31/05/2026
হজ্জ শুধু একটি সফর নয়, এটি আত্মার পুনর্জন্ম। কেউ কাবার গিলাফ ছুঁয়ে আসে, আবার কেউ কাবার মালিকের সাথে সম্পর্ক গড়ে ফিরে আসে। তাই আলেমগণ বলেন, হজ্জ কবুল হওয়ার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো—হজ্জের পরে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসা।
এক ব্যক্তি ছিল, নাম ধরা যাক আবদুল্লাহ। বহু কষ্টে টাকা জমিয়ে তিনি হজ্জে গেলেন। আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে তিনি কাঁদলেন, মুযদালিফায় রাত কাটালেন, মিনায় জামারায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করলেন। বাহ্যিকভাবে সব কাজই তিনি সম্পন্ন করলেন। কিন্তু তার অন্তরের ভিতরে তখনও অহংকার, হিংসা, মানুষের প্রতি কষ্ট দেওয়ার স্বভাব রয়ে গেল। দেশে ফিরে আসার পরও তার ভাষা বদলালো না, নামাজে মন বসলো না, মানুষের হক আদায়ের অনুভূতি জাগলো না। লোকেরা তাকে “হাজী সাহেব” বলে ডাকত, কিন্তু তার চরিত্রে হজ্জের আলো ফুটে উঠলো না।
অন্যদিকে আরেক ব্যক্তি ছিলেন—নিঃশব্দ, সাধারণ এক মানুষ। হজ্জে গিয়ে তিনি মিনার প্রান্তরে দাঁড়িয়ে অনুভব করলেন, আসল শয়তান তো বাইরের নয়, নিজের নফসের ভিতরে লুকিয়ে আছে। যখন তিনি জামারায় পাথর মারছিলেন, তখন মনে মনে নিজের অহংকার, লোভ, গুনাহ আর কুপ্রবৃত্তিকেই আঘাত করছিলেন।
লোকমুখে একটি কথা প্রচলিত আছে—যাদের হজ্জ কবুল হয়, আল্লাহ তাআলা অদৃশ্যভাবে তাদের নিক্ষিপ্ত পাথরগুলো কবুল করে নেন; আর যাদের কবুল হয় না, পাথরগুলো সেখানেই পড়ে থাকে। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য শরয়ি দলিল নেই, তবু এর ভেতরে একটি গভীর ইশারা আছে—আল্লাহ শুধু পাথর দেখেন না, দেখেন অন্তরের অবস্থা।
সেই মানুষটি দেশে ফিরে এসে বদলে গেলেন। আগে যিনি নামাজে অবহেলা করতেন, এখন আজানের আগেই মসজিদে চলে যান। আগে মানুষের ভুল খুঁজতেন, এখন নিজের ভুলের জন্য কান্না করেন। আগে দুনিয়ার জন্য ব্যস্ত ছিলেন, এখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন সাজাতে শুরু করলেন। তার চোখে নম্রতা এল, কথায় মাধুর্য এল, অন্তরে আল্লাহর ভয় জন্ম নিল।
তখন গ্রামের এক বৃদ্ধ বললেন,
“হজ্জ কবুল হয়েছে কি না, তা কাবার দেয়াল বলে না; বলে মানুষের বদলে যাওয়া জীবন।”
হজ্জ কবুল হওয়ার কিছু নিদর্শন হলো—
গুনাহ থেকে ফিরে আসা।
নামাজ, কুরআন ও ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাওয়া।
মানুষের হক আদায়ে সচেতন হওয়া।
অহংকার কমে বিনয় বৃদ্ধি পাওয়া।
দুনিয়ার চেয়ে আখিরাতের চিন্তা বেশি হওয়া।
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর হওয়া।
আর হজ্জ কবুল না হওয়ার আশঙ্কাজনক লক্ষণ হলো—
হজ্জের পরেও গুনাহে ডুবে থাকা।
আগের মতোই জুলুম, প্রতারণা ও অন্যায় চালিয়ে যাওয়া।
ইবাদতের প্রতি উদাসীনতা রয়ে যাওয়া।
“আমি হাজী” এই অহংকারে মানুষের সম্মান কামনা করা।
কারণ, কবুল হজ্জের প্রতিদান শুধু “হাজী” উপাধি নয়; বরং পরিবর্তিত একটি জীবন এবং জান্নাতের সুসংবাদ।
✍️গাজী আশিক
31/05/2026
উমরাহর সফর : অশ্রু থেকে আত্মার প্রশান্তি
গ্রামের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন “গাজী হুজুর” নামে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, দ্বীনের দাওয়াত, মানুষকে নসীহত—এসব নিয়েই কেটে যাচ্ছিল তার জীবন। বাইরে থেকে সবাই তাকে সুখী ভাবলেও তার অন্তরের গভীরে ছিল এক অদৃশ্য অশান্তি।
রাতের নির্জনে তিনি প্রায়ই ভাবতেন—
“আমি মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকছি, কিন্তু আমার নিজের আমল কি আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে?”
এক রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে দীর্ঘ সিজদায় পড়ে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। কাঁপা কণ্ঠে শুধু বললেন—
“হে আল্লাহ! জীবনে একবার শুধু তোমার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দাও।”
মানুষ যখন অন্তরের গভীর থেকে আল্লাহকে ডাকে, তখন আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন গাজী হুজুরের সেই আকাঙ্ক্ষা কবুল করলেন। তার হৃদয়ের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ হতে চলল—তিনি উমরাহর সফরে রওনা হলেন।
কাবাঘর প্রথম দেখার মুহূর্ত
মক্কায় পৌঁছানোর পর যেদিন প্রথম তিনি মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন, সেদিন রাতের আকাশ ছিল নিস্তব্ধ। মানুষের ঢল ধীরে ধীরে বাইতুল্লাহর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
গাজী হুজুরও কাঁপা পায়ে সামনে এগোলেন।
হঠাৎ যখন তার দৃষ্টি কাবাঘরের উপর পড়ল, তখন তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বুকভরা কান্না নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার মনে হচ্ছিল—
দুনিয়ার সমস্ত ক্লান্তি, পাপ আর অশান্তি যেন কাবার সামনে এসে ভেঙে পড়ছে।
তার অন্তর থেকে শুধু একটি কথাই বের হচ্ছিল—
“হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ডেকেছ, এটাই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
তাওয়াফের মাঝে উপলব্ধি
তাওয়াফ করতে করতে গাজী হুজুর ভাবছিলেন—
“মানুষ সারা জীবন দুনিয়ার পিছনে ঘুরে বেড়ায়, অথচ মুমিনের হৃদয় ঘুরে শুধু তার রবের ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে।”
সাফা-মারওয়ার সাঈ করতে গিয়ে তার মনে পড়ল হযরত হাজেরা (আ.)-এর ত্যাগের ইতিহাস। তিনি অনুভব করলেন—
আল্লাহর জন্য করা দৌড় কখনো বৃথা যায় না।
মদিনায় এক আত্মিক পরিবর্তন
উমরাহ শেষে তিনি মদিনায় গেলেন। প্রিয় নবী ﷺ-এর রওজার সামনে দাঁড়িয়ে দরুদ পড়তে পড়তে তার চোখ আবার ভিজে উঠল।
তার হৃদয়ের ভেতর থেকে যেন একটি আওয়াজ আসছিল—
“হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমরা আপনার সুন্নাহ থেকে কত দূরে সরে গেছি!”
সেদিন রাতে তিনি এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলেন। মনে হচ্ছিল—
তার অন্তরের বহু বছরের ভার যেন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে।
দেশে ফিরে নতুন মানুষ
দেশে ফিরে গ্রামের মানুষ দেখল— গাজী হুজুর যেন বদলে গেছেন। তার কথায় আগের চেয়ে আরও কোমলতা এসেছে, চোখে এসেছে অদ্ভুত নূর, আর ইবাদতে এসেছে গভীর এক একাগ্রতা।
একদিন এক যুবক তাকে জিজ্ঞেস করল—
“হুজুর, উমরাহর সবচেয়ে বড় ফজিলত কী?”
গাজী হুজুর মুচকি হেসে বললেন—
“উমরাহ মানুষকে শুধু কাবার কাছে নিয়ে যায় না; বরং নিজের রবের কাছেও ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে মানুষ বুঝতে পারে— দুনিয়ার সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসাই চিরস্থায়ী।”
তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন—
“যে হৃদয় একবার বাইতুল্লাহর সামনে কেঁদেছে, সে হৃদয় আর আগের মতো থাকে না।”
✍️গাজী আশিক
30/05/2026
মানুষের জীবনে সম্পদ একটি নিয়ামত, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা কাউকে ধন-সম্পদ দিয়ে সম্মানিত করেন না; বরং পরীক্ষা করেন—সে এই সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করবে, নাকি আল্লাহর নাফরমানির পথে অপচয় করবে।
কত মানুষ আছে, যারা ভুলে যায় যে তাদের ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি সবই আল্লাহর দান। তারা মনে করে, নিজের যোগ্যতা, বুদ্ধি ও কৌশল দিয়েই সবকিছু অর্জন করেছে। ফলে সম্পদের নেশায় তারা আল্লাহকে ভুলে যায়, ইসলামের বিধানকে তুচ্ছজ্ঞান করে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে অবাধে অর্থ ব্যয় করে। কেউ অশ্লীলতা বিস্তারে অর্থ ব্যয় করে, কেউ গুনাহের আসর জমায়, কেউ দ্বীনের অনুসারীদের উপহাস করে, আবার কেউ ইসলামের খেদমতের পরিবর্তে শয়তানের কর্মসূচিকে শক্তিশালী করাকে গর্বের বিষয় মনে করে।
কিন্তু তারা কি ভেবে দেখেছে, যে সম্পদ আজ তাদের অহংকারের কারণ, সেই সম্পদই কিয়ামতের দিন তাদের জন্য জাহান্নামের আগুনে পরিণত হতে পারে? যে অর্থ দিয়ে তারা আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, সেই অর্থের প্রতিটি পয়সার হিসাব দিতে হবে। যে সম্পদকে তারা নিজের শক্তি মনে করেছে, সেই সম্পদ তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
কুরআনের ভাষায়, যারা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের কদর করে না এবং অবাধ্যতার পথে চলে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। দুনিয়াতে অনেক সময় মানুষ বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখে বিভ্রান্ত হয়, কিন্তু আল্লাহ যখন পাকড়াও করেন, তখন কোনো সম্পদ, কোনো ক্ষমতা, কোনো পরিচয় কাজে আসে না। ইতিহাসে কারূনের ধনভাণ্ডারও তাকে রক্ষা করতে পারেনি; বরং তার সম্পদই তার ধ্বংসের অন্যতম কারণ হয়েছিল।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, কিয়ামতের দিন একজন মানুষকে তার সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে। যদি সেই সম্পদ আল্লাহর নাফরমানি, মানুষের ক্ষতি, দ্বীনের বিরোধিতা কিংবা গুনাহের প্রসারে ব্যয় হয়ে থাকে, তবে সেই হিসাব হবে অত্যন্ত কঠিন। সেদিন সম্পদের গর্ব ভেঙে যাবে, অহংকার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে, কিন্তু অনুতাপ কোনো উপকারে আসবে না।
তাই জ্ঞানীর কাজ হলো, সম্পদকে নিজের শক্তি মনে না করে আল্লাহর আমানত মনে করা। কারণ যে সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় হয়, তা নাজাতের সোপান; আর যে সম্পদ আল্লাহর অসন্তুষ্টির পথে ব্যয় হয়, তা দুনিয়ার সাময়িক গৌরবের আড়ালে আখিরাতের ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সম্পদের মোহ, অহংকার ও নাফরমানি থেকে হেফাজত করুন এবং তাঁর দেওয়া নিয়ামতকে তাঁরই সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করার তাওফীক দান করুন। আমীন
✍️গাজী আশিক
30/05/2026
মিনায় অবস্থান: আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও ইবাদতের এক অনন্য মহড়া
পবিত্র হজের ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যে মিনায় অবস্থান একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত আমল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি যেন কেবল নির্দিষ্ট একটি স্থানে অবস্থানমাত্র; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা, আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
মিনা এমন এক পবিত্র ভূমি, যেখানে যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আত্মনিবেদন ও আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই জনপদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হযরত ইবরাহীম (আ.), হযরত ইসমাঈল (আ.) এবং হযরত হাজেরা (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় ত্যাগ, ধৈর্য ও আত্মসমর্পণের ইতিহাস, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
হাজিগণ যখন মিনায় অবস্থান করেন, তখন তারা মূলত আল্লাহ তাআলার নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কারণ মিনায় অবস্থানের পেছনে কোনো পার্থিব স্বার্থ, কোনো জাগতিক লাভ কিংবা কোনো দৃশ্যমান উপকারিতা নেই। এখানে রয়েছে কেবল একটি বিষয়—‘আল্লাহ আদেশ করেছেন, তাই পালন করছি।’ আর এটাই তো প্রকৃত ইবাদতের মর্মকথা।
মিনার তাঁবুগুলোতে অবস্থানকালে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো সকল মানুষ একই পরিবেশে বসবাস করেন। এতে মানুষের অন্তরে বিনয়, নম্রতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্যের চেতনা বিকশিত হয়। পৃথিবীর সকল কৃত্রিম বিভেদ যেন সেখানে বিলীন হয়ে যায়। মানুষ উপলব্ধি করতে শেখে, মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি সম্পদ বা বংশ নয়; বরং তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।
মিনায় অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং নানাবিধ কষ্টের মধ্যেও একজন হাজিকে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। এর মাধ্যমে মানুষ জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হাসিমুখে বরণ করে নেওয়ার শিক্ষা লাভ করে।
মিনার প্রতিটি মুহূর্ত মূলত জিকির, তাসবীহ, তিলাওয়াত, দোয়া ও আত্মসমালোচনার সময়। এই অবস্থান মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর জীবনও এক অস্থায়ী সফর। যেমন হাজিগণ কয়েক দিনের জন্য মিনার তাঁবুতে অবস্থান করেন, তেমনি দুনিয়ার জীবনও ক্ষণস্থায়ী; একদিন সবাইকে চিরস্থায়ী আবাস আখিরাতের দিকে যাত্রা করতে হবে।
সুতরাং মিনায় অবস্থান কেবল হজের একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি ঈমান, আনুগত্য, ধৈর্য, ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহমুখীতার এক মহাসম্মিলন। যে হৃদয় মিনার শিক্ষা আত্মস্থ করতে পারে, সে হৃদয় আল্লাহর প্রতি আরও বেশি নিবেদিত, বিনয়ী ও পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে মিনার প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন করার এবং সেই শিক্ষাকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়নের তাওফীক দান করুন। আমীন
✍️গাজী আশিক
29/05/2026
মুযদালিফা—এটি কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; বরং হজের সফরে এটি এমন এক রুহানী বিরতিক্ষণ, যেখানে আরাফাতের অশ্রুসিক্ত ময়দান থেকে ফিরে এসে হাজিগণ আল্লাহর দরবারে নিজেদের সর্বস্ব সমর্পণের এক অনুপম দৃশ্য উপস্থাপন করেন। দিনের প্রখর আর্তনাদ শেষে রাতের নিস্তব্ধতায় মুযদালিফা হয়ে ওঠে বান্দা ও রবের অন্তরঙ্গ সংলাপের এক পবিত্র প্রান্তর।
মুযদালিফার পরিচয় ও ইতিহাস
মক্কা ও মিনার মধ্যবর্তী পবিত্র স্থানটির নাম মুযদালিফা। একে “মাশ‘আরুল হারাম” বলেও অভিহিত করা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
“তোমরা যখন আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করবে, তখন মাশ‘আরুল হারামের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করবে।”
—সূরা আল-বাকারা : ১৯৮
এই আয়াতের মাধ্যমেই মুযদালিফার মর্যাদা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগের ইতিহাসে যেমন মিনার ভূমিকা রয়েছে, তেমনি হজের পরিপূর্ণতায় মুযদালিফাও একটি অপরিহার্য স্তম্ভস্বরূপ।
“মুযদালিফা” শব্দের অর্থ নৈকট্য লাভ করা, সান্নিধ্যে আসা। এখানে এসে হাজিগণ যেন আল্লাহর আরও নিকটে পৌঁছে যান। আরাফাতের কান্না এখানে এসে প্রশান্তির ধ্যানে রূপ নেয়।
কেন মুযদালিফায় অবস্থান করতে হয়?
আরাফাতে অবস্থানের পর ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের পরে হাজিগণ মুযদালিফায় আগমন করেন। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায় করা হয় এবং রাতযাপন করা হয়। এটি হজের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল।
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে মুযদালিফায় অবস্থান করেছেন এবং সাহাবায়ে কিরামকেও সেখানে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে—
রাসূল ﷺ মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করেন এবং ফজর ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সালাত আদায় করেন।
এই অবস্থানের মধ্যে বহু তাৎপর্য নিহিত রয়েছে—
এটি আল্লাহর নির্দেশ পালনের প্রতীক।
এটি ধৈর্য, কষ্টসহিষ্ণুতা ও আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়।
এটি দুনিয়াবিমুখ সরল জীবনের বাস্তব অনুশীলন।
এটি কিয়ামতের ময়দানের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি—যেখানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সবাই একই মাটিতে, একই আকাশের নিচে অবস্থান করে।
মুযদালিফার রজনী : আধ্যাত্মিক মহিমা
মুযদালিফার রাত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লক্ষ লক্ষ মানুষ খোলা আকাশের নিচে, কোনো বিলাসিতা ছাড়া, কেবল আল্লাহর স্মরণে রাত অতিবাহিত করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল।
এখানে মানুষ উপলব্ধি করে—
দুনিয়ার চাকচিক্য ক্ষণস্থায়ী,
প্রকৃত আশ্রয় কেবল আল্লাহ,
মৃত্যুর পরে মানুষকে এমনই নিরুপায় অবস্থায় রবের সামনে দাঁড়াতে হবে।
মুযদালিফার মাটিতে শয়ন করা যেন মানুষকে কবরের নিঃসঙ্গতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই অনেক আরিফ ও বুযুর্গ বলেছেন, “মুযদালিফা হলো আত্মশুদ্ধির রজনী।”
মুযদালিফার গুরুত্বপূর্ণ আমল
মুযদালিফায় হাজিদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে—
১. মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায় করা।
২. খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করা।
৩. অধিক পরিমাণে যিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
৪. মিনায় শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য কঙ্কর সংগ্রহ করা।
৫. ফজরের নামাজ আদায় করে আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকা।
এই কঙ্কর সংগ্রহের মধ্যেও এক গভীর প্রতীকী শিক্ষা রয়েছে। মানুষ যেন ঘোষণা করে—
“হে শয়তান! আমি তোমার কুমন্ত্রণা, প্রবৃত্তির অহংকার ও পাপের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করছি।”
মুযদালিফার শিক্ষা
মুযদালিফা মুসলিম উম্মাহকে কয়েকটি মহান শিক্ষা দেয়—
১. সরলতার শিক্ষা
রাজা ও সাধারণ মানুষ একই মাটিতে ঘুমায়। এতে অহংকার ভেঙে যায়।
২. ঐক্যের শিক্ষা
ভাষা, বর্ণ, জাতি ভিন্ন হলেও সবাই একই উদ্দেশ্যে সমবেত হয়—আল্লাহর সন্তুষ্টি।
৩. আত্মসমর্পণের শিক্ষা
মানুষ নিজের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে কেবল রবের আদেশ পালনে ব্যস্ত হয়।
৪. আখিরাতের স্মরণ
খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন মানুষকে কবর ও হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মুযদালিফা হজের একটি আনুষ্ঠানিক ধাপমাত্র নয়; বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধি, বিনয় ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অনুপম প্রশিক্ষণক্ষেত্র। আরাফাতের কান্নার পর মুযদালিফার নীরবতা মানুষের অন্তরকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলে। এখানে এসে মানুষ উপলব্ধি করে—জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ভোগে নয়, বরং রবের আনুগত্যে।
যে হৃদয় মুযদালিফার রজনীতে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সে হৃদয় আর আগের মতো থাকে না। মুযদালিফার আকাশের নিচে উচ্চারিত “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক”—এই ধ্বনি তখন কেবল ঠোঁটে নয়, আত্মার গভীরতম স্তরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
✍️গাজী আশিক
26/05/2026
আজ ৯ই জিলহজ—ইয়াওমে আরাফাহ। এটি বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বরকতময় দিন। এই দিনে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন, দোয়া কবুল করেন এবং রহমতের দরজা খুলে দেন। যারা হজে নেই, তাদের জন্য এই দিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল হলো রোজা রাখা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্বের এক বছর এবং পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২
এই হাদিসের অর্থ হলো, একজন মুমিন যখন ইখলাসের সাথে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আরাফার দিনের রোজা রাখে, তখন আল্লাহ তাআলা তার দুই বছরের সগীরা গুনাহ মাফ করে দেন। কী বিশাল রহমত! একটি দিনের রোজা—আর বিনিময়ে দুই বছরের গুনাহ মাফ!
তবে মনে রাখতে হবে, এখানে মূলত ছোট গুনাহ (সগীরা গুনাহ) বোঝানো হয়েছে। আর বড় গুনাহ (কবীরা গুনাহ) থেকে তওবা করা আবশ্যক। তাই এই দিনটি হওয়া উচিত তওবা, কান্না, দোয়া এবং আত্মশুদ্ধির দিন।
আরাফার দিনের ফজিলত সম্পর্কে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, এই দিনে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন। হজে উপস্থিত হাজীগণ যখন আরাফার ময়দানে “লাব্বাইক” ধ্বনি তোলে, তখন আসমান কেঁপে ওঠে রহমতের নূরে। আর যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে রোজা রাখে, দোয়া করে, ইবাদতে মশগুল থাকে—তারাও এই রহমতের অংশীদার হয় ইনশাআল্লাহ।
এই দিনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল—
বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করা
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর জিকির করা
দরুদ শরিফ পড়া
কুরআন তিলাওয়াত করা
নিজের, পরিবার, উম্মাহর জন্য দোয়া করা
গোপনে চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।”
এই দিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো—
> لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই, আর তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।”
আজকের দিনটি শুধু রোজা রাখার দিন নয়; বরং নিজের জীবনকে বদলে ফেলার দিন। গুনাহ থেকে ফিরে আসার দিন। আল্লাহর দরবারে ভেঙে পড়ার দিন। কত মানুষ গত বছর আরাফার রোজা রেখেছিল, কিন্তু আজ তারা কবরের বাসিন্দা। আর আমরা এখনও বেঁচে আছি—এটাই আল্লাহর বিশেষ সুযোগ।
আসুন, আজকের এই মহিমান্বিত দিনে আমরা আন্তরিকভাবে বলি—
“হে আল্লাহ! আমাদের অতীতের গুনাহ মাফ করে দিন, ভবিষ্যৎকে হেদায়েতপূর্ণ করুন, আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন এবং আমাদেরকে বারবার আপনার ঘর জিয়ারত করার তাওফিক দান করুন।”
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আরাফার দিনের রোজার পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন
✍️গাজী আশিক