24/03/2023
টাকা
মোহীত উল আলম
খুকুকে কালকে টেলিফোন করল হারুণ। হারুণ হলো কাজীর দেউড়ির কাঁচা বাজারের একজন মুরগি বিক্রেতা। ওকে আমরা ওর ছোটবেলা থেকে চিনি। ছোটবেলা থেকে খুব কষ্ট করে ওর এই ব্যবসাটা দাঁড় করিয়েছে। ওর থেকেই আমরা মাসিক হিসাবে মুরগি কিনে রাখি। তো খুকু অবাক হয়ে বলল, গত সপ্তাহে না তোমার থেকে মুরগি নিলাম। হারুণ অকপটে বলল, তাতো নিয়েছেন, মামী, ভাবলাম আগামীকাল থেকে রোজা শুরু, মুরগি আরও লাগবে কিনা। খুকু বলল, আমরা মোয়াফ নাকি যে এত মুরগি খাব। মোয়াফ হলো চট্টগ্রামের ভাষায় মুরগি খেকো শিয়াল এবং বনবিড়ালকে বোঝায়।
খুকু আমাকে সংলাপটা রিপোর্ট করার পর আমি বললাম, রোজা ঢুকছেতো তাই মলকন্ডো কালচারটার শুরু হয়েছে। “মলকন্ডো কালচার” বা Mallcondo Culture ফ্রেইজটা আমি নতুন শিখেছি ইংরেজিতে অধ্যাপক জেইমস বি টুইচেলের “Two Cheers for Materialism”-এর ওপর একটি রম্যরচনা পড়তে গিয়ে। আমাদের দেশে আজকে (২৪/৩/২৩) থেকে রোজা শুরু হয়েছে। তার অর্থ ঈদের জন্য কেনাকাটার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত (সাধ্যানুযায়ী), এবং নিম্নবিত্ত (আরও সাধ্যানুযায়ী) কেনাকাটা শুরু করবে, যাবে বড়-মাঝারি-ছোট মলে, ফলে মল-সংস্কৃতি গতি পাবে, আর সাথে লম্বা হবে বাজারের ফর্দ।
১৯৯৯ সালে রচিত এই রচনায় টুইচেল বলছেন যে মানুষ খরচ করতে ভালোবাসে। আমাদের প্রবচনে আছে ঋণ করে ঘি খাওয়া জায়েজ। টুইচেল আমেরিকার একটি হিসাব দিচ্ছেন যে সেখানে সব ধরনের ঋণের কিস্তির পরিশোধের হার ৯৫.৫%, অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯৫জন তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করে থাকেন। আমাদের দেশের হিসাবটা এই মুহূর্তে আমার জানা নেই, কিন্তু পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে প্রায় জানতে পারি যে ঋণ অনাদায়ে অমুক শিল্প প্রতিষ্ঠান বা অমুক ব্যক্তি দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে হয় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, নচেৎ গারদখানায় আছেন। সম্ভবত ঋণের টাকা পরিশোধের হিসাব আমাদের দেশে খুব সুবিধার নয়। একজন ব্যাংকার বন্ধু আমাকে একবার বলেছিলেন যে অমুক শিল্পপতি আগে আমার ব্যাংকে এসে হত্যা দিয়ে পড়ে থাকত ঋণ অনুমোদনের জন্য, আর এখন উনার বাসায় আমাকে প্রতি সকালে যেতে হয় গৃহীত ঋণের টাকার কিস্তি যাতে ঠিক সময়ে পরিশোধ করেন তার তদ্বির করতে।
টুইচেল সাহেব ব্যঙ্গ করে বলছেন, টাকা সুখ কিনতে পারে না, মানলাম, কিন্তু একটু টাকা বেশি থাকলে একটু সুখ কি বেশি করা যায় না! টুইচেল সাহেবের সঙ্গে আমি একমত। এটা অবশ্য সত্য যে কোন কারণে যদি ব্যক্তিগত জীবনে কেউ প্রেমে বা আকাঙ্খায় বা স্বাস্থ্যে ঠকা খায়, জীবন যখন তার কাছে বিষময় হয়ে ওঠে, মৃত্যুই জীবনের চেয়ে অধিকতর কাম্য মনে হয়, সে লোকের কাছে টাকা অর্থহীন, কিন্তু ব্যক্তি বাদে পারিবারিক এবং সামাজিক অর্থে টাকা অর্থহীন নয়। টাকা উপোযোগ ভোগ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। সে জন্য টাকা আসুক, সেটা সবাই চায়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকেই হারুণের খুকুকে ফোন করা। এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমার মধ্যে এই চিন্তা ঢুকল যে হারুণ যখন বলছেই, তাহলে মুরগির বাইরে একটা টার্কি এবং দুটো হাঁসের বায়না দিই না কেন?
তা হলে এবার ড্রামাটা খেয়াল করুন। রোজার মাস হচ্ছে সংযমের মাস। সৃষ্টিকর্তাকে অবিরামভাবে স্মরণ করার মাস, কিন্তু এই রোজার মাসেই হারুণের ভূমিকাকে যদি একটি প্রেক্ষাপটে ফেলি, তাহলে তার ভূমিকা হচ্ছে এ্যাজেন্ট প্রভোকেট্যুর বা উস্কানিদাতা, অর্থাৎ সে তার ব্যবসার আয় বৃদ্ধির জন্য তার মুরগির গ্রাহকদের প্ররোচিত করার চেষ্টা করছে তাদের প্রয়োজন না থাকলেও যেন প্রয়োজনের বাইরে মুরগি সংগ্রহ করে রাখে। অর্থাৎ ধর্মীয় একটি আবহের মধ্যে কেমন করে একটি পার্থিব জগতের বিষয় ঢুকে গেল। আর শেক্সপিয়ারেরি রাজা লিয়ারতো বলেছেনই “প্রয়োজন নিয়ে তর্ক করো না।” আসলেইতো প্রয়োজন একটি আপেক্ষিক ব্যাপার।
হারুণের মতো অসংখ্য হারুণ সমাজের সব জায়গায় আছে। গত শুক্রবারে (১৭/৩/২৩) আমি কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার একটি মসজিদে ঢুকি জুমার জামায়াত আদায় করার জন্য। মসজিদটিতে পর্যটকের কারণে অসম্ভব ভিড়। কিন্তু ঈমাম সাহেব মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসার দ্বিতল বা ত্রিতল করার জন্য বারবার মাইকের মধ্যে নামাজ শুরুর আগে প্রচার করতে লাগলেন যে ৩০০ বস্তা সিমেন্ট লাগবে, প্রতি বস্তার দাম ৫৫০০ (সাড়ে পাঁচ হাজার) টাকা, কে দেবেন, কে দেবেন, কারা দেবেন,কারা দেবেন বলে এমন জজবা করতে লাগলেন যে আমার মনে হচ্ছিলো মসজিদে আসিনি, যেন একটি নিলামের ডাকে এসেছি। আবার বললেন, জনৈক ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ১০০ বস্তা কমিট করেছেন, এর পরক্ষণেই বললেন, জনৈক ব্যবসায়ী বাকি ২০০ বস্তা কমিট করেছেন। এরপরের ড্রামার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি কাকে যেন জিজ্ঞেস করলেন, যেটা মাইকে শোনা যাচ্ছিলো, হ্যাঁ, আরও ৩০০ বস্তা লাগবে, মোট ৬০০ বস্তা? তা হলে, মুসল্লী ভাইয়েরা আরও ৩০০ বস্তার টাকা তুলতে হবে।
যদিও এটাই বাস্তব, মানুষ চিরদিনই ধর্মীয় অনুভূতিকে কব্জা করেছে বৈষয়িক লাভ সাধনের জন্য, কিন্তু সেদিন নামাজ ও জামাত আদায় করতে সত্যি আমার মন প্রচুর খারাপ হয়ে গেছিল।
তাহলে সে পুরোনো কথাটাই বলি, মানুষ মুখে আদর্শ বা ধর্মের কথা বলে, কিন্তু কাজ করে বৈষয়িক জীবনের আজ্ঞা মেনে।
গত পরশু (২২/৩/২৩) আমাদের কলাভবনে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একজন মাঠকর্মী এলেন রোজার প্রাক্কালে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রসঙ্গে শিক্ষকদের মতামত নিতে। আমার একজন মহিলা সহকর্মীকে বলতে শুনলাম ছোলা, ডাল, তেল, মরিচ ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম গত বছরের রোজার প্রাক্কালে যা ছিল তার চেয়ে ৩৮% পারসেন্ট বেড়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার বুঝতে বাজারের ব্যাগের সাইজই যথেষ্ট। আগে যে টাকা দিয়ে যে পরিমাণ বাজারের থলে বাসায় ঢুকত, এখন সে পরিমাণ টাকা দিয়ে ঢুকছে আরও অনেক কম থলে।
তা হলে দেখা যায় রোজার মাসে ঈদ উপলক্ষে পরিবার পরিবারে একটা অতিরিক্ত অর্থের চাপের সৃষ্টি হয়। সীমিত আয়ের ভোক্তাদের হয় হাঁসফাঁস অবস্থা, আর নিম্নবিত্তদের কথা ভাবতে সত্যি ভয়ই লাগে।
ধনী আর গরিবের মধ্যে বিভাজনটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় এই রোজার মাসেই। একদিকে মলকন্ডো কালচারের স্ফীতি অন্যদিকে ভিক্ষুকের বাড়ানো হাত—অর্থাৎ, সমাজের চিত্রটি সেই দ্বিভাঁজকৃত চিত্র যেখান থেকে পরিত্রাণ পাবার আশু কোন পথ দেখছি না।
টাকা উপার্জন করার পথ যেমন দুটি—হালাল পথে, এবং হারাম পথে, টাকা ব্যয়েরও পথ দুটি—ভালো কাজে এবং খারাপ কাজে। “যাকাত”-এর যে সামাজিক ব্যবহার আছে, এটি হলো ভালো কাজে টাকা ব্যয় করার একটি পন্থা, আর যাকাৎ ছাড়াও রোজার মাসে চাকুরিজীবীরা বোনাস-টোনাস পেয়ে একটু সচ্ছ্বলতার মুখ দেখলে তার থেকে গরিব আত্মীয়-স্বজন, গরিব দু:খি মানুষকে দান করতেই পারে। কী জানি কী রহস্য কাজ করে, কিন্তু দেখা যায় যৌক্তিকতার মধ্যে দান-খয়রাত করলে মানুষ গরিব হয় না।
টাকা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত দর্শন হলো, টাকা উপার্জন কখনো জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না। আমি প্রায় বলি, ডৌন্ট চেইজ মানি, লেট মানি চেইজ ইউ। আসলে মানুষের যেটি সম্বল সেটি হলো তার উদ্যমী ও কল্পনাশক্তি। অবশ্য অবস্থাগত কারণে যথেষ্ট উদ্যম থাকলেও পারিপার্শ্বিক প্রতিকূল অবস্থার কারণে বহু মানুষ তাদের উদ্যমী শক্তি হারিয়ে ফেলে। আবার সকলরকম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও ব্যক্তিমানুষ তার উদ্যমীশক্তি ও কল্পনাশক্তি দিয়ে সমাজে মানবকল্যাণে অবদান রাখতে পারে তারও নজীর কম নেই, বিদেশেতো বটেই, আমাদের এখানেও। আবার প্রচুর উদ্যমী ও কল্পনাশক্তিসম্পন্ন মানুষের নামে শয়তানও কম সৃষ্টি হয় না। কথাটা হলো, টাকার সঙ্গে যে অর্ন্তগতভাবে নৈতিকতার সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই এটাই তার প্রমাণ যে সমাজে টাকাওয়ালা ভালো মানুষও আছে, আবার টাকাওয়ালা খারাপ মানুষও আছে।
কার্ল মার্কস তাঁর কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো-র এক জায়গায় লিখছেন যে সামন্তবাদী অর্থনীতি থেকে পশ্চিমা বিশ্ব যখন পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে প্রবেশ করল তখন একটি বিরাট ধ্বস নামল মানবিক মূল্যবোধে—সেটি হলো মানুষে মানুষে আগে যে সম্পর্ক ছিল, ওপর থেকে নীচে, ওপরকে মান্য করা আর নীচেকে আশ্রয় দেয়া, অর্থাৎ হৃদয়বৃত্তিক যে সম্পর্ক ছিল সেখানে জায়গা নিল সম্পর্ককে টাকা দিয়ে তুল্যমূল্য করা। ফলে ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবসের ধারণানুযায়ী মানুষ মানুষকে সংহারে নামল। মাৎস্যান্যায় তৈরি হলো।
একটি রাজনৈতিক সমাজে কিন্তু টাকার সর্ববিধ ব্যবহার নিশ্চিত হয় রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত অর্থনৈতিক নীতিগুলো দ্বারা।
বড় বড় অর্থনীতিবিদেরা এই নিশ্চয়তা দিতে চাইছেন যে বাংলাদেশে টাকা সংক্রান্ত বর্তমানে বা নিকট ভবিষ্যতে সংকট দেখা দেবে না। আমরা এটা নিয়ে আশাবাদী থাকতে চাই।
তবে আপাতত মলকন্ডো সংস্কৃতি কী আগ্রাসী রূপ লাভ করে সেটি দেখতে আগ্রহ হচ্ছে।
আর একটা অনুরোধ রইল, আপনারা রোজা এবং ঈদের জন্য মুরগি কাজীর দেউড়ির কাঁচা বাজারের হারুণ থেকে কিনতে পারেন। সুলভ মূল্যে ভালো মুরগি দেয় সে।
=শেষ=
২৪/৩/২৩