লাক্স সুন্দরী থেকে বিসিএস ক্যাডার
Career Canvas
শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার গল্প!
30/12/2025
প্রথম বিসিএসেই যেভাবে প্রথম হলেন সাঈদা
৪০তম বিসিএস ছিল সাঈদা আক্তারের প্রথম বিসিএস পরীক্ষা। প্রথম বিসিএসেই তিনি ফিশারিজ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন।
ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন আর সমাপনী পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় ২০১৩ সালে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায়। ৬২.২৫ নম্বর পেয়েছিলেন, যেখানে কাট মার্কস ছিল ৬৬, এ ব্যর্থতার জন্য হীনম্মন্যতায় ভুগে তার স্কুল-কলেজের বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ রাখেননি। পরে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ অনুষদে ২০১৩-১৪ সেশনের স্নাতকে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা শুরু করেন। সেই উদ্দেশ্যেই ২০১৬ সালে একটা স্থানীয় কোচিংয়ে ভর্তি হন। তার বিশ্ববিদ্যালয় টার্ম সিস্টেম হওয়ায় প্রায় প্রতি সপ্তাহেই মিড পরীক্ষা লেগেই থাকত। তাই অনার্স ৩য় বর্ষের শেষ থেকে শুক্র ও শনিবার নিয়মিত বিসিএসের পড়া চালিয়ে যান। আর ৩৯তম বিসিএসে স্পেশাল হওয়াতে অনেকটা সময়ও পান ৪০ প্রিলিমিনারির আগে। কিন্তু গাজীপুরে তখন তেমন ভালো কোচিং না থাকায় ফার্মগেটে একটা কোচিংয়ে এক্সাম ব্যাচে ভর্তি হন। তখন মাস্টার্সের একাডেমিক ক্লাস চলছিল, তাই গাজীপুর থেকে ফার্মগেট গিয়ে রাতের ব্যাচে পরীক্ষা দিয়ে রাতে ভাইয়ার বাসায় থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে গাজীপুর পৌঁছে ক্লাস করতেন।
প্রিলির পর থেকেই নিয়মিত লিখিত গণিত ও ইংরেজি পড়া চালিয়ে যেতে থাকেন। ২০১৯-এ যখন মাস্টার্সের রিসার্চ পুরোদমে চলছিল, এ সময়টাতে প্রিলির ফলাফল পান এবং ঢাকায় লিখিত কোচিংয়ে ভর্তি হন। সাঈদা বলেন, ‘যেহেতু এটা আমার প্রথম বিসিএস ছিল সিলেবাস সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই ছিল না বলতে গেলে। তবে আমি সব সময় প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ পছন্দ করতাম। খুব সকালে কোচিংয়ে যেতাম, ক্লাস করতাম, তার পর লাইব্রেরিতে পড়তাম এবং রাতে বেশিরভাগ সময় আমার ভাইয়া অফিস থেকে ফেরার পথে লাইব্রেরি থেকে আমাকে নিয়ে যেত। পরিবারের প্রতিটি সদস্য আমাকে প্রচুর সাপোর্ট দিয়েছে। অনেক সময়ই হতাশ হয়ে যেতাম, কিন্তু আমার ভাবি আমাকে অনেক মোটিভেট করত তাই আবার নতুন উদ্দীপনায় পড়তে থাকতাম।’ তিনি কোচিং, নামাজ আর ঘুম বাদে যেটুকু সময় পেতেন সারাক্ষণই পড়তেন, তবে রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে ফজরের পর থেকে গভীরভাবে মনোনিবেশ করতেন। তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছে হয়তো আমার এসব সংগ্রাম অতিরঞ্জিত শোনাবে, কিন্তু আমাদের ১২টা টার্মের মিড ফাইনালের গণ্ডি পেরিয়ে শুধু ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নে মাস্টার্স চলাকালীন ঢাকা পর্যন্ত এসে কোচিং করাটা আমার জন্য দুঃসাহসই বলা চলে।’
পরে ৪০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে তিনি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্বাদুপানি উপকেন্দ্র সৈয়দপুরে যোগদান করেন। সেখান থেকেই ২০ জানুয়ারি, ২০২২-এ বিসিএস ভাইভাতে অংশগ্রহণ করেন। মহান আল্লাহ তাকে কখনো খালি হাতে ফেরাননি, ২০২০ সালে মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন, ২০২১-এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ২০২২-এ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়া ব্যাংক ও আরও কয়েকটি চাকরির পরীক্ষায় প্রিলি ও লিখিত উত্তীর্ণ হন। পরে আর সেদিকে ধাবিত হননি। আল্লাহর অশেষ কৃপায় ভার্সিটিতে অনার্স ও মাস্টার্সে ৩.৯৮ সিজিপিএ ধরে রাখতে সক্ষম হন। বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য তার পরামর্শ হলো, ‘জীবনে সফল হতে হলে অবশ্যই পরিশ্রমী হতে হবে। আর বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৪ মাসের বেশি সময় পাওয়া যাচ্ছে না, তাই প্রিলির সঙ্গেই লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি শানিত করতে হবে। নিয়মিত একটা বাংলা ও একটা ইংরেজি পত্রিকা পড়তে হবে।’
তিনি বলেন, বাংলা পত্রিকা পড়ার সময় প্রিলির ক্ষেত্রে একটা খাতায় প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো টুকে রাখতেন, আর লিখিত পরীক্ষার সময় পেপার কেটে রাখতেন। আর ইংরেজি একটা কলাম পড়তেন প্রতিদিন, পড়ার সময় বাক্যের গঠন লক্ষ্য করতেন ও অপরিচিত শব্দগুলো খাতায় টুকে রাখতেন, যা পরে তাকে ইংরেজি রচনা লেখায় বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। প্রত্যেক মাসে কারেন্ট আফেয়ার্সে চোখ বুলাতেন, খুব বেশি সময় নিয়ে নয়, কিন্তু ধারণা রাখতেন। তিনি গণিতে দুর্বল হওয়ায় নিয়মিত গণিত অনুশীলন করতেন। বাজারে প্রচলিত গাইড বই খুব কম পড়েছেন। বোর্ড বই যেমন- ষষ্ঠ থেকে দশম গণিত, নবম-দশম শ্রেণির রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ভূগোল, উচ্চ মাধ্যমিকের পৌরনীতি ২য় পত্র, নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ২য় পত্র বই, ১ম পত্র, উচ্চ মাধ্যমিকের প্রকৌশল ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এই বইগুলো তিনি খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যগুলো টুকে রাখতেন। এ ছাড়া বিজ্ঞান, বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও আন্তর্জাতিকের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চিত্র, গ্রাফ, ফ্লোচার্ট ও মানচিত্র ব্যবহার করতেন। প্রস্তুতির সময়গুলোতে হতাশ হলে বিভিন্ন মোটিভেশনাল ভিডিও দেখতেন তাও ইংলিশ সাবটাইটেলযোগে। এটাও পরে ভোকাবুলারি সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করেছে।
চরম দারিদ্রতা থেকে জজ হওয়ার গল্প
10/12/2025
গত কয়েক বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, পিএসসি গতানুগতিক ধারার প্রশ্ন থেকে বেরিয়ে আসছে। বিশেষ করে ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন থেকে এটা স্পষ্ট যে- কোচিং, গাইড বা মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির যুগ শেষ। তাহলে বিসিএসে সফল হতে হলে কী করতে পারেন?
১. নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস তৈরি
বাংলা ও ইংরেজি দু’ধরনের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস আপনাকে অন্যদের তুলনায় আলাদা জায়গায় নিয়ে যাবে। পত্রিকা পড়ার ক্ষেত্রে প্রথম পাতা, শেষ পাতা, সম্পাদকীয় ও আন্তর্জাতিকপাতা অবশ্যই পড়বেন।
পাশাপাশি মানসম্পন্ন নিউজ চ্যানেলগুলো দেখতে পারেন। এতে করে আলোচিত বিষয়গুলো আরও সহজে মনে রাখতে পারবেন৷
২. ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিংয়ের অভ্যাস গড়ে তুলুন
৪৭তম বিসিএস লিখিত প্রশ্ন দেখলেই বুঝবেন যাদের ফ্রি হ্যান্ড রাইটিংয়ের অভ্যাস আছে, তারা ভাল করবেন। এই অভ্যাস রাতারাতি তৈরি করা যায় না। তাই প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং অনুশীলন করুন।
৩. কনসেপ্টুয়াল লার্নিংকে গুরুত্ব দিন
বিসিএসে এখন আন্তর্জাতিক, অর্থনীতি, তথ্য-প্রযুক্তি, পরিবেশ—সবক্ষেত্রেই কনসেপ্ট ভিত্তিক প্রশ্নের প্রবণতা বাড়ছে। তাই মুখস্থ করার পরিবর্তে বুঝে পড়ুন। প্রশ্ন হুবহু কমন পাবেন না ধরে প্রস্তুতি নিন।
৪. নিজের নোট তৈরি করুন
গাইড বুকের ওপর নির্ভর না করে, পত্রিকা, রিপোর্ট, সরকারি ওয়েবসাইট, বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রতিবেদন থেকে নিজের নোট তৈরি করুন। এতে করে নিজের ওপর আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
৫. পূর্ববর্তী প্রশ্ন বিশ্লেষণ করুন
প্রশ্নের ধরন যতই বদলাক, মূল বিষয়গুলো একই থাকে। তাই প্রতিটি বিষয়ের বিগত প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো পরিষ্কারভাবে বুঝে নিন। দেখবেন কোন না কোনভাবে কাজে লাগবে।
৬. ম্যাথ, বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে জোর দিন
বিগত বিসিএসগুলোর প্রশ্ন দেখলে দেখা যায়, এই তিন বিষয়ের ওপর দক্ষতা থাকাই মূল পার্থক্য তৈরি করছে। তাই নিয়মিত চর্চা ছাড়া বিকল্প নেই।
৭. বানান সম্পর্কে সচেতন হোন
আপনি যত সুন্দরভাবে উত্তরই লিখুন না কেন, তাতে যদি বানান ভুল থাকে তবে পরীক্ষকের কাছে আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। তাই নিয়মিত বানান অনুশীলন করুন এবং কঠিন শব্দগুলো আলাদা করে লিখে রাখুন। প্রয়োজনে একটি ছোট খাতা বা নোটে ভুল বানানগুলো সংগ্রহ করে বারবার চর্চা করুন।
৮. টাইম ম্যানেজমেন্ট শিখুন
লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে টাইম ম্যানেজমেন্ট একটি বড় ফ্যাক্টর। এজন্য পড়ার পাশাপাশি ঘড়ি ধরে লিখার অভ্যাস করতে হবে। কত নম্বরের জন্য কতটুকু লেখা দরকার, তা বুঝতে হবে।
৯. নিয়মিত রিভিশন করুন
যতই পড়াশোনা করুন না কেন, নিয়মিত পুনরাবৃত্তি ছাড়া সেই জ্ঞান স্থায়ী হয় না। তাই প্রতিদিন রিভিশনের জন্য কিছু সময় আলাদা করে রাখুন। এতে পরীক্ষার আগে চাপ কমবে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
১০. মডেল টেস্ট দিন
টাইম ম্যানেজমেন্ট, পরীক্ষার হলে মাথা ঠান্ডা রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে মডেল টেস্টের বিকল্প নেই। তাই সুযোগ থাকলে মডেল টেস্ট দিন। এতে আপনার প্রস্তুতির প্রকৃত অবস্থাট বুঝতে পারবেন।
সবশেষে বলতে চাই, বিসিএস একটি সাধনার বিষয়। এখানে সফল হতে হলে একই সাথে পরিশ্রমী, কৌশলী ও ধৈর্যশীল হতে হবে। পাশাপাশি স্রষ্টার ওপর আস্থা রাখতে হবে। আপনার প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ই আপনাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। সবার জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইলো।
শুভেচ্ছান্তে,
রায়হান আতাহার
সহকারী কমিশনার (সুপারিশপ্রাপ্ত)
৪৪তম বিসিএস প্রশাসন
মেধাক্রম: ১৬
Click here to claim your Sponsored Listing.