27/03/2026
✅যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরান ইসরায়েলের চেয়ে দুবাইতে বেশি হামলা চালিয়েছে!
অথচ দুবাই কোনোদিন ইরানের দিকে একটাও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়েনি।
বরং তারা পরিষ্কার জানিয়ে রেখেছিল, তাদের মাটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনো ধরনের হামলা চালানো যাবে না।
এমনকি তেহরানের সাথে বছরের পর বছর ধরে তাদের এক ধরনের নীরব কূটনৈতিক বোঝাপড়াও ছিল। সুতরাং, ইরানের তো সেখানে হামলা চালানোর প্রশ্নই উঠে না!
কিন্তু ইরান ইসরায়েলের চেয়ে তাদের ওপরই বেশি আঘাত হেনেছে। আমি পুরো হিসাবটা দিচ্ছি।
যুদ্ধের প্রথম ১৩ দিনেই ইরান শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত (যাকে আমরা এক নামে ‘দুবাই’ হিসেবে চিনি) দিকে ৩১৪ টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৬৭২টি ড্রোন ছুড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ছোড়া মোট অস্ত্রের অর্ধেকেরও বেশি টার্গেট ছিল এই আমিরাত।
এই যুদ্ধ শুরু করার পেছনে যে দেশটির কোনো হাতই ছিল না, তাদের ওপর ৩,০০০-এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন চালানো হলো!
✔️ইরান তাহলে দুবাইয়ের সাথে এত অন্যায় আচরণ কেন করলো?
☑️উত্তরটা ঠিক সামরিক নয়, উত্তরটা লুকিয়ে আছে টাকা-পয়সা আর ব্যবসার ভেতর।
আর আপনি যখন এই বিষয়টা বুঝতে পারবেন, তখন পুরো যুদ্ধটাকে আপনার কাছে একেবারেই ভিন্ন মনে হবে।
ইরান আসলে কোন জিনিসটাকে টার্গেট করছে, তা একটু বুঝিয়ে বলি।
২০২৫ সালের মে মাসে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় অঞ্চলে এক সফরে গিয়েছিলেন, হয়তো অনেকেরই মনে আছে সে কথা।
আধুনিক ইতিহাসে অর্থনৈতিক দিক থেকে একে অন্যতম সেরা সফল সফর ধরা হয়। কারণ সেখানে যা যা চুক্তি হয়েছিলঃ
সৌদি আরবঃ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি।
কাতারঃ ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক চুক্তি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতঃ ১০ বছরের জন্য ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বিনিয়োগ ফ্রেমওয়ার্ক—যার মূল ফোকাস ছিল এআই (AI), সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি এবং উৎপাদন শিল্পের ওপর।
সব মিলিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো আমেরিকার জন্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। আর এই যে আমিরাতের ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি—তা তাদের পুরো জিডিপি’র প্রায় ৩০ শতাংশ! সহজ কথায়, একটি দেশ তাদের পুরো অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ আমেরিকার ওপর বাজি ধরছে।
ট্রাম্পও আমিরাতকে বছরে এনভিডিয়ার (Nvidia) ৫ লাখ অত্যাধুনিক এআই চিপ দেওয়ার সবুজ সংকেত দেন। মাইক্রোসফ্ট ১৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। অ্যামাজন, গুগল থেকে শুরু করে আমেরিকার বড় বড় টেক কোম্পানিগুলো দুবাই আর আবুধাবিতে তাদের ডেটা সেন্টার বানানো শুরু করেছিলো।
আমিরাত তখন শুধু তেলের দেশ হিসেবে নয়, হয়ে উঠছিল মধ্যপ্রাচ্যের ‘এআই ক্যাপিটাল’। পূর্ব আর পশ্চিমের সংযোগকারী এক নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র। আধুনিক আরব অর্থনীতি কেমন হওয়া উচিত, তার নিখুঁত এক রোল মডেল।
আর এই পুরো মডেলটা দাঁড়িয়ে ছিল আমেরিকার সাথে অংশীদারিত্বের ওপর।
আবুধাবির জাতীয় তেল কোম্পানির (ADNOC) প্রধান নির্বাহী যখন আমিরাতের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের হামলার কথা বলেন, তখন তিনি একে "বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধ" বলে উল্লেখ করেন।
খেয়াল করেন, সামরিক যুদ্ধ নয়—অর্থনৈতিক যুদ্ধ।
ইরান আমিরাতের রুবাইস রিফাইনারিকে টার্গেট করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শোধনাগার।
টার্গেট করেছে জেবেল আলী বন্দরকে, যা ৩,৫০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষের বাণিজ্যের মূল ধমনী।
টার্গেট করা হয়েছে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টকে—যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর।
এমনকি ইরান আঘাত করেছে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে, যার কারণে পুরো অঞ্চলের ক্লাউড সার্ভিস ব্যাহত হয়েছে।
এগুলো কোনো সামরিক ঘাঁটি নয়। এগুলো হচ্ছে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সেই মার্কিন-আমিরাত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মূল কাঠামো।
ইরান সামরিক শক্তিতে আমেরিকাকে হারাতে পারবে না, এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। কিন্তু ইরান একটা জিনিস খুব ভালো বোঝে, যা সাধারণ মানুষ বোঝে না।
দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ক্ষেপণাস্ত্র নয়। সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো—অর্থনৈতিক ক্ষতি।
ইরানের কৌশলটা মারাত্মক রকমের সহজ, আবার একই সাথে সুক্ষ্ম।
আমিরাতে আসল টাকাটা থাকে। এখানেই আমেরিকার সব টেক কোম্পানিগুলো তাদের হেডকোয়ার্টার বানিয়েছে। এখানেই আমেরিকার এআই অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে।
এখানেই ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন হওয়ার কথা।
ইরান চায় এই জিনিসটাই ধ্বংস করতে। এমন একটা অবস্থা তৈরি করতে যাতে বীমা কোম্পানিগুলো এখানকার ব্যবসার দায়িত্ব নিতে ভয় পায়, বড় বড় বিনিয়োগকারীরা টাকা ঢালতে ভয় পায়।
সিলিকন ভ্যালির সিইও-রা যাতে নিজেদের প্রশ্ন করতে বাধ্য হন: "আমরা কি আসলেই একটা যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতর আমাদের ডেটা সেন্টারগুলো বানাব?"
যদি ইরানের এই চাল সফল হয়, তবে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সেই চুক্তি ভেস্তে যাবে।
সেই সাথে মার্কিন টেক কোম্পানিগুলো চলে যাবে। আমিরাত মডেল মুখ থুবড়ে পড়বে। আর আমেরিকার সাথে গভীর বন্ধুত্বের স্বপ্ন দেখা অন্য আরব দেশগুলোর কাছে একটা স্পষ্ট বার্তা যাবে: "দেখে নাও, দুবাইয়ের অবস্থা কী হয়েছিল!"
টার্গেটটা এটাই। ইসরায়েল কিংবা আমেরিকান সৈন্য নয়—টার্গেট হলো আমেরিকা আর উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যকার এই অর্থনৈতিক সেতুটি।
যুদ্ধ এবং ব্যবসা নিয়ে আমার ‘রিচ ড্যাড’ (Rich Dad) আমাকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন: *"শত্রু যেখানে শক্তিশালী, সেখানে কখনো লড়তে যেও না। আঘাত করো সেখানে, যেখানে তারা অরক্ষিত।"*
আমেরিকার সামরিক বাহিনী অপরাজেয়, ইরান সেটা জানে। কিন্তু আমেরিকার অর্থনীতি? তেলের দাম? শেয়ার বাজার? টেকনোলজি পার্টনারশিপ?
এই জায়গাগুলো অরক্ষিত।
আর এ অঞ্চলে আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত পার্টনার হিসেবে আমিরাত ছিল ইরানের জন্য সেই অরক্ষিত মোক্ষম জায়গা।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) নিজেও এর সত্যতা স্বীকার করেছে যখন তারা বলেছিল যে—তারা তাদের শক্তির ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত স্বার্থের’ বিরুদ্ধে।
খেয়াল করেন, ’সামরিক ঘাঁটির’ বিরুদ্ধে নয়, ’কৌশলগত স্বার্থের’ বিরুদ্ধে।
তাই ইরানের এই লড়াইটা শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়।
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধের পর আমেরিকান আর্থিক কাঠামোর ওপর এটি ইতিহাসের সবচেয়ে সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক আক্রমণ।
তবে এর মানে এই নয় যে এই বন্ধুত্ব হুট করে শেষ হয়ে যাবে কিংবা তাদের ভরসা টুটে যাবে—জিনিসটা এত সহজও নয়।
এটা মূলত ইরানের একটা রণকৌশল, আর এই আলোকেই তারা বর্তমান যুদ্ধটাকে নিজেদের মতো করে সাজাতে চাইছে!
(লেখাটি রবার্ট কিয়োসাকির ফেসবুক পেইজ থেকে নেয়া)