পিরোজপুর জেলার সর্ব উত্তরের জনপদ নাজিরপুর উপজেলার সাবেক স্বরূপকাঠী (বর্তমান নেছারাবাদ) অর্ন্তভুক্ত ছিল । নাজিরপুর উপজেলার ২নং মালিখালী ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের অর্ন্তগত মালিখালী গ্রামে মধুমতি, বলেশ্বর ও তালতলা নদীর ত্রিমোহনায় মনোরম চির সবুজ প্রকৃতির কোলে মালিখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় অবস্থিত । নাজিরপুর সে কালে মাটিভাঙ্গা পঞ্চায়েতে বর্তমানে ১নং মাটিভাঙ্গা ও ২নং মালিখালী ইউনিয়ন পরিষদ এ দু’টি স্থানীয় সরকার পরিষদে বিভক্ত ছিল । ১৯০৭ সালে এ বিদ্যাপীঠের গোড়াপত্তন হয়, তখন গ্রামটি ছিল মাটিভাঙ্গা পঞ্চায়েতের আওতাধীন। মালিখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে নাজিরপুর উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী টুঙ্গীপাড়া ও চিতলমারী উপজেলায় কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না ।
তখন মাটিভাঙ্গা পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন বাবু উ্ঁমাচরণ বিশ্বাস। তিনি তার পরিষদবর্গসহ এগিয়ে আসেন। তা্ঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মালিখালী নিবাসী বাবু বনমালী রায় ও হরিচরণ রায় এবং কলমা জমিদার কোম্পানীর মাটিভাঙ্গা কাচারীর পরিচালক বাবু ভূপতি রঞ্জন রায় চৌধুরী । শুরু হয় স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা । ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জনসভা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও স্থান নির্বাচন করা হয়। ১৯০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ক্লাশ শুরূ করার পদক্ষেপ নেয়া হয় । স্কুলের নামকরণ করা হয় মালিখালী মাইনর ইংরেজী M.E. স্কুল। ডিসেম্বর মাসের মধ্যে একটি টিনের চালাঘর তোলা হয়, একই ঘরের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের অফিস ও মিলনায়তনসহ পাঁচটি শ্রেণী কক্ষ স্থাপিত হয়। ১৯০৭ সালের জানুয়ারি বুধবার থেকে ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণীর অতি অল্প সংখ্যক ছাত্র নিয়ে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন বাবু কেশব লাল সমাজপতি এবং সেক্রেটারী বাবু উ্ঁমাচরণ বিশ্বাস । বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বেশীরভাগ জমি ও অর্থ দান করেন উ্ঁমাচরণ বিশ্বাস। বিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত করা হয় ১৯২১ সনের জানুয়ারি থেকে ।মাইনর থেকে উচ্চ ইংরেজী স্কুলে (M.E.) উন্নীত হয় ।প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন বাবু যতীন্দ্র নাথ বিশ্বাস । কলিকাতা কতৃক তপশিলী বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় । ১৯২৫ সনে সর্ব প্রথম কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক গৃহীত মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে । পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬ জন । সকলে উত্তীর্ণ হওয়ায় বিদ্যালয়ের গৌরব চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ।
সুদূর অঞ্চল থেকে ছাত্র আসতে থাকে এ বিদ্যালয়ে পড়াশুনার জন্য । প্রতিষ্ঠিত হয় ভূপেন্দ্রনাথ ছাত্রাবাস ১৯২১ সনে ।গতানুগতিক ধারার পরিবর্তে সরকার ১৯৬১ সন থেকে বহুমুখী শিক্ষাধারা চালু করে ।পরীক্ষার নাম মেট্রিকুলেশনের পরিবর্তে হয় এস.এস.সি । শুরু থেকেই বিজ্ঞান শাখা খোলা হয় । এবছরের ২৬শে বৈশাখ এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে সমস্ত বিদ্যালয় গৃহ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায় । দক্ষ প্রধান শিক্ষক বাবু নীরোধ বিহারী নাগের প্রচেষ্টায় স্কুল গৃহ পুনঃ নির্মাণ করা হয় । এত সমস্যার মধ্যেও ১৯৬৩ সনে নতুন ধারার পরীক্ষায় ৩৬ জন এস.এস.সি পরীক্ষার্থীর ৩৪ জন পাস করে । বিজ্ঞান শাখার ১৩ জন সকলেই পাস করে।
১৯৭০ সনে নতুন পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় । স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সনে এক ধ্বংস স্তূপের উপর নতুন করে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় । ।প্রধান শিক্ষক বাবু বঙ্কিম বিহারী মুখার্জী, শিক্ষকমন্ডলী, ছাত্র-ছাত্রী ও জনগনকে সংগে নিয়ে বিদ্যালয় পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন । এত দুর্দশার মধ্যেও ১৯৭৩ সনে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয় ।
বাবু বঙ্কিম বিহারী মুখার্জী ১৯৮১ সনের ২৬শে জুন অবসর গ্রহণ করেন এবং বাবু গিরীশ চন্দ্র মন্ডল নতুন প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন । ১৯৮৮ সনের ১লা জুলাই ভয়াবহ বন্যায় এলাকার বাড়ি ঘর রাস্তাঘাট ডুবে যায়, এলাকাবাসী স্কুল গৃহে আশ্রয় নেয় । জল কমে যাওয়ার পর ২৮শে নভেম্বরের প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ে স্কুলের সকল টিনের চালা উড়িয়ে নিয়ে যায় । পাকা দেওয়াল আংশিক ধ্বংস হয় । উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুস সত্তার শেখ ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বাবু রমেশ চন্দ্র মন্ডলের সহযোগিতায় প্রধান শিক্ষক বাবু গিরীশ চন্দ্র মন্ডল স্কুল গৃহ মেরামত ও সংস্কারের কাজ স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করেন । শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসাবে উপজেলা পর্যায়ে ১৯৯৬, ১৯৯৯ এবং ২০০২ সনে স্বীকৃতি পান মিঃ গিরীশ চন্দ্র মন্ডল । বর্তমানে বাবু অসিত কুমার মল্লিক প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত রয়েছেন ।
১৯৯৬ সনে অনেক চেষ্টার পর স্কুল উন্নয়ন পরিকল্পনা ভুক্ত হয় । ছয় কক্ষ বিশিষ্ট একটি দ্বিতল ভবন নির্মিত হয় । ২০০০ সনে ছাত্রাবাস পুনঃনির্মাণ হয় । ২০০২ সনে পুরাতন স্কুলের সংস্কার ও পুনঃ নির্মানের স্কীম এর আওতায় ৫ কক্ষ বিশিষ্ট একটি পাকা দ্বিতল ভবন নির্মিত হয়েছে ।
বিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে ৫০০০ উর্ধ্বে বিভিন্ন বই আছে । ১২ টি কম্পিউটারসহ সুসজ্জিত কম্পিউটার কক্ষ রয়েছে ।
১৯৯৫, ১৯৯৮, ২০০০ সনে উপজেলা এবং ২০০২ সনে জেলা পর্যায়ে এ বিদ্যালয় শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায় । ১৯৯২ সনে বৃক্ষ রোপণে স্কুল ক্যাটাগরিতে জাতীয় পর্যায় প্রথম স্থান লাভ করে এ বিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত হয় । ২০০২ সনে এস.এস.সি পরীক্ষায় উত্তম ফলাফলের জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত ২টি কম্পিউটার বিদ্যালয়কে দেয়া হয় ।
মালিখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে । বহু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসাবে এ স্বীকৃতি আছে ।