18/04/2024
হোয়াট জেনিফার ডিড?
দেখা শেষ করলাম নেটফ্লিক্সে নতুন আসা ক্রাইম ডকুমেন্টারী "হোয়াট জেনিফার ডিড?"। ২০১০ সালে কানাডায় (আমার বাসার খুব কাছে) একটি পরিবারে খুনের ঘটনা নিয়ে নির্মিত। এ খবরটা কানাডার এশিয়ান পরিবারের জন্য মারাত্বক রকমের ধাক্কা ছিল। অনেক হৈচৈ হয়েছিল তখন। কিন্তু কেন? আগে তাহলে ঘটনা শুনি!
আট দশটা এশিয়ান পরিবারের মতই ভিয়েতনাম থেকে কানাডায় আসা প্যান পরিবারের প্রথম এবং প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল সন্তানদের একটা ভালো জীবন দেয়া। নিজেদের সব ব্যার্থতা বা স্বপ্ন পূরণ আমরা এশিয়ান প্যারেন্টস্ রা আমাদের সন্তানদের মাধ্যমে তা পূরণের চেস্টা করি। আমার সন্তান ডাক্তার/ইন্জিনিয়ার হতেই হবে, এর মাধামাঝি কিছু নেই। নিজে গানের "গ" জানি না কিন্তু সন্তানদেরকে লতা/রফি বানানোর জোর প্রচেস্টা চালাই। আমরা কখনই জানতে চাই না আমাদের সন্তানরা কি চায়? ওদের কি পছন্দ?
তার উপর আমাদের ধারনা, আমরা যত কঠোর হবে বাচ্চাদের সাথে, তত সফল হতে পারবে তারা। যার কারনে তাদের উপর আমরা স্টিম রোলার চালাই।
ঠিক সেরকম বিশ্বাস থেকেই বাবা হুই প্যান ও মা বিক প্যান কড়া শাসনে রাখে তাদের সন্তান জেনিফারকে। নাচ, গান, পিয়ানো, স্কেটিং সেই সাথে পড়াশোনার চাপতো আছেই। মেয়ের ব্যার্থতা কোনভাবেই সহ্য করতে পারতো না বাবা বিক প্যান। স্কুল, পিয়ানো, স্কেটিং এর ক্লাস আর বাসা এর বাইরে কোন জীবন ছিল না জেনিফারের। কোনভাবেই কোন ব্যার্থতা সহ্য করতে পারতো না বাবা-মা। পরীক্ষায় কম নাম্বার পেলে কোনভাবেই রক্ষা পেত না জেনিফার। যার কারনে কোন পরীক্ষায় কম নাম্বার পেলে বাবা-মায়ের ভয়ে রেজাল্ট কার্ডে নাম্বার চেইন্জ করে বাবা-মাকে দেখাতো। এভাবেই শুরু হয় তার মিথ্যার হাতেখড়ি।
কানাডার নিয়ম হলো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে হলে হাই স্কুলের রেজাল্ট ভালো থাকতে হবে। কিন্তু গ্রেড ১২ এ ক্যালকুলাসে ফেল করে জেনিফার। ভয়ে আর সে কথা বলতে পারেনি বাবা-মাকে। তাই আবারো নকল রেজাল্টসিট তৈরী করে ও পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাকোলজিতে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করেছে এমন কিছু বাবা-মাকে জানায়। বাবা-মা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি তাদের আদরের সন্তান এভাবে তাদেরকে ফাঁকি দিয়ে চলছে। এরই মাঝে স্কুলের এক বন্ধু ড্যানিয়েল যে মারিজুয়ানার ব্যাবসার সাথে জড়িত তার সাথে প্রেম শুরু করে জেনিফার। এবং তা জানতে পেরে বাবা-মা আরো কঠোর হয় ও ড্যানিয়েল এর সাথে সব সম্পর্ক চিহ্ন করতে বাধ্য করে।
এভাবে চার বছর বাবা-মাকে ফাঁকি দেয় জেনিফার। এমন কি ইউনিভার্সিটির নকল সার্টিফিকেট তৈরী করে বাবা-মাকে দেখায়। কিন্তু এক সময় ধরে পরে যায় জেনিফার। কিন্তু তারপরও তাকে আবার নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ দেয় বাবা-মা।
এদিকে জেনিফারের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের পর ড্যানিয়েল নতুন গার্লফেন্ড জোগাড় করে। একদিকে বাবা-মার কাছে মিথ্যা ধরা খেয়েছে অন্যদিকে বয়ফেন্ড হাতছাড়া হয়েছে বাবা-মায়ের কারনে তাই নতুন একটা ছক আঁকে জেনিফার। ড্যানিয়েল এর সাথে যোগাযোগ করে বলে যে সে যদি তার বাবা-মাকে মারতে পারে তাহলে সে সহজেই সব সম্পত্তি পাবে। তারপর ড্যানিয়েলকে সহজেই বিয়ে করতে পারবে কারন বাঁধা দেবার কেউই থাকবে না। ড্যানিয়েল এতে সায় দেয়। তারপর দু'জন মিলে ভাড়াটে খুনী ভাড়া করে ও বাবা-মাকে খুন করার প্লান করে। এ আক্রমনে মা মারা গেলেও বাবা মারাত্বক ইনজুরর্ড হয় ও কোনরকমে প্রানে বেঁচে যায়।
প্রথমে জেনিফারকে কেউ সন্দেহ না করলেও বাবার জ্ঞান ফেরার পর সে একটি কথাই বলেছিল যে, আস্ক জেনিফার? হোয়াট সি ডিড?
এ ঘটনা কেন এতো এতো মিডিয়া দখল করেছিল? কারন....
- আমরা এশিয়ান প্যারেন্টস্ রা আমাদের সব স্বপ্ন ওদের উপর চাপিয়ে দেই কিন্তু সে চাপ তারা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে কিনা তার খোঁজ আমরা রাখি না।
-আমরা মনে করি মাইরের উপর কোন ওষুধ নাই। কড়া শাসনে রাখলেই বাচ্চা-কাচ্চা সঠিকভাবে মানুষ হবে।
-সন্তানের ব্যার্থতা আমরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারি না। তাদের উপর স্টিম রোলার চালাই।
-আমরা আমাদের সন্তানদের ডাক্তার/ইন্জিনিয়ার বানানোর চেস্টা করি কিন্তু কখনই একজন মানুষ বানানোর কথা কখনই ভাবি না। যে মানুষটি হবে মানবিক, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।
যার কারনে আমরা আমাদের সন্তানদের দিন দিন পশু তৈরী হয়, মানুষ না। তার ফল জেনিফার, ড্যানিয়েল কিংবা শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রম।
আসুন, আমরা আবারো ভাবি, সন্তানদের ডাক্তার/ইন্জিনিয়ার বানানো বেশী প্রয়োজন নাকি কখনই একজন মানুষ বানানো প্রয়োজন।