11/08/2026
এপিটাফেরও পরে
--রুদ্র সারথি
এপিটাফের পরেও
একদিন শহরটি আমার নাম ভুলে যাবে—
যেভাবে প্রতিদিন অসংখ্য মুখ ভুলে গিয়ে
পরদিন নতুন ভিড়ের দিকে তাকায়।
সেদিনও সন্ধ্যা নামবে
তার নির্ধারিত সময়ে।
চায়ের দোকানে কাচের গ্লাসে
চামচের ক্ষীণ শব্দ উঠবে,
শেষ বাসটি ভেজা রাস্তায়
তার হলুদ আলো টেনে নিয়ে যাবে দূরে;
কোনো টেবিলে হঠাৎ
কেউ হেসে উঠবে—
শুধু আমার জন্য
একটি চেয়ারও খালি থাকবে না।
হিসাবের খাতায়
শেষ দাগটি টানা হয়ে যাবে।
পাওনা থাকবে না, দেনাও নয়;
তবু কিছু ঋণ থেকে যাবে—
একটি অসমাপ্ত কথা,
ফিরে না-দেওয়া দৃষ্টি,
বিদায়ের আগে পকেটে ভাঁজ করে রাখা
একটি পুরোনো বিকেল।
তারপর আমার ঠিকানাও বদলে যাবে।
বাড়ির দরজায় নয়,
কোনো পরিচিত জানালার পাশে নয়—
কয়েক হাত মাটির নিচে
পাথরের গায়ে
আমার নামটুকু শুয়ে থাকবে।
বর্ষা আসবে।
শেওলা ধীরে ধীরে
অক্ষরগুলোর ভেতর ঢুকে পড়বে।
কোনো একদিন
কোনো অচেনা আঙুল
আমার নামের অর্ধেক মুছে দেবে—
জানবেও না,
এই নামের একজন মানুষ
কোনো এক জীবনে
রাতের পর রাত
নিজের ঘুম বন্ধক রেখে
শব্দের কাছে বসেছিলো।
তারপর আরও অনেক দিন।
হয়তো কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে
একজন অচেনা মানুষ
আমার একটি কবিতা খুলবে।
ঘরে থাকবে কেবল একটি বাতি,
জানালার ওপারে বৃষ্টির শব্দ,
পাশে পড়ে থাকবে একটি ফোন—
অসংখ্য মানুষের উপস্থিতির মধ্যেও
যার কাছে সেদিন কেউ নেই।
সে পড়বে।
হয়তো কোনো একটি শব্দে এসে
হঠাৎ থেমে যাবে তার চোখ।
একটি শব্দ—
যার ভেতর দিয়ে খুলে যাবে
তার নিজের বহুদিন-বন্ধ একটি দরজা।
সেখানে হয়তো থাকবে
একটি মুখ,
একটি বিকেল,
অথবা এমন কোনো বিদায়
যাকে সে বিদায় বলে মেনে নিয়েছিলো,
কিন্তু তার হৃদয় কখনো নেয়নি।
সেখানে আমার থাকার কথা নয়।
তবু যদি সে আমাকে খুঁজে পায়,
তবে সে আমাকে নয়—
নিজেকেই পড়বে।
কারণ কবিতা
লেখকের হাতে জন্ম নিলেও
তার জীবন লেখকের কাছে শেষ হয় না।
একবার পাঠকের রক্তে মিশে গেলে
সে নিজের অর্থ বদলায়,
অন্য এক জীবনের অন্ধকারে
অন্য এক আলো হয়ে ওঠে।
আমার চাওয়া এতটুকুই—
আমার কবরের কাছে
কোনো ফুল রেখো না।
কোনো স্মরণসভাও নয়,
কোনো দীর্ঘশ্বাসের আয়োজনও নয়।
শুধু কোনো এক গভীর রাতে,
যখন নিজের ঘরটাকেও
অচেনা মনে হবে,
যখন সমস্ত আলো জ্বালিয়েও
অন্ধকারের উৎস খুঁজে পাবে না,
তখন আমার কোনো একটি কবিতা
খুলে বসো।
খুব ধীরে।
হয়তো সেখানে
আমার কোনো নাম থাকবে না;
থাকবে শুধু একটি শব্দ—
আর সেই শব্দের ভেতর দিয়ে
তুমি হেঁটে যাবে
নিজেরই বহু পুরোনো অন্ধকারে।
বাইরে তখনও শহর জেগে থাকবে।
দূরে কোনো ট্রেন
রাতের শরীর কেটে চলে যাবে,
কোনো জানালায় দেরিতে নিভবে আলো,
আর পৃথিবী তার পুরোনো অভ্যাসে
সবকিছুকে ভুলে যেতে থাকবে।
শুধু একটি পাতা
তোমার আঙুলের নিচে
নিঃশব্দে কেঁপে উঠবে।
তুমি বুঝতে পারবে না—
সে কি কবিতা,
নাকি তোমারই
কোনো হারানো জীবন।
আর সেই না-বোঝার ভেতরেই
হয়তো একদিন
আমার নামেরও আর প্রয়োজন থাকবে না।
এপিটাফেরও নয়।
শুধু একটি শব্দ বেঁচে থাকবে—
যার ভেতর দিয়ে
একজন মৃত মানুষ নয়,
একজন জীবিত মানুষ
নিজেকেই ফিরে পাবে।
১১.০৮.২০২৬