শিক্ষা ও শিক্ষক

শিক্ষা ও শিক্ষক আসুন শিখি ও শেখাই...

12/05/2026

স্মৃতিকথা
শামসুন্নাহার নিজামী
----------------------------

সংগ্রাম দিয়েই আমি আজকের স্মৃতিকথা শুরু করি। শিক্ষাজীবন শেষে বিয়ের পর আমাদের শিশু সন্তানসহ ঢাকায় এলাম। সময়টা ১৯৭৬ সাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া নতুন বাংলাদেশে সাবেক ছাত্রনেতার পারিবারিক জীবন কেমন হতে পারে তা হয়তো অনেকেই বুঝবে না। কিন্তু আমাদের মনে ছিল ঈমানের যজবা। সামনে চলার এক অদম্য শক্তি। যে শক্তি আমি পেয়েছিলাম আমার স্বামীর কাছ থেকে।

ছাত্রজীবনে তিনি মাওলানা মওদূদী রহ. কাছ থেকে সরাসরি উৎসাহ-উদ্দীপনা পেয়েছেন। মাওলানা ছাত্রদেরকে সমাজের মহিলাদের কাজের গুরুত্ব বোঝাতেন।

মেয়েরো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সমাজ গঠনে কাজ করতে হবে এ Inspiration তিনি সেখান থেকে পেয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের বিয়ে এবং মহিলাদের মধ্যে আমার কাজ শুরু করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে আমি হয়তো ভালো কোনো সম্মানজনক চাকরি বেছে নিতে পারতাম। কিন্তু সে পথে আমি যাইনি। লেখালেখির অভ্যাস আমার কোনোদিনই ছিল না। কিন্তু তার অনুপ্রেরণায় লেখনিকে দ্বীনের কাজের অংশ হিসেবে লেখার জগতে আমার প্রবেশ।

মফস্বল শহরে বেড়ে উঠা-রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া আমি ঢাকাতে একেবারেই নতুন। স্বাভাবিক কারণেই তখন আয়-রোজগারের জন্যও কোনো ভালো ব্যবস্থা ছিল না। অন্যের সাহায্য নিয়ে চলব না এটাও ছিল আমাদের মর্যাদাবোধের অংশ।

ঢাকাতে এসে উঠলাম পুুরনো ঢাকার বাংলা দুয়ারের গলির মধ্যের এক বাসায়। গলিটা এত শুরু ছিল যে, পায়ে হেঁটে যেতে হতো। দু’পাশের ময়লাযুক্ত ড্রেন। দুই রুমের বাসা। ছোট একফালি উঠানের মতো জায়গা। তখন ভূষির চুলায় রান্না করতে হতো। যাই হোক সবটাই তখন খুব সহজ এবং আনন্দের ছিল। আমাদের চার জনের সংসার। আমার ৩ মাসের মেয়ে, মুহসিনা, ননদের মেয়ে মুন্না আর আমরা। মুন্না তখন আমার সব সময়ের সঙ্গী। সংসারে অনভিজ্ঞ আমি এর ছোট ছোট হাতের সাহায্য-সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি।

শুরু হলো পথ চলা। বলছিলাম সংগ্রাম দিয়ে শুরু করি। দৈনিক সংগ্রামের ‘মহিলা পাতা’ চালানোর কাজ পেলাম। সংগ্রামের সম্পাদক তখন আখতার ফারুক সাহেব। নিজামী সাহেবও তখন টুকটাক লেখালেখি করেন। এটা সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। সেই সময় আমার শ্রদ্ধেয়া মুরুব্বী ‘সাইয়েদা মুনিরা খালাম্মা আমাকে দুইজন ছাত্র ঠিক করে দিলেন প্রাইভেট পড়ানোর জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো, কোথায় বসে পড়াবো? কোনো চেয়ার-টেবিল নেই। এরপর তারা ১ম মাসের বেতন দিল সেটা দিয়ে বেতের একসেট চেয়ার-টেবিল কেনা হলো।

পুরনো ঢাকায় তখন আমার প্রতিবেশী যারা ছিল তারা আমার পড়াশোনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতো। আমি এমএ পাস শুনলে তারা বলতো, কত মেট্রিক আইএ পাস আছে। অর্থাৎ এমএ পাসের চেয়ে মেট্রিক, আইএ পাস তাদের কাছে বড়। এমএ ডিগ্রি একটা তাচ্ছিল্যের ব্যাপার। আমি ঐ জায়গায় প্রতিবেশীদের লেবেলটা বোঝানোর জন্য কথাটা বললাম। তখন আমাদের বাসায় ছেলেদের প্রোগ্রামগুলো হতো। সেখানে চা পান হতো। একটা কেটলিতে চা। কাপ একটাই ছিল। সেটা দিয়েই পর্যায়ক্রমে সবাই চা পান করতো। আর সঙ্গে থাকতো পুরনো ঢাকার ডাল বা আলুপুরি। আমার মনে হয় সেই নাস্তার যে আনন্দ আর তৃপ্তি ছিল তা অবর্জনীয়।

তখন জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী আন্দোলনের নামও নেওয়া যেত না। বাংলা দুয়ারের বাসায় আমি মহিলা এবং ছাত্রীদের (যাদেরকে চিনতাম) নিয়মিত একটা প্রোগ্রাম শুরু করলাম। একদিনের ঘটনা। আমাদের প্রোগ্রামে এক পিতা তার মেয়েকে দিতে এসেছেন। বাইরের ঘরে নিজামী সাহেব বসা। তাকে তো তখন অনেকেই চেনে না। ভদ্রলোক এসে উনাকে জিজ্ঞাসা করছেন, এটা কি শামসুন্নাহার নিজামীর বাসা? এটা নিয়ে আমরা বেশ মজা পেতাম। একটা কথা বলা দরকার আমি আমার নামের সাথে বিয়ের পরও নিজামী ব্যবহার করার পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু ঢাকায় এসে বুঝতে পারলাম এই অঞ্চলের মানুষদের খুঁজে পাওয়ার জন্যে নামের এই অংশটি জরুরি। আর তখন থেকেই আমি হয়ে গেলাম নিজামী আপা। আমার মাতৃতুল্য সাইয়্যেদা মুনিরা খালাম্মা পাকিস্তান আমলেই জামায়াতের রুকন ছিলেন। তিনি ঢাকায় এসে ২টি নামে তার দাওয়াতি এবং সাংগঠনিক কাজ চালাতেন।

এক. পুরনো ঢাকায় ‘মহিলা মজলিস’ নামে। যার সভানেত্রী ছিলেন তাহেরা খাতুন। এক ধনাঢ্য ব্যক্তির স্ত্রী।

দুই. ‘তৌহিদ প্রচার সমিতি’ যার মূল দায়িত্বে ছিলেন ‘সাইয়্যেদা সুলতানা’। এটি মীরপুরে।

আমি ঢাকায় আসার পর তিনি আমাকে নাসিহা নামে ডাকতেন। বলতেন, তুই মানুষকে নসিহত করবি। আজ তাদের কেউ আর দুনিয়াতে নেই আল্লাহর কাছে দোয়া করি, জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় তাদের আল্লাহ সম্মানিত করুন।

সংগ্রামে মহিলা পাতা চালানোর বদৌলতে আমার সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। বিভিন্ন সময়ে প্রেস ক্লাবেও গিয়েছি। তখন আমার সম্পর্কে বা জামায়াত সম্পর্কে বিশেষ কোনো এলার্জি চোখে পড়েনি। হয়তো বা এটাকে কেউ কোনো ঋধপঃড়ৎ মনে করেনি। এভাবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে ঢাকার মাটিতে আমাদের কাজ শুরু। তখন ছাত্রদের মধ্যেও কাজ করার চিন্তা আমাদের ছিল। ইডেন কলেজে বেশ কিছু বোনকে পেয়ে গেলাম। ইডেন কলেজের মহিলা হোস্টেলের সুপার তখন চেমন আপা। তিনি নিজে একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক এবং প্রখ্যাত কথাশিল্পী সাহেদ আলীর স্ত্রী। আমাদের ইডেনের বোনদের সাথে তার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। তাদের উদ্যোগে ইডেন কলেজের মহিলা হোস্টেলে আমরা তাফসির ক্লাস শুরু করলাম। সেখান থেকে অনেক মেয়েকে আমরা পেলাম। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে (১৯৭৮ সালে) ছাত্রীসংস্থা তাদের যাত্রা শুরু করে।

একটা মজার ব্যাপার বলার লোভ সামলাতে পারছি না। অনেকদিন ইডেন কলেজে আমি তাফসির ক্লাস চালিয়েছি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় আমরা মোটামুটি পরিচিতি পেয়েছি। ১৯৭৯ সালে জামায়াত তার স্বনামে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই তখন নিজামী সাহেব জামায়াতে ইসলামীতে কাজ করে, সেই সুবাদে নিজামী আপাও জামায়াতের একথা রাজনৈতিকভাবে যারা সচেতন তাদের বুঝতে বাকি রইল না। তখন অনেককেই বলতে শুনেছি, ‘আমরা তো জানতাম নিজামী আপা ভালো মানুষ, এখন দেখি জামায়াতে ইসলামী করে।’

বলছিলাম রুজি ও রিজেকের সংগ্রামের কথা। প্রাইভেট টিউশনি থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি দ্বীনের কাজে ব্যস্ততার মধ্যে সময়গুলো কেটে গেছে। আমার এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, শহীদ আমীরে জামায়াত অর্থ উপার্জনে কোনো অংশ নেননি। বরং আমরা দু’জন পরামর্শের ভিত্তিতে চলতাম, আমাদের মূল লক্ষ্য আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে। মূল কাজের জন্য যার পক্ষে যতটুকু প্রয়োজন সেটাই আমরা করেছি। অনেক অর্থের হাতছানি এসেছে। কিন্তু শহীদ আমীরে জামায়াত সেসব ফাঁদে পা দেননি। আমরা অত্যন্ত সাদামাটাভাবে জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।

আজ স্মৃতিচারণ করতে বসে আমার মনে হচ্ছে, আমার যতটুকু কাজ করা সম্ভব হয়েছে, সবই আমার স্বামীর অবদান। অবশ্যই আল্লাহ আমার তকদীরে যা রেখেছেন তার বাইরে আমি কিছুই করতে পারব না। কিন্তু একথা আমাকে বলতেই হবে যে, শহীদ আমীরে জামায়াতের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া আমি হয়তো কিছুই করতে পারতাম না।

তিনি শুধু সংগঠন আন্দোলনের কাজেই আমাকে সহযোগিতা করেছেন তাই না। বরং সংসারে তিনি ছিলেন আমার দৃষ্টিতে একজন আদর্শ স্বামী, আদর্শ পিতা। আমার এবং আমার সন্তানদের দৃষ্টিতে রাসূল সা.-এর স্বার্থক অনুসারী। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে না। কিন্তু আমার বিশ্বাস আল্লাহ সবাইকে শাহাদাদের মর্যাদা দেন না। যাদেরকে দেন তারা মহা সৌভাগ্যবান এবং এই সৌভাগ্য তারা অর্জন করেন তাদের কাজের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা আমল করতে, তার প্রতিদান স্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সূরা আন-নহল : ৩২)।

আল্লাহ তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। আর আমাদের পরিবারকে শহীদের পরিবার হিসেবে তাঁর রহমতের চাদরে আবৃত করে দেন। যে বাংলাদেশের কল্যাণের জন্য, মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, জুলুম-নির্যাতন রোধের জন্য আল্লাহর নির্দেশিত ও রাসূল সা.-এর প্রদর্শিত পথে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিচলভাবে চেষ্টা করেছেন আল্লাহ সেটাকে কবুল করুন। আমিন, সুম্মা আমিন।

01/04/2025

আসসালামু আলাইকুম

25/01/2025

Address

Dhaka
1200

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when শিক্ষা ও শিক্ষক posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The School

Send a message to শিক্ষা ও শিক্ষক:

Shortcuts

Share

Category