We invite you to join and become a member of this page for know about Noakhali Division
*** নোয়াখালীর অজানা তথ্য ***
নোয়াখালী জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। বর্তমান নোয়াখালী জেলা আগে ফেনী, লক্ষীপুর এবং নোয়াখালী জেলা নিয়ে একটি বৃহত্তর অঞ্চল ছিল, যা এখনও বৃহত্তর নোয়াখালী নামে পরিচিত। নোয়াখালী জেলার প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া। নোয়াখালী সদর থানার আদি নাম সুধারাম। ইতিহাসবিদদের মতে একবার ত্রিপুরা-র পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে
ভুলুয়া-র উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসাবে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়, যা পানির প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করে। এই বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় "নোয়া (নতুন) খাল" বলা হত, এর ফলে "ভুলুয়া" নামটি একসময়ে পরিবর্তিত হয়ে ১৬৬৮ সালে হয়ে যায় "নোয়াখালী"।
______________________________________________________________
*** নোয়াখালী শহরের খোঁজে ***
আপনি যদি খুব আগ্রহ ভরে নোয়াখালী আসতে চান তাহলে আপনাকে নামতে হবে মাইজদী কোর্টে। নোয়াখালীর বিকল্প শহর হিসাবে এটি গড়ে উঠেছে ১৯৫০ সালের দিকে। সুন্দর ছিমছাম নিরিবিলি শহর। চমত্কার পরিবেশ। শান্তির শহর হিসাবেও এর সুখ্যাতি আছে প্রচুর। না শহর না গ্রাম এমন পরিবেশে ইত:স্তত ঘুরতে ঘুরতে স্নিগ্ধতায় ভরে যাবে আপনার মন। আপনি যদি মূল নোয়াখালী খুঁজতে চান তো এখানে পাবেননা। আপনাকে যেতে হবে আরো পাঁচ ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে। রিক্সা কিংবা বাস টেম্পুতে চড়ে নির্মল বাতাস খেতে খেতে চলে আসুন সোনাপুরে। না এখানেও নোয়াখালী খুঁজে পাবেননা। তবে সোনাপুর রেল ষ্টেশানের নাম ফলকে দেখা পাবেন ‘নোয়াখালী’ লেখা। জায়গাটি সোনাপুর, রেল ষ্টেশানের নাম নোয়াখালী। আপনি নিশ্চই বিভ্রান্তের মধ্যে পড়বেন। এখানে শেষ হয়ে গেছে রেলের সমান্তরাল লাইন। না ঠিক শেষ নয়, যেন থমকে গেছে। শুধু তো নাম ফলকই নোয়াখালী নয়। আপনি খুঁজতে থাকুন উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে চতুর্দিকে। ক’কদম সামনে রাস্তা। পূর্ব পশ্চিমে পাকা। আসলে ঠিক রাস্তা নয়। এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ি বাঁধ। সোনাপুর নতুন বাজার চিরে পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত। দক্ষিন-পশ্চিমে রাস্তাটি ঘুরে চলে গেছে চর জব্বর, রামগতি। পূর্বে গেছে কবির হাট উপজেলায়। সোজা দক্ষিনে আর একটি রাস্তা চলে গেছে প্রায় ষাট কিলোমিটার দূরে হাতিয়া ষ্টিমার ঘাটে। কাউকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন নোয়াখালী শহরের কথা। অবাক বিস্ময়ে আপনার দিকে তাকিয়ে আরো দক্ষিনে আঙুল দিয়ে দেখাবে। কিন্তু তার চেয়ে বেশী বিস্মিত হবেন আপনি নিজেই। শত বছরের কোলাহলময় কর্মচঞ্চলতায় ভরা কোথায় সে শহর! ততক্ষনে দক্ষিনের দূর সমুদ্র থেকে হয়তো আরো এক ঝাপটা লোনা বাতাস আপনাকে আরো আবিষ্ট করে ফেলবে। ইতিমধ্যে আপনি হয়তো খুব বৃদ্ধ কাউকে পেয়েও যাবেন। যিনি আপনাকে নিয়ে যাবেন সেই স্বপ্নময় এক অতীতে। সত্তর আশি বছর আগে তার শৈশব কিংবা যৌবনের সেই সব সোনালি দিনের কাছে। আপনি যদি তাঁর স্মৃতিতে আঁচড় দিয়ে বস করতে পারেন, তাহলে তাঁর স্মৃতির পঙ্খীরাজে চড়িয়ে আপনাকেও নিয়ে যাবে নিকট অতীতের এক স্বপ্নময় শহরে। যে শহর ছিলো সমুদ্র উপকূলবর্তী এক অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির প্রাচুর্যে ভরা হাজার বছরের সমৃদ্ধশালী নোয়াখালী শহর।
আমরা পৃথিবীর সমৃদ্ধশালী সভ্যতার দিকে তাকালে দেখতে পাই, সে সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো কোনো নদী কিংবা সমুদ্রতীরে। নোয়াখালীর ভৌগোলিক অবস্থানই একটি সমৃদ্ধশালী জনপদ গড়ে উঠার জন্য যথেস্ট অনুকূলে ছিলো। হাজার বছর ধরে তিল তিল করে গড়েও উঠেছিলো। প্রাচীন কাব্যে নানা ভাবে নোয়াখালীর স্তুতি নিয়ে নানান স্লোক গাঁথা হয়েছে।
‘পূর্ব দিকে চট্টগ্রাম ত্রিপুরা পাহাড়
পশ্চিমে মেঘনা নদী ভীষম আকার
উত্তরে ত্রিপুরা জেলা দক্ষিনে সাগর
মধ্যে শোভে নোয়াখালী কিবা মনোহর’।
এই মনোহর শহর একদিনে গড়ে উঠেনি। সুদূর অতীত কালেও চির হরিতের দেশ ছিলো এই সমুদ্র-মেখলা নোয়াখালী। বিশাল সমতল প্রান্তর ছিলো এই অঞ্চল। মধ্য যুগের কবিরা সেই প্রান্তরকে তুলনা করতেন স্বর্গের মস্রিন সবুজ গালিচার মতন। প্রথিতযশা সাংবাদিক সানাউল্লা নূরী এ অঞ্চল নিয়ে গবেষনা ধর্মী লেখায় বর্ণনা করলেন, ‘আবহমান কাল থেকেই এই মাটির বুকে জুড়ে ছিলো কনকচূড় ধানের স্বর্ণালী সমারোহ। ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা গ্রাম গুলি ছিলো তাল তমাল আর নারিকেল সুপারি কুঞ্জ খচিত একেকটি আদিগন্ত অরণ্য। সাগরের ললাটে কাঁচ-টিপের মত শোভা পেতো এই ভূ-খন্ডের ফসল সম্ভারে ভরা শ্যামল দ্বীপ মালা। সপ্তম শতকে এই উপকূলের দেশের সমৃদ্ধি বর্ণাঢ্য নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর জনগনের সুখময় জীবনের রূপ দেখে বিস্ময় বিমূঢ় হয়েছিলেন চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন-সাঙ। সাত শ’ বছর পরে চতুর্দশ শতকে এই উপকূলীয় দেশ হয়ে দূর প্রাচ্য সফরে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত আরব পর্যটক ইবনে বতুতা। মহান এই পরিব্রাজক আফ্রিকা মধ্যপ্রাচ্য মধ্য এশিয়া প্রাচীন ভারত দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া এবং দূর প্রাচ্যের বহু দেশ আর জনপদ ভ্রমন করেছেন। কিন্তু বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী এই ভূখন্ডের মত আর কোনো অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সম্পদ সমারোহ তার মনে অমন গভীর ভাবে রেখাপাত করতে পারেনি’।
নোয়াখালীর আদি নাম ছিলো ‘ভুলুয়া’। নানা ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় ভুলুয়া ছিলো বঙ্গপসাগর তীরবর্তী অঞ্চলের প্রাচীনতম ইতিহাসের স্নায়ু কেন্দ্র। এটি ছিলো একসময়ের বর্ধিষ্ণু সামুদ্রিক বন্দর। কিংবন্তিতে বঙ্গোপসাগরকে ক্ষীরদ সাগর বা ক্ষীর সাগর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। খৃষ্টের জন্মের বহু পূর্ব থেকেই ভূলুয়া বন্দর ছিলো প্রাচীন পৃথিবীর একটি আন্তর্জাতিক আত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বানিজ্য বন্দর। এই বন্দরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিলো মিসর, লবানন, জাঞ্জিবার, বসরা, শ্রীলঙ্কা, তাম্রলিপি, সুমাত্রা, জাভা প্রভৃতি সমুদ্র বন্দরের সাথে। আসাম আরাকান সহ দূর প্রাচ্যের সাথে ছিলো এর ঘনিষ্ট যোগাযোগ।
সুপ্রাচীন কাল থেকে যোগাযোগের কারনে এ অঞ্চলে একটি স্বাতন্ত্র সভ্যতার সৃষ্টি হয়। ভাষা সংস্কৃতি কৃষ্টিতে ছিলো পৃথিবীর নানান জাতীর একটি মিশ্র সংস্কৃতি। গড়ে উঠেছিলো একটি উন্নত নগর। পরবর্তীতে যা হয়ে উঠেছিলো ঐতিহ্যবাহি ঐতিহাসিক নগরীতে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠে পর্তুগীজ, স্পেনীয়, ইংরেজ ও আরবীয় স্থাপত্যের বহু ইমারত ও ভবন। নোয়াখালী টাউন হল ছিলো জার্মান গ্রীক ও রোম সভ্যতার মিশ্রনে অপূর্ব স্থাপত্যকলার নিদর্শন। একটি সুপরিকল্পিত নগর হিসাবে গড়ে উঠে সমগ্র শহর। ছিলো ঘোড়দৌড়ের মাঠ। ছিলো কালেক্টরেট ভবন, জর্জকোর্ট, পুলিশ লাইন, জেলখানা, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, স্কুল, মাদ্রাসা। ছিলো সুপ্রসস্ত রাস্তা। শহরে যান বাহনের মধ্যে ছিলো মূলত: ঘোড়ার গাড়ি। সুপ্রস্ত রাস্তার দুধারে ছিলো নয়নাভিরাম ঝাউ বীথিকা। সারা নগর জুড়ে ছিলো নানা ফল আর সুবৃহৎ বৃক্ষের সাজানো স্বর্গীয় বাগানের মত উদ্যান। না, সে অনিন্দ্য সুন্দর নগরীর সামান্যতমও আপনি এখন আর দেখতে পাবেন না। খুঁজে পাবেন না কোনো ধংসাবশেষের চিহ্ন। যা প্রত্নতাত্বিকদের মনোবাঞ্ছনা পূরণ করেত পারে। দৈব দুর্যোগে পম্পেই নগরী ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে। সব কিছু ধ্বংস হলেও কিছুটা চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো যার সূত্র ধরে প্রত্নতাত্বিকরা খুঁজে পেল অতীত সভ্যতার ইতিহাস। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, ব্যাবিলন, ক্যালাডিয়া, মেম্পিস, প্রভৃতি নগরী ইতিহাসের বিস্মৃতির অধ্যায় থেকে ফের উঁকি দেয় সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া চিহ্ন গুলোর রেশ ধরে ধরে। বেড়ি বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে দক্ষিনে তাকিয়ে দেখুন। আদিগন্ত সবুজের সমারোহ। ছোট ছোট খড়ের ঘর। ঘর গুলোকে ঘিরে আছে নানান ছায়া বৃক্ষ। আপনি একে একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম বলেই ভ্রম করবেন। এই এখানেই ছিলো এক সময়ের কোলাহলময় ছিমছাম নোয়াখালী শহর। এখন তার কিছুই বুঝার উপায় নেই। প্রায় হাজার বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠা তিলোত্তমা এই নগরী প্রায় দু’শ বছর ধরে ভাঙ্গা গড়ার খেলা খেলেখেলে শেষ বারে যেন হঠাৎই একেবারে এক ঝাপটায় চিরতরে হারিয়ে গেলো। নোয়খালী শহর যখন ভাঙ্গনের শেষ প্রান্তে তখন চলছিলো বিশ্বযুদ্ধ। ইতিহাসের এক বিশেষ ক্রান্তিকাল। বৃটিশ সাম্রাজ্যের টিকে থাকার মরণপন লড়াই। প্রতি মুহুর্তে জাপানী বোমার আতঙ্ক। উপমহাদেশে চলছিলো বৃটিশ বিরোধী রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। নেতাজী সুভাষ বসুর আজাদহিন্দ ফৌজের সশস্ত্র লড়াই। স্বদেশী আন্দোলন। নোয়াখালীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। গান্ধিজীর অহিংস আন্দোলন। বাজছিলো বৃটিশ বিউগিলের শেষ করুণ নিনাদ। রাজনীতি আর প্রকৃতির ভাঙ্গাগড়ার এক অভুতপূর্ব মিশ্রন। সেই সাথে মিশেল হলো দক্ষিণ-পূর্ববাংলার সমুদ্রোপকূলীয় সাহসী লোনা মানুষদের ভিটে মাটি রক্ষার এক প্রাণপণ লড়াই। মাত্র ষাট সত্তর বছর আগে শেষ চিহ্ন টুকুও হারিয়ে গেলো। তখনও বিজ্ঞান প্রযুক্তি প্রায় সবই ছিলো। হয়তো একটু শেষ চেষ্টা করলে কিছুটা রক্ষা পেতো কিন্তু তখনকার বৃটিশ শাসকদের সীমাহীন ঔদাসিন্য আর অবহেলায় চির অভিমানি সাগর পাড়ের রূপসী জলকন্যা সাগরেই বিসর্জন দিলো নিজেকে। সে সময এলাকার মানুষরা নিজেরা নিজেদের মত করে স্বেচ্ছাশ্রমে শেষ চেস্টা করেছিলো। সাগরকে রুখতে চেয়েছিলো তারা। সাগরের মধ্যে বাঁধ দিয়ে ভাঙ্গন ঠেকাতে চেয়েছিলো। কিছুটা সফলকাম হয়েওছিলো। সেটি এখন ওবায়দুল্লা ইঞ্জিনিয়র বাঁধ নামে এলাকার মানুষের মুখে মুখে কিংবদন্তি হয়ে আছে। কিন্তু শেষ রক্ষাটি আর হয়নি।
সোনাপুর বাজারের পাশে যে বেড়ি বাঁধে আপনি দাঁড়িয়েছেন, ঠিক সেখান ১৯৭০ সনের ১২ নভেম্বরের গর্কিতে শত শত লাশ ভেসে এসেছিলো। এই সেদিনও সাগরের উত্তাল ঢেউ এসে আছাড় খেত এখানে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালেও নিত্য জোয়ার ভাটা হতো এখানে। ধীরে ধীরে এখানে গড়ে উঠলো বাজার। সোনাপুর বাজারের মধ্যদিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে ডানে পড়বে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। একেবারে নতুন চরে নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটি। তার আগে পুরাতন শহরের কিছু দেখতে চান তো বাজার থেকে একটু দক্ষিণে গেলে ডানে পড়বে মন্তিয়ার ঘোনা। শহরের গন্যমান্য ব্যক্তিদের এখানে ছিলো বাসস্থান। নতুন পাকা রাস্তা ধরে এগুলে পড়বে ইনকাম চৌধুরীর পোল। তারপর ঠ্ক্কর। জ্বী হ্যাঁ, জায়গাটির নাম ঠক্কর। নতুন বসতির নতুন মানুষেরা এই স্থানগুলোর এ রকম নাম দিয়েছে। যেমন আইন্নালাসা, আলু ওয়ালার দোকান, গুইল গুইল্লা বাজার ইত্যাদি। কি ভাবে এ রকম কিম্ভুত নাম হলো তার কাহিনীগুলোও খুব মজার।
ঘুরতে ঘুরতে আপনি প্রবীন কাউকে পেয়েও যাবেন। তিনি আপনাকে তাঁর স্মৃতি হাতড়ে আঙ্গুল দিয়ে দেখাবেন, ‘ঐ বড় মসজিদ, গীর্জা, ঐ কোর্ট বিল্ডিং, ঐতো জেলখানা, পুলিশ লাইন। আর দূরে দিগন্তে আঙ্গুল দিয়ে দেখাবেন, ‘ঐ যে ঘোড় দৌড়ের মাঠ’। আপনি বিস্ময়ে ভাবুন, কিরকম ঐতিহ্যের শহর ছিলো, যেখানে নিয়মিত ঘোড়দৌড় হোতো। তিনি আরো বলবেন, ‘এই যে এখানে ছিলো চল্লিশ ফুট প্রশস্ত সদর রাস্তা। বাস্তবে নয়, আপনি চোখ বুজে সব কলাপনায় দেখে নেবেন। ‘এই যে এখানে, সল্লাঘটিয়া, মল্লাসটাইয়ার মোড়, নাগপাড়া, বকুলতলা, দেবালয়, মন্দির’। ঘোড়দৌড়ের বিশাল চত্বরে আপনি হয়তো কান পেতে এখনো শুনতে পাবেন, উদ্দাম বেগে ছুটে চলা সেই পেশী বহুল ঘোড় সওয়ারের ছুটন্ত অশ্বখুরের শব্দ। কল্পনায় আপনি অনুভব করবেন। আর কল্পনার জগত্ ছেড়ে সত্যি সত্যি আপনি বাস্তবে দেখতে পাবেন, সেই বৃদ্ধের দুই উদাস করা চোখের কোনে চিক চিক করে সমুদ্রের লোনা জল ঝলক দিয়ে উঠছে। আর বুক চিরে উতরে উঠছে এক দীর্ঘশ্বাস, যেন বহু দূর সমুদ্রের কান্না জড়িত হুহু করে ধেয়ে আসা বিষন্ন বাতাস। চাপা কান্নায় কষ্টের বেহাগ সুরে তিনি আপনাকে শুনাবেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া শহরের কাহিনী।
জীবন জীবিকা
সাগর পাড়ের বসতি হওয়ায় এই এলাকার মানুষের জীবিকা ছিলো মূলত: মত্স্য চাষ। নদী বন্দরের কারনে এখানে বাস করেতেন অনেক বনেদি ব্যাবসায়ী। আর উর্বর সমতল ভূমির কারনে বিপুল জনগোষ্ঠী ছিলো কৃষিজীবী। সুদূর অতীত কাল থেকে বিক্ষুব্ধ সাগর বারবার আঘাত হেনেছে এ অঞ্চলে। মানুষজনও সে সাগরকে সাহসীকতায় রুখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। সে কারনে এ অঞ্চলের মানুষ প্রকৃতিগত ভাবেই হয়ে উঠেছে সাহসী স্বাধীনচেতা পরিশ্রমী আর একরোখা। সমতল ভূমি যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু হয়েছে বিশাল নীলজলরাসীর উদার সমুদ্র। তাই স্বভাবেও এ এলাকার মানুষ হয়েছে সমুদ্রের মত উদার প্রকৃতির। হয়েছে বন্ধুবৎসল আর অতিথিপরায়ন।
শত শত বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ গিয়েছে ভিন্ন অঞ্চলে আবার ভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরা এসেছে এ অঞ্চলে। সৃষ্টি হয়েছে এক মিশ্র স্বাতন্ত্র সংস্কৃতির। ভাষা সংস্কৃতিতে যা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন। স্থানীয় ভাষার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে ইংরেজী জার্মান পর্তুগীজ আরাকানী আর আরবীয় ভাষার ছড়াছড়ি সহ নানান ভাষার মিশ্রন। নানা দেশের নানা জ্ঞানী গুনী শিক্ষিত মানুষের সংস্পর্শে এসে এ এলাকার মানুষের মধ্যে জেগেছে শিক্ষার স্পৃহা। এ এলাকার বিপুল জনগোষ্ঠী ছিলো বেশ শিক্ষত। শিক্ষিতের হার বেশী বলে এখনো দেশে ও বিদেশে এর সুখ্যাতি রয়েছে। এক বিরাট অংশ ছিলো বনেদি ব্যবসায়ী। ধান চাল কাপড় কাঠ লবন আর মসল্লা ছিলো মূলত: প্রধান পন্য।
বর্তমান প্রেক্ষিত
একটি মৌচাকে ঢিল ছুঁড়লে যেমন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সবাই ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছুটাছুটি করে, তেমনি শহরের শেষ চিহ্ন মুছে যাবার সাথে সাথে সহায় সম্বলহীন মানুষ যে যেদিকে পেরেছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলো চতুর্দিকে। কেউ আস্তানা গাঁড়লেন মাইজদী সোনাপুরে, কেউ ঢাকা চট্টগ্রাম সহ দেশের বিস্তীর্ন অঞ্চলে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উপমহাদেশ জুড়ে রাজনৈতিক ভাঙ্গাগড়ার নতুন মেরুকরণ, দেশ বিভাগ সবই এক সাথে চলছিলো তখন। এক বিরাট অংশ চলে গেলো পশ্চিম বঙ্গে। সৃষ্টি হোলো বিরাট শূন্যতা।
সে শহরে ছিলো অনেক গুলো নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রায়বাহাদুর রাজকুমার জিলা স্কুল বা আর, কে, জিলা স্কুল, বঙ্গবিদ্যালয়, আহমদীয়া হাই স্কুল, অরুণ চন্দ্র বিদ্যালয়, হরিনারায়ন হাই স্কুল, কল্যান চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, উমা চরণ গার্লস হাই স্কুল, ব্রাদার আঁন্দ্রেজ হাইস্কুল, কেরামতিয় আলিয়া মাদ্রাসা ইত্যাদি। সেগুলো টিনের ছাউনি দিয়ে ছাপড়ার মত করে স্থানান্তরিক হোলো সোনাপুর, মাইজদীতে। সেখানে শিক্ষক নেই ছাত্র নেই। এক সময়ের উপমহাদেশ খ্যাত বিদ্যাপিট গুলো হয়ে পড়লো নীরব নিথর শূন্যতায় ভরা।
এ সময় নতুন শহর মাইজদীতে স্থানান্তরিত হোলো কোর্ট কাছারি সরকারী দপ্তর অফিস। বৃটিশ শাসনের শেষ সময়টিতে মাইজদীতে একটি বড় দীঘি কেটে তার চতুর্দিকে করা হোলা সড়ক। বাংলো প্যাটার্নের টিনের শেড করে তৈরি হোলো অফিস আদালত। মাইজদীর যে অংশে কোর্ট কাছারি বসলো তার ভিণ্ণ নাম হোলো মাইজদী কোর্ট। শহরের পশ্চিম অংশ দিয়ে চলে গেছে প্রধান সডক। আর প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্বদিক দিয়ে গেছে নোয়াখালী-লাকসাম রেল লাইন। শহরের উত্তর পূর্বদিকে আগেই ছিলো মাইজদী রেল ষ্টেশান তার প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিনে একটি নতুন রেল ষ্টেশান স্থাপিত হোলো মাইজদী কোর্ট রেল ষ্টেশান। সে সময় শহরটি স্থানান্তরিত হওয়ার সময় হারিয়ে গেছে অনেক মূল্যবান দলিল দস্তাবেজ।
এক সময় যত দ্রুত শহর ভাঙলো তার চেয়ে যেন দ্রুত উঠতে থাকে নতুন চর। সৃষ্টি হয় আগ্রাসী চর দখলকারী গোষ্ঠির। গড়ে উঠে সেটেলম্যান্টের ভূয়া দলিল আর কাগজ তৈরির এক লোভী সুযোগসন্ধানী চক্র। এক বিপুল সরকারী ও নানা মানুষের জায়গা জমি দখল করে নেয় কুটবুদ্ধি সম্পন্ন দখলদারী গোষ্ঠী। নতুন চরে চরে হামলে পড়লো দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল বাহিনী। চর দখল নিয়ে শুরু হোলো রক্তারক্তি হানাহানি। নতুন চরের লোনা মাটি আর মানুষের তাজা লোনা রক্ত ফিনকি দিয়ে মিশে একাকার হোলো। মৌরসী জমি ফিরে পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করলেন অনেকে। কেউ কেউ আবার ফিরে পেতে এসেছেন তার জমি। কেউ উদ্ধার করতে পেরেছেন। কেউ পারেননি। যারা উদ্ধার করতে পারেনি আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা। এখনও শত শত মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন পড়ে আছে।
নাড়ির টান
যে কোনো মানুষের স্বভাবে রয়েছে তার উতসের দিকে তার মূলের দিকে নিবিড় স্পর্শ কাতরতা। প্রকৃতিগত এক সহজাত প্রবৃত্তি। আর এই সহজাত স্বহজাত স্বভাবের জন্য হাজার হাজার মাইল দূরে তার উতসের দিকে নাড়ির টান অনুভব করে। শত বাধা বিপত্তি ডিঙিয়ে সে যেতে চায় তার উতসের গভীর মূলে। যারা এক সময় বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিলো তাদের কেউ কেউ আবার ফিরে এসেছে এই এলাকায়। ধীরে ধীরে নির্মিত হচাছে রাস্তাঘাট।যোগাযোগ হয়েছে সহজ। কেউ গড়ে তুলেছেন নানা কৃষি খামার। কেউ বাড়িঘর। গড়ে উঠছে হাউজিং প্রকল্প। কেউ জমিতে করছেন চাষাবাদ।একটু একটু আবাদি হয়ে উঠেছে সমগ্র এলাকা।গড়ে উঠছে স্কুল, মক্তব, মাদ্রাসা, মসজিদ বাজার। এ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশাল এলাকা জুড়ে এর অবস্থান। পাশেই গড়ে উঠছে শিল্প এলাকা। ধীরে ধীরে আবার সৃষ্টি হবে নতুন এক সভ্যতার।
নোয়াখালী ইউনিয়ন
যে নোয়াখালী নিয়ে এত এত গবেষণা লেখালেখি। সেই নোয়াখালী নামে এখন আছে স্থানীয় সরকারের অধীনে একটি ইউনিয়ন। নদীতে ভেঙ্গে যাওয়া নোয়াখালী শহর আবার জেগে উঠলে সেটি এখন একটি ইউনিয়ন হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। সেই ঐতিহাসিক শহর নগরী এখন নিভৃত একটি ইউনিয়ন পরিষদ মাত্র। বৈচিত্রময় ভাষার মাহাত্ম্য ছাড়া যার আর কিছুই নেই। কিছু নেই।
______________________________________________________________
*** রূপে ঝলমল নিঝুম দ্বীপ ***
নোয়াখালী উপকূলে গভীর সমুদ্রে জেগে উঠা এক রহস্যময়ী দ্বীপ 'নিঝুমদ্বীপ'। সাগরের উত্তাল ফেনিল তরঙ্গ, নীল আকাশ আর ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘেরা সেখানে নিত্য মাতামাতি করে। নীরবে নিভৃতে সাগরের গর্ভ থেকে ধীরে ধীরে এ দ্বীপটি জেগে উঠেছে। এখন সে পূর্ণ যৌবন প্রাপ্ত সবুজ অরণ্যের নেকাবে ঘেরা লাস্যময়ী সাগর দূহিতা। তার শান্ত স্নিগ্ধ রূপ ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে। দেশ বিদেশের মানুষ কৌতুহলী হয়ে উঠছে এ দ্বীপকে ঘিরে।
নিঝুম দ্বীপের জন্ম
নোয়াখালী দক্ষিণে সাগর বেষ্টিত হাতিয়া দ্বীপ। তারও দক্ষিণে অথই নীল সমুদ্র। শত শত বছর ধরে হাতিয়া দ্বীপ এক সমৃদ্ধশালী জনপদে পরিনত হয়। এখানের অনেকেই বংশ পরম্পরায় অবস্থাপন্ন কৃষক ও মত্স্যজীবি। অনেকে ছিলেন বনেদী ব্যাবসায়ী। উত্তাল সাগরের সাথে হেসে খেলে এদের বেড়ে উঠা। সাম্পান আর বড় বড় বজরা নিয়ে এরা যুগ যুগ ধরে সাগরে মাছ ধরতে যেতেন। পঞ্চাশের দশকের দিকে হাতিয়ার জেলেরা দক্ষিণে দূর সমুদ্রে দেখতে পেলেন সাগরের মধ্যখানে একটি বিশাল ভূখন্ড জেগে উঠছে। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা দেখে আসছেন সমুদ্রের এসব অঞ্চলে মাঝে মাঝে এরকম ভাসমান দ্বীপ ভেসে উঠে আবার তীব্র স্রোতে হারিয়েও যায়। তারা ভেবেছিলেন এরকমই হয়তো কোন দ্বীপ এটি। কিন্তু দেখা গেলো ধীরে ধীরে সে ভূখন্ড চিক চিক করে আরো বেশী দৃশ্যমান হচ্ছে দিন দিন। এক সময় সত্যিই সেটি একটি রুপময় দ্বীপে রুপ নিলো। এ দ্বীপের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এ দ্বীপের মাটি চিকচিকে বালুকাময়। জেলেরা নাম দিলেন 'বাল্লারচর' বা বালুর চর। জেলেরা দূর সমুদ্রে যাবার পথে একটি বিশ্রাম আর আশ্রয়ের জায়গাও খুঁজে পেলেন। শুকনো মৌসুমে তাঁরা সে বালুর মধ্যে মাছ শুকানোর কাজও শুরু করলেন। ধীরে ধীরে সে চরে নল খগড়া উরি আর বুনো ঘাস জমাতে লাগলো। হাতিয়ার মহিষের বাথানিয়ারাও যাওয়া আসা শুরু করলেন সে দ্বীপে। ওসমান মিয়া নামে এক বাথানিয়াও তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ সাগর ডিঙ্গিয়ে তার বাথানের শত শত মহিষগুলো নিয়ে গেলেন সে দ্বীপে। তার নামেই সে দ্বীপের নাম হয় চর ওসমান। সরকারী দলিল দস্তাবেজে চর ওসমান হিসাবে এটি এখন লিপিবদ্ধ আছে। ধীরে ধীরে দ্বীপাটির আয়তন বাড়তে থাকে। কিছু কিছু গাছ গাছালী জন্ম নিলো। ফুটে উঠলো তার শান্ত স্নিগ্ধ রূপ। দ্বীপের পরিবেশ হলো নীরব নিঝুম তার চতুর্দিকে ফেনীল সাগরের ছন্দময় খেলা।
নিঝুম দ্বীপের নাম করণঃ
সত্তর দশকে হাতিয়ার সংসদ সদস্য ছিলেন আমিরুল ইসলাম কালাম। তিনি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নিয়ে গেলেন সে দ্বীপে। অবাক বিষ্ময়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে সবাই অবলোকন করলেন এর শান্ত স্নিগ্ধ রূপ। তিনি এ দ্বীপের নাম দিলেন ’নিঝুম দ্বীপ। সে থেকে নিঝুম দ্বীপ হিসেবেই এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কিছু জেলে আর বাথানিয়া সেখানে অস্থায়ীভাবে আবাস গড়ে তুলেছিলেন। ৭০ এর ১২ নভেম্বর প্রলয়কারী ঘূর্ণিতে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বিরান হয়ে যায় সে জনপদ। স্বাধীনতা পর বন বিভাগ এর দায়িত্ব নেয়। শুরু করে বনায়ন।
এক সময়ের নিঝুম নীরব নিথর জনপদ মানুষের পদচারনায় এখন ধীরে মুখরিত হয়ে উঠছে। গড়ে উঠছে জনবসতি। গাবাদি পশুর খামার। দ্বীপ সংলগ্ন চতুর্দিকে বিপুল মৎস্য ভান্ডার আর দুলর্ভ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ নিঝুম দ্বীপ সম্ভাবনার এর উজ্জল দিগন্ত উম্মোচিত করছে।
জনবসতিঃ
১৭৯৪ সনের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তখন এর জনসংখ্যা ছিলো ৪৫জন। পুরুষ ২৩ জন ও মহিলা ২২জন। স্বার ছিলো ৭জন। এরা সবাই বিভিন্ন যায়গা থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ভোলা, মনপুরা, রামগতি থেকেও অনেকে এখানে চলে আসেন। ১৯৮৮ সনে সরকারি ভাবে ৯টি গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টিকরে ৫শ ৪৬টি পরিবারকে বসতির ব্যাবস্থা করা হয়। এই গুচ্ছগ্রাম গুলো হলো, বসুন্ধরা, বাতায়ন, আনন্দ, আগমনি, ছায়াবীথি, ধানসিঁড়ি, যুগান্তর, সূর্যদয় ও পূর্বাচল। এখানে প্রতিটি পরিবারকে দেয়া হয় দুই একর করে জমি। যাতে রয়েছে, বাড়ী ৮ ডিসিমেল ও কৃষি জমি ১ একর ৯২ ডিসিমেল করে। একটি বড় দীঘির চতুর্দিকে বাড়ী গুলো করা হয়েছে। এছাড়াও এ দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার অধিবাসী বসবাস করছে। দিন দিন এ সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
জীবিকাঃ
এ অঞ্চলে মানুষদের প্রধান জীবিকা সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও কৃষি। নিঝুম দ্বীপে একটি ছোট্ট পরিসরের বাজার রয়েছে। এ দ্বীপে আগে কখনো কোন পোষ্ট অফিস ছিলো না, অতিস¤প্রতি বাজারের মধ্যে একটি পোষ্ট অফিস চালু হয়েছে। তবে এখনও ব্যবসা বাণিজ্য বা যোগাযোগের জন্য এখানে অধিবাসীদের অসুবিধা রয়ে গেছে। এ দ্বীপে শুটকীর ব্যবসার সঙ্গে অনেকেই জড়িত। শুকনো মৌসুমে এখানে শত শত মন মাছ শুটকী করা হয়। এখানে রয়েছে অনেক গুলো মাহিষের বাথান। পর্যাপ্ত দুধ পাওয়া যায় সেখান থেকে। সে দুধ থেকে তৈরী হয় উৎকৃষ্ট মানের দই। চট্টগ্রাম মাইজদীতে মহিষের দই-এর বিপুল চাহিদা রয়েছে।
শিক্ষা:
নিঝুম দ্বীপে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। একটি নিঝুম দ্বীপ বিদ্যানিকেতন অপরটি নিঝুম দ্বীপ শতফুল স্কুল। স্কুল দুটি দুই সাইক্লোন সেন্টারে গড়ে উঠেছে। প্রায় ১ হাজার ২শ ছাত্র-ছাত্রী এখানে পড়া শুনা করে। হাতিয়া দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এ এলাকার জনগণের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ নানান উন্নয়ন কর্মের সহযোগীতা করে আসছে। এদের মধ্যে আক্ষরিক শিক্ষা না থাকলেও সামাজিক শিক্ষায় অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। দ্বীপের জনগণ বেশ ভদ্র বন্ধুবৎসল ও কর্মঠ।
নিঝুম দ্বীপের আয়তন:
নিঝুম দ্বীপের বর্তমান আয়তন প্রায় ৪৪ বর্গ কিলোমিটার এর উত্তর অংশে রয়েছে বন্দরটিলা। বনের মাঝা-মাঝি একটি সরু ছরা বা খাল দ্বীপকে দুভাগ করছে। এর উত্তর অংশ বন্দরটিলা ও হাতিয়া দক্ষাণ অংশ মোক্তারিয়ার সঙ্গে দুরত্ব কমে আসছে। এখানে মাঝখান বরাবর সাগরের গভীরতাও কমে আসছে। এর উপর দিয়ে একটি বাঁধ কিংবা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। তাহলে হাতিয়া থেকে সরাসরি সড়ক পথে নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যাবে। দ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণে সাগর থেকে জেগে উঠছে আরো নতুন নতুন ভুখন্ড। এত দিন নিঝুম দ্বীপটি ছিলো হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড। বর্তমানে নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়নে উন্নিত করা হয়েছে। । বন বিভাগের সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে মনোমালিন্য ছাড়া আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতি অত্যন্ত শান্ত। এ দ্বীপের দক্ষিণ পশ্চিম কোনে ইতিমধ্যে একটি বড় দ্বীপ জেগে উঠেছে। ঢাল চর হিসাবে এটি এখন চিহ্নিত হয়েছে। দ্বীপের আশ-পাশে ছোট বড় কয়টি দ্বীপ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে চর কালাম, রৌশনীচর, দমারচর প্রভৃতি অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের ধারনা নদী বাহিত পলি মাটি জমে জমে বেড়ে যাচ্ছে নিঝুম দ্বীপের আয়নত।
অভ্যন্তরিন যোগাযোগঃ
এ দ্বীপের অভ্যন্তরিন যোগাযোগ এখানো তেমন উন্নত নয়। এখানে কয়টি মাটির রাস্তা রয়েছে। সমগ্র দ্বীপে কোন যাত্রীবাহি যানবাহন নেই। কোন রিক্সাও নেই। এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে হেঁটেই যেতে হয়। স¤প্রতি এখানে একটি পোষ্টঅফিস স্থাপিত হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের ওয়ারলেসের মাধ্যমে জরুরী সংবাদ আদান প্রদান হতো। দূর্যোগের সময় এই ওয়ারলেস সেইটিই ছিলো একমাত্র আবলম্বন। স¤প্রতি গ্রামীণ ফোনের টাওয়ার বসানো হয়েছে। এখন মোবাইলেও যোগাযোগ করা যায।
অর্থনীতিঃ
নিঝুম দ্বীপে প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন খনিজ পদার্থ রয়েছে বলে ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে ও বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। এখানে রয়েছে মহিষের বড় বড় বাথান। সবগুলোই স্থানীয় বাথানিয়াদের নিজস্ব উদ্যোগে গড়া। এখান থেকে উৎপন্ন দুধ থেকে তৈরী হয় বিখ্যাত দই। অথচ প্রক্রিয়াজাত করার কোন ব্যবস্থা নেই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দুগ্ধ খাতে বিপুল অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন চর কমলা, চর রোশনী, চর রোহানীরা, চর নুরুল ইসলাম, চর পিয়া, ঢালচর, মৌলভী চর, চর গিয়াস উদ্দিন, তেলিয়ার চর, চর রশিদ, চর আজমন, চর আমানত, সাগরদী প্রভৃতি দ্বীপে চারণ ক্ষেত্র করা যেতে যারে। নিঝুম দ্বীপ ঘিরে রয়েছে বিপুল মৎস্য ভান্ডার। এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক চিংড়ি জোন। সুস্বাধু ইলিশের চারণ ক্ষেত্র এই জলসীমানা। সুন্দর সুষ্ঠু প্রকৃতি নির্ভর পরিকল্পনা নিলে দেশের অর্থনীতির বিপুল উন্নতি সাধিত হবে বলে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন।
বনায়ন
নিঝুম দ্বীপের অন্যতম আকর্ষনীয় দিক হলো এর বিশাল শান্ত স্নিগ্ধ গভীর ঘন বন। নিঝুম দ্বীপের আয়তন ৪৪ বর্গকিলোমিটারের প্রায় তিন চতুর্থাংশই গভীর ঘন বনে আবৃত। স্বাধীনতার পর থেকে বন বিভাগ এখানে বন সৃজন করে আসছে। তবে গভীর সমুদ্রের আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন মাটিতে বাইন ও কেওড়া গাছ লাগানো হয়েছে। নতুন মাটিতে নতুন চরে এ গাছগুলো বেশ কার্যকর। আবার নতুন মাটি পোক্ত ও শক্ত করার জন্য এ গাছ গুলো বেশ উপযোগী বলে বন বিভাগ জানিয়েছে। এ বনের মধ্যে আছে বানর, উদবিড়াল, গুঁই সাপ, নানান জাতের পাখি, বন মোরগ, কাঠরিড়ালী, বিভিন্ন ধরনের সাপ, কাছিম, প্রভৃতি। আর আছে হাজার হাজার মায়াবি হরিণ। লাখ লাখ অতিথি পাখির জন্য এ দ্বীপ এক বিরাট আকর্ষন। প্রচন্ড শীতে খাদ্যের অন্বেষণে এসব পাখিরা উড়ে আসে এ দ্বীপে। এ সময় পাখিদের অপূর্ব মোহনীয় কূজন শুনে মনে হয় কোন এক রূপকথার পঙ্খীরাজ্য। তবে শিকারীদের জন্য দুঃসংবাদ হলো এ রাজ্যে শিকার নিষিদ্ধ। এ দ্বীপের ভিতর আছে মানুষে প্রাণীতে এক নিবিড় সংখ্যতা। ঘন বনের মধ্যে উৎপন্ন হয় উৎকৃষ্ট মধু। প্রতি বছর আহরিত হয় শত শত লিটার মধু।
আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্রঃ
একটি আকর্ষণীয় লাভজনক পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে নিঝুম দ্বীপ এক স্বর্গভূমিতে পরিনত হতে পারে। দ্বীপের দক্ষিণ বৃত্তাকার প্রায় ১২ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে সী-বীচ। চিকচিকে মোটা বালুকারময় এ সৈকত ঢালু হয়ে চলে গেছে সমুদ্রের অভ্যন্তরে। ভাটায় জেগে উঠে দীর্ঘ বেলাভূমি। সে বেলাভূমিতে সাগরের ফেনীল উর্মীমালা আছড়ে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য কাউকে আলোড়িত না করে পারে না। চন্দ্রালোকে জোয়ার ভাটায় এর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি সৃষ্টি করে। জোৎস্নার আলোয় ফেনিল উর্মীমালার শীর্ষে শীর্ষে যেন এক একটি মনি মুক্তা জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকে। দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়।
নিঝুম দ্বীপকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছিলো। ১৯৭৪ সনে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এ দ্বীপকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেদ্র করার পদপে নিয়েছিলো। বর্তমানে এ দ্বীপকে পর্যটন দ্বীপ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য সরকারী ব্যাপক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে কয়টি সরকারি বেসরকারি রেষ্ট হাউজ করা হয়েছে। একটি বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান সেখানে পর্যটকদের জন্য হাতি ঘোড়া ইত্যাদির ব্যাবস্থা করেছে। অনেকের ধারনা এ দ্বীপের বালুকাবেলায় কোন অবকাঠামো গড়ে তুললে সমুদ্রের জোয়ারে তা ভেঙ্গে পড়তে পারে। তবে বিকল্প ব্যবস্থায় পি-ফেব্রিকেটেড কটেজ নির্মাণ করে পর্যটন মৌসুমে এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বন বিভাগে একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে চিহ্নিত করে অভয়ারন্য হিসাবে ঘোষণা করে এর ভিতর ছোট ছোট চ্যানেলে পর্যটকদের জন্য দৃশ্য অবলোকনের ব্যবস্থা করতে পারে। যেভাবে দেশী বিদেশী বিভিন্ন পর্যটক এ দ্বীপের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে, এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে এখানে গড়ে উঠতে পারে অত্যন্ত আকর্ষণীয় পর্যটন জোন। এ থেকেও আমাদের দেশ উপার্জন করতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্র।
প্রাকৃতিক স্বাস্থ্য নিবাসঃ
ইতিমধ্যে নিঝুম দ্বীপটি হয়ে উঠেছে একটি চমত্কার স্বাস্থ্য নিবাস। যে কেই এখানে এসে সুন্দর সূর্যস্নাত দিনে সমুদ্র অবগাহনে হবেন পুলকিত। বছরের ঝূঁকিপূর্ণ ঝড় ঝঞ্ঝার দিনগুলো বাদে বিশেষ করে শীত-হেমন্তে ভ্রমন বেশ জমে উঠে। এখানে শহরের মত গাড়ীর ধোঁয়া নেই। ধুলি বালির আধিক্য নেই। কান ফাটা গাড়ীর হর্ন নেই। কেবল সমুদ্রের নির্মল বায়ু শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ, বায়ু পরিবর্তনকারীদের জন্য এ দ্বীপটি এক স্বর্গরাজ্য। মাত্র কয়েক ঘন্টার অবস্থানেই শরীর ও মন হয়ে উঠবে ঝরঝরে তাজা।
মত্স্য ভান্ডারঃ
নিঝুম দ্বীপের চতুর্দিকে আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশাল মৎস্য ভান্ডার। বৈশাখ থেকে আষাঢ় শ্রাবণ পর্যন্ত এখানে সবচেয়ে বেশী মাছ ধরা পড়ে। এ সময় সবচেয়ে বেশী ধরা পড়ে ইলিশ। ইলিশ ছাড়াও নানান জাতের মাছ সারা বছরই এখানে পাওয়া যায়। খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, চট্টগ্রামের শত শত মাছ ধরার ট্রলার এ সময় এ অঞ্চলে এসে মাছ ধরে নিয়ে যায়। এ সময় নিঝুম দ্বীপের চতুর্দিকে হাজার হাজার জেলেদের পাল তোলা নৌকা মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠে। নানা রঙের নানা আকারের পালের নৌকার সাগরের মধ্যে এক রঙ্গিন ফুলের মালায় পরিনত হয়। সে দৃশ্য স্বচে না দেখলে কল্পনা করাও অসম্ভব।
সমুদ্রের কলতান, মায়াবী হাতছানীঃ
সমুদ্রের ডাক শুনতে সবাই ছুটে যায় কক্সবাজার। সমুদ্র সৈকত বলতে বুঝায় কক্সবাজার টেকনাফ এবং স¤প্রতিক কুয়াকাটা। অথচ নিঝুম দ্বীপের বিস্তীর্ণ সমুদ্রতট ও তার মায়াবী হাতছানী এখনো অনেকের আড়ালে রয়ে গেছে। অদ্ভুত এক নির্জনতা নিঝুম দ্বীপকে ঘিরে রেখেছে এর সৈকতে দাঁড়ালে গভীর সমুদ্র থেকে তরঙ্গে ভেসে আসে সমুদ্রের মায়াবী আহ্বান। হৃদয়ে বেজে উঠে অপূর্ণ সুরের মুর্ছনা। তনুমন তখন তন্ময় হয়ে হারিয়ে যায় সুদূর দিগন্তে। যেন সাগরের নীলে দাঁড়িয়ে আকাশের নীলকে ছুঁয়ে দেখা। সমুদ্রের হৃদপিন্ডে বসে সমুদ্রের শব্দ শোনা। আর মনের সাধ মিটিয়ে বেড়াতে চাইলে নিঝুম দ্বীপ হচ্ছে আদর্শ স্থান। সমুদ্রের গানের সাথে নিজ হৃদয়ের সুর মিলিয়ে একাকার হয়ে যাওয়া, দূরনীলিমায় আকাশ রাঙানো দিগন্তের ফুলসজ্জায় সূর্য আর সাগরের অপূর্ব মৈথুন উপভোগ করা। পরক্ষনেই উর্মিল সাগরের জলদ শরীরে লাল সূর্যের হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে যে কারো রোমান্টিক হৃদয়কেও নিরুদ্দেশ করে দেবে
যেভাবে নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যাবেঃ
ঢাকা থেকে খুব সহজেই নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়। ঢাকার সদরঘাট থেকে একটি স্টিমার সপ্তাহে দুদিন হাতিয়ায় চলাচল করে। হাতিয়া থেকে ট্রলারে যেতে হয় নিঝুম দ্বীপ। ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত পর্যন্ত অনেকগুলো চেয়ারকোচ সরাসরি নোয়াখালীতে যাতায়ত করে। চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টায় এগুলো সরাসরি মাইজদী সোনাপুর এসে পৌঁছে। চেয়ার কোচের ভাড়া দুইশ' টাকা । সকাল সাতটায় কমলাপুর থেকে ছাড়ে উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেন । এছাড়া ঢাকা সাঈদাবাদ থেকে আধা ঘন্টা পর পর যাত্রীসেবা বাস গুলো ছাড়ে নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে, ভাড়া ১শ ২০ টাকা। নোয়াখালী সোনাপুর পৌঁছে সেখান থেকে যেতে হবে স্টিমার ঘাট। বাস টেম্পো বা বেবীতে সরাসরি পাকা মশ্রিণ পথ ধরে ৪০ কিঃমিঃ দক্ষিণে সুধারামের শেষ প্রান্তে চর মজিদ স্টিমার ঘাট। তার পরেই হাতিয়া যাবার চেয়ারম্যান ঘাট। পাকা রাস্তা একেবারে ঘাট পর্যন্ত এসে মিশেছে। সোনাপুর থেকে একটি বেবী রিজার্ভ নিলে ২৫০টাকা থেকে ৩০০ টাকা অথবা জনপ্রতি ৫০টাকা দিয়ে যাওয়া যায়। টেম্পো, বাসে জনপ্রতি ভাড়া আরো কম। চর মজিদ ঘাট থেকে ট্রলার কিংবা সী-ট্রাকে করে হাতিয়া চ্যানেল পার হয়ে যেতে হবে হাতিয়া নলচিরা ঘাটে। সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টা। । নলচিরা বাজার থেকে যেতে হবে হাতিয়ার দক্ষিণে জাহাজমারা। সময় নেবে আধা ঘন্টা। জাহাজমারা থেকে ট্রলারে সরাসরি নিঝুম দ্বীপ। সময় নেবে ৪০/৫০মিনিট। তবে দলবেঁধে গেলে ট্রলার রিজার্ভ করে সরাসরি নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়। ঘাট থেকে নদীপথে হাতিয়া অথবা নিঝুম দ্বীপে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে জোয়ারের জন্য। কারণ জোয়ার না থাকলে ঘাটে ট্রলার ভিড়ানো যায় না। আবার ভাটার সময় নদীতে অসংখ্যা ডুবা চরে ট্রলার আটকে যাবার সম্ভাবনা থাকে। জোয়ারের সঠিক সময় জেনে ঢাকা থেকে ভোরে রওনা হলে বিকালের মধ্যে নিঝুম দ্বীপে পৌছানো যায়। নিজস্ব গাড়ী নিয়ে আসলে ঢাকা থেকে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টায় সহজেই স্টিমার ঘাটে পৌঁছা যাবে। পথিমধ্যে যোগাযোগের এই সামান্য অসুবিধা ছাড়া এত অল্প সময় ও অল্প খরচে সমুদ্রের কাছে যাওয়ার আর কোন সহজ উপায় নেই।
থাকার ব্যবস্থাঃ
নিঝুম দ্বীপে অতি স¤প্রতি একটি ভালোমানের হোটেল বাণিজ্যিক ভাবে চালু হয়েছে। এখানকার স্থানীয় বাজারে খুব সস্তায় অল্প দামে চার পাঁচটি আবাসিক বোডিং আছে। তাছাড়া বন বিভাগের একটি চমৎকার বাংলো আছে। পাশেই আছে জেলা প্রশাসকের ডাক বাংলো। এগুলোতে আগে ভাগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা যায়। তাছাড়া রেড-ক্রিসেন্ট ইউনিট ও সাইক্লোন সেন্টারেও থাকার ব্যবস্থা করা যায়। এ দ্বীপে অনেকেই আছেন খুব বন্ধু বত্সল। পর্যটকদের এরা খুব সম্মানের চোখে দেখেন। যেকোন অসুবিধা দুর করতে আগ্রহ করে তারা নিজেরাই এগিয়ে আসেন। নোয়াখালী শহরে থাকতে চাইলে এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি ভাল ভাল আবাসিক হোটেল। প্রধান সড়কের পাশেই এই হোটেল গুলো রয়েছে। তাছাড়া বিআরডিবি রেস্ট হাউস, সড়ক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য বিভাগের আধুনিক ডাক বাংলো রয়েছে। সরকারী অনুমতি নিয়ে সার্কিট হাউসেও যে কেউ থাকতে পারেন। সময় করে মাইজদীতে একদিন থেকে এর শান্তরূপ উপভোগ করা হবে ভ্রমনের একটি বাড়তি পাওনা। পথে পড়বে বিখ্যাত মোঘল স্থাপত্যের নান্দনিক সৌন্দর্যের বজরা মসজিদ। আর একটু সময় নিলে দেখে আসা যাবে অহিংস ভাবাদর্শের নানান ঘটনা বিজড়িত উপ মহাদেশ খ্যাত গান্ধি আশ্রম।
নিঝুম দ্বীপের রোমাঞ্চঃ
যারা উচ্ছাস উচ্ছলতা আর রোমাঞ্চে জীবনকে অর্থবহ করতে চান তারা নিঝুম দ্বীপকে ঘিরে, সে আশা ষোলকলা পূর্ণ করতে পারেন। শীত মৌসুমে সাগর শান্ত থাকলেও বছরের যেকোন সময় এখানে আসা যায় এপ্রিল থেকে সাগর ধীরে ধীরে অশান্ত বা গরম হতে থাকে। তখন ঢেউয়ের উচ্চতাও বৃদ্ধি পায়। ট্রলারে সে তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ সাগর পাড়ি দিতে প্রয়োজন পড়ে সাহসের। সে সময় এক রোমাঞ্চ অভিজ্ঞতায় দুধর্ষ অভিযাত্রীর মত মনে হবে নিজেকে। উদ্দাম ঢেউয়ে ছিটকে আসা সমুদ্রের লোনা জল পুলকিত হবে হৃদয়। এ সময় সমুদ্র পাড়ি হবে জীবনের রোমাঞ্চাকর হৃদ-কাঁপানো অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতার ভান্ড ভারী হলে জীবনও হবে সমৃদ্ধশালী।
নিঝুম দ্বীপ। সে এক অজানা মায়াবী রহস্য দ্বীপ। ধীরে ধীরে অবগুষ্ঠন খুলে উন্মোচন করছে নিজেকে। দূর সমুদ্র থেকে হাতছানি দেয় সে। চপলা লাস্যময়ী কুমারীর মত ইশারায় কাছে ডাকে। যাদের সৌভাগ্যের দেবী সুপ্রসন্ন হবে তারাই ছুটে যাবে সাগর সঙ্গমে।
______________________________________________________________
*** ভাঙ্গা গড়ার খেলা ***
ভূলুয়া যার বর্তমান নাম নোয়াখালী
বর্তমান নোয়াখালী শহরের দক্ষিণ প্রান্তে- সোনাপুরে নোয়াখালী রেলষ্টেশনের মাইল খানেক দক্ষিণে ছিল মূল নোয়াখালীর জেলা সদর সুধারাম। এক সময় এ এলাকা সুধারাম ভান্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন উপন্যাস, কবিতা, গানে এই সুধারামের উল্লেখ আছে। এখানকার জনজীবনকে কেন্দ্র করে শহীদ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সার লিখেছিলেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘সারেং বৌ’। কতজনের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে সমুদ্র গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সেই নোয়াখালী শহরকে ঘিরে। বুদ্ধদেব বসুর শৈশব কৈশোর কেটেছে বিস্মৃত সেই অনিন্দ্যসুন্দর শহরে। তার ভাষাতেই বলা যায়......নোয়াখালীর পথে এবং অপথে আমার ভূগোল শিক্ষা।..... আমার কাছে নোয়াখালী মানেই ছেলেবেলা আর ছেলেবেলা মানেই নোয়াখালী।... এমন কোন পথ ছিল না নোয়াখালীর, যাতে হাঁটিনি।....শহর ছাড়িয়ে বনের কিনারে নদীর এবড়ো থেবড়ো পাড়িতে কালো কালো কাদায়, খোঁচা খোঁচা কাঁটায়-চোরাবালির বিপদে। ....কখনো গেছি সুদূর রেলষ্টেশনে, রেল লাইনের নূড়ি কুড়োতে, কখনো জেলখানার পেছনে ভূতুড়ে মাঠে.....। ঘাসে গন্ধ নেশার মত লাগছিল আমার।... সংসারটা জঞ্জাল, সমস্য- গোলমাল অর্থহীন। সবচেয়ে ভাল রাখাল হয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো, গাছের ছায়ায় ঝির ঝিরে হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়া.....।
প্রখ্যাত সাংবাদিক সানাউল্ল্যাহ্ নূরী তার বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখায় নোয়াখালী সম্বন্ধে অনেক চমৎকার তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তার মতে আধুনিক নোয়াখালী ভূ-খন্ডের প্রাচীন নাম ভুলুয়া। ভুলুয়া ছিল বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অঞ্চলের প্রাচীনতম ইতিহাসের স্নায়ুকেন্দ্র। খ্রিস্টপূর্ব যুগেও ভুলুয়া বন্দর প্রাচীন পৃথিবীর আনর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। গুপ্ত বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য তথা সমুদ্র গুপ্তের আমলের (৩৭৫-৪১৪ খ্রিষ্টাব্দ) শেষ ভাগে যখন চৈনিক পরিব্রাজক কাহিয়েন এ উপমহাদেশে আসেন, তখনও সামুদ্রিক বন্দর হিসেবে ভুলুয়ার খ্যাতি ছিল। বৌদ্ধযুগ, পাল ও সেনযুগ এবং পরবর্তীকালের বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল, পাঠান তুর্কি আমল, মুঘল আমলসহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর যুগ পর্যন্ত প্রাচীন সূত্র ও দলিল দস্তাবেজে ভুলুয়ার বহু উল্লেখ দেখা যায়। এ সময়ের মধ্যে সমুদ্র বহুবার উপকূলসংলগ্ন মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি এসে প্রাচীন জনপদ সমূহকে গ্রাস করেছে। লক্ষ্মীপুর সুধারাম, বামনী, কোম্পানীগঞ্জ, ফেনী নদীর মধ্যে কমপক্ষে সাত থেকে দশবার গ্রাস করেছে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল নীল তরঙ্গের ফেনীল জলরাশি। আবার প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে সাগর তাকে উগরেও দিয়েছে। নীরবিচ্ছিন্ন এই ভাঙ্গাগড়ার কারণে প্রাচীন এইসব ভূখন্ডের অতীত কোন নির্দশন খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ অঞ্চলে ভৌগলিক পরিবর্তন ঘটেছে অবিশ্বাস্যভাবে। এ অভূতপূর্ব ভাঙ্গাগড়ার ইতিহাস পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। ১৯২২ থেকে ১৯৩২ এবং ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে মোট চার দফা ভাঙ্গনের পর বর্তমানে নোয়াখালীর দক্ষিণ অংশে পূর্বে-পশ্চিমে প্রায় ৬৪ (চৌষট্টি) কিলোমিটার এবং আয়তনের সমুদ্র উপকূলবর্তী বিশাল চর অরন্য। নোয়াখালী সদর সোনাপুর থেকে এর শুরু। পশ্চিমে ওদারহাট রামগতি, পূর্বে ফেনীর বামনী কোম্পানীগঞ্জ। কখনো ধীরে কখনো দ্রুত জেগে উঠেছে চর। মেঘনা নদী আর ফেনী নদী বার বার নানা ভাবে ভাঙ্গাগড়ার খেলা খেলেছে এ অঞ্চলে। শত শত বছর ধরে গড়া নোয়াখালী জেলা শহর সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে মেঘনার গর্ভে । এক সময় সে লোকালয় ছিল কোলাহলমুখর, ছিল কোর্ট- কাছারি-স্কুল-মাদ্রাসা-মসজিদ, ঘোড় জোড়ের মাঠ, বাজার মহল্লা। মেঘনার উত্তাল করাল গ্রাসে একে নদী গর্ভে হারিয়ে গেল। দু’দিন আগে যে ছিল জমিদার যার ছিল অঢেল প্রতিপত্তি আজ সে নিঃস্ব হতম্বি। একদিন যেখানে ছিল জনস্রোত লোকালয় আজ সেখানে সমুদ্রের উত্তাল ফেনিল ঢেউ, নদীর তীব্র লোনা স্রোত।
শুরু হল এক মরণপণ সংগ্রামের লড়াই। রুখতে হবে নদী, বাঁধতে হবে ভাঙ্গন। সে এক অভূতপূর্ব জয় আর অর্জনের কাহিনী। যখন একে একে দেশি-বিদেশি সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে লাগল। ভাঙ্গনের নেশায় নদীল আগ্রাসী হিংস্র দৃষ্টি উত্তরের জনপদের দিকে। ধ্বংসের ছায়া পড়ল মাইজদী আর উপ-মহাদেশের বিখ্যাত ব্যস্ততম ব্যবসাকেন্দ্র চৌমুহনীতে।
যেভাবে প্রমত্তা মেঘনা বসে এলত্রিশের দশকে সর্বনাশা মেঘনা হিংস্র থাবা মেরে মেরে ধেয়ে আসছিল উত্তরের লোকালয়ের দিকে। একে একে নদীগর্ভে বিলীন হতে লাগল সুপ্রসিদ্ধ ওসমান আলী দারগারবাড়ী, জজ কোর্ট কালেক্টরেট ভবন। শহর রক্ষার সমস- প্রচেষ্টা ব্যর্থ। বড় বড় দেশি-বিদেশি পরিকল্পনাবিদদের ঘুম নেই। এক সময় হাল ছেড়ে দিল সবাই। ঠিক সেই সময় ১৯২৯ সালে নোয়াখালীতে ফিরে এলেন এলাকার এক কৃতী সন্তান প্রবাদ পুরুষ ওবায়দুল্লাহ্ ইঞ্জিনিয়ার। ভূপাল আর কাবুলের রাষ্ট্রীয় সভায় কর্মরত থেকে এই মেধাবী মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার সেখানে বহু মূল্যবান খনি আবিস্কার করে সে দেশেই এক কিংবদন্তি নায়কে পরিণত হন। কথিত আছে তিনি মাটি দেখেই বলে দিতে পারতেন মাটির তলার লুকানো সসম্পদরাজির কথা, সাগরের ঢেউ দেখে এর আহাজারি আর আগ্রাসী নদীর হুঙ্কারে বিচলিত হলেন তিনি। তার পৈত্রিক চিহ্নটুকুও যে চলে যাচ্ছে গহীন সমুদ্রে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বাঁধ দিতে হবে নদীতে। বাঁধের স্থানটিও নির্ধারন করলেন। তিনি নিশ্চিত হলেন পরিকল্পনা সফল হলে শুধু সমগ্র নোয়াখালীই রক্ষা হবে না সমুদ্র থেকে জেগে উঠবে বিশাল ভূখন্ড। স্বপ্ন দেখলেন এক বিশাল সম্ভাবনাময় প্রাচুর্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটলেন শিমলায় তৎকালীন ভারতবর্ষের গ্রীস্মকালিন রাজধানীতে। শিমলায় কেন্দ্রীয় সরকারের সেচ মন্ত্রনালয়ে বুঝাতে চেষ্টা করলেন ব্যাপারটা। ব্রিটিশ ভারতের প্রধান প্রকৌশলী স্যার এডওয়েস উইলিয়াম নাক্চ করে দিলেন এ প্রকল্প। স্রোতের তোড়ে যেখানে ভাঙ্গছে শহর ভাঙ্গছে জনপদ নিশ্চিহ্ন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম সেখানে বাঁধ কি করে টিকবে, কি করে সম্ভব। অনেকটা ভৎসনা করেই ফিরিয়ে দিল তাকে। কিন্তু দমলেন না তিনি। নিজের উপর যার অগাধ বিশ্বাস, আস্থা, তিনি তো আর বসে থাকার লোক নন। ফিরে এলেন দেশে। যা কিছু সহায় সম্বল আছে তা নিয়ে এলাকার হাজার হাজার মানুষের সহযোগীতায় নেমে পড়লেন কাজে। তাঁর উদাও আহ্বানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে রাজি হল। ধানের বড় বড় ঢোল আর চটের বস্তা মাটিতে ভরাট করে তোলা হল নৌকায়। বুঝে নিলেন অমাবস্যা পূর্ণিমার অবস্থান। পরখ করলেন প্রতিদিনের জোয়ার ভাটার গতি-প্রকৃতি। দেখলেন ঘূর্নায়মান স্রোতের গতি। নিখুঁত জ্যামিতিক অবস্থান আর অঙ্কের হিসাব নিকাশ করে ঠিক সময় নির্দিষ্ট জায়গায় মাটি ফেলতে নির্দেশ দিলেন তিনি। নৌকায় মাটি ভরাট করে স্থানে স্থানে নৌকাসহ ডুবিয়ে দেয়া হল। প্রায় এক মাস রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে পাঁচ হাজার মানুষের অসাধারন শ্রমের ফসল ফলল অবশেষে। ১৯৩০ সালের শেষ জানুয়ারিতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না মানুষ, তৈরী হল চল্লিশ ফুট উঁচু এক বিরাট বাঁধ। প্রমত্তা মেঘনা দুর্বল হতে লাগল। রক্ষা পেল শহর জনপদ। কিন্তু ১৯৩৪ সালে বেগমগঞ্জের কিছু উদ্ধত প্রভাবশালী জোতদারদের নগন্য সংকীর্ণতায় ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারের প্রবল আপত্তি ও বাধার মুখেও সেই বাঁধ কেটে দেওয়া হল। বাঁধ ছিঁড়ে আবার ঢুকলো সমুদ্রের উত্তাল জোয়ার, আছড়ে পড়লো নদীর তীব্র ঢেউ। প্রমত্তা মেঘনা অগ্নিমূর্তিতে আবার ধরা দিল। সমুদ্রগর্ভে বিলীণ হয়ে গেল অবশিষ্ট শহর। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সমুদ্রোপকূলবর্তী হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা নয়নাভিরাম শহরের শেষ চিহ্নটুকু। এরি মধ্যে ১৯৩৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী ৬০ বছর বয়সে তৎকালীণ অবিভক্ত বাংলার একমাত্র মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার প্রতিভাধর এই ব্যক্তিত্ব ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ার তাঁর গ্রামের বাড়ী সন্নাখটিয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর কিছুদিনের মধ্যে তার কবর আর বাড়ীসহ সমগ্র গ্রামটিই মেঘনার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় শহর স'ান-ারিত হয় মূল শঞর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে বর্তমান মাইজদী কোর্টে। ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হয় নতুন রাষ্ট্রের। নতুন রাষ্ট্র গঠনের দিকেই নতুন সরকারের সমস- দৃষ্টি। সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়া শহর আর তার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধান- হয়ে যাওয়া লাখ লাখ ছিন্নমূল মানুষের প্রতি কারো নজর রইল না। অনেক পরে তৎকালীন সকরার অনুধাবন করতে পারে ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারের উদ্ভাবিত পরিকল্পনা। ষাটের দশকে তৎকালিন ওয়াপদার চেয়ারম্যান ডি কে পাওয়ার মরহুম ওবায়দুল্লাহর পরিকল্পনার আদলে প্রণয়ন করেন চর জব্বার ক্রস বাঁধ।
মেঘনার বুকে ক্রসড্যাম এবং উপকূলে ভেড়ি বাঁধ নির্মাণ করার ফলে লাখ লাখ একর জমি সমুদ্রগর্ভ থেকে জেগে উঠেছে। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন গ্রাম-গঞ্জ এবং হাট-বাজার। দিগন- বিস্তৃত ধান ফসলের মাঠ। স্নিগ্ধ সবুজ বনরাজি। স্থানে স্থানে কৃষকের শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় তৈরী নির্মল স্বপ্নিল খড়েড় ঘর। মাঠ থেকে মাঠে উড়ে যাওয়া ঝাঁকে ঝাঁকে জানা অজানা পাখির কলরব। গুরু মহিষের বাথান। চরের বুক চিরে কাঁচা পাকা প্রশস্ত রাস্তা দেখে কে বলবে এখানে এক সময় ছিল উত্তাল জলরাশির নীলাভ সমুদ্র আর নদী। ঝড় সামুদ্রিক বান পূর্ণিমা-অমাবস্যার জলোচ্ছাস বা বিশ ত্রিশ ফুট উঁচু শরের তোড়ে নৌকা আর জাহাজ ডুবি হয়ে শত শত মানুষের সলিল সমাধি ঘটেছে এই রাক্ষুসি নদীতে। সমুদ্রের হাঙ্গর একইভাবে রামগতি নদীতে তরুন বিপ্লবী নেতা তোহা জনগণকে নিয়ে দিল আরেকটি বাঁধ। সেটি তোহা বাঁধ বলে খ্যাত। শুরু হল প্রকৃতি আর মানুষের গড়ার পালা। যত দ্রুত ভাঙ্গল শহর তত দ্রুত গড়তে থাকল নতুন চর। দুদিন আগেও যে লোকালয় ছিল শহর। তারপর ভাঙ্গন, নদী-সমুদ্র। বড় বড় নৌকা স্টিমার। আবার সেখানেই গজে উঠল সমুদ্র থেকে পলি মাটি। যেন চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে সব। মানুষজন নেই। শুধু খাঁ খাঁ করছে সব। বিরান নিস্তদ্ধ। একে একে জেগে উঠল ঘোড় দৌড়ের মাঠ, মসজিদ, বড় রাস্তা, পুলিশ লাইন, গীর্জা, রেল স্টেশন, স্কুল, কোর্ট-কাছারি। না, দালান কোঠা ইমারতসহ নয়। পলিমাটি সমৃদ্ধ নতুন ভূমি। নতুন নাম হল ‘চর’। মানুষজন এককালের জমজমাট শহরকে বলতে লাগল চর সল্লা, চবর এলাহী, সল্লাঘটিয়া। নতুন নতুন নাম হল। ঠক্কর, ইনকাম চৌধুরীর পোল, বাংলা বাজার, গাইজ্জার খেয়া, চর জাহাজমারা, জগদানন্দ, চর বৈশাখী, চর নবগ্রাম, টুমচর আরও কত নাম। শুধু পুরাতন নোয়াখালী শহরই নয়। সমুদ্র থেকে জেগে উঠতে লাগল নতুন নতুন উর্বর ভূমি। ধীরে ধীরে শুরু হল আরেক সংগ্রামের পর্ব। উরি আর নলখগড়া গজানো চরে দেখা যেতে লাগল মহিষ আর ভেড়ার বাথান। উর্বর পলিমাটিতে ধানের আবাদ। জোয়ারে ভেসে আসা সমুদ্রের মাছ। চিরিং, ফুলচিরিং, গাং কই, কোরাল। হাতছানি দেয় এক বিশাল সম্পদের খনি। আস্তে আস্তে আবার মানুষ ফিরে আসে। জনকলরবে আবার সরগরম হতে থাকে বিসৃত সেই জনপদ।
আমাদের নোয়াখালী
গাঙ্গেয় পলিমাটি সমৃদ্ধ উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী। এ উর্বর অঞ্চল এক সময় সমতট নামে সুপরিচিত ছিলো। সহস্র বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগের কারণে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলো এ অঞ্চল। পত্তন হয় ভুলুয়া ষ্টেটের। সে থেকে ভুলুয়া পরগণা হিসেবেই এ অঞ্চল প্রসিদ্ধি লাভ করে। ভুলুয়া বন্দরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। শিক্ষা দীক্ষা, জ্ঞানে মানে এলাকার মানুষ প্রভুত উন্নতি লাভ করে।
মেঘনার মোহনায় সমুদ্রের উদার স্পর্শে এ এলাকার মানুষগুলো হয়ে উঠে উদার হৃদয়, আতিথি পরায়ণ আর কর্মঠ। বিক্ষুব্ধ সাগর ডিঙ্গিয়ে এদেশের মানুষ পাড়ি দিয়েছিলো দেশ বিদেশে। স্বভাবেও এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীন চেতা ও দৃঢ় চিত্তের আধিকারী। নানা দেশের সূফী দরবেশ আর জ্ঞানীদের আগমন ঘটেছিলো এই অঞ্চলে। কাল ক্রমে এর নাম করণ করা হয় নোয়াখালী। আরবীয় ইংরেজ আর গ্রীক সভ্যতার মিশ্রনে নোয়াখালী শহর গড়ে উঠেছিলো এক অপরুপ রুপসী সাজে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই আবিশ্বাস্যভাবে ভাঙ্গন শুরু হয় এ জনপদের। যে রুপময় মেঘনার তীরে গড়ে উঠেছিলো সে সময়ের সমৃদ্ধ জনপদ সে মেঘনাই এক সময় রাক্ষুসী রূপ ধারণ করে। মাইলের পর মাইল সেই ঐতহ্যবাহী জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই সাথে বিলীন হয়ে যায় হাজার বছর ধরে গড়ে উঠা সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যের চিহ্ন। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে কোলাহলময় এ লোকালয়। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় অসংখ্য গৌরব গাঁথা অধ্যায়। ভাঙ্গাগড়ার অমোঘ বাত্যাবয়নে জেলার ভৌগোলিক ইতিহাসও বাঁক নিয়েছে নানান ভাবে। তবুও কখনো থেমে থাকেনি এর চলার গতি। এখন এই জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। বর্তমান নোয়াখালী জেলা একসময় ফেনী, লক্ষীপুর এবং নোয়াখালী জেলা নিয়ে একটি জেলা বা বৃহত্তর অঞ্চল ছিল, যা এখনও বৃহত্তর নোয়াখালী নামে পরিচিত।
ইতিহাস
নোয়াখালী জেলার প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া। নোয়াখালী সদর থানার আদি নাম সুধারাম। নোয়াখালী নামের উত্পত্তি নিয়ে নানা জনের নানান মত রয়েছে। তবে ইতিহাসবিদদের ভিতর সবচেয়ে যে মতটি প্রচলিত তা হলো. একবার ত্রিপুরা-র পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়া-র উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসাবে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়, যা পানির প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করে। এই বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় "নোয়া (নতুন) খাল" বলা হত, এর ফলে "ভুলুয়া" নামটি একসময়ে পরিবর্তিত হয়ে ১৬৬৮ সালে হয়ে যায় "নোয়াখালী"।
নোয়াখালীর ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা ১৮৩০ সালে নোয়াখালীর জনগণের জিহাদ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ১৯২০ সালের খিলাফত আন্দোলন। বৃটিশ ভারতের শেষ দিকে নোয়াখালীর রামগঞ্জে এক ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা সংঘটিত হয়। সে দাঙ্গা বা রায়টের পর ১৯৪৬ সালে মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে আগমণ করেন। এখানে তিনি জাতিগত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। বর্তমান সোনাইমুড়ি উপজেলার জয়াগ নামক স্থানে গান্ধীজির নামে একটি আশ্রম রয়েছে, যা "গান্ধী আশ্রম" নামে পরিচিত। ১৭৯০ সালের পর হতে নোয়াখালী জেলা বহুবার ঘুর্ণিঝড়, বন্যা, টর্নেডো, সাইক্লোন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত হয়। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে নোয়াখালী উপকূল লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিলো। তখন সমগ্র উপকূলে প্রায় ১০ লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নোয়াখালীর মাটি রঞ্জিত হয়ে আছে। সে সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরিহ নিরস্ত্র মানুষকে বিভিন্ন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে অকথ্য নির্যাতনের পর হত্যা করে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। ১৯৭১ এর ১৫ই জুনে সোনাপুর আহমদীয়া স্কুল সংলগ্ন শ্রীপুরে নিরিহ গ্রামবাসীর উপর অতর্কিত এসে হামলা করে মেশিনগান চালিয়ে প্রায় শতাধিক নারী পুরুষকে হত্যা করে। এ সময় তারা শুধু মানুষ হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, সমগ্র গ্রামটিও তারা জ্বলিয়ে দিয়েছিলো। ১৯৭১ সালের ১৯ আগস্ট পাকবাহিনী বেগমগঞ্জ থানার গোপালপুরে গণহত্যা চালায়। নিহত হন প্রায় ৫০ জন নিরস্ত্র মানুষ। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধারা আসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ করে নোয়াখালী জেলা শত্রু মুক্ত করে।
ভৌগলিক সীমানা
চট্টগ্রাম প্রশাসনিক বিভাগের অধীন নোয়াখালী জেলার মোট আয়তন ৩৬০১ বর্গ কিলোমিটার। নোয়াখালী জেলার উত্তরে কুমিল্লা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলা এবং পশ্চিমে লক্ষীপুর ও ভোলা জেলা অবস্থিত। বছরব্যাপী সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় ৩৪.৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার গড় ১৪.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বছরে গড় বৃষ্টিপাত ৩৩০২ মিমি। এই জেলার প্রধান নদী বামনি এবং মেঘনা।
প্রশাসনিক এলাকাসমূহ
নোয়াখালী জেলায় ৯ টি উপজেলা রয়েছে। এগুলো হলো: নোয়াখালী সদর, বেগমগঞ্জ, চাটখিল, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া, সেনবাগ, কবির হাট, সুবর্ণ চর ও সোনাইমুড়ি নোয়াখালীর শহর নোয়াখালী সদর মাইজদি ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। আদম শুমারীর সর্বশেষ তথ্য আনুযায়ী শহরের মোট জনসংখ্যা ৭৪,৫৮৫; এর মধ্যে ৫১.৫০% পুরুষ এবং ৪৮.৫০% মহিলা; জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫৯১৫। শহুরে লোকদের মধ্যে শিক্ষিতের হার প্রায় ৬০.৭০%। নোয়াখালী সদরের আদি নাম সুধারাম। ১৯৪৮ সালে যখন উপজেলা সদর দফতর মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তখন তা ৮ কিলোমিটার উত্তরে সরিয়ে বর্তমান মাইজদিতে স্থানান্তর করে হয়। তখন থেকে সম্পুর্ন নতুন ভাবে গড়ে উঠে নোয়াখালী শহর যা 'মাইজদী শহর' নামেও পরিচিত। চৌমুহনী নোয়াখালীর আরেকটি ব্যস্ত শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র, যা একসময়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনা ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। সরিষার তেলের মিলের জন্যও সমগ্র দেশে এ বানিজ্য কেন্দ্রটির সুখ্যাতি ছিলো। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট শহরটি দ্রুত বেড়ে উঠছে এবং এটি এখন একটি ব্যস্ত শহরের রুপ নিচ্ছে । এই শহরের অধিবাসীদের একটি বড় অংশ কাজের জন্য আমেরিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী। এ অঞ্চলের যুগদিয়াতে এক সময় একটি ব্যাস্ত নৌবন্দর ছিলো যা বৃটিশ ভারতে লবণের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলো। এখান থেকেই জাহজ বোঝাই হয়ে পাট এবং লবণ ইংল্যান্ডে রফতানী হতো। জনশ্রুতি আছে এখানে এক সময় যুদ্ধ জাহাজ তৈরী হতো এবং তা সারা বিশ্বে রফতানী হতো।
অর্থনীতি
বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, নোয়াখালী জেলার মোট আয় ৩৭৮ কোটি টাকা (১৯৯৯-২০০০)। জেলার মোট আয়ের ৪৮% আসে চাকরি বা সেবামূলক খাত থেকে। অপরদিকে আয়ের মাত্র ১৭% আসে শিল্পখাত থেকে। নোয়াখালী জেলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ হারে হচ্ছে। নোয়াখালী জেলার মানুষের মাথা পিছু আয় ১৩,৯৩৮ টাকা (১৯৯৯-২০০০)। এ জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। তাদের পাঠানো বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা জাতীয় আয়কেও সমৃদ্ধ করছে।
চিত্তাকর্ষক স্থান
নোয়াখালী জেলার দক্ষিণে অবস্থিত নিঝুম দ্বীপ দর্শনীয় স্থান হিসাবে দিন দিন খ্যাতি লাভ করছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু উপযোগী শহীদ ভুলু স্টেডিয়াম, দৃষ্টি নন্দন বজরা শাহী মসজিদ, সোনাপুরে লুর্দের রাণীর গীর্জা, উপমহাদেশ খ্যাত সোনাইমুড়ির জয়াগে অবস্থিত গান্ধি আশ্রম, নোয়াখালীর উপকূলে নতুন জেগে উঠা চরে বন বিভাগের সৃজনকৃত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, মাইজদী শহরে অবস্থিত নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ , নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মাইজদী বড় দীঘি, কমলা রাণীর দীঘি, হরিণারায়ণ পুর জমিদার বাড়ি প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান হিসাবে উল্লেখযোগ্য।
উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
শিক্ষাদীক্ষায় নোয়াখালীর সুখ্যাতি বহু দিনের। সুদুর অতীতকাল থেকেই নোয়াখালী আঞ্চলের মানুষ জ্ঞান লাভের উদ্যেশে দেশ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলো। তখন থেকেই এ আঞ্চলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। কর্তমানেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষা ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করে চলছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় -সোনাপুর নোয়াখালী, নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চৌমুহনী এস এ কলেজ, নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় -মাইজদি, সোনাপুর ডিগ্রি কলেজ - সোনাপুর, অরুণ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় - মাইজদি বাজার, হরিণারায়ন পুর উচ্চ বিদ্যালয় - হরিণারায়নপুর, নোয়াখালী সরকারি কলেজ, বিদ্যানিকেতন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় - মাইজদি বাজার, জেলার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নোয়াখালী জিলা স্কুল , ব্রাদার আন্দ্রে উচ্চ বিদ্যালয় - সোনাপুর, পৌর কল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয় - মাইজদী,এম এ রশিদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় - মাইজদী, আহমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাপুর, নোয়াখালী আইন মহাবিদ্যালয় - মাইজদী, নোয়াখালী পাবলিক কলেজ - মাইজদী, চৌমুহনী মদন মোহন উচ্চ বিদ্যালয় - চৌমুহনী, বেগমগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় - বেগমগন্জ, গণিপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় - গণিপুর, চৌমুহনী, চৌমুহনী সরকারি সালেহ আহমেদ কলেজ - চৌমুহনী, চৌমুহনী টেকনিক্যাল স্কুল, নোয়াখালী কৃষি ইন্সিটিউট - বেগমগঞ্জ, টেক্টাইল ইন্সটিটিউট, নোয়াখালী যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ট্যাকনিক্যাল ইন্সটিট্উট, গাবুয়া। মাইজদী ম্যাডিক্যাল এ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেইনিং স্কুল। বসুরহাট সরকারি মুজিব কলেজ- কোম্পানীগঞ্জ, বসুরহাট সরকারি এ এইচ সি উচ্চ বিদ্যালয়, বসুরহাট ইসলামিয়া সিনিয়র আলীয়া মাদ্রাসা, কোম্পানীগঞ্জ মডেল স্কুল (কেজি), বামনী আছিরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, , কামাল আতাতুর্ক হাই স্কুল, দাগনভূঁয়া, কবির হাট কলেজ, হাতিয়া ডিগ্রি কলেজ, হাতিয়া হাই স্কুল, প্রভৃতি।নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ
উল্লেখযোগ্য সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান
জেলার অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র -নোয়াখালী জেলা শিল্পকলা একাডেমি শিশু কিশোরদের শিল্প সংস্কৃতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র- নোয়াখালী শিশু একাডেমি, নোয়াখালী মৌমাছি কচিকাঁচার মেলা, নোয়াখালী জেলা উদীচী শিল্পি গোণ্ঠী, নোয়াখালী জেলা উদীচী কর্তৃক পরিচালিত আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়, ললিতকলা সংগীত বিদ্যালয়, মোহাম্মদ হাসেম সংগীত বিদ্যালয়। এছাড়াও প্রত্যেক উপজেলায় রয়েছে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
নোয়াখালী থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র
নানান সীমাবদ্ধতার ভিতরে নোয়াখালী সংবাদ পত্র গুলো প্রকাশিত হয়। তবে কোনো পত্রিকাই এখন পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছেনা। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবই এর প্রধান কারণ। তবুও অনেক বাধাবিপত্তি সত্তেও কিছু পত্রিকা অনিয়মিত হলেও প্রকাশিত হয়ে আসছে। তার মধ্যে উল্লখযোগ্য, দৈনিক জাতীয় নিশান, দৈনিক জনতার অধিকার, দৈনিক জাতীয় নূর, পাক্ষিক লোকসংবাদ, নোয়াখালী কন্ঠ, নোয়াখালী মেইল, সাপ্তাহিক চলমান নোয়াখালী প্রভৃতি
অনলাইন পত্রিকা
আধুনিক বিশ্ব তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। নোয়াখালীও এর থেকে পিছিয়ে নেই। তথ্যপ্রযুক্তির এ প্রসারের যুগে নোয়াখালীতে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।এখান থেকে বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রজন্ম কম্পিউটার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর অনলাইন পত্রিকা। বেশ কিছু অনলাইন পত্রিকা অন লাইনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে সবচেয় জনপ্রিয় ও বহুল পঠিত পত্রিকা 'নোয়াখালী ওয়েভ'। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন পত্রিকা। দেশ বিদেশের বিপুল সংখ্যক পাঠক এ সাইটটি নিয়মিত ভিজিট করছেন। দিন দিন এর পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়ন সংগঠন
নোয়াখালীতে বেশ কিছু বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা স্থানীয় উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখছে। তাদের মধ্যে অন্যতম, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট, নোয়াখালী পল্লি উন্নয়ন সংস্থা-এন.আর.ডি.এস, বন্ধন, রিমোল্ড, পার্টিসিপেটরি রিসার্চ এন্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক- প্রান, সাগরিকা, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা, উপমা, এনরাস, ঘর, তথ্য প্রযুক্তি প্রসারে কর্মরত-দিগন্তের ডাক প্রভৃতি।
নোয়াখালীর উন্নয়নে সম্ভাবনা
খুবই ধীর গতিতে নোয়াখালীর উন্নয়নের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এজেলায় কোনো বড় শিল্প কারখানা নেই। তবে বর্তমানে কিছু শিল্প গোষ্ঠী এ জেলায় শিল্প প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছে। এখানের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা জেলার ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বছরের প্রায় অর্ধক সময় জেলার অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন থাকে। তাই উন্নয়নের কাজও বাধাগ্রস্ত হয়। এর জন্য নোয়াখালী খালই প্রধান দায়ি বলে অনেকে মনে করেন। এ খাল সঠিকভাবে খনন করতে পারলে যেমন জলাবদ্ধতা দূর হবে তেমন করে কৃষি উন্নয়নেও এর ভূমিকা থাকবে। তাছাড়া এ খালের পানি প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে নৌ-যোগাযোগ ও পর্যটন শিল্পও প্রসার ঘটবে। ইতিমধ্যই জেলায় কিছু উন্নয়নের কাজ হাতে নেয়া হয়েছ। এর মধ্যে নোয়াখালী-লাকসাম সড়কটি প্রসস্ত করা হচ্ছে, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের কর্মসূচীও এ বছর থেকে শুরু হয়েছে। সোনাপুর থেকে চরজব্বর পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নিঝুমদ্বীপকে ঘিরে একটি ব্যাপক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য নানান সময় বিভিন্ন মহল থেকে দাবী উঠেছে। প্রকৃতির অপার কৃপায় নোয়াখালীর দক্ষিনে সাগর থেকে জেগে উঠছে বিপুল পরিমান নতুন নতুন ভূমি। সঠিক ভাবে এ ভূমিগুলো কাজে লাগিয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহন করা যায়।
______________________________________________________________
*** নোয়াখালীর ভাষা ***
নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ আর এর ভাষা নিয়ে দেশের অন্য অঞ্চলের লোকজনদের মধ্যে এক দারুন কৌতুহল রয়েছে। নানান মুখরোচক গল্পও প্রচলিত আছে এ জেলাকে নিয়ে। সারা দেশে তো বটেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নোয়াখালীর মানুষ। অনেকেই রসিকতা করে বলেন, চাঁদেও নাকি নোয়াখালীর মানুষ আছে। রূপক অর্থেই কথাটি বলা হয়। তবে এর একটা ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক কারণও রযেছে। বহু প্রাচীন কাল থেকেই এক সমৃদ্ধ সমুদ্র বন্দর ছিলো এ অঞ্চলে। এ বন্দরই ছিলো প্রাচীন পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রবেশ পথ। সমুদ্র বন্দরের সুবাদে এ জেলার মানুষ ভাগ্যান্বেষণে হাজার বছর ধরে বিশ্বের নানান দেশে বিচরণ করেছে। আবার নানান দেশের মানুষ এ অঞ্চলে এসেছে ব্যাবসার উদ্দেশ্যে। কোম্পানীগঞ্জের যুগদীয়া আর সুধারামের শান্তাসিতা বন্দর ছিলো এর মধ্যে অন্যতম। এ বন্দরগুলো দিয়েই সারাবিশ্বে পন্য আমদানী রফতানী হতো। এই পথে শুধু পন্যই লেনদেন হয়নি। জনযোগাযোগ ছিলো সারা বিশ্বের সাথে। লেনদেন হয়েছে নানান ভাষারও। এ অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে মিশে গেছে গ্রীক, ইংরেজী, ল্যাটিন, পর্তুগীজ সহ নানান ইউরোপীয় ভাষা। সেই সাথে আরবী ফারসীতো রয়েছেই। ফলে নানান ভাষার মিশেল এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের রূপ নিয়েছে নোয়াখালীর ভাষায়। এক স্বাতন্ত্র আঞ্চলিক ভাষা হিসাবে এর ব্যাপক প্রচলন হতে থাকে। খুব গভীর ভাবে পর্যক্ষেণ করলে বুঝা যায় এ ভাষার পরিবর্তন এখনও চলমান রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রায় এক কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। বৃহত্তর নোয়াখালী ছাড়াও কুমিল্লার লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, চাঁদপুরের কিছু এলাকা, ভোলা, চট্টগ্রামের মিরসরাই সীতাকুন্ড ও সন্দীপের মানুষ এ ভাষাটিকেই ব্যাবহার করছে। মূল নোয়াখালী সাগর আর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় অনেক ঐতিহ্যই হারিয়ে গেছে। কিন্তু বুভূক্ষু সাগর গ্রাস করতে পারেনি এর ভাষা। একটি সমৃদ্ধ জনপদ নি:শেষ হয়ে গেলেও মানুষ ধারণ করে রেখেছে এই ভাষাকে।
বিশ্বের অনেক দেশের ভাষার সঙ্গে নোয়াখালী ভাষার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সুদূর অতীত কাল থেকে এ বন্দরের সাথে নীবিড় যোগাযোগ ছিলো মিয়ানমারের আরাকান. রেঙ্গুন, ভারতের কলিকাতা আর আসামের সাথে। সে অঞ্চলগুলোর সাথে নোয়াখালী ভাষার অনেক লেনদেন হয়েছে। নোয়াখালী ভাষার সঙ্গে আরাকানী ভাষার অনেক সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। অসমীয় ভাষার সাথে এ অঞ্চলের ভাষার অদ্ভুত মিল রয়েছে।
বাংলা ভাষা নিঃসন্দেহে বিশ্বের সমৃদ্ধ ভাষার মধ্যে অন্যতম। এ ভাষা আরো সমৃদ্ধ হয়েছে এর আঞ্চলিক ভাষা গুলোর জন্য। সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, কুষ্টিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষার মধ্যে রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নোয়াখালীর ভাষার মধ্যে রয়েছে অন্য এক মাদকতা। বিভিন্ন এলাকার ভাষার মধ্যেও রয়েছে নানান বৈচিত্র্য। বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেণী, রায়পুর-লক্ষীপুর, বেগমগঞ্জ-চাটখিল, কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট, হাতিয়া এবং মাইজদী প্রভৃতি অঞ্চলের আলাদা আলাদা ভাষার টান রয়েছে। শব্দ ও ভাষাতে কিছু কিছ ভিন্নতাও রয়েছে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলে এর বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে রয়েছে অসাধারণ রসবোধতা। নানান কথায় নানান রসিকতায় এ ভাষা প্রাঞ্জল হয়ে উঠে। গ্রামীণ নারীদের ভিতর নানান স্লোক রসিকতা দিয়ে কথা বলার প্রচলন বহু কাল ধরেই রয়েছে। যে কোনো উৎসব পার্বনে এ ভাষাতে চলে নানান রসিকতার আয়োজন।
অনেকেই এ ভাষার উপর গবেষণা করেছেন। কিন্তু এ ভাষাকে নিয়ে আরো প্রচুর গবেষণার ক্ষেত্র রয়ে গেছে। এ ভাষায় প্রচুর গান নাটক লেখা হয়েছে। যেগুলো একেবারে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাতেই রচিত হয়েছে। সেগুলোর জনপ্রিয়তাও প্রচুর। সেলিম আল দীন নোয়াখালী ভাষায় নাটক লিখে ও পরিবেশন করে এ ভাষাকে আরো নান্দনিকতায় এনে দিয়েছেন। তাঁর ‘হাতহদাই’ ক্লাসিক নাটকটি আঞ্চলিক ভাষার এক অনবদ্য সাহিত্য। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত নোয়াখালী ভাষার নাটক গুলো বিভিন্ন দর্শকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। নোয়াখালী ভাষার এক নিবেদিত সাধক অধ্যাপক মোঃহাশেম এ অঞ্চলের মাটির ভাষায় প্রচুর গান রচনা করেছেন। সে গান গুলো এ অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার মত বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাগুলোও বাংলা ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আঞ্চলিকতার দোষে সেগুলো আমাদের মূল ভাষাতে স্থান করে নিতে পারেনি। গণমানুষের ভাষা হিসাবে গণমানুষের কাছেই কেবল সেগুলো সমাদৃত হয়ে আছে।
বুদ্ধদেব বসু বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী পুরুষ। তাঁর শৈশব কৈশোর কেটেছে নোয়াখালীতে। এ অঞ্চলের ভাষার মাধুর্য তাঁকে বিমুগ্ধ করেছিলো। তাঁর স্মৃতি কথায় তিনি লিখেছেন- ‘আর কোথাও শুনিনি ঐ ডাক, ঐ ভাষা, ঐ উচ্চারনের ভঙ্গি। বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ভাষা বৈশিষ্ট্য বিস্ময়কর। চাটগাঁর যেটা খাঁটি ভাষা, তাকেতো বাংলাই বলা যায়না। নোয়াখালীর ভাষা আমার মত জাত বাঙালকেও কথায় কথায় চমকে দিতো। শুধু যে ক্রিয়াপদের প্রত্যয় অন্যরকম তা নয়, শুধু যে উচ্চারনে অর্ধস্ফুট ‘হ’ এর ছড়াছড়ি তাও নয়, নানা জিনিসের নামও শুনতাম আলাদা। সে সমস্ত কথাই মুসলমানী বলে মনে করতে পারিনা। অনেক তার মগ, কিছু হয়তো বর্মী আর পর্তুগীজের কোনো না ছিটে ফোঁটা।’
ইতিহাসের অনেক হারিয়ে যাওয়া জনপদের সন্ধান খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। মাটির নীচ থেকে আবিষ্কার করেছেন হারিয়ে যাওয়া নানান সভ্যতা। কিন্তু মটি খুঁড়ে নোয়াখালীর প্রাচীন সভ্যতার কোনো হদিস কেউ খুঁজে পাবেনা। তবু কেউ কেউ সে অতীত খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। কাজী মাহ্ফুজুল হক নোয়াখালী জেলার সমাজ সংস্কারক, সংস্কৃতিজন হিসাবে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তিনি আজ প্রয়াত। নোয়াখালী পুরাতন শহরের ভাঙ্গন, আবার মাইজদীতে নতুন শহরের পত্তন, এ সবের অনেক কিছুই তিনি আশৈশব অবলোকন করেছেন। এ শহরে পুরাতন ঐতিহ্যের এখন আর কিছু নেই। অন্ধকারে শুধু হাতড়িয়ে বেড়ানো ছাড়া অতীত খুঁজা খুবই দুষ্কর। সে অতীত খুঁজতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ইতিহাসের তাড়নায়, অকৃতজ্ঞতার যাতনায় হারিয়ে যাওয়া চেতনা ধিক্কার দিচ্ছে। তাই পিছন ফিরে কোথা হোতে এলাম তাই খুঁজছি। মানুষ অন্ধকার পাতাল চিরে অজ্ঞাত অদৃশ্য সম্পদ আহরণ করে। গভীর সাগর তলায় ঝিনুক তুলে মুক্তা খোঁজে। অজানাকে জানার, অন্ধকারকে জয় করার কামনায় জীবনের ঝুঁকি নেয়। সে এক অদ্ভুত উন্মাদনা। সেই উন্মাদনায় মানুষ হিমালয়ের উচ্চ শিখরে পা রেখে আকাশ জয় করে চাঁদের বুকে খেলা করেছে। কিন্তু অতীতের হারিয়ে যাওয়া শত বছরের ইতিহাস শুধু মাত্র স্মৃতি দিয়ে লালন করা তথ্য দিয়ে গ্রন্থনা করা শুধু দু:সাধ্য নয় -দু:সাহসও। তবু আমরা সেই পথের অভিযাত্রী।’
এখন নোয়াখালীর প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে কেবল আছে এর ভাষা। কোনো অনুসন্ধিৎসু অভিযাত্রী দল একদিন এই অথৈ ভাষার সাগর পাড়ি দিয়ে ঠিকই খুঁজে নেবে হারানো সেই সবুজাভ দারুচিনি দ্বীপের ঠিকানা।
মাইজদী যখন নোয়াখালী
নোয়াখালীর মত বাংলাদেশে আর এমন কোনো জেলা খুঁজে পাওয়া যাবেনা, যে জেলার আয়তন প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে নোয়াখালীর উপকূলে প্রতি বছর সাগর থেকে জেগে উঠছে বিপুল পরিমান ভূমি। এর ফলে বেড়ে যাচ্ছে নোয়াখালীর আয়তন। সুপরিকল্পিত ভাবে এ ভূমিকে ঘিরে কোনো সুদুর প্রসারী উদ্যোগ কেউ কখনো নেয়নি। প্রাকৃতিক আর রাজনৈতিক নানান টালমাটালে এ জেলা নানান ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে নোয়াখালীর উপজেলার সংখ্যা নয়টি।
এ উপজেলা গুলোর কেন্দ্র বিন্দু নোয়াখালী শহর। তবে এ শহরের ভিন্ন এক যন্ত্রনাদায়ক ইতিহাস আছে। নতুন অনেকে নোয়াখালী শহরে এসে থমকে পড়েন। এখানে নোয়াখালী নামের কিছুই নেই। এ শহরটির নাম মাইজদী শহর। মাইজদী কোর্ট। সরকারি ভাবে বলা হয় নোয়াখালী সদর। কোনো হৈচৈ নেই। সন্ত্রাস বা বড় ধরনের কোনো ক্রাইমও নেই। গ্রাম আর শহরের মিশেল এক ছোট্ট ছিমছাম সোম্য শান্ত শহর। পুরো জেলায় কোনো রুক্ষতা নেই। সমস্ত জেলা জুড়ে শুধুই সবুজের স্নিগ্ধতা। নারিকেল সুপারি আর নানান বৃক্ষের ছায়া ঘেরা জেলা। পঞ্চাশের দশকে মূল নোয়াখালী মেঘনা আর সাগরে বিলিন হয়ে গেলে বৃটিশদের পরিকলপনায় নতুন করে এ শহরের পত্তন হয়। নোয়াখালী শহর যখন ভেঙ্গে যাচ্ছিলো তখন মাইজদী মৌজায় ধান ক্ষেত আর খোলা প্রান্তরে পুরাতন শহরের ভাঙ্গা অফিস আদালত গুলো এখানে এনে স্থাপন করা হয়। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে প্রায় ষোলো একর জুড়ে কাটা হয় এক বিশাল দীঘি। লোক মুখে প্রচলিত হয় বড় দীঘি নামে। সে দীঘির চতুর্দিকে চক্রাকারে বানানো হয় ইট সুরকীর রাস্তা। সে রাস্তাকে ঘিরে বাংলো প্যাটার্ণে তৈরী হয় সরকারী সব দপ্তর। রাস্তার পাশে রোপিত হয়েছিলো বকুল আর জারুল গাছ। কিছুদিন পরে গাছগুলো বড় হলে ফুলে ফুলে পুষ্পিত হয়ে অপরুপ সাজে সজ্জিত হয়ে উঠে। এক অপরুপ রুপে শহর সাজতে থাকে। আশে পাশে নদী ভাঙ্গা বসতিদের বাড়ি ঘর উঠতে থাকে। এক রুচিশীল হারানো শহরের মানুষ গুলো রুচিশীলতা দিয়েই নতুন করে তৈরী করলো সেই সব। একটু একটু করে গড়তে থাকে শহর। গ্রামাঞ্চলের বড়িঘর গুলোও ছিলো সুঠাম ছিম ছাম। দেশের নানান যায়গা থেকে মানুষ জন দেখতে আসতো এ শহরটির রুপ। একটা অলিখিত পর্যটন শহর হিসাবে গড়ে উঠছিলো এটি। কিন্তু এ শহর বাসীর দুর্ভাগ্য সেই সৌন্দর্য সেই সৌষ্ঠব ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকলো। শহর স্থানান্তরের সময় নতুন শহরকে সাজিয়ে তুলতে মাইজদীতে অনেক যায়গা হুকুম দখল করা হয়েছিলো। যেগুলো সরকারের খাস জমি হিসাবে রক্ষিত আছে। মাইজদী শহরের বড় দীঘিকে ঘিরে যে সুন্দর আঙ্গিনা গড়ে উঠেছিলো পরবর্তীতে তাকে নষ্ট করে বস্তির মত গড়ে উঠে সরকারী ভবন। আনেক সরকারী জায়গা দখল করে গড়ে উঠলো দোকানপাট। অথচ সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক সরকারী জমি। বড়দীঘি ও তার চতুর্দিকের বকুল জারুলের বৃক্ষ শোভিত এ অঙ্গনকে নষ্ট না করে সে সব খাস জমিতে সরকারী ভবন গুলো নির্মান করা যেতো। এখন সে যায়গা গুলো কিছু বিরান হয়ে আছে আর কিছু অবৈধ দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। কিছু কিছু খাস জমি লুটেরা ভূমি দখলদারদের লোভাতুর দৃষ্টির মধ্যে আছে। পাঁয়তারা চলছে সেগুলোও দখলে নেবার। বড়দীঘি থেকে পানি উত্তোলন করে সারা শহরে পরিবেশন করা হতো। পানির কোনো দুষণ ছিলোনা। স্বচ্ছ পানিতে ভরে থাকতো বড় দীঘি। পরবর্তীতে সে দীঘির কোল ঘেঁসে কিছু ভবন তৈরী হয়। মল মূত্র আর ময়লা আবর্জনায় এখন প্রায় ভরে থাকে এ সুন্দর জলাশয়টি। অবশ্য মাঝে মাঝে কিছু উদ্দ্যোগযে নেয়া হয়নি তা নয়। বিভিন্ন সময় পৌর কতৃপক্ষ এর সৌন্দর্য বর্ধনে কিছুটা উদ্যোগী হয়েছিলো। দীঘির এক পাড়ে মাটি ভরাট করে গাছ লাগিয়ে কিছুটা পার্কের আদল করার চেষ্টা হয়েছে। দীঘির চতুর্পাশে সে পার্ককে ঘিরে লোহার রেলিং দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সে পর্যন্তই সার। স্থানে স্থানে কে বা কারা সে রেলিংগুলো খুলে নিয়ে গেছে। তবে এখন যে টুকু অবশিষ্ট আছে তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে শহরবাসি হয়তো কিছুটা স্বস্তি পেতো। কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য অনেকের কাছে এ শহর বেশ সমাদৃত। সে বৈশিষ্টের মধ্যে অন্যতম হলো এ শহর একেবারেই সন্ত্রাস মুক্ত একটি শহর। এ শহরে সন্ত্রাস নেই বল্লেই চলে। দ্বিতীয় এর বৈশিষ্ট হলো এর স্বচ্ছ পরিবেশ । যেহেতু এ জেলায় বড় কোনো মিল কারখানা নেই তাই এর বড় কোনো পরিবেশ দুষণও নেই। সবচেয়ে বড় দিক হলো কোলাহল মুক্ত একটি শহর হিসাবে এখনো এর সুনাম চতুর্দিকে। অনেকে এখানে এসে বাড়িঘর তৈরী করে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে চান। এ জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ সারা পৃথিবীতে ছড়িযে ছিটিয়ে আছে। তাদের টাকা রেমিটেন্স বেশীর ভাগ জমি কেনার কাজে ব্যাবহার করা হয়। এসব কারনেই দিন দিন এখানের যায়গা জমির দাম বেড়ে যাচ্ছে।। প্রবাসীদের পাঠানো টাকা সঠিক কাজে ব্যাবহার করে এ জেলাকে আরো সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। একটি পর্যটন জেলা হিসাবে গড়ে উঠার সব রকম সুযোগ সুবিধাই এ জেলায় বিদ্যমান। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিটি উপজেলার সাথে জেলা শহরের যোগাযোগ অনেক উন্নত। জেলা শহরের কাছাকাছিই রয়েছে কয়টি দর্শণীয় স্থান। এর মধ্যে আছে গান্ধীআশ্রম, বজরা শাহী মসজিদ, সোনাপুর গীর্জা, হরিণারাযন পুর জমিদার বাড়ি, রামভাইয়ের আশ্রম ইত্যাদি। আরো আছে নোয়াখালীর দক্ষিণে বিশাল খোলা প্রান্তর, বন বিভাগের সৃজিত বন। আছে হাতিয়া দ্বীপের দক্ষিনে সমুদ্র থেকে জেগে উঠা নিঝুম দ্বীপ। সবচেযে বড় বিষয় হলো এ জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ। একটি সবুজ ক্যানভাসের দৃশ্য অবলোকন করতে মানুষ হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়। প্রকৃতি প্রেমিকরা একটু দৃষ্টি মেলে ঘুরে দেখলেই এখানে এসে দেখতে পাবেন বাংলার এক অপরূপ রূপের জনপদ। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বর্তমান মহাজোট সরকার দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। এ অঞ্চলের উন্নয়নে নতুন সরকারের নানান প্রতিশ্র“তি রয়েছে। এ জেলার উন্নয়নে যে কোনো পরিকল্পনায় পর্যটনের বিষয়টি চিন্তায় থাকলে খুব অল্প খরচেই এ জেলাটি এক অনন্য জেলায় রুপান্তরিত হতে পারে।
*** ভাঙ্গা গড়ার খেলা ***
ভূলুয়া যার বর্তমান নাম নোয়াখালী
বর্তমান নোয়াখালী শহরের দক্ষিণ প্রান্তে- সোনাপুরে নোয়াখালী রেলষ্টেশনের মাইল খানেক দক্ষিণে ছিল মূল নোয়াখালীর জেলা সদর সুধারাম। এক সময় এ এলাকা সুধারাম ভান্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন উপন্যাস, কবিতা, গানে এই সুধারামের উল্লেখ আছে। এখানকার জনজীবনকে কেন্দ্র করে শহীদ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সার লিখেছিলেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘সারেং বৌ’। কতজনের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে সমুদ্র গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সেই নোয়াখালী শহরকে ঘিরে। বুদ্ধদেব বসুর শৈশব কৈশোর কেটেছে বিস্মৃত সেই অনিন্দ্যসুন্দর শহরে। তার ভাষাতেই বলা যায়......নোয়াখালীর পথে এবং অপথে আমার ভূগোল শিক্ষা।..... আমার কাছে নোয়াখালী মানেই ছেলেবেলা আর ছেলেবেলা মানেই নোয়াখালী।... এমন কোন পথ ছিল না নোয়াখালীর, যাতে হাঁটিনি।....শহর ছাড়িয়ে বনের কিনারে নদীর এবড়ো থেবড়ো পাড়িতে কালো কালো কাদায়, খোঁচা খোঁচা কাঁটায়-চোরাবালির বিপদে। ....কখনো গেছি সুদূর রেলষ্টেশনে, রেল লাইনের নূড়ি কুড়োতে, কখনো জেলখানার পেছনে ভূতুড়ে মাঠে.....। ঘাসে গন্ধ নেশার মত লাগছিল আমার।... সংসারটা জঞ্জাল, সমস্য- গোলমাল অর্থহীন। সবচেয়ে ভাল রাখাল হয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো, গাছের ছায়ায় ঝির ঝিরে হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়া.....।
প্রখ্যাত সাংবাদিক সানাউল্ল্যাহ্ নূরী তার বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখায় নোয়াখালী সম্বন্ধে অনেক চমৎকার তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তার মতে আধুনিক নোয়াখালী ভূ-খন্ডের প্রাচীন নাম ভুলুয়া। ভুলুয়া ছিল বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অঞ্চলের প্রাচীনতম ইতিহাসের স্নায়ুকেন্দ্র। খ্রিস্টপূর্ব যুগেও ভুলুয়া বন্দর প্রাচীন পৃথিবীর আনর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। গুপ্ত বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য তথা সমুদ্র গুপ্তের আমলের (৩৭৫-৪১৪ খ্রিষ্টাব্দ) শেষ ভাগে যখন চৈনিক পরিব্রাজক কাহিয়েন এ উপমহাদেশে আসেন, তখনও সামুদ্রিক বন্দর হিসেবে ভুলুয়ার খ্যাতি ছিল। বৌদ্ধযুগ, পাল ও সেনযুগ এবং পরবর্তীকালের বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল, পাঠান তুর্কি আমল, মুঘল আমলসহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর যুগ পর্যন্ত প্রাচীন সূত্র ও দলিল দস্তাবেজে ভুলুয়ার বহু উল্লেখ দেখা যায়। এ সময়ের মধ্যে সমুদ্র বহুবার উপকূলসংলগ্ন মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি এসে প্রাচীন জনপদ সমূহকে গ্রাস করেছে। লক্ষ্মীপুর সুধারাম, বামনী, কোম্পানীগঞ্জ, ফেনী নদীর মধ্যে কমপক্ষে সাত থেকে দশবার গ্রাস করেছে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল নীল তরঙ্গের ফেনীল জলরাশি। আবার প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে সাগর তাকে উগরেও দিয়েছে। নীরবিচ্ছিন্ন এই ভাঙ্গাগড়ার কারণে প্রাচীন এইসব ভূখন্ডের অতীত কোন নির্দশন খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ অঞ্চলে ভৌগলিক পরিবর্তন ঘটেছে অবিশ্বাস্যভাবে। এ অভূতপূর্ব ভাঙ্গাগড়ার ইতিহাস পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। ১৯২২ থেকে ১৯৩২ এবং ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে মোট চার দফা ভাঙ্গনের পর বর্তমানে নোয়াখালীর দক্ষিণ অংশে পূর্বে-পশ্চিমে প্রায় ৬৪ (চৌষট্টি) কিলোমিটার এবং আয়তনের সমুদ্র উপকূলবর্তী বিশাল চর অরন্য। নোয়াখালী সদর সোনাপুর থেকে এর শুরু। পশ্চিমে ওদারহাট রামগতি, পূর্বে ফেনীর বামনী কোম্পানীগঞ্জ। কখনো ধীরে কখনো দ্রুত জেগে উঠেছে চর। মেঘনা নদী আর ফেনী নদী বার বার নানা ভাবে ভাঙ্গাগড়ার খেলা খেলেছে এ অঞ্চলে। শত শত বছর ধরে গড়া নোয়াখালী জেলা শহর সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে মেঘনার গর্ভে । এক সময় সে লোকালয় ছিল কোলাহলমুখর, ছিল কোর্ট- কাছারি-স্কুল-মাদ্রাসা-মসজিদ, ঘোড় জোড়ের মাঠ, বাজার মহল্লা। মেঘনার উত্তাল করাল গ্রাসে একে নদী গর্ভে হারিয়ে গেল। দু’দিন আগে যে ছিল জমিদার যার ছিল অঢেল প্রতিপত্তি আজ সে নিঃস্ব হতম্বি। একদিন যেখানে ছিল জনস্রোত লোকালয় আজ সেখানে সমুদ্রের উত্তাল ফেনিল ঢেউ, নদীর তীব্র লোনা স্রোত।
শুরু হল এক মরণপণ সংগ্রামের লড়াই। রুখতে হবে নদী, বাঁধতে হবে ভাঙ্গন। সে এক অভূতপূর্ব জয় আর অর্জনের কাহিনী। যখন একে একে দেশি-বিদেশি সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে লাগল। ভাঙ্গনের নেশায় নদীল আগ্রাসী হিংস্র দৃষ্টি উত্তরের জনপদের দিকে। ধ্বংসের ছায়া পড়ল মাইজদী আর উপ-মহাদেশের বিখ্যাত ব্যস্ততম ব্যবসাকেন্দ্র চৌমুহনীতে।
যেভাবে প্রমত্তা মেঘনা বসে এলত্রিশের দশকে সর্বনাশা মেঘনা হিংস্র থাবা মেরে মেরে ধেয়ে আসছিল উত্তরের লোকালয়ের দিকে। একে একে নদীগর্ভে বিলীন হতে লাগল সুপ্রসিদ্ধ ওসমান আলী দারগারবাড়ী, জজ কোর্ট কালেক্টরেট ভবন। শহর রক্ষার সমস- প্রচেষ্টা ব্যর্থ। বড় বড় দেশি-বিদেশি পরিকল্পনাবিদদের ঘুম নেই। এক সময় হাল ছেড়ে দিল সবাই। ঠিক সেই সময় ১৯২৯ সালে নোয়াখালীতে ফিরে এলেন এলাকার এক কৃতী সন্তান প্রবাদ পুরুষ ওবায়দুল্লাহ্ ইঞ্জিনিয়ার। ভূপাল আর কাবুলের রাষ্ট্রীয় সভায় কর্মরত থেকে এই মেধাবী মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার সেখানে বহু মূল্যবান খনি আবিস্কার করে সে দেশেই এক কিংবদন্তি নায়কে পরিণত হন। কথিত আছে তিনি মাটি দেখেই বলে দিতে পারতেন মাটির তলার লুকানো সসম্পদরাজির কথা, সাগরের ঢেউ দেখে এর আহাজারি আর আগ্রাসী নদীর হুঙ্কারে বিচলিত হলেন তিনি। তার পৈত্রিক চিহ্নটুকুও যে চলে যাচ্ছে গহীন সমুদ্রে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বাঁধ দিতে হবে নদীতে। বাঁধের স্থানটিও নির্ধারন করলেন। তিনি নিশ্চিত হলেন পরিকল্পনা সফল হলে শুধু সমগ্র নোয়াখালীই রক্ষা হবে না সমুদ্র থেকে জেগে উঠবে বিশাল ভূখন্ড। স্বপ্ন দেখলেন এক বিশাল সম্ভাবনাময় প্রাচুর্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটলেন শিমলায় তৎকালীন ভারতবর্ষের গ্রীস্মকালিন রাজধানীতে। শিমলায় কেন্দ্রীয় সরকারের সেচ মন্ত্রনালয়ে বুঝাতে চেষ্টা করলেন ব্যাপারটা। ব্রিটিশ ভারতের প্রধান প্রকৌশলী স্যার এডওয়েস উইলিয়াম নাক্চ করে দিলেন এ প্রকল্প। স্রোতের তোড়ে যেখানে ভাঙ্গছে শহর ভাঙ্গছে জনপদ নিশ্চিহ্ন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম সেখানে বাঁধ কি করে টিকবে, কি করে সম্ভব। অনেকটা ভৎসনা করেই ফিরিয়ে দিল তাকে। কিন্তু দমলেন না তিনি। নিজের উপর যার অগাধ বিশ্বাস, আস্থা, তিনি তো আর বসে থাকার লোক নন। ফিরে এলেন দেশে। যা কিছু সহায় সম্বল আছে তা নিয়ে এলাকার হাজার হাজার মানুষের সহযোগীতায় নেমে পড়লেন কাজে। তাঁর উদাও আহ্বানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে রাজি হল। ধানের বড় বড় ঢোল আর চটের বস্তা মাটিতে ভরাট করে তোলা হল নৌকায়। বুঝে নিলেন অমাবস্যা পূর্ণিমার অবস্থান। পরখ করলেন প্রতিদিনের জোয়ার ভাটার গতি-প্রকৃতি। দেখলেন ঘূর্নায়মান স্রোতের গতি। নিখুঁত জ্যামিতিক অবস্থান আর অঙ্কের হিসাব নিকাশ করে ঠিক সময় নির্দিষ্ট জায়গায় মাটি ফেলতে নির্দেশ দিলেন তিনি। নৌকায় মাটি ভরাট করে স্থানে স্থানে নৌকাসহ ডুবিয়ে দেয়া হল। প্রায় এক মাস রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে পাঁচ হাজার মানুষের অসাধারন শ্রমের ফসল ফলল অবশেষে। ১৯৩০ সালের শেষ জানুয়ারিতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না মানুষ, তৈরী হল চল্লিশ ফুট উঁচু এক বিরাট বাঁধ। প্রমত্তা মেঘনা দুর্বল হতে লাগল। রক্ষা পেল শহর জনপদ। কিন্তু ১৯৩৪ সালে বেগমগঞ্জের কিছু উদ্ধত প্রভাবশালী জোতদারদের নগন্য সংকীর্ণতায় ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারের প্রবল আপত্তি ও বাধার মুখেও সেই বাঁধ কেটে দেওয়া হল। বাঁধ ছিঁড়ে আবার ঢুকলো সমুদ্রের উত্তাল জোয়ার, আছড়ে পড়লো নদীর তীব্র ঢেউ। প্রমত্তা মেঘনা অগ্নিমূর্তিতে আবার ধরা দিল। সমুদ্রগর্ভে বিলীণ হয়ে গেল অবশিষ্ট শহর। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সমুদ্রোপকূলবর্তী হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা নয়নাভিরাম শহরের শেষ চিহ্নটুকু। এরি মধ্যে ১৯৩৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী ৬০ বছর বয়সে তৎকালীণ অবিভক্ত বাংলার একমাত্র মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার প্রতিভাধর এই ব্যক্তিত্ব ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ার তাঁর গ্রামের বাড়ী সন্নাখটিয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর কিছুদিনের মধ্যে তার কবর আর বাড়ীসহ সমগ্র গ্রামটিই মেঘনার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় শহর স'ান-ারিত হয় মূল শঞর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে বর্তমান মাইজদী কোর্টে। ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হয় নতুন রাষ্ট্রের। নতুন রাষ্ট্র গঠনের দিকেই নতুন সরকারের সমস- দৃষ্টি। সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়া শহর আর তার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধান- হয়ে যাওয়া লাখ লাখ ছিন্নমূল মানুষের প্রতি কারো নজর রইল না। অনেক পরে তৎকালীন সকরার অনুধাবন করতে পারে ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারের উদ্ভাবিত পরিকল্পনা। ষাটের দশকে তৎকালিন ওয়াপদার চেয়ারম্যান ডি কে পাওয়ার মরহুম ওবায়দুল্লাহর পরিকল্পনার আদলে প্রণয়ন করেন চর জব্বার ক্রস বাঁধ।
মেঘনার বুকে ক্রসড্যাম এবং উপকূলে ভেড়ি বাঁধ নির্মাণ করার ফলে লাখ লাখ একর জমি সমুদ্রগর্ভ থেকে জেগে উঠেছে। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন গ্রাম-গঞ্জ এবং হাট-বাজার। দিগন- বিস্তৃত ধান ফসলের মাঠ। স্নিগ্ধ সবুজ বনরাজি। স্থানে স্থানে কৃষকের শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় তৈরী নির্মল স্বপ্নিল খড়েড় ঘর। মাঠ থেকে মাঠে উড়ে যাওয়া ঝাঁকে ঝাঁকে জানা অজানা পাখির কলরব। গুরু মহিষের বাথান। চরের বুক চিরে কাঁচা পাকা প্রশস্ত রাস্তা দেখে কে বলবে এখানে এক সময় ছিল উত্তাল জলরাশির নীলাভ সমুদ্র আর নদী। ঝড় সামুদ্রিক বান পূর্ণিমা-অমাবস্যার জলোচ্ছাস বা বিশ ত্রিশ ফুট উঁচু শরের তোড়ে নৌকা আর জাহাজ ডুবি হয়ে শত শত মানুষের সলিল সমাধি ঘটেছে এই রাক্ষুসি নদীতে। সমুদ্রের হাঙ্গর একইভাবে রামগতি নদীতে তরুন বিপ্লবী নেতা তোহা জনগণকে নিয়ে দিল আরেকটি বাঁধ। সেটি তোহা বাঁধ বলে খ্যাত। শুরু হল প্রকৃতি আর মানুষের গড়ার পালা। যত দ্রুত ভাঙ্গল শহর তত দ্রুত গড়তে থাকল নতুন চর। দুদিন আগেও যে লোকালয় ছিল শহর। তারপর ভাঙ্গন, নদী-সমুদ্র। বড় বড় নৌকা স্টিমার। আবার সেখানেই গজে উঠল সমুদ্র থেকে পলি মাটি। যেন চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে সব। মানুষজন নেই। শুধু খাঁ খাঁ করছে সব। বিরান নিস্তদ্ধ। একে একে জেগে উঠল ঘোড় দৌড়ের মাঠ, মসজিদ, বড় রাস্তা, পুলিশ লাইন, গীর্জা, রেল স্টেশন, স্কুল, কোর্ট-কাছারি। না, দালান কোঠা ইমারতসহ নয়। পলিমাটি সমৃদ্ধ নতুন ভূমি। নতুন নাম হল ‘চর’। মানুষজন এককালের জমজমাট শহরকে বলতে লাগল চর সল্লা, চবর এলাহী, সল্লাঘটিয়া। নতুন নতুন নাম হল। ঠক্কর, ইনকাম চৌধুরীর পোল, বাংলা বাজার, গাইজ্জার খেয়া, চর জাহাজমারা, জগদানন্দ, চর বৈশাখী, চর নবগ্রাম, টুমচর আরও কত নাম। শুধু পুরাতন নোয়াখালী শহরই নয়। সমুদ্র থেকে জেগে উঠতে লাগল নতুন নতুন উর্বর ভূমি। ধীরে ধীরে শুরু হল আরেক সংগ্রামের পর্ব। উরি আর নলখগড়া গজানো চরে দেখা যেতে লাগল মহিষ আর ভেড়ার বাথান। উর্বর পলিমাটিতে ধানের আবাদ। জোয়ারে ভেসে আসা সমুদ্রের মাছ। চিরিং, ফুলচিরিং, গাং কই, কোরাল। হাতছানি দেয় এক বিশাল সম্পদের খনি। আস্তে আস্তে আবার মানুষ ফিরে আসে। জনকলরবে আবার সরগরম হতে থাকে বিসৃত সেই জনপদ।
আমাদের নোয়াখালী
গাঙ্গেয় পলিমাটি সমৃদ্ধ উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী। এ উর্বর অঞ্চল এক সময় সমতট নামে সুপরিচিত ছিলো। সহস্র বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগের কারণে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলো এ অঞ্চল। পত্তন হয় ভুলুয়া ষ্টেটের। সে থেকে ভুলুয়া পরগণা হিসেবেই এ অঞ্চল প্রসিদ্ধি লাভ করে। ভুলুয়া বন্দরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। শিক্ষা দীক্ষা, জ্ঞানে মানে এলাকার মানুষ প্রভুত উন্নতি লাভ করে।
মেঘনার মোহনায় সমুদ্রের উদার স্পর্শে এ এলাকার মানুষগুলো হয়ে উঠে উদার হৃদয়, আতিথি পরায়ণ আর কর্মঠ। বিক্ষুব্ধ সাগর ডিঙ্গিয়ে এদেশের মানুষ পাড়ি দিয়েছিলো দেশ বিদেশে। স্বভাবেও এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীন চেতা ও দৃঢ় চিত্তের আধিকারী। নানা দেশের সূফী দরবেশ আর জ্ঞানীদের আগমন ঘটেছিলো এই অঞ্চলে। কাল ক্রমে এর নাম করণ করা হয় নোয়াখালী। আরবীয় ইংরেজ আর গ্রীক সভ্যতার মিশ্রনে নোয়াখালী শহর গড়ে উঠেছিলো এক অপরুপ রুপসী সাজে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই আবিশ্বাস্যভাবে ভাঙ্গন শুরু হয় এ জনপদের। যে রুপময় মেঘনার তীরে গড়ে উঠেছিলো সে সময়ের সমৃদ্ধ জনপদ সে মেঘনাই এক সময় রাক্ষুসী রূপ ধারণ করে। মাইলের পর মাইল সেই ঐতহ্যবাহী জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই সাথে বিলীন হয়ে যায় হাজার বছর ধরে গড়ে উঠা সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যের চিহ্ন। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে কোলাহলময় এ লোকালয়। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় অসংখ্য গৌরব গাঁথা অধ্যায়। ভাঙ্গাগড়ার অমোঘ বাত্যাবয়নে জেলার ভৌগোলিক ইতিহাসও বাঁক নিয়েছে নানান ভাবে। তবুও কখনো থেমে থাকেনি এর চলার গতি। এখন এই জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। বর্তমান নোয়াখালী জেলা একসময় ফেনী, লক্ষীপুর এবং নোয়াখালী জেলা নিয়ে একটি জেলা বা বৃহত্তর অঞ্চল ছিল, যা এখনও বৃহত্তর নোয়াখালী নামে পরিচিত।
18/11/2018
নিঝুম দ্বীপের নাম করণঃ
সত্তর দশকে হাতিয়ার সংসদ সদস্য ছিলেন আমিরুল ইসলাম কালাম। তিনি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নিয়ে গেলেন সে দ্বীপে। অবাক বিষ্ময়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে সবাই অবলোকন করলেন এর শান্ত স্নিগ্ধ রূপ। তিনি এ দ্বীপের নাম দিলেন ’নিঝুম দ্বীপ। সে থেকে নিঝুম দ্বীপ হিসেবেই এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কিছু জেলে আর বাথানিয়া সেখানে অস্থায়ীভাবে আবাস গড়ে তুলেছিলেন। ৭০ এর ১২ নভেম্বর প্রলয়কারী ঘূর্ণিতে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বিরান হয়ে যায় সে জনপদ। স্বাধীনতা পর বন বিভাগ এর দায়িত্ব নেয়। শুরু করে বনায়ন।
এক সময়ের নিঝুম নীরব নিথর জনপদ মানুষের পদচারনায় এখন ধীরে মুখরিত হয়ে উঠছে। গড়ে উঠছে জনবসতি। গাবাদি পশুর খামার। দ্বীপ সংলগ্ন চতুর্দিকে বিপুল মৎস্য ভান্ডার আর দুলর্ভ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ নিঝুম দ্বীপ সম্ভাবনার এর উজ্জল দিগন্ত উম্মোচিত করছে।
18/11/2018
*** নোয়াখালীর অজানা তথ্য ***
নোয়াখালী জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। বর্তমান নোয়াখালী জেলা আগে ফেনী, লক্ষীপুর এবং নোয়াখালী জেলা নিয়ে একটি বৃহত্তর অঞ্চল ছিল, যা এখনও বৃহত্তর নোয়াখালী নামে পরিচিত। নোয়াখালী জেলার প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া। নোয়াখালী সদর থানার আদি নাম সুধারাম। ইতিহাসবিদদের মতে একবার ত্রিপুরা-র পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়া-র উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসাবে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়, যা পানির প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করে। এই বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় "নোয়া (নতুন) খাল" বলা হত, এর ফলে "ভুলুয়া" নামটি একসময়ে পরিবর্তিত হয়ে ১৬৬৮ সালে হয়ে যায় "নোয়াখালী"।
08/04/2018
একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি
নাম :পেয়ারা বেগম
গ্রাম +ডাকঘর:পিতাম্বর পুর(মজিদ পাঠান বাড়ী)
উপজেলা: সোনাইমুড়ী
জেলা :নোয়াখালী
উনি আজ ৮ এপ্রিল ২০১৮, রবিবার সকাল অানুমানিক ৮ টায় ঢাকার এ্যালিপ্যান্ট রোড, একটি হোটেল থেকে হারানো গিয়েছে
উনাকে চিকিৎসা করানোর জন্য ঢাকাতে রাখা হয়েছে,উনি ব্রেন স্টোক এর রোগী,কাউকে তেমন চিনেন না।
উনার ছেলেদের নাম, আহসান (ছুট্টু), পারভেজ,ইয়াছিন,মজিব,
যদি ঢাকাতে কেউ উনার সন্ধান পেয়ে থাকেন, তাহলে দয়াকরে যোগাযোগ করবেন,
01814841866
01816666944
বিজয়ের আলো
একটি অরাজনৈতিক ,রক্তদানকারী,মাদকবিরোধী ও সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান ।
পিতাম্বরপুর ,সোনাইমুড়ী,নোয়াখালী।
ওয়েবসাইট - www.bejoyeralo.org
ফেসবুক পেইজ- www.facebook.com/bejoyeralo
12/08/2017
ঢাকায় নোয়াখালী সমিতি আয়োজন করছে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান “নোয়াখালী উৎসব ২০১৭”। আগামী ২৪ নভেম্ভর ৬০ হাজার নোয়াখালীবাসীদের নিয়ে ঢাকার সেহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হবে এ উৎসব।
এ উৎসবের প্রতিটি টিকেটের মূল্য ধরা হয়েছে ১০০ টাকা। টিকেট ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আপনার টিকেটের জন্য আজই যোগাযোগ করুন ।
যোগাযোগ :- 01996956512