30/12/2025
🔍 অষ্টনীতি
দারুল উলূম দেওবন্দ
‘উসূল-ই-হাশত গানা’ একটি ফারসি পরিভাষা। এর অর্থ আটটি নীতি। এই অষ্টনীতি দারুল উলূম দেওবন্দের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবি (রহ.) দারুল উলূম দেওবন্দের জন্য সংবিধানস্বরূপ প্রণয়ন করেছিলেন। নীতিগুলো গভীর ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ, এবং আজও দারুল উলূম দেওবন্দ এই নীতিমালার উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
⸻
🟢 প্রথম নীতি
যতদূর সম্ভব, মাদরাসার কর্মীদের সর্বদা চাঁদা সংগ্রহের দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। নিজেরা চেষ্টা করবে এবং অন্যদের দিয়েও করাবে। মাদরাসার কল্যাণকামীদের জন্য বিষয়টি সর্বদা স্মরণে রাখা জরুরি।
⸻
🟢 দ্বিতীয় নীতি
ছাত্রদের খাবারের ব্যবস্থা বজায় রাখা, বরং যতটা সম্ভব ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির চেষ্টা করা—এ বিষয়ে মাদরাসার শুভাকাঙ্ক্ষীরা সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।
⸻
🟢 তৃতীয় নীতি
মাদরাসার পরামর্শদাতাদের সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য ও শালীনতা বজায় থাকে। নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা যেন না আসে। আল্লাহ না করুন, যদি এমন অবস্থা তৈরি হয়—যেখানে পরামর্শদাতাদের কাছে নিজের মতের বিরোধিতা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অন্যের মত মানতে অনীহা হয়—তাহলে মাদরাসার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে।
সারকথা হলো—
সময়মতো আন্তরিকতার সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি এবং পরামর্শের আগে-পরে মাদরাসার শালীনতা ও কল্যাণ বিবেচনায় রাখতে হবে। কথা সাজিয়ে বলা বা আত্মপ্রচার যেন না থাকে।
এ জন্য প্রয়োজন—
• পরামর্শদাতারা যেন কোনো কারণেই মত প্রকাশে দ্বিধা না করেন।
• শ্রোতারা যেন সৎ নিয়তে সেই মত শোনেন এবং যদি অন্যের কথা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়—তা নিজের বিপক্ষে হলেও মন-প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করেন।
এ কারণেই মুতাওয়াল্লি/মুহতামিমের জন্য আবশ্যক—
যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ চাইলে নিয়মিত পরামর্শদাতাদের সঙ্গে যেমন পরামর্শ করবেন, তেমনি কোনো জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান আগন্তুক ব্যক্তি, যিনি মাদরাসার শুভাকাঙ্ক্ষী—তার সঙ্গেও পরামর্শ করতে পারেন।
আর যদি কোনো কারণে সকল পরামর্শদাতার সঙ্গে পরামর্শ না হয়ে থাকে, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরামর্শদাতার সঙ্গে পরামর্শ করা হয়ে থাকে—তাহলে শুধু এই কারণে অসন্তুষ্ট হওয়া ঠিক নয় যে “আমার সঙ্গে কেন পরামর্শ করা হলো না”। তবে যদি মুহতামিম কারও সঙ্গেই পরামর্শ না করেন, তখন আপত্তি তোলা যেতে পারে।
⸻
🟢 চতুর্থ নীতি
মাদরাসার শিক্ষকরা যেন একই চিন্তা-ধারার ও ঐক্যবদ্ধ হন। তারা যেন যুগের কিছু আলেমের মতো আত্মকেন্দ্রিক না হন এবং অন্যদের অপমানের প্রবণতা না থাকে। আল্লাহ না করুন, যদি এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়—তাহলে এই মাদরাসার কোনো কল্যাণ থাকবে না।
⸻
🟢 পঞ্চম নীতি
পাঠদানের যে পদ্ধতি পূর্বে নির্ধারিত হয়েছে, অথবা পরবর্তীতে পরামর্শের মাধ্যমে নতুন কোনো পদ্ধতি নির্ধারিত হবে—তা পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় এই মাদরাসা হয়তো বাহ্যিকভাবে বড় হবে, কিন্তু উপকারহীন হয়ে পড়বে।
⸻
🟢 ষষ্ঠ নীতি
যতদিন পর্যন্ত মাদরাসার কোনো নিশ্চিত ও স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকে, ততদিন পর্যন্ত—ইনশাআল্লাহ—আল্লাহর দিকে মনোনিবেশের শর্তে এই মাদরাসা চলতে থাকবে।
কিন্তু যদি কোনো নিশ্চিত আয় অর্জিত হয়ে যায়—যেমন জমিদারি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বা কোনো প্রভাবশালী ধনীর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি—তবে আশঙ্কা আছে যে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার যে ভয় ও আশা (খাওফ ও রজা), যা আল্লাহমুখী হওয়ার মূল পুঁজি—তা হারিয়ে যাবে। তখন গায়েবি সাহায্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।
সুতরাং আয় ও ভবন নির্মাণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে এক ধরনের সাধারণতা ও নির্ভরশীলতা-বর্জিত অবস্থা বজায় রাখা উচিত।
⸻
🟢 সপ্তম নীতি
সরকারি অংশগ্রহণ এবং ধনীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণও ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মান হয়।
⸻
🟢 অষ্টম নীতি
যতদূর সম্ভব, এমন লোকদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া বেশি বরকতময়—
যারা নিজেদের দানের মাধ্যমে নাম-খ্যাতি প্রত্যাশা করে না।
সারকথা—
চাঁদাদাতাদের সৎ নিয়তই মাদরাসার স্থায়িত্বের সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
⸻
📚 তথ্যসূত্র:
তারিখে দারুল উলূম দেওবন্দ, পৃষ্ঠা ১৫২–১৫৪
ফটোকার্ড :Muhammad Jasimuddin