20/12/2025
জম জম কূপের রহস্য
মরুভূমির বুকে রহমতের ঝরনা
হাজার হাজার বছর আগে—
আল্লাহর মহান নির্দেশ পালনে
অবিচল ছিলেন হযরত ইব্রাহীম
(আলাইহিস সালাম)।
সেই আদেশ বাস্তবায়নের অংশ
হিসেবে তিনি তাঁর প্রিয় স্ত্রী হাজেরা
(আলাইহাস সালাম)
ও দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাঈল
(আলাইহিস সালাম)-কে
রেখে এলেন এক নিঃসঙ্গ
, নির্জন মরুপ্রান্তরে।
সে প্রান্তর ছিল আজকের মক্কা
—কিন্তু তখন সেখানে ছিল না
কোনো জনবসতি,
ছিল না কোনো ছায়া,
ছিল না এক ফোঁটা পানিও।
চারদিকে শুধু ধূ ধূ বালু, রুক্ষ
পাহাড় আর নীরবতার ভয়াল ডাক।
মরুভূমিতে নিঃসঙ্গতা ও ঈমানের পরীক্ষা
যখন ইব্রাহীম (আঃ) ফিরে যাওয়ার জন্য
পা বাড়ালেন, তখন ব্যাকুল হৃদয়ে
হাজেরা (আঃ) তাঁর পিছু ডাকলেন—
“হে ইব্রাহীম! আপনি আমাদের এমন
জায়গায় রেখে কোথায় যাচ্ছেন,
যেখানে নেই কোনো মানুষ,
নেই খাবার, নেই পানি?”
কিন্তু ইব্রাহীম (আঃ) কোনো
উত্তর দিলেন না।
হাজেরা (আঃ) আবার
জিজ্ঞেস করলেন—
“আল্লাহ কি আপনাকে এই
আদেশ দিয়েছেন?”
ইব্রাহীম (আঃ) শান্ত কণ্ঠে বললেন
—হ্যাঁ।”
এই একটিমাত্র শব্দই যথেষ্ট ছিলো।
ঈমানে দীপ্ত কণ্ঠে হাজেরা
(আঃ) বললেন—
“তবে আল্লাহ আমাদের কখনো
ধ্বংস হতে দেবেন না।”
তৃষ্ণার কান্না ও মায়ের অসহায়তা
সাথে থাকা অল্প খাবার আর
পানিটুকুও একসময় শেষ হয়ে গেলো।
ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় ছটফট করতে লাগলো
ছোট্ট ইসমাঈল (আঃ)।
শিশুর শুকনো ঠোঁট,
অসহায় কান্না—সবকিছু মায়ের
হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিলো।
একজন মা কীভাবে স্থির থাকে,
যখন তার সন্তানের জীবন মৃত্যুর মুখে?
সাফা–মারওয়ার সেই মরিয়া দৌড়
পানির আশায় হাজেরা (আঃ)
প্রথমে উঠলেন সাফা পাহাড়ে।
চারদিকে তাকালেন—
না! কোথাও কোনো মানুষ নেই,
নেই কোনো জীবনের চিহ্ন।
তিনি ছুটলেন মারওয়া পাহাড়ের দিকে।
আবার তাকালেন—শুধু মরুভূমি,
শুধু নীরবতা।সন্তানের জন্য,
প্রাণ বাঁচানোর আশায়—
তিনি এভাবে সাতবার সাফা ও
মারওয়ার মাঝে দৌড়ালেন।
চোখে ছিলো অশ্রু, পায়ে ছিলো ক্লান্তি—
কিন্তু হৃদয়ে ছিলো আল্লাহর
ওপর অটল ভরসা।
অলৌকিক রহমত : জমজমের আবির্ভাব
সপ্তমবার মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছে
হঠাৎ তিনি একটি শব্দ শুনতে পেলেন।
চমকে ফিরে তাকালেন…
দেখলেন—
যেখানে শিশু ইসমাঈল (আঃ)
তৃষ্ণায় পা ছুড়ে মারছিলেন,
ঠিক সেখানেই মাটি ফেটে
বেরিয়ে আসছে পানির ঝর্না ধারা!
কোনো বর্ণনায় ধরা যায় না
সেই মুহূর্তের বিস্ময়।
জিবরাইল (আলাইহিস সালাম)-
এর আঘাতে বা ইসমাঈল (আঃ)-
এর পদতলে—
আল্লাহর কুদরতে ফুটে উঠলো
এক রহমতের ঝরনা।
আনন্দে ও শঙ্কায় হাজেরা (আঃ)
দ্রুত চারপাশে বালু জড়ো করে
পানিকে ধরে রাখতে লাগলেন
এবং বললেন—
“জমজম! জমজম!”
অর্থাৎ— থামো, থামো!
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
পরে বলেছেন—
“আল্লাহ উম্মে ইসমাঈলের ওপর রহম করুন। তিনি যদি পানি আটকে না দিতেন,
তবে তা প্রবহমান নদীতে পরিণত হতো।”
আজীবন বরকতের উৎস
যেখানে একসময় এক ফোঁটা
পানিও ছিলো না—
সেখানেই আল্লাহর কুদরতে
সৃষ্টি হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কূপ,
জমজম।
এই পানি পান করেই বেঁচে গেলেন
হাজেরা (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)।
ধীরে ধীরে সেখানে মানুষ বসতি গড়লো—
আর সেই মরুপ্রান্তরই হয়ে উঠলো
আজকের পবিত্র মক্কা নগরী।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন—
“জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয়, আল্লাহ সে নিয়ত পূরণ করেন।”
(ইবনে মাজাহ)
🌙 শিক্ষা ও উপলব্ধি
১. তাওয়াক্কুল:
আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা থাকলে নির্জন মরুভূমিতেও রহমতের ঝরনা প্রবাহিত হয়।
২. ধৈর্য ও সংগ্রাম:
মা হাজেরা (আঃ)-এর সেই আত্মত্যাগ ও দৌড়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই আজ হাজীদের জন্য সাফা–মারওয়ার সাঈ ওয়াজিব করা হয়েছে।
৩. মায়ের ভালোবাসা:
একজন মায়ের অশ্রু ও আকুতি আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়—আর তাঁর রহমত নেমে আসে পৃথিবীতে।