06/09/2025
ছোটবেলায় যখন আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করতো: “তুমি কি মুসলিম?” আমি উত্তর দিতাম: “সুন্নি মুসলিম।”
আমি মুখস্থ বলতাম, কারণ পরিবার থেকে জেনেছিলাম আমরা সুন্নি মুসলিম। তখন জানতাম না সুন্নি আর ওহাবি আসলে কী, কিন্তু শিয়া নামটা শুনলেই ভয় পেতাম- কারন সমাজে তাদের ভালো চোক্ষে দেখে না।
বড় হতে হতে শুনলাম মুসলিমদের ভেতরে আরও অনেক ভাগ আছে। আমি যেহেতু মাদ্রাসায় পড়িনি, তাই সুন্নি-ওহাবি, শিয়া, ইসমাঈলি- এসব নিয়ে তেমন কিছুই বুঝতাম না। আজ ও দেখলাম ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান নিয়ে অনেককে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া করতে।
যখন আমি পায়ে হেঁটে মক্কা সফরে বের হই, তখন থেকে আমার চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
ভারতে প্রবেশ করার পর উত্তর প্রদেশের একটি মাদ্রাসায় রাতে থাকার জায়গা পাই। সেখানে অনেক সবুজ পতাকা দেখলাম। জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, এটা মহানবীর (সা.) জন্মদিনের প্রতীক। আমি কনফিউজড হয়ে যাই, কারণ ইউটিউবে শোনা অনেক ওয়াজে শুনেছিলাম মিলাদুন্নবী করা নাকি জায়েজ না। সেখানেই তাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
কিছুদিন পর লখনৌতে একটি মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে দেখি, সবার জায়নামাজে একটি করে ছোট পাথর রাখা। আমি ভয় পেয়ে যাই, পরে বুঝলাম এটি শিয়াদের প্রথা। যেহেতু আগে কখনও শিয়া মসজিদে প্রবেশ করিনি, তাই ভয় পেয়ে নামাজ না পড়ে বের হয়ে আসি।
পাকিস্তানে প্রবেশ করার পর প্রায় সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করতো: “আপনি কি মুসলিম?”
সত্যি বলতে, তখন মনে ভয় কাজ করতো। যদি বলি আমি সুন্নি, আর তারা শিয়া হয়—তাহলে হয়তো বিপদে পড়তে পারি। আবার কেউ সরাসরি জিজ্ঞেস করতো: “আপনি কি সুন্নি মুসলিম?”
আমি সবার উত্তর দিতাম একটাই: “আমি মুসলিম।”
যখন তারা আরও জানতে চাইতো, তখনো বলতাম: “আমি শুধু মুসলিম। আমি যা কোরআন ও হাদিসে আছে তাই মানি, আর যা নেই তা করি না।”
এই উত্তর শুনে আশ্চর্যজনকভাবে শিয়া মুসলিমও আমাকে পছন্দ করতো, সুন্নিও করতো, এমনকি ওহাবি, ইসমাইলি—সবাই আমাকে সম্মান দিতো। তখন আমি গভীরভাবে বুঝলাম—আসল পরিচয় মুসলিম, এর আগে বা পরে কোনো ট্যাগের দরকার নেই।
আজ আমাদের মুসলিম-মুসলিমের মধ্যে যে বিভক্তি ও সংঘাত—এটা শিয়া, সুন্নি, ওহাবি, ইসমাইলি এসব নামের কারণেই। অথচ আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা, একই কোরআন, একই রাসূলের (সা.) অনুসারী।
ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, বাহরাইন, নাইজেরিয়া—
এইসব দেশে শিয়া–সুন্নি, ইসমাইলি ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে প্রচুর সহিংসতা, মারামারি আর রাজনৈতিক টানাপোড়েন হয়। সেখানে যদি আপনার পরিচয় তাদের সাথে না মেলে, মার খাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
বাংলাদেশেও দেখা যায়, সুন্নি আর ওহাবিদের মধ্যে কথা কাটাকাটি এমনকি কখনও মারামারি। অথচ দু’জনই মুসলিম!
আল্লাহ আমাদের এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন ইবাদত করার জন্য, মুসলিম মুসলিমের সাথে ঝগড়া করার জন্য নয়।
আজ আমি শুধু বলি—
আমি মুসলিম।
এর আগে বা পরে আর কোনো ট্যাগ লাগাই না।
কারণ ট্যাগ মানেই বিভাজন, আর বিভাজন মানেই সংঘাত।
আমার কথাটা কেউ ভুলভাবে নেবেন না। আমি শুধু চাই, আমরা সবাই মুসলিম হয়ে একসাথে ইবাদত করি, ঈদ করি, আনন্দ করি।
-আলিফ মাহমুদ
খোদা হাফেজ।