01/07/2026
যারা কোনো কোচিং ছাড়াই বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে চান, লেখাটি তাদের কাজে লাগবে আশাকরি।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আমি একটা কোচিং-এ প্রিলির এক্সাম ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে টপিকস-ভিত্তিক ৩/৪টা এক্সাম দিয়ে আর কন্টিনিউ করিনি। এছাড়া কোনো পর্যায়েই কোনো কোচিং করিনি।
যাইহোক, আমার জার্নিটা শেয়ার করি।
এ লেখায় মূলত পরীক্ষা-কেন্দ্রিক আমার স্ট্রাটেজি নিয়েই আলোচনা থাকবে। আমি যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১। শুরুতে যা করেছি
বিসিএস প্রস্তুতির শুরুতেই আমি সিলেবাস, প্রিলি ও লিখিত প্রশ্নব্যাংক এবং প্রিলি ডাইজেস্ট পড়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এর মাধ্যমে নিজের দুর্বলতা খুব সহজেই ধরতে পেরেছি। তাছাড়া ইন-ডেপথে যেসব কৌশল ফলো করেছি, নিম্নে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
২। নিজের দুর্বলতাকে খুঁজে বের করা ও সমাধানের চেষ্টা করা।
আমার সবথেকে বড় দুর্বলতা ছিল ইংরেজি সাহিত্য, বাংলা, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির কনসেপচুয়াল ইস্যুগুলো।
আমি প্রস্তুতির শুরুতেই দীর্ঘ ১ মাস ধরে ইংরেজি সাহিত্যের একটা গাইড বই ফলো করেছিলাম।
সকালে বসতাম আর (মাঝখানে খাওয়া ও ব্যক্তিগত কাজ বাদে) সন্ধ্যায় উঠতাম।
পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
সংবিধান আয়ত্তে আনতে খুব কষ্ট পেতে হয়েছিল। ৬ মাসেরও বেশি সময় লেগেছে এটাতে দখল আনতে।
মূলত সাধু ভাষায় পড়তে গিয়ে এই বিপত্তিটা বেধেছিল।
বাংলার জন্য ৫টা গাইড বই, ২টা সাহিত্য সমালোচনা/আলোচনামূলক বই ফলো করেছি।
পাশাপাশি বিখ্যাত সাহিত্যিকদের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু লেখা পড়ে ফেলি।
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে ব্যাপক আগ্রহ থাকার কারণে মজার সাথেই পড়েছি। প্রতিটি নতুন শব্দ ও ধারণা নোট করে রাখতাম এবং গভীরে জানার চেষ্টা করতাম।
৩। ঘরে বসে প্রিলির মডেল টেস্ট দেওয়া
প্রথম প্রিলি পরীক্ষার আগে ঘরে বসে টাইম ধরে মডেল টেস্ট দিয়েছি। এক্ষেত্রে একটা মডেল টেস্ট গাইড ফলো করতাম। পরবর্তীতে এত রিয়েল এক্সাম দিয়েছি যে মডেল টেস্টের প্রয়োজন পড়েনি।
৪। টাইম ম্যানেজমেন্ট
আমার প্রথম প্রিলি ও রিটেন পরীক্ষায় পরীক্ষার হলে টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে খুব বেগ পেতে হয়েছে।
প্রিলিতে সমস্যা হয়েছিল প্রশ্ন পড়ে উত্তর করতে বেশি সময় নেওয়া।
এরপরের এক্সামগুলোতে প্রশ্ন পড়া সারা, বৃত্ত ভরাট করা সারা—এই নীতিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই সব জানা প্রশ্নের উত্তর করতে পেরেছি।
যেসব MCQ প্রথম দেখাতেই পারিনি, সেগুলো স্কিপ করে গিয়েছি। এভাবে টাইম অনেক সেভ হয়েছে।
হালকা কনফিউশনগুলো মার্ক করে রাখতাম। পরে সেগুলো থেকে অধিক সম্ভাবনাযুক্ত কিছু প্রশ্নের উত্তর করেছি।
লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে, প্রতিটি সমান নম্বরের প্রশ্নের জন্য একই সময় দিয়েছি। পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগেই ঠিক করে যেতাম কোন প্রশ্নের উত্তর কত সময় দেব। এজন্য পরীক্ষার হলে প্রিসাইজ টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে পেরেছি। সমস্যা হয়নি।
৫। জব সল্যুশন ভালোভাবে আয়ত্তে নিয়ে আসা
প্রথম দিকে জব সল্যুশন পড়তে বিরক্ত লাগত। কিন্তু একটা সময় গিয়ে আমি ৫/৬ ঘণ্টায় প্রফেসরসের মোটা জব সল্যুশন শেষ করে ফেলতাম।
এক্ষেত্রে কেটে দেওয়া টেকনিক অবলম্বন করতাম।
যেসব প্রশ্ন আত্মস্থ হয়ে গিয়েছিল, সেগুলো কেটে দিতাম।
যেগুলো মনে রাখতে কষ্ট হতো, সেগুলো মার্ক করে রাখতাম। মূলত এগুলোই পরীক্ষার আগের দিন পড়ে যেতাম।
৬। নোট করা
প্রিলির জন্য আমি কোনো নোট করিনি। তবে,লিখিত পরীক্ষার জন্য নোট করা আমার বিসিএস ক্র্যাক করার ক্ষেত্রে গেম-চেঞ্জার ছিল। নিজে নোট করার কারণে অনেক তথ্য মাথায় রাখা সম্ভব হতো। সবথেকে বড় সুবিধা পেতাম এক্সামের আগে রিভিশনের সময়।
গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি বাদে সব বিষয়ই নোট করে পড়েছিলাম।
প্রথম বিসিএসের আগে পরীক্ষার আগের দিন গাইড বই পড়তাম, কিন্তু শেষ করতে পারতাম না। মাথায় অযথা প্রেশার কাজ করত। কিন্তু পরবর্তীতে নিজে নোট করার কারণে এই সমস্যায় আর পড়তে হয়নি।
৭। পরীক্ষার খাতায় উপস্থাপনা
পরীক্ষার খাতায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আমি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছি—
• প্যারা করে লেখা।
• একই মানের প্রশ্নোত্তর ইউনিফর্ম ওয়েতে লেখা।
যেমন, ১০ মার্কের প্রতিটি প্রশ্নোত্তর ২.৫/৩ পেইজে লেখা।
• লেখা রিডেবল করা, যাতে পরীক্ষকের পড়তে বিরক্তি না আসে।
• সুযোগ থাকলে ইউনিক ইনফরমেশন যুক্ত করা।
• ডেটা/কোটেশন প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সুযোগ থাকলে দিয়েছি, অন্যথায় ব্যবহার করিনি।
৮। স্বল্প পরিচিত/আনকমন প্রশ্নের উত্তর
কোনো প্রশ্নই ছেড়ে আসা যাবে না—এমন মানসিকতাই ধরে রেখেছিলাম সবসময়।
এক্ষেত্রে রিলেট করে লেখার চেষ্টা করেছি।
যেমন—
Soft Power-এর প্রশ্নে ‘Panda Diplomacy’, আবার
মূল্যস্ফীতির প্রশ্নে ‘Commodity Market’-এর ধারণা লিখেছি।
একেবারেই অজানা প্রশ্নও কিছু না কিছু লিখে এসেছি।
৯। ইউনিক কম্বাইন্ড প্রিপারেশন
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, ইংরেজি, রচনা ও অনুবাদের এক অনন্য প্রিপারেশন নিয়েছি।
এজন্য আমি ইংরেজিতে বিভিন্ন Think Tank Websites ও পত্রিকা পড়তাম।
ইংরেজিতে পড়ার কারণে ভোকাবুলারিতে সমৃদ্ধ হতে পেরেছি, আবার অনুবাদও প্র্যাকটিস হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিভিন্ন টপিকসের ওপর এসব আর্টিকেল পড়ার কারণে বৈশ্বিক চলমান ও স্থায়ী ঘটনার বিশ্লেষণ বুঝতে এবং নিজের মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।
রচনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অনেক তথ্য এসব আর্টিকেল থেকে সংগ্রহ করতে পেরেছি।
১০। ভাইভার জন্য বন্ধু/জুনিয়রের সাথে কনভারসেশন
এক বন্ধু ও এক ছোট ভাইয়ের সাথে ভাইভা প্র্যাকটিস করেছি। একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি বলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমাদের আলোচনায় উঠে আসত।
১১। লিখিত পরীক্ষায় সব সাবজেক্টকে সমান গুরুত্ব দেওয়া
যেহেতু আমার শুধু জেনারেল ক্যাডারই অপশন ছিল, তাই সব সাবজেক্টই সমান গুরুত্ব দিয়েছি।
একটায় খারাপ হলে আরেকটায় কাভার করবো এই ভরসা রাখতে বা রিস্ক নিতে পারিনি। সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের হয়েও নিয়মিত গণিত চর্চা ও বিজ্ঞান পড়েছি।
১২। ইন্টারনেট ও ফ্রি রিসোর্সের ব্যবহার
আমি কোচিং না করলেও রুমমেট থেকে প্রাপ্ত তার কোচিং-এর কিছু নোট, ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপের নোট ও ইউটিউবের অনেক সাহায্য নিয়েছি।
আমার প্রিপারেশনের পিক সময়ে AI available ছিল না। সব ম্যানুয়ালি কালেক্ট করতে হয়েছে।
গাইড বইয়ের পাশাপাশি আমি যেসব রিসোর্স ব্যবহার করতাম—
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিউজ মিডিয়া যেমন—
Al Jazeera, BBC, CNN, Reuters, AP, AFP, DW—ফলো করতাম।
🧠 Think Tank Websites
~ CFR
~ RIAC (Russian International Affairs Council) — পশ্চিমা মিডিয়ার বাইরে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়
~ Atlantic Council
~ Project Syndicate (সাবস্ক্রিপশন প্রয়োজন)
~ The Diplomat
~ Foreign Affairs
~ The Hill
~ RAND
~ Carnegie Endowment for International Peace
~ CSIS
~ European Council on Foreign Relations
📱 ভ্রমণের সময় পড়লে গুরুত্বপূর্ণ টার্ম বা ডেটা কপি/স্ক্রিনশট নিয়ে নোটপ্যাড অ্যাপে রাখতাম। বাসায় ফিরে নোট খাতায় টুকে নিতাম।
ইউটিউব চ্যানেলসমূহ—
🔹 BBC বাংলা
🔹 Jamuna TV (Jamuna iDesk)
🔹 সময় টিভি (দৃশ্যপট – ওমর ইনানের বিশ্লেষণ)
🔹 Johnny Harris
🔹 StudyIQ IAS
🔹 AJ Start Here (Al Jazeera)
🔹 Caspian Report
🔹 Zeihan on Geopolitics
১৩। নিজের ভেতর অদম্য ইচ্ছা ও ভাগ্যের খেলা
আমি একটা চাকরি পাওয়ার পরে জয়েন না করে পরে প্রায় দেড় বছর বেকার ছিলাম শুধু বিসিএসের কমপ্লিট প্রিপারেশনের জন্য।
আর এর ফল পেয়েছি পরে। যেমন, ৪৫তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার পরে ব্যাংকে জয়েন করি।
এরপরে আমার আর তেমন পড়া হয়নি।
৪৬তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার আগে পড়ার তেমন সুযোগ পাইনি, আগের পড়াই কাজে লেগেছিল। আগের বিসিএসগুলোতে ক্যাডার না পেলেও শেষ দুই বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।
বিসিএসে আমার জার্নির সারসংক্ষেপ—
৪১তম বিসিএস, নন-ক্যাডার,
৪৩তম বিসিএস, নন-ক্যাডার,
৪৪তম বিসিএস, নন-ক্যাডার,
৪৫তম বিসিএস, প্রশাসন ক্যাডার (সুপারিশপ্রাপ্ত)
৪৬তম বিসিএস, পররাষ্ট্র ক্যাডার (সুপারিশপ্রাপ্ত)
পরিশেষে বলি, কোচিং হয়তো অনেকের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। তবে কোচিং না করলে আপনি ক্যাডার হতে পারবেন না বা পিছিয়ে পড়ছেন—এমনটা ভাববেন না।
যারা কোচিং করছেন বা নিজ থেকে চেষ্টা করছেন, এই লেখা দ্বারা উপকৃত হলে তাতেই আমার আনন্দ। সবার জন্য শুভকামনা রইল।
©সংগ্রহীত ~ মূল লেখা : এস. এম. নাসির উদ্দিন