩য়ও খন্ড, فصل: في هجرة المسلمين إلى الحبشة حين اشتد الأذى عليهم )
হযরত জাফর বিন আবু তালেবের নাজাশীর সামনে ঐতিহাসিক বক্তব্য: হাবশা থেকে মুসলমানদেরকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কুরাইশের পক্ষ থেকে আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবিআ নাজাশীর কাছে গিয়ে তাদের ফেরত চান। নাজাশী মুসলিমদের ডেকে তাদের ধর্ম সম্পর্কে জানতে চাইলে হযরত জাফর রা. তাদের পক্ষ থেকে কথা বলেন। এই ঐতিহাসিক বক্তব্যে জাফর রা. প্রথমে জাহেলিয়াতের চিত্র, এরপর ইসলামের আকীদা ও নৈতিকতা, তারপর মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, এবং সর্বশেষ হাবশায় আশ্রয় গ্রহণের কারণ তুলে ধরেন। তিনি নাজাশীকে সম্বোধন করে বলেন:
أَيُّهَا الْمَلِكُ، كُنَّا قَوْمًا أَهْلَ جَاهِلِيَّةٍ، نَعْبُدُ الْأَصْنَامَ، وَنَأْكُلُ الْمَيْتَةَ، وَنَأْتِي الْفَوَاحِشَ، وَنَقْطَعُ الْأَرْحَامَ، وَنُسِيءُ الْجِوَارَ، وَيَأْكُلُ الْقَوِيُّ مِنَّا الضَّعِيفَ.
“হে বাদশাহ! আমরা ছিলাম জাহেলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত এক জাতি। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণীর গোশত খেতাম, অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতাম, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতাম এবং আমাদের শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলকে গ্রাস করত।” এরপর তিনি ইসলামের আগমনের কথা বলেন: فَكُنَّا عَلَى ذَلِكَ حَتَّى بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْنَا رَسُولًا مِنَّا، نَعْرِفُ نَسَبَهُ وَصِدْقَهُ وَأَمَانَتَهُ وَعَفَافَهُ. “আমরা এই অবস্থাতেই ছিলাম। অবশেষে আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল পাঠালেন। আমরা তাঁর বংশপরিচয়, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও পবিত্রতা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলাম।” তিনি আরও বলেন: فَدَعَانَا إِلَى اللَّهِ لِنُوَحِّدَهُ وَنَعْبُدَهُ، وَنَخْلَعَ مَا كُنَّا نَعْبُدُ نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنْ دُونِهِ مِنَ الْحِجَارَةِ وَالْأَوْثَانِ. “তিনি আমাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করলেন, যেন আমরা একমাত্র তাঁরই তাওহিদ ঘোষণা করি ও তাঁর ইবাদত করি এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষেরা যেসব পাথর ও মূর্তির উপাসনা করতাম, তা পরিত্যাগ করি।” এরপর তিনি ইসলামের নৈতিক শিক্ষা তুলে ধরেন:
وَأَمَرَنَا بِصِدْقِ الْحَدِيثِ، وَأَدَاءِ الْأَمَانَةِ، وَصِلَةِ الرَّحِمِ، وَحُسْنِ الْجِوَارِ، وَالْكَفِّ عَنِ الْمَحَارِمِ وَالدِّمَاءِ، وَنَهَانَا عَنِ الْفَوَاحِشِ، وَقَوْلِ الزُّورِ، وَأَكْلِ مَالِ الْيَتِيمِ، وَقَذْفِ الْمُحْصَنَاتِ.
“তিনি আমাদের সত্য কথা বলতে, আমানত আদায় করতে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করতে এবং হারাম কাজ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আমাদের অশ্লীলতা, মিথ্যা কথা, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ এবং সতী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করতে নিষেধ করেছেন।” ......
এরপর হযরত জাফর রা. আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। বক্তব্যের শেষ দিকে নাজাশী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তার কোনো অংশ কি তোমার কাছে আছে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” নাজাশী বললেন, “তাহলে আমাকে পড়ে শোনাও।” তখন তিনি সূরা মারিয়ামের প্রথম অংশ অর্থাৎ كهيعص থেকে তিলাওয়াত করেন এবং হযরত মারিয়াম ও ঈসা আ. এর ঘটনা পাঠ করেন। তা শুনে নাজাশী ও তাঁর ধর্মীয় নেতারা কাঁদতে শুরু করেন। বর্ণনায় এসেছে, নাজাশীর দাড়ি অশ্রুতে ভিজে যায় এবং তাঁর ধর্মীয় নেতাদের হাতে থাকা কিতাবগুলোও অশ্রুতে ভিজে যায়। এরপর নাজাশী বলেন: إِنَّ هَذَا وَالَّذِي جَاءَ بِهِ عِيسَى لَيَخْرُجُ مِنْ مِشْكَاةٍ وَاحِدَةٍ. “নিশ্চয়ই এটি এবং ঈসা যে বাণী নিয়ে এসেছিলেন, উভয়ই একই উৎস থেকে এসেছে।” তারপর তিনি কুরাইশের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে মুসলিমদের ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৬, নাজাশীর কাছে সাহাবাদের বক্তব্যের অধ্যায়। إحْضَارُ النَّجَاشِيِّ الْمُهَاجِرِينَ ، وَسُؤَالُهُ لَهُمْ عَنْ دِينِهِمْ ، وَجَوَابُهُمْ عَنْ ذَلِكَ , সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী (রহ.), খণ্ড ২৬, পৃষ্ঠা ৩৬৪, قِصَّةُ النَّجَاشِيِّ )
(৭) হযরত ওমর রা. এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা: নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছর মক্কার মহান দুই বীর হযরত ওমর ও হামজা রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর ইসলাম আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়। হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণ ছিল নবীজি সা. এর দোয়ার বরকত। হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন: একদিন হযরত উমর রা. তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে বের হলেন। পথে বনু যুহরার এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলল, “হে উমর! কোথায় যাচ্ছ?” তিনি বললেন, “আমি মুহাম্মদ সা. কে হত্যা করতে যাচ্ছি।” লোকটি বলল, “তুমি মুহাম্মদ সা. কে হত্যা করলে বনু হাশিম ও বনু যুহরার লোকদের কাছ থেকে কীভাবে নিরাপদ থাকবে?” এরপর সে বলল, “আমার তো মনে হচ্ছে, তুমিও তাদের ধর্ম গ্রহণ করে ফেলেছ!” লোকটি বলল, “তোমার জন্য এর চেয়েও আশ্চর্যজনক খবর আছে। তোমার ভগ্নিপতি ও তোমার বোনও ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তোমার ধর্ম পরিত্যাগ করেছে।”
এ কথা শুনে উমর রা. সরাসরি তাঁর বোনের বাড়ির দিকে রওনা হলেন। সেখানে তখন খাব্বাব ইবনুল আরাত রা. উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁদের কুরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন। উমরের আগমনের শব্দ শুনে খাব্বাব ঘরের ভেতরে আত্মগোপন করলেন। উমর রা. ঘরে প্রবেশ করে বললেন, “এই যে তোমাদের কীসের ফিসফিসানি শুনছি?” তাঁরা তখন সূরা ত্ব-হা পাঠ করছিলেন। তাঁরা বললেন, “আমরা নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলছিলাম।” উমর রা. বললেন, “সম্ভবত তোমরা দুজনও তোমাদের পূর্বের ধর্ম পরিত্যাগ করেছ?” তাঁর ভগ্নিপতি বললেন, “হে উমর! যদি সত্য তোমার ধর্মের বাইরে কোথাও থাকে, তাহলেও কি তুমি তা গ্রহণ করবে না?” এ কথা শুনে উমর রা. তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং কঠোরভাবে প্রহার করতে লাগলেন। তাঁর বোন স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন। উমর রা. তাঁকেও আঘাত করলেন, ফলে তাঁর মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। তখন তাঁর বোন রাগান্বিত অবস্থায় দৃঢ় কণ্ঠে বললেন: “যদি সত্য তোমার ধর্মের বাইরে কোথাও থেকেও থাকে, তবুও আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল!”
বোনের এই দৃঢ়তা দেখে উমর রা. বললেন, “তোমাদের কাছে যে কিতাবটি রয়েছে, সেটি আমাকে দাও। আমি তা পড়ব।” উমর রা. তখন পড়তে জানতেন। তাঁর বোন বললেন, “তুমি অপবিত্র অবস্থায় আছ। পবিত্র ব্যক্তিরাই এটি স্পর্শ করতে পারে। সুতরাং তুমি আগে গোসল করো অথবা অজু করো।” উমর রা. অজু করলেন। এরপর কিতাবটি নিয়ে সূরা ত্ব-হা পড়তে শুরু করলেন। পড়তে পড়তে যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন: إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي “নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে নামাজ কায়েম করো।” (সূরা ত্ব-হা, আয়াত নং ১৪) এই আয়াত তাঁর হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করল। তিনি বললেন: “আমাকে মুহাম্মদ সা. এর কাছে নিয়ে চলো।” তখন আত্মগোপন করে থাকা খাব্বাব বেরিয়ে এসে বললেন: “হে উমর! তোমার জন্য সুসংবাদ! আমি আশা করি, বৃহস্পতিবার রাতে রাসূলুল্লাহ সা. যে দোয়া করেছিলেন, তুমি-ই তার ফল। তিনি দোয়া করেছিলেন: ‘হে আল্লাহ! উমর ইবনুল খাত্তাব অথবা আমর ইবনু হিশামের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করো।’ সে সময় রাসূলুল্লাহ সা. সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি বাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন। উমর রা. সেখানে পৌঁছলেন। বাড়ির দরজায় ছিলেন হযরত হামজা রা. হযরত তালহা রা. এবং আরও কয়েকজন সাহাবি। হযরত হামজা রা. বললেন: “এ তো উমর! আল্লাহ যদি তার কল্যাণ চান, তাহলে সে ইসলাম গ্রহণ করবে। আর যদি অন্য কিছু চান, তাহলে তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য কঠিন হবে না।”
এদিকে রাসূলুল্লাহ সা. ঘরের ভেতরে ছিলেন এবং তাঁর ওপর ওহি নাজিল হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর তিনি বাইরে এসে উমর রা. এর কাছে গেলেন। তিনি উমরের জামার সামনের অংশ ও তরবারির ফিতা শক্ত করে ধরে বললেন: “হে উমর! তুমি কি থামবে না? যতক্ষণ না আল্লাহ তোমার ওপরও সেই লাঞ্ছনা ও শাস্তি অবতীর্ণ করেন, যা তিনি ওয়ালিদ ইবনুল মুগীরার ওপর অবতীর্ণ করেছিলেন?” এরপর রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: هَذَا عُمَرُ، اللَّهُمَّ أَعِزَّ الْإِسْلَامَ بِعُمَرَ “এই তো উমর! হে আল্লাহ, উমরের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী ও মর্যাদাবান করুন।” তখন হযরত উমর রা. বললেন: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنَّكَ عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।” (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী (রহ.), খণ্ড ২৬, পৃষ্ঠা ১৩৮, إِسْلَامُ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ )
(৮) আবু তালেব এর ঘাঁটিতে সামাজিক অবরোধ: ইবনু ইসহাক (রহ.) বলেন: “কুরাইশ যখন দেখল, রাসূলুল্লাহ সা. এর সাহাবিগণ এমন একটি দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে তারা নিরাপদে ও স্বস্তিতে বসবাস করতে পারছেন; আর নাজাশীও তাঁদের মধ্যে যারা তাঁর কাছে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছেন; উপরন্তু উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তিনি ও হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রা.) রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে রয়েছেন; আর বিভিন্ন গোত্রে ইসলামের প্রসার ঘটতে শুরু করেছে, তখন কুরাইশের লোকেরা একত্রিত হ