17/05/2026
ইসলামে দল-উপাত্ত তৈরি করা, উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং আল্লাহ প্রদত্ত 'মুসলিম' পরিচয় বাদ দিয়ে নতুন কোনো নাম বা উপদলে (যেমন: শিয়া, সুন্নি, ওহাবি, সালাফি, দেওবন্দী, বেরেলভি ইত্যাদি) বিভক্ত হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম।
নিচে এই বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসের আরও বিস্তারিত প্রমাণ এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হলো:
📖 পবিত্র কুরআনের আরও কিছু বাণী ও ব্যাখ্যা
কুরআনে বারবার ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং দলবাজি বর্জন করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূরা আল-বাকারাহ (আয়াত ২১৩):
"মানুষ ছিল এক উম্মত (একক জাতি)। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠালেন এবং মানুষের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, তার মীমাংসার জন্য সত্য কিতাব অবতীর্ণ করলেন..."
ব্যাখ্যা: এই আয়াত প্রমাণ করে যে, মানবজাতির মূল ভিত্তি ছিল ঐক্য। মানুষের তৈরি দলবাজি ও মতভেদ দূর করতেই আল্লাহ কিতাব পাঠিয়েছেন, নতুন দল তৈরি করতে নয়।
সূরা ফুসসিলাত (আয়াত ৩৩):
"তার চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং বলে, 'নিশ্চয়ই আমি একজন মুসলিম'।"
ব্যাখ্যা: আল্লাহ এখানে সর্বোত্তম কথার উপাধি তাকেই দিয়েছেন, যে নিজেকে কোনো দল বা তরিকার নামে না ডেকে সরাসরি 'মুসলিম' হিসেবে পরিচয় দেয়।
সূরা আশ-শূরা (আয়াত ১৩):
"তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধান নির্ধারণ করেছেন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে এবং যা আমি ওহী করেছি আপনার প্রতি... এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি করো না।"
ব্যাখ্যা: সব নবীর মূল দাওয়াতই ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা এবং দল উপদলে বিভক্ত না হওয়া। দল তৈরি করা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদের সুন্নতের পরিপন্থী।📜 সহিহ হাদিসের আরও কিছু বাণী ও ব্যাখ্যা
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর জীবদ্দশায় সাহাবিদের যেকোনো ধরনের গোষ্ঠীগত বা দলীয় গোঁড়ামি থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
সহিহ বুখারি (হাদিস নং ৩৫০২) ও সহিহ মুসলিম:
একবার এক যুদ্ধে আনসার ও মুহাজিরদের দুই যুবকের মধ্যে ঝগড়া বাঁধল। মুহাজির যুবক ডাক দিল, "হে মুহাজিরগণ (তোমরা আসো)!" আর আনসার যুবক ডাক দিল, "হে আনসারগণ (তোমরা আসো)!" রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ডাক শুনে অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং বললেন:
"তোমরা কি জাহেলিয়াত বা মূর্খ যুগের ডাক ডাকছ? অথচ আমি তোমাদের মাঝে উপস্থিত আছি! এগুলো (দলীয় ও আঞ্চলিক অহংকার) বর্জন করো, কারণ এগুলো অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত ও নিকৃষ্ট।"
ব্যাখ্যা: 'মুহাজির' ও 'আনসার' নাম দুটি স্বয়ং আল্লাহ কুরআনে দিয়েছেন এবং এগুলো অত্যন্ত সম্মানিত নাম। কিন্তু যখনই এই নামগুলোকে উম্মাহর মধ্যে পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব বা দলবাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলো, রাসুল (সা.) তাকে 'জাহেলিয়াতের দুর্গন্ধযুক্ত ডাক' বলে আখ্যা দিলেন। তাহলে বর্তমানের মানুষের তৈরি শিয়া, সুন্নি, ওহাবি, বেরেলভি নামগুলোর অবস্থান কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
মুসনাদে আহমাদ (হাদিস নং ৪১৮৩ - সহিহ):
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের হাতে মাটিতে একটি সোজা দাগ টানলেন এবং বললেন, "এটি আল্লাহর সরল পথ (সিরাতুল মুস্তাকিম)।" এরপর তিনি তার ডানে ও বামে আরও অনেকগুলো আঁকাবাঁকা দাগ টানলেন এবং বললেন:
"এই আঁকাবাঁকা পথগুলোর প্রতিটির মাথায় একটি করে শয়তান দাঁড়িয়ে আছে, যে মানুষকে সেই পথের দিকে ডাকছে।" এরপর তিনি কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন, "নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ, সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করো এবং অন্যান্য পথের অনুসরণ করো না, অন্যথায় তা তোমাদের তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।" (সূরা আল-আনআম: ১৫৩)
জামে আত-তিরমিযী (হাদিস নং ২১৬৫ - সহিহ):
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমরা জামাতকে (মুসলিম উম্মাহর মূল ধারা বা ঐক্য) শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্নতা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ শয়তান একাকী থাকা মানুষের সাথে থাকে, আর দুজন থেকে সে দূরে থাকে। যে ব্যক্তি জান্নাতের সুউচ্চ প্রাসাদ চায়, সে যেন জামাতকে আঁকড়ে ধরে।"
💡 বিষয়টি সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা যাক
১. দল গঠন কেন হারাম?
ইসলামে মূল উৎস দুটি—পবিত্র কুরআন এবং সহিহ হাদিস। কোনো ব্যক্তি যখন নিজেকে 'মুসলিম' বাদ দিয়ে অন্য কোনো দলের নামে পরিচয় দেয়, তখন সে পরোক্ষভাবে দাবি করে যে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহর বাইরেও তার দলের কিছু নিজস্ব মতামত বা মূলনীতি আছে, যা অন্য মুসলিমদের থেকে আলাদা। এটিই উম্মতের মাঝে হিংসা, বিদ্বেষ এবং একে অপরকে কাফের বা গোমরাহ ডাকার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. তাহলে ৭৩ দলের হাদিসের অর্থ কী?
রাসুল (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, যার মধ্যে কেবল একটি দল সঠিক পথে থাকবে। সেই সঠিক দলটির কোনো 'বিশেষ নাম' রাসুল (সা.) দেননি। তিনি শুধু বলেছেন, "আমি ও আমার সাহাবিরা আজ যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।" অর্থাৎ, সাহাবিদের যুগে যেমন কোনো দল বা ফিরকা ছিল না, তারা শুধু 'মুসলিম' ছিলেন, শেষ জমানাতেও যারা কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি না করে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবিদের পথ মানবে, তারাই মুক্তিপ্রাপ্ত দল।
৩. মতভেদ ও দলভেদের পার্থক্য:
ফেকাহগত বা ইজতিহাদি বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ছোটখাটো মতভেদ (যেমন হাত বাঁধা, আমিন জোরে বা আস্তে বলা) থাকা স্বাভাবিক এবং এটি সাহাবিদের যুগেও ছিল। কিন্তু এই মতভেদের ওপর ভিত্তি করে আলাদা দল তৈরি করা, নিজেদের অন্য নামে ডাকা, মসজিদের দেয়াল তুলে দেওয়া এবং অন্য মুসলিমদের শত্রু মনে করা—এটিই হলো সেই 'তাজাক্কুর' বা দলবাজি, যা ইসলামে কঠোরভাবে হারাম করা হয়েছে।
মূল শিক্ষা
ইসলামে "মুসলিম" এবং "মুমিন" আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র পরিচয়। উম্মতের ঐক্য নষ্ট করে নতুন নতুন নামে (যেমন: শিয়া, সুন্নি, ওহাবি, সালাফি, মওদুদি ইত্যাদি) দল উপদল তৈরি করা এবং নিজেদের অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করা কুরআনের বিধানের পরিপন্থী। সত্যের মাপকাঠি কোনো দলের নাম নয়, বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসের নিঃশর্ত অনুসরণ।
#ইসলামিক_পোস্ট #আমরামুসলিম #উম্মাতে_মুহাম্মাদী #উম্মাহর_ঐক্য #সুন্নাহর_আলো