Madrasa Darus Salam Sreepur

Madrasa Darus Salam Sreepur ইলম ও আমলের সমন্বয়ে দক্ষ, যোগ্য ও আদর্শ তালিবুল ইলম গড়ে তুলতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।

মিথ্যা কখনো সাওয়াবের কাজ হতে পারে?"কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের আলোকে ‘তিন ক্ষেত্রে মিথ্যার অনুমতি’"ভূমিকা : যে মিথ্যা মানুষ...
20/08/2026

মিথ্যা কখনো সাওয়াবের কাজ হতে পারে?
"কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের আলোকে ‘তিন ক্ষেত্রে মিথ্যার অনুমতি’"

ভূমিকা : যে মিথ্যা মানুষকে জাহান্নামের দিকে নেয়, কখনো কি সেটিই নেকির কারণ হতে পারে?
মিথ্যা—সাধারণ মানুষের চোখে হয়তো একটি ছোট্ট কথা; কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি জিহ্বার অন্যতম ভয়ংকর গুনাহ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।”
—সূরা আত-তাওবা: ১১৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ
“নিশ্চয়ই সত্য নেকির দিকে নিয়ে যায়, আর নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।”
—সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম
অতএব মূলনীতি অত্যন্ত পরিষ্কার:
الأصل في الكذب التحريم
“মিথ্যার মূল হুকুম হলো—হারাম।”
কিন্তু শরিয়ত মানুষের বাস্তব জীবন, বৃহত্তর কল্যাণ এবং ক্ষতি প্রতিরোধের বিষয়টিও বিবেচনা করেছে। তাই বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে সীমিত রুখসত এসেছে।
১.
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর তিনটি বিশেষ অনুমতি
হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ رضي الله عنها বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَا يَحِلُّ الْكَذِبُ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ: يُحَدِّثُ الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ لِيُرْضِيَهَا، وَالْكَذِبُ فِي الْحَرْبِ، وَالْكَذِبُ لِيُصْلِحَ بَيْنَ النَّاسِ.
“তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া মিথ্যা বলা বৈধ নয়: ১. স্বামী তার স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য কথা বলা, ২. যুদ্ধের ক্ষেত্রে, ৩. মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার উদ্দেশ্যে।”
সনদ
ইমাম তিরমিযী رحمه الله বর্ণনা করেন—
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ حَدَّثَنَا أَبُو أَحْمَدَ الزُّبَيْرِيُّ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُثْمَانَ بْنِ خُثَيْمٍ عَنْ شَهْرِ بْنِ حَوْشَبٍ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ...
অর্থাৎ সনদের ধারাবাহিকতা:
মুহাম্মদ ইবনু বাশশার - আবু আহমাদ আয-যুবায়রী - সুফিয়ান - আবদুল্লাহ ইবনু উসমান ইবনু খুসাইম -শাহর ইবনু হাওশাব - আসমা বিনতে ইয়াযীদ رضي الله عنها - রাসূলুল্লাহ ﷺ।
ইমাম তিরমিযী رحمه الله বলেন—
هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
“এটি হাসান, গরীব হাদীস।”
—জামে‘ আত-তিরমিযী, হাদীস ১৯৩৯।
মুসনাদে আহমদের বর্ণনায়ও অনুরূপ হাদীস এসেছে; সেখানে শব্দ হলো—
لَا يَصْلُحُ الْكَذِبُ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ
“তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া মিথ্যা উপযুক্ত নয়।”
—মুসনাদ আহমদ, ২৭৬০৮।
২.
সহীহ মুসলিমের আরও শক্তিশালী বর্ণনা
হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা رضي الله عنها বলেন—
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَهُوَ يَقُولُ: لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ فَيَنْمِي خَيْرًا أَوْ يَقُولُ خَيْرًا.
“যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে এবং ভালো কথা পৌঁছে দেয় অথবা ভালো কথা বলে, সে নিন্দনীয় মিথ্যাবাদী নয়।”
এরপর তিনি বলেন—
وَلَمْ أَسْمَعْ يُرَخَّصُ فِي شَيْءٍ مِمَّا يَقُولُ النَّاسُ كَذِبٌ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ: الْحَرْبُ وَالْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ وَحَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا.
“মানুষ যেসব কথাকে মিথ্যা বলে, সেগুলোর মধ্যে আমি কেবল তিন ক্ষেত্রে রুখসতের কথা শুনেছি—যুদ্ধ, মানুষের মধ্যে মীমাংসা এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক কথাবার্তা।”
—সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬০৫।
সহীহ মুসলিমের সনদ
حَدَّثَنِي حَرْمَلَةُ بْنُ يَحْيَى أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ أَخْبَرَنِي يُونُسُ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ أَخْبَرَنِي حُمَيْدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ أَنَّ أُمَّهُ أُمَّ كُلْثُومٍ بِنْتَ عُقْبَةَ...
সনদের ধারাবাহিকতা:
হারমালা ইবনু ইয়াহইয়া - ইবনু ওয়াহব - ইউনুস - ইবনু শিহাব আয-যুহরী - হুমাইদ ইবনু আবদুর রহমান - তাঁর মা উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা رضي الله عنها - রাসূলুল্লাহ ﷺ।
এটি সহীহ মুসলিমের হাদীস হওয়ায় দলীলের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী।
৩.
‘মিথ্যাবাদী নয়’—এর অর্থ কি সব মিথ্যা হালাল?
না।
এখানেই হাদীসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
ইমাম নববী رحمه الله ব্যাখ্যা করেছেন—
مَعْنَاهُ لَيْسَ الْكَذَّابُ الْمَذْمُومُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ، بَلْ هَذَا مُحْسِنٌ
অর্থাৎ—
“এর অর্থ হলো, মানুষের মধ্যে মীমাংসা করতে যে ব্যক্তি এমন কথা বলে, সে নিন্দিত মিথ্যাবাদী নয়; বরং সে একজন সৎকর্মশীল ব্যক্তি।”
—শরহু সহীহ মুসলিম, باب تحريم الكذب وبيان المباح منه।
অর্থাৎ এখানে উদ্দেশ্য মিথ্যাকে পছন্দনীয় করে তোলা নয়; বরং একটি বৃহত্তর শরয়ী কল্যাণ অর্জনের জন্য সীমিত অনুমতি দেওয়া।
৪.
প্রথম ক্ষেত্র : স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি
হাদীসে এসেছে—
حَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ، وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا
“স্বামী তার স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তার স্বামীকে যে কথা বলে।”
এর উদ্দেশ্য হলো—
ভালোবাসা বৃদ্ধি করা,
মন জয় করা,
দাম্পত্য সম্পর্ক মধুর করা,
পরস্পরের হৃদয় ভাঙা থেকে বেঁচে থাকা।
যেমন স্বামী স্ত্রীকে বলে—
“তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।”
অথবা স্ত্রী স্বামীকে বলে—
“তোমার মতো স্বামী পেয়ে আমি সত্যিই সৌভাগ্যবান।”
এ ধরনের ভালোবাসা প্রকাশের কথায় যদি সামান্য অতিরঞ্জনও থাকে, তা এই রুখসতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কিন্তু এর অর্থ কখনোই এই নয় যে—
“স্ত্রীর সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে।”
“স্বামীর অধিকার নষ্ট করে মিথ্যা বলা যাবে।”
“অন্য নারীর সঙ্গে হারাম সম্পর্ক গোপন করা যাবে।”
“ঋণ, আমানত বা আর্থিক প্রতারণা করা যাবে।”
ইমাম সুয়ূতী رحمه الله-এর ব্যাখ্যায় স্পষ্ট হয়েছে—স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে ভালোবাসা প্রকাশ ও এমন প্রতিশ্রুতির রুখসত আছে যা আবশ্যিক অধিকার নষ্ট করে না; কিন্তু কারও অধিকার ঠকানো বা সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা বলা সর্বসম্মতভাবে হারাম।
৫.
দ্বিতীয় ক্ষেত্র : যুদ্ধ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
الْحَرْبُ خَدْعَةٌ
“যুদ্ধ হলো কৌশল।”
—সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।
যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে সামরিক তথ্য না দেওয়া, নিজের পরিকল্পনা গোপন রাখা, শত্রুকে বিভ্রান্ত করার কৌশল গ্রহণ করা—এসব বৈধ হতে পারে।
কারণ এখানে উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়; বরং মুসলিমদের জীবন, নিরাপত্তা ও বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা।
কিন্তু এটিও সীমাহীন নয়।
যুদ্ধের নামে—
নিরপরাধ মানুষের অধিকার নষ্ট করা,
চুক্তি ভঙ্গ করা,
বিশ্বাসঘাতকতা করা,
আমানতদার ব্যক্তিকে প্রতারণা করা
শরিয়তের অনুমোদিত ‘কৌশল’ হয়ে যায় না।
৬.
তৃতীয় ক্ষেত্র : মানুষের মধ্যে মীমাংসা
এটি হাদীসটির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক।
দুই মুসলমানের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে।
একজন বলছে—
“সে আমাকে অপমান করেছে।”
অন্যজন বলছে—
“আমি আর তার সঙ্গে কখনো কথা বলব না।”
তখন একজন মুমিন এগিয়ে এলো।
সে যদি দুজনের কাছে গিয়ে বলে—
“ভাই, সে তোমার ব্যাপারে ভালো কথাই বলেছে। সে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করতে চায়।”
যদিও কথাটি পুরোপুরি বাস্তবতার সঙ্গে মিলে না—কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় দুই মুসলমানের হৃদয়ের বরফ গলানো, তাহলে হাদীসের রুখসতের মধ্যে এটি পড়তে পারে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ، فَيَنْمِي خَيْرًا أَوْ يَقُولُ خَيْرًا.
“যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে এবং ভালো কথা পৌঁছে দেয় বা ভালো কথা বলে, সে মিথ্যাবাদী নয়।”
—সহীহ মুসলিম ২৬০৫; সহীহ বুখারী ২৬৯২।
৭.
কী আশ্চর্য! সত্য কথা বলেও মানুষ গুনাহগার হতে পারে!
একজন লোক দুই বন্ধুর ঝগড়া মেটাতে গেল।
একজন বলল—
“সে আমার সম্পর্কে কী বলেছে?”
সে যদি সত্য কথাই বলে—
“সে তোমাকে খুব খারাপ বলেছে।”
ফলাফল কী হলো?
ঝগড়া বেড়ে গেল।
অথচ সে সত্য বলেছে!
কিন্তু সে নামীমা করেছে।
অন্যদিকে যদি সে বলে—
“সে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করতে চায়।”
এবং উদ্দেশ্য হয় সত্যিই তাদের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা—তাহলে শরিয়ত তাকে বিশেষ রুখসত দিয়েছে।
এখানে শিক্ষা হলো:
শুধু ‘আমি সত্য বলেছি’—এটাই যথেষ্ট নয়। সত্য কথাটি বলার ফলে শরিয়তসম্মত ফল হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচ্য।
৮.
ইমাম গাযালী رحمه الله : মিথ্যার আসল সমস্যা কোথায়?
ইমাম গাযালী رحمه الله মিথ্যার আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, মিথ্যা নিন্দনীয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এতে মানুষের ক্ষতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে বৃহত্তর শরয়ী কল্যাণ অর্জনের জন্য রুখসত আসে, তখন বিষয়টি ভিন্ন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে—
“যেখানে আমার লাভ আছে, সেখানে মিথ্যা বলা যাবে।”
বরং শরিয়তের মাপকাঠি হলো—
مصلحت شرعية معتبرة
অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য শরয়ী কল্যাণ।
৯.
ইমাম নববী رحمه الله-এর গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি ব্যাখ্যা
ইমাম নববী رحمه الله বলেন, আলেমগণ এই তিন ক্ষেত্রে অনুমোদিত মিথ্যার ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
একদল বলেছেন, প্রয়োজনীয় কল্যাণের ক্ষেত্রে প্রকৃত মিথ্যারও অনুমতি রয়েছে।
আরেকদল আলেম—যেমন ইমাম তাবারী رحمه الله—বলেছেন, সম্ভব হলে তাওরিয়া ও তাওরীজ/মাআরীয (معاريض) ব্যবহার করা উচিত; অর্থাৎ এমন দ্ব্যর্থবোধক কথা বলা, যার একটি অর্থ শ্রোতা বুঝবে, আর বক্তা অন্য সত্য অর্থ উদ্দেশ্য করবে।
ইমাম নববীর আলোচনায় এই মতভেদ বিস্তারিতভাবে এসেছে।
১০.
তাই মিথ্যার আগে ‘তাওরিয়া’ খুঁজে নিন
একজন জ্ঞানী মানুষ সরাসরি মিথ্যার দিকে দৌড়াবেন না।
আগে দেখবেন—সত্যের কোনো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়ে কি সমস্যার সমাধান করা যায়?
এটাই معاريض বা তাওরিয়ার সৌন্দর্য।
উদাহরণ:
কোনো জালিম একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে খুঁজছে।
সে জিজ্ঞেস করল—
“লোকটি কোথায়?”
সরাসরি মিথ্যা বলার আগে এমন সত্য বাক্য ব্যবহার করা সম্ভব কি না—যা তার উদ্দেশ্য পূরণ করবে এবং নিরপরাধ ব্যক্তিকে রক্ষা করবে—তা দেখা হবে।
কারণ শরিয়তের মূলনীতি:
إذا أمكن التورية فلا يُعدل إلى الكذب
“তাওরিয়ার মাধ্যমে উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব হলে সরাসরি মিথ্যার দিকে যাওয়া উচিত নয়।”
১১.
তবে কখন মিথ্যা ‘ওয়াজিব’ও হতে পারে?
এখানে বিষয়টি আরও গভীর।
যদি কোনো নিরপরাধ মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতে একজন জালিম আসে এবং তাকে রক্ষা করার জন্য মিথ্যা বলা ছাড়া কোনো উপায় না থাকে—তাহলে শুধু ‘মিথ্যা বলা জায়েয’ বলেই থেমে যাওয়া যথেষ্ট নয়।
বরং নিরপরাধের জীবন রক্ষা করা যদি শরয়ীভাবে আবশ্যক হয়, তাহলে তাকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাও আবশ্যক হতে পারে।
ইমাম নববী رحمه الله-এর আলোচনায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে মিথ্যার হুকুম উদ্দেশ্যের হুকুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কথা এসেছে।
অর্থাৎ:
কখনো মিথ্যা জায়েয, কখনো মুস্তাহাব, এমনকি বিশেষ পরিস্থিতিতে ওয়াজিবও হতে পারে—কিন্তু সবকিছুই শরয়ী প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী।
১২.
‘তিন ক্ষেত্র’ মানে কি তিনটির বাইরে কখনোই কোনো রুখসত নেই?
এখানে আলেমদের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।
হাদীসটি মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্র উল্লেখ করেছে। কিন্তু ফকীহগণ এর পেছনে একটি সাধারণ নীতি লক্ষ্য করেছেন:
যেখানে সত্য বললে গুরুতর অন্যায় ও ক্ষতি সৃষ্টি হবে এবং শরয়ী কল্যাণ অর্জনের জন্য মিথ্যা ছাড়া কার্যকর কোনো পথ থাকবে না—সেখানে প্রয়োজনের পরিমাণে রুখসত হতে পারে।
ইমাম নববীর শরহে এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
তবে এখানে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
নিজের ব্যবসায়িক লাভ—
শরয়ী مصلحت নয়।
নিজের অপরাধ গোপন করা—
শরয়ী مصلحت নয়।
কারও হক মেরে দেওয়া—
শরয়ী مصلحت নয়।
আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া—
শরয়ী مصلحت নয়।
অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ—
শরয়ী مصلحت নয়।
নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য নিরপরাধ ব্যক্তিকে দোষী বানানো—
শরয়ী مصلحت নয়।
১৩.
মিথ্যার নামে আজকের সমাজের ভয়াবহ অপব্যবহার
আজ কেউ ব্যবসায় মিথ্যা বলে—
“আল্লাহর কসম, এটাই শেষ দাম!”
তারপর আরও দশজনকে একই কথা বলে।
কেউ বলে—
“আমি টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।”
অথচ পাঠায়নি।
কেউ বলে—
“আমি আপনার কথা কাউকে বলিনি।”
অথচ সবার কাছে বলে বেড়িয়েছে।
কেউ বলে—
“আমি আজ আসছি।”
অথচ আসার কোনো ইচ্ছাই নেই।
তারপর কেউ হাদীস শুনিয়ে বলে—
“ভাই, তিন জায়গায় তো মিথ্যা বলা জায়েয!”
এটি হাদীসের সঙ্গে চরম বেঈনসাফি।
হাদীস মিথ্যার লাইসেন্স নয়; হাদীস হলো জরুরি পরিস্থিতিতে শরিয়তের সীমিত রুখসতের ঘোষণা।
১৪.
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভাষায় মিথ্যার পরিণতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ
“মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।”
আর বলেছেন—
وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا
“মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যার অনুসন্ধান করতে থাকে, অবশেষে আল্লাহর কাছে তাকে মহামিথ্যাবাদী হিসেবে লিখে দেওয়া হয়।”
—সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
কী ভয়ংকর পরিচয়!
মানুষের কাছে হয়তো সে—
“ভালো মানুষ।”
কিন্তু আসমানে যদি লেখা থাকে—
كَذَّاب
“মহামিথ্যাবাদী”—
তাহলে তার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে?
১৫.
সালাফের শিক্ষা : সত্য শুধু মুখের গুণ নয়, ঈমানের গুণ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ
“আর যারা নিজেদের আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে।”
—সূরা আল-মু’মিনূন: ৮
সত্যবাদিতা শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়।
সত্যবাদিতা মানে—
কথা সত্য হওয়া,
প্রতিশ্রুতি সত্য হওয়া,
লেনদেন সত্য হওয়া,
আমানত সত্য হওয়া,
সাক্ষ্য সত্য হওয়া,
সম্পর্ক সত্য হওয়া,
নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস থাকা।
১৬.
মীমাংসাকারীর জন্য এক অনন্য শিক্ষা
দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে।
আপনি যদি তাদের মধ্যে আগুন বাড়ান—আপনার মুখের সত্য কথাও গুনাহের কারণ হতে পারে।
আর আপনি যদি তাদের হৃদয় জোড়েন—শরিয়ত আপনার জন্য বিশেষ রুখসত রেখেছে।
কুরআন বলে—
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ
“তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই; তবে যে ব্যক্তি দান-সদকা, সৎকাজ অথবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার নির্দেশ দেয়—তার কথা ভিন্ন।”
—সূরা আন-নিসা: ১১৪
এবং আল্লাহ বলেন—
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
“মীমাংসাই উত্তম।”
—সূরা আন-নিসা: ১২৮
১৭.
একজন মুমিনের জিহ্বা কেমন হবে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
—সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
এটি জিহ্বার জন্য এক মহা-নীতি।
সত্য? বলুন।
কল্যাণকর? বলুন।
মীমাংসা হবে? প্রয়োজনমতো বলুন।
কথা সত্য হলেও যদি তা নিছক আগুন বাড়ায়? নীরব থাকুন।
মিথ্যা বলে নিজের স্বার্থ রক্ষা? চুপ থাকুন।
মিথ্যা বলে কারও হক নষ্ট? কখনো নয়।
১৮.
‘মিথ্যার তিন রুখসত’—মনে রাখার পাঁচটি শর্ত
এই হাদীসের অপব্যবহার ঠেকাতে পাঁচটি বিষয় মনে রাখা জরুরী:
১. মূলনীতি হলো মিথ্যা হারাম
الأصل في الكذب التحريم
২. রুখসতের পেছনে শরয়ী উদ্দেশ্য থাকতে হবে
ব্যক্তিগত সুবিধা বা দুনিয়াবী লাভ যথেষ্ট নয়।
৩. যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই,
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বলা যাবে না।
৪. সম্ভব হলে তাওরিয়া উত্তম
সরাসরি মিথ্যার পরিবর্তে সত্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ব্যবহার করা নিরাপদ।
৫. কারও শরয়ী অধিকার নষ্ট করা যাবে না
স্বামী-স্ত্রীর রুখসতও অধিকার আত্মসাৎ করার অনুমতি নয়।
১৯.
এক হৃদয়স্পর্শী শিক্ষা
কখনো একটি সত্য কথা দুই ভাইকে দশ বছর দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
আর কখনো একটি অনুমোদিত ভালো কথা তাদের দশ বছরের বিচ্ছেদ শেষ করে দিতে পারে।
কখনো আপনি সত্য কথা বলে মানুষের হৃদয়ে বিষ ঢেলে দিতে পারেন।
আবার কখনো আপনি একটি কল্যাণকর কথা বলে দুটি ভাঙা হৃদয় জোড়া দিতে পারেন।
তাই মুমিনের প্রশ্ন শুধু—
“আমি যা বলছি তা কি সত্য?” এটুকু নয়।
বরং আরও প্রশ্ন করতে হবে—
“এটি বলা কি শরিয়তসম্মত?”
“এর দ্বারা কারও হক নষ্ট হবে কি?”
“এতে ফিতনা বাড়বে, নাকি কমবে?”
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলছি, নাকি নিজের স্বার্থের জন্য?”
২০.
শেষ কথা : মিথ্যার রুখসতকে পাপের দরজা বানাবেন না

রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মিথ্যার লাইসেন্স দেননি।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—
সত্যের সাধারণ নিয়ম অটুট থাকবে; তবে জীবন, যুদ্ধ, দাম্পত্য সম্পর্ক ও মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার মতো বিশেষ ক্ষেত্রে শরিয়ত সীমিত রুখসত দিয়েছে।
সুতরাং একজন আল্লাহভীরু মানুষের নীতি হবে—
أقول الحق ما استطعت ولا أعدل إلى الكذب إلا عند الحاجة الشرعية
“আমি যতটা সম্ভব সত্য বলব; আর শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া মিথ্যার দিকে যাব না।”
আর সম্ভব হলে—
التورية أولى من الكذب الصريح
“সরাসরি মিথ্যার চেয়ে তাওরিয়া উত্তম।”
কারণ জিহ্বা ছোট হলেও এর হিসাব বড়।
একটি মিথ্যা কখনো সংসার ভাঙে।
একটি মিথ্যা কখনো বন্ধুত্ব ধ্বংস করে।
একটি মিথ্যা কখনো নিরপরাধকে জেলে পাঠায়।
একটি মিথ্যা কখনো মানুষের সম্পদ গ্রাস করে।
আবার—
একটি কল্যাণকর কথা দুই ভাইকে মিলিয়ে দিতে পারে।
একটি ভালো কথা স্বামী-স্ত্রীর ভাঙা হৃদয় জুড়ে দিতে পারে।
একটি কৌশলী কথা যুদ্ধের ময়দানে বহু জীবন রক্ষা করতে পারে।
এই হলো ইসলামের ভারসাম্য—সত্যকে মূলনীতি বানানো, আর রুখসতকে রুখসত হিসেবেই রাখা।

সংক্ষিপ্ত দলীল-তালিকা
১. জামে‘ আত-তিরমিযী:
হাদীস ১৯৩৯ — আসমা বিনতে ইয়াযীদ رضي الله عنها-এর বর্ণনা; ইমাম তিরমিযী: حسن غريب।
২. সহীহ মুসলিম:
হাদীস ২৬০৫ — উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা رضي الله عنها; মানুষের মধ্যে মীমাংসা ও তিন ক্ষেত্রে রুখসতের বর্ণনা।
৩. সহীহ বুখারী:
হাদীস ২৬৯২ — لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ।
৪. মুসনাদ আহমদ:
হাদীস ২৭৬০৮ — আসমা رضي الله عنها-এর সূত্রে তিন ক্ষেত্রে রুখসতের বর্ণনা।
৫. শরহু সহীহ মুসলিম—ইমাম নববী رحمه الله:
মিথ্যার রুখসতের প্রকৃতি, তাওরিয়া ও মصلحة-ভিত্তিক ব্যাখ্যা।
৬. ‘রিয়াদুস সালিহীন’ ও সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা:
মানুষের মধ্যে মীমাংসা ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আমল।
এক বাক্যে পুরো বিষয়টি:
الكذب حرامٌ في الأصل ويُرَخَّصُ فيه بقدر الحاجة لتحقيق مصلحة شرعية ولا يجوز أن يكون وسيلةً إلى ظلمٍ أو أكلِ حقٍّ أو خيانةٍ أو خداعٍ.
“মিথ্যা মূলত হারাম; শরয়ী কল্যাণ অর্জনের জন্য প্রয়োজনের পরিমাণে এতে রুখসত হতে পারে। কিন্তু মিথ্যাকে কখনো জুলুম, অন্যের হক আত্মসাৎ, খিয়ানত বা প্রতারণার মাধ্যম বানানো যাবে না।”
দোয়া প্রার্থী
মুহাম্মাদ রফীউদ্দীন

"ইলম—স্মৃতি থেকে হৃদয়ে, হৃদয় থেকে আমলে"*আকাবিরে আসলাফের হৃদয়-নিংড়ানো বাণী ও জীবনাদর্শের আলোকে ছাত্র ও শিক্ষকের পথচলা*ভূম...
19/08/2026

"ইলম—স্মৃতি থেকে হৃদয়ে, হৃদয় থেকে আমলে"
*আকাবিরে আসলাফের হৃদয়-নিংড়ানো বাণী ও জীবনাদর্শের আলোকে ছাত্র ও শিক্ষকের পথচলা*

ভূমিকা : ইলম কি শুধু জানা, নাকি বদলে যাওয়ার নাম?
কেউ অনেক কিছু জানে—কিন্তু আল্লাহকে ভয় করে না।
কেউ শত শত কিতাব পড়েছে—কিন্তু তার জবান নিরাপদ নয়।
কেউ অসংখ্য মাসআলা মুখস্থ করেছে—কিন্তু নিজের নফসকে একটি মাসআলার ওপরও আমল করাতে পারেনি।
আবার এমন মানুষও ছিলেন, যাঁদের ইলম হয়তো আমাদের মতো অগণিত বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে ছিল না; কিন্তু তাঁদের জানা একটি আয়াত তাঁদের রাতের কান্না বদলে দিয়েছে, একটি হাদীস তাঁদের চরিত্র বদলে দিয়েছে, একটি নসীহত তাঁদের জীবন বদলে দিয়েছে।
এটাই ছিল সালাফের ইলম।
ইলম তাঁদের কাছে তথ্য ছিল না—ইলম ছিল হিদায়াত।
ইলম ছিল আল্লাহকে চেনার মাধ্যম।
ইলম ছিল নফস ভাঙার হাতিয়ার।
ইলম ছিল আমলকে সুন্দর করার আলো।
ইলম ছিল আখলাককে পরিশুদ্ধ করার পথ।
তাই প্রশ্ন শুধু—
“আমি কতটুকু জানি?”
প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“আমি যা জানি, তা আমাকে কতটুকু বদলেছে?”
১.
ইলমের প্রথম দরজা—ইখলাস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
“কর্মসমূহ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।”
হাওয়ালা: সহীহ আল-বুখারী, হাদীস ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯০৭।
একজন ছাত্র কিতাব খুলবার আগে যদি নিজের অন্তর খুলে নেয় এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করে—
“আমি কেন পড়ছি?”
আর একজন শিক্ষক দরসে বসার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করেন—
“আমি কেন পড়াচ্ছি?”
তাহলে ইলমের পথ আলোকিত হয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠিন সতর্কবাণী দিয়েছেন:
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ... لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا...
যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অর্জনীয় ইলম দুনিয়ার স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে অর্জন করে, তার জন্য ভয়াবহ পরিণতির সতর্কতা এসেছে।
হাওয়ালা: সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩৬৬৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস ২৫২।
সালাফের ভয় ছিল—ইলম যেন তাদের জন্য হুজ্জত না হয়ে যায়
ইমাম হাসান আল-বসরী رحمه الله-এর প্রতি সম্বন্ধিত একটি প্রসিদ্ধ বাণী:
العِلْمُ عِلْمَانِ: عِلْمٌ فِي الْقَلْبِ فَذَاكَ الْعِلْمُ النَّافِعُ، وَعِلْمٌ عَلَى اللِّسَانِ فَذَاكَ حُجَّةُ اللَّهِ عَلَى ابْنِ آدَمَ
“ইলম দুই প্রকার—এক ইলম অন্তরে; সেটিই উপকারী ইলম। আর এক ইলম জবানে; সেটি আদমসন্তানের বিরুদ্ধে আল্লাহর হুজ্জত।”
হাওয়ালা: ইবন আবদিল বার, جامع بيان العلم وفضله; বর্ণনাটি হাসান আল-বসরী رحمه الله-এর নামে প্রসিদ্ধ।
কী ভয়ংকর কথা!
ইলম যদি অন্তরে না নামে, তাহলে সেই ইলম একদিন আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হতে পারে।
২.
ইলমের সৌন্দর্য—খাশিয়ত
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।”
হাওয়ালা: সূরা ফাতির, ৩৫:২৮।
অর্থাৎ আলেমের পরিচয় শুধু তার মুখস্থ শক্তি নয়।
তার পরিচয় হলো—
তার অন্তরের খশিয়ত।
সে যত আল্লাহকে চেনে, তত আল্লাহকে ভয় করে।
সে যত ইলম অর্জন করে, তত নিজের অজ্ঞতা অনুভব করে।
সে যত বড় হয়, তত ছোট হয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়।
ইমাম আহমদ رحمه الله-এর জীবন আমাদের শেখায়—ইলমের সঙ্গে আমল ও সবরকে আলাদা করা যায় না।
তাঁদের কাছে “আলেম” হওয়া মানে ছিল না শুধু মানুষের সামনে কথা বলতে পারা; বরং আল্লাহর সামনে কাঁদতে পারা।
৩.
ইলমের আগে আদব—এটাই ছিল সালাফের মাদরাসা
ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক رحمه الله বলেন:
نَحْنُ إِلَى قَلِيلٍ مِنَ الْأَدَبِ أَحْوَجُ مِنَّا إِلَى كَثِيرٍ مِنَ الْعِلْمِ
“অনেক ইলমের চেয়ে অল্প আদবের আমাদের প্রয়োজন বেশি।”
হাওয়ালা: ইবনুল মুবারক, الزهد والرقائق; অনুরূপ বাণী جامع بيان العلم وفضله-এও এসেছে।
আর ইমাম মালিক رحمه الله-এর কাছে তাঁর মা বলতেন বলে জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে—
“রবী‘আহর কাছে যাও; তার ইলমের আগে তার আদব শিখো।”
এ কারণেই সালাফের ছাত্ররা শুধু কিতাব বহন করতেন না—তাঁরা উস্তাদের কাছ থেকে আদব বহন করতেন।
আজ আমরা ছাত্রকে শেখাই—
কীভাবে পরীক্ষায় ভালো করতে হয়।
সালাফের মাদরাসা শেখাত—
কীভাবে মানুষ হতে হয়।
৪.
ইবনুল মুবারকের কাছে আদব ছিল ইলমের সৌন্দর্য
ইবনুল মুবারক رحمه الله বলেছেন:
نَحْنُ إِلَى قَلِيلٍ مِنَ الْأَدَبِ أَحْوَجُ مِنَّا إِلَى كَثِيرٍ مِنَ الْعِلْمِ
অর্থাৎ—
“অনেক ইলমের তুলনায় অল্প আদবের প্রয়োজন আমাদের বেশি।”
একজন ছাত্র যদি—
কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টাতে পারে, কিন্তু উস্তাদের সামনে অহংকার করে;
হাদীসের সনদ বলতে পারে, কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে;
ফিকহের মাসআলা জানে, কিন্তু মানুষের হক নষ্ট করে;
তাহলে তার ইলমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখনো শূন্য।
৫.
সালাফের কাছে দশ আয়াত মানে দশটি পরিবর্তন
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ رضي الله عنه থেকে প্রসিদ্ধ বর্ণনা:
كَانَ الرَّجُلُ مِنَّا إِذَا تَعَلَّمَ عَشْرَ آيَاتٍ لَمْ يُجَاوِزْهُنَّ حَتَّى يَعْرِفَ مَعَانِيَهُنَّ وَالْعَمَلَ بِهِنَّ
“আমাদের কেউ যখন দশটি আয়াত শিখত, তখন সেগুলোর অর্থ ও সে অনুযায়ী আমল না জানা পর্যন্ত পরবর্তী আয়াত অতিক্রম করত না।”
হাওয়ালা: তাফসীর আত-তাবারী, সূরা আল-বাকারা ২:১২১-এর তাফসীর; ইবন কাসীর, একই আয়াতের তাফসীর। বর্ণনাটির বিভিন্ন সূত্র ও শব্দে কিছু পার্থক্য আছে।
এখানে শিক্ষার একটি বিপ্লবী নীতি রয়েছে—
কম পড়ো, কিন্তু গভীরভাবে পড়ো।
একটি আয়াত পড়ো।
তার অর্থ বোঝো।
নিজেকে প্রশ্ন করো—
“আল্লাহ এখানে আমাকে কী করতে বলেছেন?”
তারপর জীবনে নামিয়ে আনো।
তখন একটি আয়াত তোমার শিক্ষক হয়ে যাবে।
৬.
ইলম যত বাড়বে—“আমি জানি না” বলার সাহস তত বাড়বে
সালাফের অন্যতম সৌন্দর্য ছিল—তাঁরা না জানলে বলতে লজ্জা পেতেন না:
لَا أَدْرِي
“আমি জানি না।”
ইমাম মালিক رحمه الله-এর কাছে বহু প্রশ্ন করা হয়েছিল। বহু প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন—
لَا أَدْرِي
“আমি জানি না।”
এমনকি মানুষ বিস্মিত হলে তিনি নিজের মর্যাদার দিকে না তাকিয়ে সত্যের দিকে তাকিয়েছেন।
কারণ—
“আমি জানি না” বলা ইলমের দুর্বলতা নয়; বরং ইলমের আমানতদারিতা।
যে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়, সে হয়তো আলেম হতে চায়।
আর যে ভুল উত্তর দেওয়ার ভয় করে, সে সত্যিই আল্লাহকে ভয় করে।
৭.
ইমাম মালিকের মজলিস—ইলমের সঙ্গে হায়বা
ইমাম মালিক رحمه الله-এর মজলিসের বর্ণনাগুলোতে তাঁর ইলমের মর্যাদা, হাদীসের প্রতি সম্মান এবং মজলিসের আদব বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।
হাদীস পড়ানোর সময় তাঁর অন্তরে হাদীসের প্রতি এমন সম্মান প্রকাশ পেত যে, তাঁর কাছে হাদীস শুধু একটি “বিষয়” ছিল না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথা ছিল তাঁর কাছে আমানত।
এটাই আমাদের শিক্ষা—
কুরআনের আয়াত পড়ার সময় হৃদয় কাঁপে কি?
হাদীস পড়ার সময় চোখ নত হয় কি?
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নাম উচ্চারিত হলে দরুদ পড়ে হৃদয় নরম হয় কি?
যদি না হয়, তাহলে আমাদের শুধু জ্ঞান বাড়ছে—তাযীম বাড়ছে না।
৮.
ইমাম শাফেয়ী رحمه الله—ইলমের সঙ্গে গুনাহের সম্পর্ক
ইমাম শাফেয়ী رحمه الله-এর স্মৃতিশক্তি নিয়ে প্রসিদ্ধ কবিতাটি:
شَكَوْتُ إِلَى وَكِيعٍ سُوءَ حِفْظِي
فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَرْكِ الْمَعَاصِي
“আমি ওয়াকী‘-এর কাছে আমার দুর্বল স্মৃতির অভিযোগ করলাম; তিনি আমাকে গুনাহ ত্যাগের দিকে পথনির্দেশ করলেন।”
এটি খুব প্রসিদ্ধ হলেও এটিকে সহীহ হাদীস বা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে পেশ করা উচিত নয়। এর সূত্র নিয়ে আলেমদের আলোচনা রয়েছে।
তবে এর ভেতরের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর—
গুনাহ অন্তরের আলোকে দুর্বল করে।
তাই যে ছাত্র ইলমের নূর চায়, তাকে নফসের অন্ধকারের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হবে।
মোবাইলের পর্দায় কী দেখি?
একাকী অবস্থায় কী করি?
মানুষ না দেখলেও আল্লাহকে ভয় করি কি?
এগুলোই ইলমের আসল পরীক্ষা।
৯.
ইমাম আহমদ رحمه الله—ইলমের জন্য আজীবন সফর
ইমাম আহমদ رحمه الله-এর জীবন আমাদের শেখায়—ইলম আরামের বস্তু নয়।
হাদীসের জন্য সফর।
উস্তাদের জন্য সফর।
একটি বর্ণনার জন্য সফর।
একটি সত্য যাচাইয়ের জন্য সফর।
আজ আমরা কখনো কখনো বলি—
“ক্লাসে যেতে একটু কষ্ট হয়।”
সালাফ যেন আমাদের জিজ্ঞেস করছেন—
“তোমরা কি সত্যিই ইলম চাও?”
যে ইলমের জন্য রাত জাগতে হয় না, নফস ভাঙতে হয় না, সময় দিতে হয় না, কষ্ট করতে হয় না—সে ইলমের গভীরতা কতটুকু?
১০.
ছাত্রের আদব—উস্তাদের সামনে নিজের অহংকার রেখে আসা
সত্যিকারের ছাত্র উস্তাদের সামনে নিজেকে জাহির করতে যায় না।
সে যায় শিখতে।
সে প্রশ্ন করবে—কিন্তু প্রদর্শনের জন্য নয়।
সে মতামত দেবে—কিন্তু অহংকারের সঙ্গে নয়।
সে ভুল ধরিয়ে দেবে—কিন্তু অপমানের জন্য নয়।
কারণ—
ইলমের দরজায় অহংকার নিয়ে প্রবেশ করলে জ্ঞান হৃদয়ে প্রবেশ করতে কষ্ট হয়।
আল্লাহ বলেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“তোমরা যদি না জানো, জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।”
হাওয়ালা: সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৩।
১১.
উস্তাদের সম্মান—কিন্তু সত্যের ঊর্ধ্বে কেউ নয়
ইমাম মালিক رحمه الله-এর নামে প্রসিদ্ধ:
كُلٌّ يُؤْخَذُ مِنْ قَوْلِهِ وَيُرَدُّ إِلَّا صَاحِبَ هَذَا الْقَبْرِ
“প্রত্যেকের কথাই গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে, এই কবরের অধিবাসী ছাড়া।”
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ ছাড়া কোনো মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নন।
এখানে ইসলামের ভারসাম্য—
উস্তাদের সম্মান থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিপূজা থাকবে না।
আদব থাকবে, কিন্তু অন্ধ অনুসরণ থাকবে না।
মুহাব্বত থাকবে, কিন্তু হককে ব্যক্তির সঙ্গে বাঁধা হবে না।
১২.
একজন শিক্ষক—শুধু শিক্ষক নন, তিনি একজন “মুরাব্বি”
একজন শিক্ষক যদি শুধু বলেন—
“নামাজ পড়ো”—
তাহলে তিনি একজন বক্তা।
কিন্তু তিনি যদি নিজে জামাতের আগে মসজিদে পৌঁছে যান এবং ছাত্র তাঁকে দেখে নামাজের স্বাদ শেখে—
তাহলে তিনি মুরাব্বি।
তিনি যদি বলেন—
“মিথ্যা বলবে না”—
কিন্তু নিজে ভুল হলে ছাত্রের কাছে বলেন—
“বাবা, এখানে আমার ভুল হয়েছে।”
তাহলে ছাত্র সততার জীবন্ত পাঠ পায়।
তিনি যদি বলেন—
“রাগ নিয়ন্ত্রণ করো”—
কিন্তু ছাত্র দেখে অপমানের পরও তাঁর মুখে ধৈর্য—
তাহলে ছাত্র একটি হাদীস মুখস্থ করেনি; একটি হাদীসকে জীবন্ত দেখেছে।
১৩.
উস্তাদের একটি আচরণ—শত বক্তৃতার চেয়ে শক্তিশালী
ছাত্র কখনো কখনো উস্তাদের একটি বাক্য ভুলে যাবে।
একটি দীর্ঘ দরসও ভুলে যেতে পারে।
কিন্তু উস্তাদের—
একটি কান্না,
একটি সিজদা,
একটি ক্ষমা,
একটি বিনয়,
একটি অসহায় মানুষের প্রতি মমতা,
একটি ভুল স্বীকার—
এসব তার হৃদয়ে বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে।
তাই শিক্ষককে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—
“আমার ছাত্ররা আমার বক্তব্য মনে রাখবে, নাকি আমার চরিত্র?”
১৪.
শিক্ষকও ছাত্র—ইলমের কোনো শেষ নেই
আল্লাহ তাঁর নবী ﷺ-কে বলেছেন:
وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا
“বলুন, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।”
হাওয়ালা: সূরা ত্বহা, ২০:১১৪।
যাঁকে আল্লাহ বলেন—
“رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا”
তাঁর উম্মতের একজন শিক্ষক কীভাবে বলতে পারেন—
“আমি সব জানি”?
যে আলেমের মুখে আজও—
“আমি জানি না”,
“আমি যাচাই করে বলব”,
“আমি ভুল করেছি”—
এই শব্দগুলো থাকে, তিনি ইলমের আমানতদার।
১৫.
আকাবিরের ইলম—তাঁদের বিনয়েই প্রকাশ পেত
ইবন আব্বাস رضي الله عنهما-এর সঙ্গে মানুষের আচরণ এবং তাঁর ইলম অর্জনের আগ্রহের ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়—বড় আলেম হওয়া মানে মানুষের ওপর বড় হওয়া নয়।
বরং—
যত ইলম, তত বিনয়।
যত ফযীলত, তত ভয়।
যত মর্যাদা, তত দায়িত্ব।
ইমাম বুখারী رحمه الله, ইমাম মুসলিম رحمه الله, ইমাম আবু হানীফা رحمه الله, ইমাম মালিক رحمه الله, ইমাম শাফেয়ী رحمه الله, ইমাম আহমদ رحمه الله—এই মহান ইমামদের জীবনে ইলমের পাশাপাশি তাকওয়া, ইখলাস, সবর ও আত্মসংযম ছিল তাঁদের পরিচয়ের অংশ।
১৬.
ইমাম আবু হানীফা رحمه الله—ইলমের সঙ্গে ওয়ারা‘
ইমাম আবু হানীফা رحمه الله-এর জীবন বিশেষভাবে আমাদের শেখায়—
ইলম শুধু হালাল-হারামের সংজ্ঞা জানা নয়; বরং হারামের আশঙ্কা থেকেও নিজেকে দূরে রাখা।
ওয়ারা‘ বা পরহেজগারি এমন এক গুণ, যা মানুষকে সন্দেহজনক বিষয় থেকেও বাঁচায়।
একজন ছাত্র যদি হাজার মাসআলা জানে, কিন্তু সন্দেহজনক বিষয়ে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে তার ইলমের আত্মা দুর্বল।
১৭.
ইলমের সবচেয়ে বড় শত্রু—কিবর
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
হাওয়ালা: সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯১।
ইলম অর্জন করতে করতে যদি মনে হয়—
“আমি ওর চেয়ে বেশি জানি।”
“ও আমার সামনে বসার যোগ্য নয়।”
“আমার কথা কেউ খণ্ডন করতে পারবে না।”
“আমি ভুল করতে পারি না।”
তাহলে সাবধান!
সম্ভবত কিতাবের পৃষ্ঠা বাড়ছে—
কিন্তু অন্তরের রোগও বাড়ছে।
১৮.
প্রকৃত আলেমের একটি চিহ্ন—সে নিজের নফসকে সন্দেহ করে
সালাফ নিজেদের ব্যাপারে অত্যন্ত ভীত ছিলেন।
তাঁরা মানুষের প্রশংসায় আনন্দিত হওয়ার চেয়ে নিজের আমল কবুল হয়েছে কি না—এ নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন।
এ কারণেই আমাদেরও প্রতিদিন আত্মসমালোচনা করা দরকার:
আজ আমি কতটুকু পড়েছি?
তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—
আজ আমি কতটুকু বদলেছি?
আজ কত হাদীস শিখেছি?
তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—
আজ কত গুনাহ ছেড়েছি?
আজ কত মাসআলা জেনেছি?
তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—
আজ কত মানুষের হক আদায় করেছি?
১৯.
শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় সাফল্য—ছাত্রের চরিত্রে নিজের শিক্ষা দেখা
একজন শিক্ষক একশ ছাত্র পড়াতে পারেন।
হাজার ছাত্র পড়াতে পারেন।
কিন্তু যদি তাঁর ছাত্ররা—
নামাজে দাঁড়ায়,
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে,
মা-বাবাকে সম্মান করে,
হারাম থেকে বাঁচে,
মানুষকে ক্ষমা করে,
সত্য কথা বলে,
উস্তাদের জন্য গোপনে দোয়া করে—
তাহলে সেই শিক্ষক সফল।
কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
“যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখায়, সে তা সম্পাদনকারীর অনুরূপ সওয়াব পায়।”
হাওয়ালা: জামে‘ আত-তিরমিযী, হাদীস ২৬৭৪।
আর সহীহ মুসলিমে এসেছে:
أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ
“অথবা এমন ইলম, যার দ্বারা উপকার লাভ করা হয়।”
হাওয়ালা: সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৩১।
২০.
একজন ছাত্রের সবচেয়ে সুন্দর দোয়া—
“আল্লাহ আমার উস্তাদকে উত্তম প্রতিদান দিন”
যে উস্তাদ তাকে কুরআনের একটি অক্ষর শিখিয়েছেন—
তিনি শুধু একটি অক্ষর শেখাননি।
তিনি হয়তো তার জান্নাতের একটি দরজা খুলেছেন।
যে শিক্ষক তাকে একটি গুনাহ থেকে বাঁচিয়েছেন—
তিনি হয়তো তার পুরো জীবন বদলে দিয়েছেন।
যে উস্তাদ তাকে নামাজের স্বাদ দিয়েছেন—
তিনি হয়তো তার আখিরাতের পথ বদলে দিয়েছেন।
তাই প্রকৃত ছাত্রের অন্তরে উস্তাদের জন্য থাকবে—
দোয়া।
সম্মান।
মুহাব্বত।
কৃতজ্ঞতা।
কিন্তু একই সঙ্গে সত্যের প্রতি আনুগত্য।
২১.
ছাত্রের জন্য দশটি অঙ্গীকার
১. আমি ইলম শিখব আল্লাহর জন্য।
২. আমি উস্তাদের সম্মান করব।
৩. আমি না বুঝলে প্রশ্ন করব, কিন্তু অহংকারের সঙ্গে নয়।
৪. আমি যা শিখব, তা আমল করার চেষ্টা করব।
৫. আমি নিজের ভুল স্বীকার করব।
৬. আমি অন্য ছাত্রকে ছোট করব না।
৭. আমি গুনাহ থেকে ইলমের নূরকে রক্ষা করব।
৮. আমি “আমি জানি না” বলতে লজ্জা পাব না।
৯. আমি উস্তাদের অনুপস্থিতিতেও তাঁর শেখানো আদব বজায় রাখব।
১০. আমি ইলমকে জীবনের অলংকার নয়—আখিরাতের পাথেয় বানাব।
২২.
শিক্ষকের জন্য দশটি অঙ্গীকার
১. আমি ইলমকে দুনিয়ার মর্যাদা অর্জনের সিঁড়ি বানাব না।
২. আমি যা বলি, নিজে আমল করার চেষ্টা করব।
৩. দুর্বল ছাত্রকে অবহেলা করব না।
৪. ছাত্রের ভুল সংশোধন করব, কিন্তু তার মর্যাদা নষ্ট করব না।
৫. ছাত্রকে শুধু তথ্য নয়—আদব শেখাব।
৬. নিজের ভুল হলে তা স্বীকার করব।
৭. ছাত্রের সফলতায় নিজের কৃতিত্ব নয়, আল্লাহর অনুগ্রহ দেখব।
৮. ছাত্রকে নিজের ব্যক্তিত্বের বন্দী নয়—কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী বানাব।
৯. ছাত্রের জন্য গোপনে দোয়া করব।
১০. মনে রাখব—একদিন আমাকে আমার ছাত্রদের সঙ্গে নয়, আমার আমল নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।
২৩.
শেষ প্রশ্ন—আমাদের ইলম কি আমাদের বদলাচ্ছে?
একটু থামুন।
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—
আমি এতদিন ধরে পড়ছি—
আমার নামাজ কি আগের চেয়ে সুন্দর হয়েছে?
আমি এত হাদীস শুনেছি—
আমার জবান কি আগের চেয়ে নিরাপদ হয়েছে?
আমি এত ফিকহ শিখেছি—
আমার লেনদেন কি আগের চেয়ে পবিত্র হয়েছে?
আমি এত তাফসীর পড়েছি—
আমার অন্তর কি আগের চেয়ে নরম হয়েছে?
আমি এত উস্তাদের সোহবত পেয়েছি—
আমার আদব কি আগের চেয়ে সুন্দর হয়েছে?
আমি এত ইলম অর্জন করেছি—
আমার একাকীত্ব কি আগের চেয়ে আল্লাহভীতিতে পূর্ণ হয়েছে?
যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়—
আলহামদুলিল্লাহ।
আর যদি উত্তর “না” হয়—
তাহলে নতুন কিতাব কেনার আগে হয়তো আমাদের প্রয়োজন পুরোনো ইলমকে নতুন করে জীবনে ফিরিয়ে আনা।
শেষ কথা : ইলমকে মস্তিষ্ক থেকে হৃদয়ে নামিয়ে আনুন
ইলম যখন শুধু মুখে থাকে—তা তথ্য।
ইলম যখন মস্তিষ্কে থাকে—তা জ্ঞান।
ইলম যখন হৃদয়ে নামে—তা হিদায়াত।
ইলম যখন চোখে পানি আনে—তা খাশিয়ত।
ইলম যখন চরিত্র বদলায়—তা নূর।
ইলম যখন গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে—তা তাকওয়া।
ইলম যখন অন্যের জীবন বদলায়—তা সদকায়ে জারিয়া।
আর ইলম যখন মানুষকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়—
তখনই ইলম তার প্রকৃত সৌন্দর্যে পৌঁছে যায়।
তাই আসুন—
শুধু “আলেম” হওয়ার চেষ্টা না করি;
ইলমওয়ালা মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি।
শুধু ছাত্র হওয়ার চেষ্টা না করি;
আদবওয়ালা ছাত্র হই।
শুধু শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা না করি;
মুরাব্বি হওয়ার চেষ্টা করি।
শুধু কিতাব শেষ করার চেষ্টা না করি;
নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করি।
কারণ শেষ পর্যন্ত আল্লাহ আমাদের জিজ্ঞেস করবেন না—
“তুমি কত পৃষ্ঠা পড়েছিলে?”
বরং আমাদের জীবন, আমল, নিয়ত ও দায়িত্বের হিসাব হবে।
হে আল্লাহ!
আমাদের এমন ইলম দান করুন—
যে ইলম আমাদের অহংকারী নয়, বিনয়ী করবে।
যে ইলম আমাদের বিতর্কপ্রিয় নয়, সত্যপ্রিয় করবে।
যে ইলম আমাদের মানুষের চোখে বড় নয়, আপনার কাছে প্রিয় করবে।
যে ইলম একাকীত্বে আপনাকে স্মরণ করাবে।
যে ইলম গোপন গুনাহ থেকে বাঁচাবে।
যে ইলম মা-বাবার খেদমত শেখাবে।
যে ইলম উস্তাদের সম্মান শেখাবে।
যে ইলম ছাত্রকে আদব শেখাবে।
যে ইলম শিক্ষককে ইখলাস শেখাবে।
যে ইলম আমাদের অন্তরকে জীবিত করবে।
হে আল্লাহ!
আমাদের দান করুন—
عِلْمًا نَافِعًا، وَقَلْبًا خَاشِعًا وَنَفْسًا قَانِعَةً وَعَمَلًا صَالِحًا وَأَدَبًا رَفِيعًا وَإِخْلَاصًا صَادِقًا
উপকারী ইলম, বিনীত হৃদয়, সন্তুষ্ট নফস, নেক আমল, উন্নত আদব এবং সত্যিকারের ইখলাস।
হে আল্লাহ!
আমাদের উস্তাদদের উত্তম প্রতিদান দিন।
তাঁদের ইলমে বরকত দিন।
তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন।
তাঁদের ইলমকে তাঁদের জন্য সদকায়ে জারিয়া বানিয়ে দিন।
আর আমাদের এমন ছাত্র বানান—
যাদের দেখে উস্তাদরা মৃত্যুর পরও বলতে পারেন:
“আলহামদুলিল্লাহ—আমার ইলম বৃথা যায়নি।”
আর আমাদের এমন শিক্ষক বানান—
যাঁদের চলে যাওয়ার পরও ছাত্রদের আমলে তাঁদের শিক্ষা জীবিত থাকে।
اللهم انفعنا بما علمتنا وعلمنا ما ينفعنا وزدنا علما.
“হে আল্লাহ! আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন তা দ্বারা আমাদের উপকৃত করুন, আমাদের এমন কিছু শিক্ষা দিন যা আমাদের উপকারে আসে এবং আমাদের ইলম বৃদ্ধি করুন।”
آمين يا رب العالمين
মুহতাজে দোয়া
মুহাম্মাদ রফীউদ্দীন
ভাইস প্রিন্সিপাল ও সিনিয়র মুহাদ্দিস
মাদরাসা বাইতুল উলূম, ঢালকানগর, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা।
ফোন নাম্বার- ০১৭১২-৬৩২২১৫

Address

শ্রীপুর চৌরাস্তা গাজীপুর
Gazipur
1740

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Madrasa Darus Salam Sreepur posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category