25/12/2024
আজকালকার যুগে আমি যখন কিশোর-কিশোরীদের জিজ্ঞাসা করি, “তোমার পছন্দের বিষয় কি ? বা “ তুমি কোন বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে চাও ? বেশিরভাগই তাদের উত্তর হয় ,
“কি আবার, বিজ্ঞান! বিজ্ঞানের উপর আমার আগ্রহ সবথেকে বেশি। আমি তো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি বড় হয়ে এক বড়মাপের বিজ্ঞানী হব।”
“বেশ তো ! তাহলে বলতো বিজ্ঞান কি , এর প্রাথমিক জ্ঞান সম্পর্কে কিছু বলো তো ।”
প্রথমে তাদের প্রস্তাবনা আমার ভালোই লাগতো , কিন্তু তারা বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে কিছু জানতো না বলে আমার স্বপ্ন ভাবাবেশ কর্পূরের মতো উড়ে যেত।তাই আজ আমি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের নিয়ে কিছু কথা তুলে ধরব। প্রথমে বিজ্ঞান নিয়ে কিছু বলা যাক:
(১) ল্যাটিন শব্দ Scientia থেকে ইংরেজি Science শব্দটি এসেছে যার অর্থ জ্ঞান ।Scient ল্যাটিন বিজ্ঞান (“জ্ঞান বা বিজ্ঞান” ) + ist এন্টি ।
দ্রষ্টব্য : বিজ্ঞানী শব্দটি দৃশ্যত ১ম ইংরেজ পলিম্যাথ উইলিয়াম হয়েল দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল।
(২) ভৌত বিশ্বের যা কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য, পরিক্ষণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য , তার সুশৃংখল, নিয়ম তান্ত্রিক , সেই গবেষণালব্ধ জ্ঞানভান্ডার ও তা অর্জনের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি বিজ্ঞান।
(৩) মূলত গ্যালিলিও গ্যালিলি কে বিজ্ঞানের জনক বলা হয় । তিনি একজন শিক্ষক ,দার্শনিক ,জ্যোতিবিদ ও পদার্থবিদ ছিলেন যা বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিতি। তার পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কারণে তাকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
(৪) পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী হলেন অ্যারিস্টটল।
(৫) বাংলাদেশের প্রথম বিজ্ঞানী হলেন জগদীশচন্দ্র বসু।
(৬) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ধাপ ৮টি
(৭)পরীক্ষণ পদ্ধতির ধাপ ৭টি
এবার কিছু বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক:
গ্যালিলিও গ্যালিলি (১৫৬৪ - ১৬৪২ ): গ্যালিলিও একাধারে পদার্থ বিজ্ঞান জ্যোতিবিজ্ঞান গণিতবিদ এবং প্রকৌশলী ছিলেন। অ্যারিস্টটল প্রদত্ত বিভিন্ন ভুল ধারণার অবসানে গ্যালিলিওর আবিষ্কার গুলো সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়াও গ্যালিলিও পূর্বাসুরি কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের মতবাদের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন। থার্মোমিটার, কম্পাস , টেলিস্কোপ , বৃহস্পতির উপগ্রহ , শনির বলয়, সৌর কলঙ্ক, চাঁদের কলঙ্ক ইত্যাদি তিনি আবিষ্কার করেছেন।
স্যার আইজ্যাক নিউটন (১৬৪৩ - ১৭২৭) : নিউটন একাধারে পদার্থবিজ্ঞানী,গণিতবিজ্ঞানী ,জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্রাকৃতিক দার্শনিক এবং আলকেমেণ্ট ছিলেন। নিউটনীয় বলবিদ্যা ,সর্বজনীন মহাকর্ষ, সূত্র ক্যালকুলাস ,শীতলিকরন সূত্র, আলোকবিজ্ঞানে বিভিন্ন আবিষ্কার ও গবেষণা দ্বিপদী উপপাদ্য ইত্যাদির জন্য পরিচিত। তার মহাকাশ সূত্র গতিসূত্র এবং নিয়ন্ত্রণীয় বলবিদ্যার নীতিগুলোই চিরায়ত বল বিজ্ঞানে ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯ - ১৯৫৫) : তিনি পদার্থ বিজ্ঞান এবং গণিতে বিশেষায়িত হয় ১৯০০ সালে জুরি খের ফেডারেশন পলিটেকনিক স্কুল থেকে একাডেমিক শিক্ষা ডিপ্লোমা অর্জন করেন । আইনস্টাইন মূলত আপেক্ষিক তত্ত্ব এবং ভর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রয়োগে মহাকর্ষ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা ,আপেক্ষিকতার সার্বজনীন তত্ত্ব ,কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যাখ্যা ,ব্রাউনীয় গতি ব্যাখ্যা , একীভূত তত্ত্বের প্রথম ধারণা ,পদার্থবিজ্ঞানের জ্যামিতিকরণ ইত্যাদিতে ছিল তার অনন্য অবদান।
এন রিকো ফার্মি (১৯০১-১৯৫৪):তিনি সর্বপ্রথম পারমাণবিক বিভাজন ঘটাতে সক্ষম হন। এই গবেষণা পরবর্তীকালে পারমাণবিক বোমা এবং পারমাণবিক চুল্লি তৈরির কাজে ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, আর এজন্য তাকে নিউক্লিয়ার যুগের স্থপতি বলা হয়। মহাবিশ্বের অর্ধেক কণা-সব পদার্থের কণাকে তার নামে ডাকা হয় ফার্মিওন। পর্যায় সারণির একটি মৌলের নাম রাখা হয়েছে তার সম্মানে ফার্মিয়াম।
ড্যানিয়েল গ্যাবরিয়েল ফারেনহাইট (১৬৮৬-১৭৩৬): ফারেনহাইট তাপমাত্রার স্কেল ও ফারেনহাইট হাইড্রোমিটার উদ্ভাবনের জন্য তিনি বেশি পরিচিত। তিনি তিনটি স্থির বিন্দুর উপর ভিত্তি করে তাপমাত্রার যে স্কেলটি নির্ধারণ করেন তা এখনো আমাদের প্রাত্যহিক ব্যবহারের অংশ। তিনি অ্যালকোহল থার্মোমিটার এবং পারদ থার্মোমিটার আবিষ্কার করেছেন।
আন্ডারস সেলসিয়াস (১৭০১-১৭৪৪): ১৭৪২ সালে তিনি প্রথম সেলসিয়াস তাপমান যন্ত্রের ধারণা দেন। পরবর্তীকালে তার নামেই সেলসিয়াস থার্মোমিটার তৈরি হয়। সেলসিয়াসলি প্রথম পৃথিবীপৃষ্ঠের চুম্বকীয় প্রভাব তুলে ধরেন।
জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭): ইতিহাসে প্রথম মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ তৈরি করেন তিনি। একাধারে ছিলেন সলিড স্টেট ফিজিক্স গবেষণার অগ্রপথী ও জীব পদার্থবিদ। এমনকি ইতিহাসের প্রথম জীব পদার্থবিদ বলা হয়ে থাকে তাকে। অথচ বিপন্ন বিষয়ে সরে এলেন পদার্থবিদ্যার জগৎ থেকে, জানতে চাইলেন সবুজের মনের বেদনা-তিনি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যে গাছেরও প্রাণ আছে। তারাও প্রজনন ,বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪-১৯৭৪): ১৯২৪ সালে কোয়ান্টাম তত্ত্বের গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে আইনস্টাইনের কাছে চিঠি লেখেন সত্যেন বসু। সেই চিঠিটি পেয়ে স্বয়ং আইনস্টাইন নরে চরে বসেন। পরে আইনস্টাইন তা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এটি বোস- আইনস্টাইন পরিসংখ্যান। মহাবিশ্বের অর্ধেক মৌলিক কণার নামকরণ করা হয়েছে সত্যেন বসুর নামে এবং এই কণার নাম বোসন কণা।
এরকম অসংখ্য বিজ্ঞানী রয়েছেন যারা কিনা আমাদের জীবনের বিভিন্ন খাতের সাথে ওতপ্রোতভাবে তাদের নিজেদেরকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। আমরাও বিজ্ঞান কে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করব। নিয়মিত বিজ্ঞান চর্চায় হয়তো আমাদের অনেক কিছু আবিষ্কার সহায়তা করবে।