07/11/2025
জীবন এমন এক নদী, যার স্রোত কেউ ধরে রাখতে পারে না। আমরা যত ভাবি সামনে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেব, ততই নতুন এক মোড় এসে পড়ে। কোথাও সংসারের বাঁধ, কোথাও পড়াশোনার চাপ, বেকারত্বের দীর্ঘ অবসাদ, কোথাও সমাজের চাপে জমে থাকা ঘূর্ণি। বয়স বেড়ে গেলে সময় আর নিজের থাকে না, শরীরও আগের মতো সাড়া দেয় না। একদিন হঠাৎ দেখা যায়, যে বইগুলো পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলে, সেগুলো ধুলোয় ঢাকা পড়ে আছে বুকশেলফে; যে নামাজে মনোযোগী হওয়ার ইচ্ছে ছিল, তা ভেসে গেছে পড়ালেখার ব্যস্ততা আর কোচিং শেষে ক্লান্ত সন্ধ্যার অন্ধকারে।
আমাদের জেনারেশন ভাবে, তারা আগে পড়াশোনা করবে, চাকুরী করবে, সংসার করবে তারপর জীবনের শেষ প্রান্তে নামাজ-কালামে মনোযোগী হবে, অনেক অনেক বই পড়বে, লেখালেখি করবে, হজ্জ, উমরা করবে, দাওয়াতের কাজ করবে ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে বাংলাদেশে থেকে স্বাভাবিক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাতে আসতেই জীবনের অর্ধেক পেরিয়ে যায়। বাকী অর্ধেকে ইচ্ছা থাকলেও আগ্রহ থাকে না।
মানুষ মনে করে সময় একদিন তাকে সুযোগ দেবে। একটি নিরব বিকেল, একটুখানি অবসর, একান্তে বসে ভাবার মতো কিছু মুহূর্ত সে নিশ্চয়ই পাবে। কিন্তু সময় কখনো দয়া করে না। সময় কারও জন্য থেমে থাকে না, কারও ক্লান্তি বোঝে না, কারও অসম্পূর্ণতা পূরণ করে না। সে শুধু চলে যায়, নিজের স্রোতে টেনে নিয়ে যায় তোমার শক্তি, তোমার আকাঙ্ক্ষা, তোমার স্বপ্নের দীপ্তিটুকুও।
মানুষের জীবন বড় আশ্চর্য। আমরা যতই পরিকল্পনা করি, জীবনের ছক কখনোই আমাদের কলমে আঁকা পথে চলে না। আমরা ভাবি, এই পরীক্ষাটা শেষ হলে একটু স্বস্তি পাবো, ভার্সিটিতে চান্সটা হয়ে গেলেই আর কিছু লাগবে না, এই চাকরিটা পেলে কিছুটা অবকাশ মিলবে, এই সংসারের চাপ সামলে নিলেই নিজের জন্য সময় বের করতে পারবো। কিন্তু বাস্তবতা হল, জীবন কখনো থামে না। একটা দায়িত্ব শেষ হতেই অন্যটা এসে দাঁড়ায় দরজায়। সন্তান বড় হয়, কিন্তু উদ্বেগও বড় হয়। পদোন্নতি হয়, কিন্তু শান্তি কমে যায়।
আমরা এমন এক ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায় থাকি, যে ভবিষ্যত আসলে কেবল কল্পনায়ই শান্ত। বাস্তব ভবিষ্যত সবসময় কোলাহলে ভরা, অসমাপ্ত কাজের বোঝায় ভারী, আর মানসিক ক্লান্তির জালে আটকে থাকে। সময় নিঃশব্দে আমাদের প্রাণশক্তি চুরি করে নিয়ে যায়। আমরা বুঝতেও পারি না কখন আমাদের দিন থেকে রাত হয়ে গেল, কখন উদ্যম থেকে উদাসীনতা এসে বসলো মনে।
যে বয়সে আমরা ভাবি, “এখন সময় নেই, পরে করবো” সেই “পরে” কখনও আসে না। বয়স বাড়ে, কিন্তু শক্তি কমে। চিন্তা বাড়ে, কিন্তু একাগ্রতা হারায়। তখন নামাজে মনোযোগ আসে না, বইয়ের পৃষ্ঠা ভারী লাগে, ভালো কিছু করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু শরীর সাড়া দেয় না। মানুষ ভাবে, অবসরে এসে ভালো কাজ করবে। অথচ অবসর আসার আগেই মন অবসন্ন হয়ে পড়ে। জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে তার এক নির্মম উপলব্ধি জাগে “আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু শুরু করিনি।”
তাই এখনই শুরু করো। যখন মন চায়, তখনই শুরু করা উচিত। কারণ সময় কখনোই সহজভাবে পাওয়া যায় না, সময়কে আদায় করে নিতে হয়। যে নিজের সময়কে জোর করে নিজের আয়ত্তে আনে, তার জীবনেই সার্থকতা আসে।
আরেকটা বিষয় মনে রাখো, জীবন কখনো পুরোপুরি সুশৃঙ্খল হবে না। সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে তুমি সারাজীবন শুধু অপেক্ষাই করবে। জীবনের প্রতিটি পর্বেই কিছু না কিছু অসম্পূর্ণ থাকবে। বাড়তি কাজ, মানসিক ক্লান্তি, পারিবারিক টানাপোড়েন। তবুও এই অসম্পূর্ণতার ভেতর দিয়েই মানুষকে অর্থ খুঁজে নিতে হয়।
একটু ভেবে দেখো, যে মানুষ আজ নামাজ শুরু করতে চায় না কারণ সময় নেই, সে কালও বলবে, “আজ শরীর ভালো না।” যে বই পড়া পিছিয়ে দিচ্ছে আজ, সে একদিন পড়তে চাইবে কিন্তু চোখের দৃষ্টি দুর্বল হবে। যে কাজটা তুমি আজকে পারছো, সেটাই একদিন অসম্ভব হয়ে যাবে।
তাই এই মুহূর্তটাই তোমার আসল সময়। আগামীকাল নয়, অবসর নয়, বয়স বাড়লে নয়, আজ। আজ তোমার হাতে আছে শক্তি, আছে চিন্তা, আছে স্বপ্ন। আজই শুরু না করলে কাল তোমার মনই তোমার শত্রু হয়ে যাবে।
শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন,
"অনেকেই মনে করে ভবিষ্যতে তাদের হাতে অনেক সময় থাকবে, মনোযোগের ব্যাঘাত কমবে, আর চিন্তা হবে স্বচ্ছ-কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। আমি তোমাকে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে বলছি, বয়স যত বাড়ে, দায়িত্বও তত বাড়ে। সামাজিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়, সময় কমে যায়, শক্তি হ্রাস পায়, স্বাস্থ্য দুর্বল হয়, আর কর্তব্য বেড়ে যায়। বার্ধক্যে সময় আরও সীমিত হয়ে পড়ে, শরীর দুর্বল হয়, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, শক্তি ক্ষীণ হয়, আর দায়িত্ব হয় আরও ভারী।
তাই জীবনের সময়কে কাজে লাগাও যতক্ষণ তা তোমার হাতে আছে। এমন ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করো না যা হয়তো আসবেই না। জীবনের প্রতিটি পর্বই নিজস্ব দায়িত্ব, বাধা-বিপত্তি ও অপ্রত্যাশিত ঘটনার ভারে পরিপূর্ণ।"
লেখক :মো:মাহমুদুল হাসান।