21/02/2026
আমাদের 'দ্বিতীয় মস্তিষ্ক' বা গাট হেলথ
সারাদিন অকারণে ক্লান্তি, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কিংবা হজমের ছোটখাটো গন্ডগোল—এগুলো কি আপনার নিত্যদিনের সঙ্গী? আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি, কাজের চাপ বা মানসিক ক্লান্তির কারণেই এমনটা হচ্ছে। কিন্তু আসল কারণটি লুকিয়ে থাকতে পারে আমাদের পেটের ভেতর! আধুনিক ফাংশনাল মেডিসিন এবং প্রাচীন আয়ুর্বেদ—উভয় বিজ্ঞানই একমত যে, আমাদের পরিপাকতন্ত্র বা 'গাট' (Gut) হলো আমাদের শরীরের 'দ্বিতীয় মস্তিষ্ক'।
আমাদের পেটের ভেতরে রয়েছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার এক বিশাল জগৎ, যাকে আমরা 'মাইক্রোবায়োম' বলি। এই মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য নষ্ট হলেই আমাদের মেটাবলিক হেলথ বা বিপাকীয় স্বাস্থ্যে ধস নামে। আপনি জেনে অবাক হবেন, আমাদের মন ভালো রাখার হরমোন 'সেরোটোনিন'-এর প্রায় ৯০ শতাংশই তৈরি হয় এই অন্ত্রে বা পেটে! তাই পেট ভালো না থাকলে, শরীরের পাশাপাশি মনও কোনোভাবেই ভালো থাকতে পারে না।
সমস্যাটা আসলে কোথায়?
আমাদের ব্যস্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো তাড়াহুড়ো করে খাবার খাওয়া। আমরা যখন ঠিকমতো না চিবিয়ে খাবার গিলে ফেলি, তখন পাকস্থলীর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। খাবার সঠিকভাবে হজম না হয়ে পেটে ফার্মেন্টেশন বা পচন ধরতে শুরু করে। এর ফলে গ্যাস, পেট ফাঁপা তৈরি হয় এবং পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো দুর্বল হতে থাকে।
বিজ্ঞানসম্মত ও ঘরোয়া সমাধান
আয়ুর্বেদিক থেরাপিউটিক নিউট্রিশন অনুযায়ী, পরিপাক বা হজমের শুরুটা কিন্তু পাকস্থলীতে হয় না, হয় আমাদের মুখে। তাই খাবার খাওয়ার সময় শান্ত পরিবেশে বসুন। প্রতিটি লোকমা অন্তত ৩২ বার চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করুন। খাবার যত বেশি চিবোবেন, মুখের লালারসের সাথে থাকা পাচক এনজাইমগুলো তত ভালোভাবে মিশবে। এই লালারস খাবারের জটিল অংশগুলোকে মুখেই ভাঙতে শুরু করে। এটি অত্যন্ত সহজ একটি প্রাকৃতিক নিরাময় (Natural healing) পদ্ধতি, যা আপনার গাট হেলথ পুনরুদ্ধারের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
খাওয়ার ঠিক পরপরই প্রচুর পরিমাণে জল পান করার অভ্যাস থাকলে তা আজই বাদ দিন। খাওয়ার পর পর জল খেলে পাকস্থলীর পাচক রস বা গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড পাতলা হয়ে যায়। আয়ুর্বেদের ভাষায় একে বলা হয় 'অগ্নিমান্দ্য' বা হজমের আগুন নিভিয়ে দেওয়া, যা মেটাবলিজমকে মারাত্মকভাবে ধীর করে দেয়। খুব তৃষ্ণা পেলে খাওয়ার মাঝে এক-আধ চুমুক কুসুম গরম জল খেতে পারেন, তবে পেট ভরে জল পান করতে হবে খাওয়ার অন্তত ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর।
সুস্থতার শুরুটা হোক আমাদের রোজকার ডাইনিং টেবিল থেকেই। নিজের শরীরকে সময় দিন, শরীরের কথা শুনুন।
20/02/2026
মাঠ-ঘাটের সঞ্জীবনী: বাংলার অচেনা পুষ্টিভাণ্ডার
পর্ব ৩: বথুয়া বা বেথো শাক—শীতের ফসলি মাঠের বহুমুখী ডিটক্স ও কিডনির রক্ষাকবচ
শীতের আমেজ শুরু হতেই বাংলার সরিষা খেত কিংবা গমের ক্ষেতের আইলে অযত্নে, অবহেলায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এক চমৎকার বুনো শাক—বথুয়া। গ্রামবাংলার মানুষের কাছে এটি বেথো শাক, বথুয়ানি বা স্তব্ভক নামেও সুপরিচিত। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় একে অনেক সময় 'আগাছা' হিসেবে গণ্য করে উপড়ে ফেলা হলেও, পুষ্টিবিজ্ঞান ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের পাতায় এই বথুয়া শাক হলো এক অমূল্য রত্ন। মাটির বুক থেকে সরাসরি পুষ্টি শুষে নেওয়া এই ছোট ছোট ধূসর-সবুজ পাতাগুলো আমাদের শরীরের ভেতরকার বর্জ্য পরিষ্কার করতে বা ডিটক্সিফিকেশনে প্রাকৃতিকভাবেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
প্রাচীন আয়ুর্বেদ সংহিতায় বথুয়া শাককে 'শাক-শ্রেষ্ঠ' হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা প্রধানত 'মূত্রল' বা ডাইইউরেটিক (Diuretic) গুণসম্পন্ন। আয়ুর্বেদ মতে, এটি শরীরের পিত্ত ও কফ দোষের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং রক্তস্বল্পতা বা পাণ্ডুরোগ নিরাময়ে মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে কিডনি ও মূত্রাশয়ের পাথর (Renal Calculi) প্রতিরোধে এবং প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমাতে এর রস অত্যন্ত কার্যকরী। অন্যদিকে, মডার্ন নিউট্রিশন বা আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এই বুনো শাকের ভেতরে খুঁজে পেয়েছে খনিজের এক বিশাল ভাণ্ডার। বথুয়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়াম। এছাড়া এতে রয়েছে ভিটামিন এ, বি-কমপ্লেক্স এবং উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, বথুয়া শাকে থাকা 'অ্যামিনো অ্যাসিড' এবং 'ফাইবার' আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য (Gut Health) রক্ষা করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং মেটাবলিক সিনড্রোম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এর উচ্চ পটাশিয়াম কন্টেন্ট উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে হৃদপিণ্ডকে সুরক্ষিত রাখে।
তবে এই বথুয়া শাকের সম্পূর্ণ বায়ো-অ্যাভেলেবিলিটি বা শরীরের শোষণ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে এর খাওয়ার পদ্ধতিতে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। বথুয়া শাকে প্রাকৃতিকভাবেই সামান্য পরিমাণ ‘অক্সালিক অ্যাসিড’ থাকে, যা অতিরিক্ত তাপে রান্না করলে বা ভুল পদ্ধতিতে খেলে কিডনির জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। আয়ুর্বেদ ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বিত পরামর্শ হলো—বথুয়া শাক রান্নার আগে হালকা ভাপিয়ে নিয়ে সেই অতিরিক্ত জলটুকু ফেলে দেওয়া, যাতে অক্সালেটের মাত্রা কমে যায়। এরপর কচি পাতাগুলো রসুন, কাঁচা লঙ্কা এবং সামান্য ঘি বা কোল্ড-প্রেসড সরিষার তেলে হালকা আঁচে রান্না করা উচিত। ভারতের অনেক জায়গায় একে টক দইয়ের সাথে মিশিয়ে ‘বথুয়া রায়তা’ হিসেবে খাওয়া হয়, যা প্রো-বায়োটিক হিসেবে হজম প্রক্রিয়াকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করে। দুপুরে গরম ভাতের সাথে এই শাকের চচ্চড়ি বা ভাজি কেবল স্বাদে অনন্য নয়, বরং এটি আপনার লিভার ও কিডনিকে ভেতর থেকে ধুয়ে মুছে সাফ করার এক জাদুকরী প্রক্রিয়া। আসুন, অবহেলিত এই ‘আগাছা’ নয়, বরং প্রকৃতির দেওয়া এই বিশুদ্ধ ডিটক্স পানীয়ের মতো পুষ্টিকর শাকটিকে আমাদের শীতকালীন খাদ্যতালিকায় স্থায়ী জায়গা করে দিই।
#বথুয়াশাক
লিখেছেন: প্রবাল কুমার মন্ডল
20/02/2026
মাঠ-ঘাটের সঞ্জীবনী: বাংলার অচেনা পুষ্টিভাণ্ডার
পর্ব ৪: সাঁচি শাক—পেট ঠান্ডা রাখতে ও অন্ত্রের সুরক্ষায় জাদুকরী পাতা
গ্রামবাংলার রাস্তার পাশে, স্যাঁতসেঁতে জায়গায় কিংবা পুকুরপাড়ে একটু খেয়াল করলেই ছোট ছোট পাতাওয়ালা একধরনের লতানো শাক চোখে পড়ে। নাম তার সাঁচি শাক। অঞ্চলভেদে এটি ছাঁচি, শ্বেত সাঁচি, জল সাঁচি বা সেচি শাক নামেও পরিচিত। আগাছা ভেবে আমরা অনেকেই একে এড়িয়ে চলি, অযত্নে পা দিয়ে মাড়িয়ে যাই। কিন্তু পেট ঠান্ডা রাখতে এবং হজমের যেকোনো জটিলতা দূর করতে এই দেশি শাকটির জুড়ি মেলা ভার। খুব সাধারণ আর সহজলভ্য এই বুনো শাকটি মূলত আমাদের অন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্রের এক পরম বন্ধু। আধুনিক যুগের ফাস্টফুড আর অনিয়মিত জীবনযাপনে যখন আমাদের পেটের বারোটা বাজছে, নিত্যদিন বুক জ্বালাপোড়া আর গ্যাসের ওষুধ খেতে হচ্ছে, তখন এই অতি সাধারণ শাকটি হতে পারে পেটের সুস্থতার এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সমাধান।
প্রাচীন আয়ুর্বেদ এবং আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সাঁচি শাকের দারুণ কদর রয়েছে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, এই শাক স্বভাবতই খুব শীতল বা 'পিত্তশামক'।
অর্থাৎ, এটি পেটের অতিরিক্ত গরম ভাব বা অ্যাসিডিটি কমিয়ে ভেতর থেকে শরীর ঠান্ডা রাখে। দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য বা কষা পায়খানার সমস্যা দূর করতে এবং পাইলস বা অর্শরোগের মতো কষ্টকর উপসর্গে সাঁচি শাককে মহৌষধ হিসেবে ধরা হয়। অন্যদিকে, আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ডায়াটারি ফাইবার বা আঁশ, যা আমাদের পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর (Gut Microbiome) অন্যতম প্রধান খাবার। এই প্রি-বায়োটিক ফাইবার অন্ত্রের নড়াচড়া (Bowel movement) স্বাভাবিক রাখে, যার ফলে খুব সহজেই পেট পরিষ্কার হয়। এছাড়া এর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহরোধী উপাদান পাকস্থলী ও অন্ত্রের যেকোনো ধরনের প্রদাহ, আলসার বা জ্বালাপোড়া কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। মেটাবলিক স্বাস্থ্য বা বিপাকীয় প্রক্রিয়া ভালো রাখতে অন্ত্রের সুস্থতা সবার আগে জরুরি, আর সাঁচি শাক ঠিক সেই কাজটিই করে অত্যন্ত নিপুণভাবে।
এই শাকের শতভাগ পুষ্টি ও ঔষধি গুণ পেতে হলে রান্নার পদ্ধতিটি হওয়া চাই একদম সাধারণ ও স্বাস্থ্যকর। সাঁচি শাকের কচি ডগা ও পাতাগুলো পরিষ্কার পানিতে ভালো করে ধুয়ে নিন।
এরপর সামান্য কোল্ড-প্রেসড বা ঘানি ভাঙা খাঁটি সরিষার তেলে রসুন ও কালো জিরার ফোড়ন দিয়ে হালকা করে সাঁতলে বা ভাপিয়ে নিতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, শাক যেন কড়া আঁচে অতিরিক্ত ভাজা না হয়। কড়কড়ে করে ভাজলে এর উপকারী ফাইবার, সূক্ষ্ম পুষ্টিগুণ ও জলীয় অংশ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। দুপুরের গরম ভাতে প্রথম পাতে একটুখানি সাঁচি শাকের ভাজি আপনার হজম প্রক্রিয়াকে যেমন ত্বরান্বিত করবে, তেমনি সারা দিনের জন্য পেট রাখবে একদম শান্ত ও শীতল। আসুন, দামি বিদেশি সাপ্লিমেন্ট বা অ্যান্টাসিড সিরাপের বদলে আমাদের চারপাশের এই প্রাকৃতিক ও উপকারী শাকগুলোকে আবার রোজকার খাবারে ফিরিয়ে আনি এবং সুস্থ থাকার আদিম অভ্যাসে অভ্যস্ত হই।
লিখেছেন: প্রবাল কুমার মন্ডল